📄 শয়তানের ফাঁদ
হযরত হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের খুতবায় এটা বলতেন, মদ সকল পাপের সমষ্টি ও মূল এবং মহিলারা শয়তানের ফাঁদ এবং দুনিয়ার মহব্বত সমস্ত খারাবীর মূল। আর আমি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ রকম বলতে শুনেছি যে, মহিলাদেরকে এমনিভাবে পিছনে রাখ যেমনিভাবে আল্লাহ্ তাদেরকে পিছনে রেখেছেন।
মদ সকল পাপের সমষ্টি। আল্লামা তিবী (রহঃ) লিখেন যে, মদ পাপের সমষ্টি, অর্থাৎ মদ অনেক গোনাহকে সমন্বিত করে নেয়, সেই সবের মাধ্যম ও উপায় হয়। এর অর্থ এই নয় যে, যে ব্যক্তি মদ পান করে সে প্রকৃতপক্ষে গোনাহসমূহকে হজম করে নেয়। বরং হতে পারে যে, মদ পান করার পর সেগুলো করার মানসিকতা তার মধ্যে প্রকাশ পায়। কেননা, মদ হচ্ছে সমস্ত ভ্রষ্টাচার ও অশ্লীলতার উৎস। মদের নেশায় মানুষ বেহুশ হয়ে সম্পূর্ণ অন্ধ ও কাম রিপুর দাস হয়ে যায়। ভাল-মন্দ বা হালাল-হারামের পার্থক্য শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং কুকুরের মত কামরিপু চরিতার্থ করার পিছনে লেগে থাকে, তার বিবেকের উপর মরিচা পড়ে যায়। এজন্য একে উম্মুল খাবায়েছ বলে। (সকল ভ্রষ্টতা ও অশ্লীলতার উৎস) ও পাপাচারের সমষ্টি।
মহিলাদেরকে শয়তানের ফাঁদ এজন্য বলা হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি মহব্বত, তাদের দিকে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। মহিলারা শয়তানের প্ররোচনায় খুব তাড়াতাড়ি আকৃষ্ট হয়ে দ্বীন ও ঈমানের ব্যাপারে খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। নিজেতো পথভ্রষ্ট হয়ই, পুরুষদেরকেও পথভ্রষ্ট করে দেয়। নিজেদের সাজ-সজ্জা ও শোভা-সৌন্দর্যের প্রদর্শনী করে পরিপাটি করে বের হয়। ফিতনা ও ফাসাদের মাধ্যম ও কারণ হয়। মানুষরূপী শয়তানদেরকে নিজের দিকে আসক্ত করে এবং শয়তানের ফাঁদ বা জাল হিসেবে কাজ করে নিজের আখেরাত তো ধ্বংস করেই সাথে সাথে পুরুষদেরকেও বিপথগামী করে। বনী ঈসরাইল (মুসা আঃ-এর উম্মতের)-এর মাঝে যে ফিনা এসেছিল তাও মহিলাদের পক্ষ থেকেই ছিল এবং এ উম্মতের মধ্যে অনেক মানুষ মহিলাদের কারণে শয়তানের ফাঁদের মধ্যে আটকা পড়ে যায়। এজন্য মহিলাদেরকে দেখা, তাদের কথা শুনা এবং তাদের সাথে মিলামিশা থেকে দূরে থাকুন।
দুনিয়ার মহব্বত সমস্ত খারাবীর মূল। দুনিয়ার মহব্বতের জন্যই মানুষ আখেরাতের চেষ্টা ছেড়ে দুনিয়ার ধান্দায় ফেঁসে যায়। টাকা-পয়সা সংগ্রহে, ঘর-বাড়ী বানানোতে, গাড়ি কিনায় এবং ব্যাংক ব্যালেন্সের মোহে মেতে থাকে, হারাম কাজ করা, মিথ্যা কথা বলা, হারাম পন্থায় উপার্জন করাকেও তুচ্ছ মনে করে। এজন্য দুনিয়াকে মহব্বত করবেন না। একে ধোঁকার ঘর মনে করুন। দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ক্ষণস্থায়ী, এর ধন-সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, মান-সম্মান সবই ক্ষণস্থায়ী। অতএব চিরস্থায়ী বস্তুকে ক্ষণস্থায়ী ধ্বংসশীল জিনিসের উপর প্রাধান্য দিন এবং আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নিন, আখেরাতের চিন্তা করুন।
