📄 ধ্বংসের মূল
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নির্মাণ কাজে হারাম থেকে বেঁচে থাক। এজন্য যে, এটা ধ্বংসের মূল।
অর্থাৎ অট্টালিকা নির্মাণ ইত্যাদিতে হারাম বা অবৈধ টাকা-পয়সার ব্যবহার অথবা টাকা-পয়সা দ্বারা হারাম বা অবৈধ কাজসমূহ অবলম্বন করা দ্বীনের ধ্বংস অথবা অট্টালিকা ধ্বংসের উসীলা বা কারণ হয়। এতে বোঝা গেল যে, হালাল পয়সা দ্বারা নির্মাণ কাজ জায়েয আছে, এই শর্তে যে, তা নির্মাণের সীমা পর্যন্ত হবে। গর্ব বা অপচয়ের কারণ হবে না। অথবা তার অর্থ এই যে, নির্মাণে পয়সা ব্যয় করা নিষিদ্ধ, তা থেকে বেঁচে থাক। কারণ এতে গর্ব, ঔদ্ধত্য আসে এবং অপচয় হয়। অথবা ভয় প্রদর্শন ও তিরস্কারের জন্য এরূপ বলা হয়েছে অথবা এর অর্থ এই যে, অট্টালিকা ধ্বংসের মূল। যদি অট্টালিকা না হতো তবে ধ্বংস ও ক্ষতি হতো না। দুনিয়াতে জন্ম হয়েছে, অতএব মৃত্যুও হবে। যার নির্মাণ হয়, তার বিনষ্টও রয়েছে। অতএব এই বিষয়ে সতর্কতা এই যে, হে আল্লাহ্র বান্দারা! এগুলো অচিরেই ধ্বংস ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। তবে কেন এরূপ ধ্বংসশীল জিনিসের মধ্যে লিপ্ত থাকা, ব্যস্ত থাকা? এর জন্যে এতো কষ্ট, এত চেষ্টা সাধনা করার কি কারণ আছে? নিজের বিবেক বিবেচনার দ্বারা সকল কাজ করুন এবং সতর্কতা অবলম্বন করুন। অতিরিক্ত যে কোন কিছু সর্বদা এড়িয়ে চলুন।
📄 মাল দৌলত সঞ্চয়কারী আহাম্মক
হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুনিয়া তার ঘর, যার আর কোন ঘর নেই এবং দুনিয়া তার সম্পদ, যার আর কোন সম্পদ নেই এবং একে সে-ই সংগ্রহ করে, যার মধ্যে বুদ্ধি নেই।
অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়াকে বাসস্থান বানিয়ে বসে, সে হচ্ছে বোকা। সে এমন ব্যক্তি যে, তার যেন কোন ঘরই নেই। কেননা, তাকে কিছুক্ষণ পরেই এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতেই হবে। অতএব সে যেহেতু আখেরাতের জন্য ঘর বানায়নি, সেহেতু সে যখন দুনিয়া থেকে সফর করে চলে গেলো, তখন তার জন্য আর কোন ঘর থাকল না। যে ব্যক্তি দুনিয়ার সম্পদ সংগ্রহ করে এবং আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে না, আখেরাতের জন্য প্রথম থেকেই কিছু করেনি, সে একেবারেই রিক্ত হস্ত, তার হাতে কিছুই নেই। কারণ মালের ঐ অংশই কাজে আসবে, যে অংশ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করা হয়, আখেরাতের সঞ্চয় বানানো হয়, অথচ সে এমনটি করেনি। অথবা এর অর্থ এই যে, যার কাছে আখেরাতের সম্পদ ও ঘর নেই, দুনিয়াই তার ঘর ও সম্পদ যা একেবারেই নিরর্থক ও ফায়দাহীন। কারণ চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া মাত্রই ঘর-বাড়ীও ওয়ারেসদের এবং ধন-সম্পদও তাদেরই হয়ে যায়। এখন তুমি (মৃত ব্যক্তি) তাদের দয়া, করুণা ও উদারতার উপর নির্ভরশীল। যদি তারা গোসল ও কাফন না দেয়, তবে খয়রাতি প্রতিষ্ঠানের দ্বারা কাফন দাফনের ব্যবস্থা করাতে হবে। অতএব বিবেকের দ্বারা কাজ কর, আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে নাও এবং আখেরাতের ঘর প্রস্তুত কর। দুনিয়ার স্বাদ, ভোগ, বিলাস ও আনন্দ স্ফূর্তির জন্য, দুনিয়ার মাল ও দৌলত শুধুমাত্র বোকা মানুষই সংগ্রহ করে। এ নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী ঘরকে এমন উত্তমরূপে নির্মাণ করে, মনে হয় যেন এখানেই চিরকাল থাকবে, সরাইখানাকে নিজের স্থায়ী বাড়ী মনে করে। এটা খুবই বোকামী ও বুদ্ধিহীনতার কথা, বুদ্ধিমান কখনোও এমন করে না।
📄 শয়তানের ফাঁদ
হযরত হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের খুতবায় এটা বলতেন, মদ সকল পাপের সমষ্টি ও মূল এবং মহিলারা শয়তানের ফাঁদ এবং দুনিয়ার মহব্বত সমস্ত খারাবীর মূল। আর আমি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ রকম বলতে শুনেছি যে, মহিলাদেরকে এমনিভাবে পিছনে রাখ যেমনিভাবে আল্লাহ্ তাদেরকে পিছনে রেখেছেন।
মদ সকল পাপের সমষ্টি। আল্লামা তিবী (রহঃ) লিখেন যে, মদ পাপের সমষ্টি, অর্থাৎ মদ অনেক গোনাহকে সমন্বিত করে নেয়, সেই সবের মাধ্যম ও উপায় হয়। এর অর্থ এই নয় যে, যে ব্যক্তি মদ পান করে সে প্রকৃতপক্ষে গোনাহসমূহকে হজম করে নেয়। বরং হতে পারে যে, মদ পান করার পর সেগুলো করার মানসিকতা তার মধ্যে প্রকাশ পায়। কেননা, মদ হচ্ছে সমস্ত ভ্রষ্টাচার ও অশ্লীলতার উৎস। মদের নেশায় মানুষ বেহুশ হয়ে সম্পূর্ণ অন্ধ ও কাম রিপুর দাস হয়ে যায়। ভাল-মন্দ বা হালাল-হারামের পার্থক্য শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং কুকুরের মত কামরিপু চরিতার্থ করার পিছনে লেগে থাকে, তার বিবেকের উপর মরিচা পড়ে যায়। এজন্য একে উম্মুল খাবায়েছ বলে। (সকল ভ্রষ্টতা ও অশ্লীলতার উৎস) ও পাপাচারের সমষ্টি।
মহিলাদেরকে শয়তানের ফাঁদ এজন্য বলা হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি মহব্বত, তাদের দিকে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। মহিলারা শয়তানের প্ররোচনায় খুব তাড়াতাড়ি আকৃষ্ট হয়ে দ্বীন ও ঈমানের ব্যাপারে খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। নিজেতো পথভ্রষ্ট হয়ই, পুরুষদেরকেও পথভ্রষ্ট করে দেয়। নিজেদের সাজ-সজ্জা ও শোভা-সৌন্দর্যের প্রদর্শনী করে পরিপাটি করে বের হয়। ফিতনা ও ফাসাদের মাধ্যম ও কারণ হয়। মানুষরূপী শয়তানদেরকে নিজের দিকে আসক্ত করে এবং শয়তানের ফাঁদ বা জাল হিসেবে কাজ করে নিজের আখেরাত তো ধ্বংস করেই সাথে সাথে পুরুষদেরকেও বিপথগামী করে। বনী ঈসরাইল (মুসা আঃ-এর উম্মতের)-এর মাঝে যে ফিনা এসেছিল তাও মহিলাদের পক্ষ থেকেই ছিল এবং এ উম্মতের মধ্যে অনেক মানুষ মহিলাদের কারণে শয়তানের ফাঁদের মধ্যে আটকা পড়ে যায়। এজন্য মহিলাদেরকে দেখা, তাদের কথা শুনা এবং তাদের সাথে মিলামিশা থেকে দূরে থাকুন।
দুনিয়ার মহব্বত সমস্ত খারাবীর মূল। দুনিয়ার মহব্বতের জন্যই মানুষ আখেরাতের চেষ্টা ছেড়ে দুনিয়ার ধান্দায় ফেঁসে যায়। টাকা-পয়সা সংগ্রহে, ঘর-বাড়ী বানানোতে, গাড়ি কিনায় এবং ব্যাংক ব্যালেন্সের মোহে মেতে থাকে, হারাম কাজ করা, মিথ্যা কথা বলা, হারাম পন্থায় উপার্জন করাকেও তুচ্ছ মনে করে। এজন্য দুনিয়াকে মহব্বত করবেন না। একে ধোঁকার ঘর মনে করুন। দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ক্ষণস্থায়ী, এর ধন-সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, মান-সম্মান সবই ক্ষণস্থায়ী। অতএব চিরস্থায়ী বস্তুকে ক্ষণস্থায়ী ধ্বংসশীল জিনিসের উপর প্রাধান্য দিন এবং আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নিন, আখেরাতের চিন্তা করুন।