মহিলাদের আক্কেল বুদ্ধি কম হয়ে থাকে, তাদের দ্বীন অসম্পূর্ণ হয়। এজন্য তাদেরকে নামাযের কাতারেও পিছনে রাখা হবে এবং দেশ ও প্রশাসন ইত্যাদি নানা রকমের কাজের মধ্যেও তাদেরকে পিছনে রাখা হবে, যাতে করে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে এবং আখেরাত ধ্বংস না হয়।
📄 সর্বাপেক্ষা বড় বিপদ
হযরত জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার নিজ উম্মতের উপর সর্বাপেক্ষা বড় বিপদ স্বীয় খেয়াল খুশি ও উচ্চাকাংখা। স্বীয় খেয়াল খুশি মানুষকে ন্যায় থেকে দূরে রাখে এবং উচ্চাকাংখা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়। এই দুনিয়া গতিশীল ও ক্রমক্ষয়শীল। পক্ষান্তরে আখেরাত গতিশীল ও আসন্ন। এ দুটির প্রত্যেকটির কিছু সন্তান ও সাথী আছে। যদি তুমি দুনিয়ার সন্তান না হয়ে পার, তবে তুমি তাই কর। কেননা, তুমি আজ আমলের ঘরে আছ। এখানে আজ কোন হিসাব-কিতাব নেই। কালকে তুমি আখেরাতের ঘরে থাকবে, সেখানে আমলের সুযোগ পাবে না।
রিপুর তাড়না মানুষকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দেয়, নফসের দাস হয়ে সত্য থেকে দূরে সরে যায়। অহংকারের মধ্যে ডুবে থাকে, আখেরাতের জন্য তার কোন চিন্তাও হয় না, এর প্রস্তুতির জন্য কোন সময়ও পায় না। আর এ ব্যক্তি জানোয়ারের মত জীবন-যাপন করে আখেরাতের আযাবের যোগ্য হয়ে যায়। তার জীবনের উদ্দেশ্য খানা-পিনা এবং ইচ্ছামত চলাফেরা ছাড়া আর কিছুই হয় না।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা বড় বড় আশা-আকাঙ্ক্ষা মানুষকে আমল থেকে বিরত রাখে। এ ধরণের মানুষ মনে করে যে, আরো তো অনেক দিন বেঁচে থাকা হবে, তাই যৌবন আছে মজা করে যাও, পরে তাওবা করে নিবে। গোনাহের জন্য মাফ চেয়ে নিবে। এরূপ ব্যক্তি আখেরাত থেকে গাফেল হয়ে যায়, দুনিয়াই তার লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ে। দুনিয়া ধ্বংসশীল, বরফের মতো ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। কিন্তু বোঝা যায় না। যেমন করে নৌকা পানিতে চলার সময় মনেই হয় না যে চলতেছে, এমনিভাবে দুনিয়া চলতেছে, কিন্তু কোন খবরই নেই। আখেরাতের সময় খুব নিকটেই আসতেছে। যখন দুনিয়া খতম হয়ে যাবে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্মের সাজা দেওয়া হবে। পৃথিবীতে কিছু মানুষ দুনিয়াদার হয়, কিছু মানুষ দ্বীনদার হয় এবং আখেরাতের জন্য চেষ্টা সাধনা করে। এজন্য মানুষকে আখেরাতের জন্য চেষ্টা সাধনা করতে হবে। দুনিয়া হচ্ছে আমলাদি করার ঘর, এখানে যে বীজ বপন করা হবে, আখেরাতে সেই ফসলই পাওয়া যাবে। আজ হিসাব-কিতাব কিছুই নেই, কাল আমলের সুযোগ হবে না, তখন হিসাব-কিতাব হবে। অতএব এখন থেকেই আখেরাতের প্রস্তুতি নিয়ে নাও, নেক আমলের ভাণ্ডার বৃদ্ধি করে নাও।