মহিলাদের আক্কেল বুদ্ধি কম হয়ে থাকে, তাদের দ্বীন অসম্পূর্ণ হয়। এজন্য তাদেরকে নামাযের কাতারেও পিছনে রাখা হবে এবং দেশ ও প্রশাসন ইত্যাদি নানা রকমের কাজের মধ্যেও তাদেরকে পিছনে রাখা হবে, যাতে করে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে এবং আখেরাত ধ্বংস না হয়।
📄 সর্বাপেক্ষা বড় বিপদ
হযরত জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার নিজ উম্মতের উপর সর্বাপেক্ষা বড় বিপদ স্বীয় খেয়াল খুশি ও উচ্চাকাংখা। স্বীয় খেয়াল খুশি মানুষকে ন্যায় থেকে দূরে রাখে এবং উচ্চাকাংখা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়। এই দুনিয়া গতিশীল ও ক্রমক্ষয়শীল। পক্ষান্তরে আখেরাত গতিশীল ও আসন্ন। এ দুটির প্রত্যেকটির কিছু সন্তান ও সাথী আছে। যদি তুমি দুনিয়ার সন্তান না হয়ে পার, তবে তুমি তাই কর। কেননা, তুমি আজ আমলের ঘরে আছ। এখানে আজ কোন হিসাব-কিতাব নেই। কালকে তুমি আখেরাতের ঘরে থাকবে, সেখানে আমলের সুযোগ পাবে না।
রিপুর তাড়না মানুষকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দেয়, নফসের দাস হয়ে সত্য থেকে দূরে সরে যায়। অহংকারের মধ্যে ডুবে থাকে, আখেরাতের জন্য তার কোন চিন্তাও হয় না, এর প্রস্তুতির জন্য কোন সময়ও পায় না। আর এ ব্যক্তি জানোয়ারের মত জীবন-যাপন করে আখেরাতের আযাবের যোগ্য হয়ে যায়। তার জীবনের উদ্দেশ্য খানা-পিনা এবং ইচ্ছামত চলাফেরা ছাড়া আর কিছুই হয় না।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা বড় বড় আশা-আকাঙ্ক্ষা মানুষকে আমল থেকে বিরত রাখে। এ ধরণের মানুষ মনে করে যে, আরো তো অনেক দিন বেঁচে থাকা হবে, তাই যৌবন আছে মজা করে যাও, পরে তাওবা করে নিবে। গোনাহের জন্য মাফ চেয়ে নিবে। এরূপ ব্যক্তি আখেরাত থেকে গাফেল হয়ে যায়, দুনিয়াই তার লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ে। দুনিয়া ধ্বংসশীল, বরফের মতো ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। কিন্তু বোঝা যায় না। যেমন করে নৌকা পানিতে চলার সময় মনেই হয় না যে চলতেছে, এমনিভাবে দুনিয়া চলতেছে, কিন্তু কোন খবরই নেই। আখেরাতের সময় খুব নিকটেই আসতেছে। যখন দুনিয়া খতম হয়ে যাবে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্মের সাজা দেওয়া হবে। পৃথিবীতে কিছু মানুষ দুনিয়াদার হয়, কিছু মানুষ দ্বীনদার হয় এবং আখেরাতের জন্য চেষ্টা সাধনা করে। এজন্য মানুষকে আখেরাতের জন্য চেষ্টা সাধনা করতে হবে। দুনিয়া হচ্ছে আমলাদি করার ঘর, এখানে যে বীজ বপন করা হবে, আখেরাতে সেই ফসলই পাওয়া যাবে। আজ হিসাব-কিতাব কিছুই নেই, কাল আমলের সুযোগ হবে না, তখন হিসাব-কিতাব হবে। অতএব এখন থেকেই আখেরাতের প্রস্তুতি নিয়ে নাও, নেক আমলের ভাণ্ডার বৃদ্ধি করে নাও।