📄 দুনিয়া ও আখেরাতের সন্তান-সন্ততি
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, দুনিয়া পিঠ দেখিয়ে বিদায় হয়ে গেছে এবং আখেরাত মুখ দেখিয়ে সামনে এসে গেছে। এই দুটির প্রত্যেকের সন্তান-সন্ততি আছে। সুতরাং তোমরা আখেরাতের সন্তান হও, দুনিয়ার সন্তান হইও না। কেননা, আজ আমলের সময়, হিসাব-কিতাব কিছু নেই। কিন্তু কাল হিসাব-কিতাব হবে, আমলের অবকাশ পাবে না।
এটাতো পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, দুনিয়া খুব তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং পিঠ দেখিয়ে বিদায় নেয়। এর সকল নিয়ামত, আরাম-আয়েশ ও উপায়-উপকরণ নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। তার প্রত্যেকটি নেয়ামতের সাথে কষ্ট এবং প্রত্যেক আনন্দের সাথে বিপদ মিশ্রিত থাকে, সমস্ত কিছুই প্রতারণায় বেষ্টিত এবং বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। দুনিয়া ধূর্ত ও প্রতারক গিরগিটের (টিকটিকির চাইতে বড় এক প্রকার বিষাক্ত প্রাণী) ন্যায় রং পরিবর্তনকারী। পক্ষান্তরে আখেরাত নিশ্চিত। এর আগমন, এর চিরস্থায়ীত্ব, এর নিয়ামত- সমূহ উপায়-উপকরণ, আরাম-আয়েশ ও আনন্দ-অনুগ্রহাদি সর্ব সময়ের জন্য হওয়া, আখেরাতের আনন্দের সাথে কোন রকম কষ্ট ও মুসীবতের কোন আশঙ্কা নাহওয়া পরিষ্কারভাবে সামনে এসে গেছে। তোমরা দুনিয়াকে স্থায়ী মনে করেছিলে, কিন্তু এটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অতএব আখেরাত সুনিশ্চিত ও চিরস্থায়ী। আর এটাও একটা বাস্তব অভিজ্ঞতার জিনিস যে, দুনিয়া ও আখেরাতের প্রত্যেকের কিছু অনুসারী সন্তান ও তাবেদার আছে। এ ব্যাপারে চিন্তা করুন, বুঝুন, বুদ্ধিমান হোন, বিবেকের দ্বারা কাজ করুন, আখেরাতের মুতাওয়াল্লী, সন্ধানকারী ও সন্তান- সন্ততি হয়ে যান। দুনিয়ার সন্তান কখনো হবেন না। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। দুনিয়া থেকেই যা কিছু করার করে নিন। আজ আমলের সময়, আখেরাতের ভাণ্ডার বানানোর সময়, আখেরাতের শস্য বপনের সময়, এখন হিসাব-কিতাব কিছু নেই। কিন্তু মনে রাখবেন, চোখ বন্ধ হওয়ার পরেই আমলের সময় শেষ হয়ে যাবে, কেয়ামতের দিবসে প্রত্যেক জিনিসের হিসাব-কিতাব হবে, তখন আমলের সুযোগ শেষ হয়ে যাবে, সেখানে আমলের অনেক প্রয়োজন হবে। অতএব এ সত্যকে উত্তমরূপে বুঝুন এবং দুনিয়ায় থাকাকালীন সময়েই নেক আমলাদি করে আখেরাতের প্রস্তুতি নিয়ে নিন।
📄 দুনিয়া ও আখেরাত
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার খুতবা দিচ্ছিলেন এবং খুতবায় বলতেছিলেন, শুনে রাখ, দুনিয়া এ রকম এক ক্ষণস্থায়ী ও বর্তমান আসবাব, যার দ্বারা নেককার ও বদকার উভয়ে ফায়েদা উঠায় এবং আখেরাত এমন এক নির্ধারিত স্থান যে, তা সম্পূর্ণ হক ও সত্য। ঐ দিন এমন এক বাদশাহ মিমাংসা ও ফয়সালা করবেন, যিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাশালী। শুনে রাখ, সমস্ত কল্যাণ পুরোপুরি বেহেস্তে হবে। অতএব তোমরা আমল কর এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং তোমরা জেনে নাও যে, তোমাদেরকে তোমাদের সমস্ত আমলের সামনে উপস্থিত করা হবে।
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرَا يَرَهُ (زلزال)
“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।”
দুনিয়াকে ধ্বংসশীল জিনিস বলা হয়েছে, ইহা এমন বস্তু যার দ্বারা ক্ষণিকের ফায়দা হাসিল করা যায়। এটা এমন এক উপকরণ যে, কিছুদিন মানুষের ব্যবহারে থাকে, তারপর ভেঙ্গেচুরে শেষ হয়ে যায়। এমন এক জিনিস এই দুনিয়া, যার দ্বারা নেককার, ছালেহ ও তালেহ সকলেই ফায়দা উঠায়, যে চায় সে নিয়ে নেয়, যে চায় সে সংগ্রহ করে ব্যবহার করে। এটাকে আল্লাহ্ সবার জন্য ব্যাপক করে দিয়েছেন। আখেরাতের দিবস সুনিশ্চিত, অবশ্যম্ভাবী। তার আগমন নিশ্চিত সত্য। ঐ দিন নেককার ও বদকারদের মধ্যে এমন এক সত্ত্বা মীমাংসা করবেন, যিনি সমস্ত জিনিসের মালিক ও ক্ষমতাশালী। তাঁকে তার সঠিক ন্যায় বিচার, ফয়সালা থেকে কেউ বাধা দিতে পারবে না। ভাল ও কল্যাণ, নেকী ও সৎকর্মের স্থান হচ্ছে জান্নাত। অতএব যদি জান্নাতে যেতে চাও তবে নেক কাজ কর, ভালকে পছন্দ কর, যাতে তুমিও তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পার। পাপ, অন্যায়, মন্দ ও অকল্যাণ সমস্ত কিছুরই স্থান হচ্ছে দোযখ। অতএব তা থেকে দূরে থাক, বেঁচে থাকার চেষ্টা কর, যাতে সে তোমাকে নিয়ে না নিতে পারে। নেক আমলসমূহ করতে থাক এবং আল্লাহ্ তা'আলার পাকড়াওকে ভয় করতে থাক, আর এই দু'আ করতে থাক যেন আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদেরকে গোনাহ্, অন্যায়, পাপ থেকে হেফাজত করেন। মনে রেখো, যেমন কর্ম তেমন ফল। কেয়ামতের দিন তোমার আমলসমূহ তোমার সামনে খুলে দেখানো হবে এবং বলা হবে, পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।
اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا (بنی اسرائيل ১৪)
“পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ১৪)
يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ (الحاقة ১৮)
“সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে, তোমাদের কোন কিছু গোপন থাকবে না।” (সূরা হাক্কাহঃ ১৮)
যদি নেক কাজ করে থাক তবে ভাল ফল পাবে, আর যদি গোনাহ্ কর তবে তার সাজা ও আযাব পাবে। অতএব আখেরাতকে গড়ে নাও এবং সেই দিনের আযাবের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাক। গোনাহসমূহ থেকে দূরে থাক, আগামীকাল সমস্ত কিছুই সামনে হাজির হবে। নেক আমল করতে থাক, ছোট থেকে ছোট আমলকেও কখনো ছোট ভেবোনা। কেয়ামতের দিন ঐ সব তোমাদের কাজে লাগবে, জানাতো নেই কোন্ কথার উপর জান্নাত পেয়ে যাবে।