📄 ভাগ্যবান ও হতভাগ্য ব্যক্তি
হযরত সাহর বিন সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ভালোর অনেকগুলো ভাণ্ডার আছে এবং এই ভাণ্ডারের অনেকগুলো চাবি আছে। অতএব কতই কল্যাণ ঐ ব্যক্তির জন্য, যাকে আল্লাহ্ তা'আলা কল্যাণের জন্য চাবি ও উসিলার মাধ্যম বানান এবং তাকে আল্লাহ্ তা'আলা অকল্যাণ বন্ধকারী বানান। পক্ষান্তরে ধ্বংস ঐ ব্যক্তির জন্য, যাকে আল্লাহ্ তা'আলা মন্দের প্রচলনকারী এবং ভাল বা কল্যাণ বন্ধকারী বানান।
ভাল, কল্যাণ এবং নেকীর অনেক পথ ও উপায় রয়েছে। যে ব্যক্তি নেকী ও কল্যাণসমূহ করার মাধ্যম হয় এবং অন্যদের জন্য নমুনা ও দৃষ্টান্ত হয়, যত মানুষ তার অনুসরণ করবে, তাঁরা উক্ত নেকীর যেরূপ প্রতিদান পাবে, তদ্রুপ সেই ব্যক্তিও এর মাধ্যম ও কারণ হবার প্রতিফল পাবে এবং তার কারণে মন্দ, অকল্যাণ, কুফর ও নাফরমানী, অহংকার ও গর্বের যত রাস্তা বন্ধ হবে এবং যত মানুষ তার চেষ্টা, তদবীর ও মেহনতের দ্বারা অকল্যাণ থেকে বাঁচবে, সে তার প্রতিফল ও সওয়াব পাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি গোনাহ, নাফরমানী এবং অপছন্দনীয় কাজকর্মের কারণ হয়, মানুষের মধ্যে অমুসলিমদের রীতি-নীতি প্রচলিত করে, বেহায়াপনা ও ব্যভিচারের দ্বার খুলে, এমন ব্যক্তিও নেকীর জন্য বাধা এবং অকল্যাণ ও গোনাহসমূহের প্রসারকারী হয়, এই সমস্ত মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর আজাব রয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (النور (১৯)
"যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।”
এর কারণে যত মানুষ গোনাহতে লিপ্ত হবে, তাদের যত গোনাহ্ হবে, তাদের সাথে সাথে তারও গোনাহ্ হতে থাকবে। কারণ, সে তার মাধ্যম ও কারণ হয়েছে। ইহা বিরাট ধ্বংস, অকৃতকার্যতা ও ক্ষতির কথা যে, মানুষ কল্যাণ ও নেকীর নমুনা হওয়ার পরিবর্তে গোনাহ্ ও অকল্যাণের নেতা হয়, অনুকরণীয় হয়। নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যারা মিল ফ্যাক্টরীতে, অফিস-আদালতে চাল-চলনে, পোশাক-পরিচ্ছদে মুসলমানদেরকে অমুসলিমদের অনুকরণে বাধ্য করে, তাদের এর পরিণাম বুঝে আগে বাড়া দরকার। অর্থ হালাল পন্থায়ও আসে, হারাম পন্থায়ও আসে। তবে হালাল পথে অর্জিত পয়সা দুনিয়ার জন্যও শান্তির বিষয় হয় এবং আখেরাতেও আপনি কল্যাণ ও নেকীর নেতা হতে পারেন, আবার গোনাহ্ ও নাফরমানীরও নেতা হতে পারেন। এই দুটির মধ্যে যেটা উত্তম সেটাই অবলম্বন করুন। কিন্তু কিছু পয়সার লোভে দ্বীন, ঈমান, সম্মান ধ্বংস করবেন না।
📄 বরকতশূণ্য ধন-সম্পদ
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন মানুষের জন্য তার মালের মধ্যে বরকত দেওয়া হয় না তখন সে ওটাকে ইট ও কাদায় লাগিয়ে দেয়।
তাদের জন্য অতটুকু জায়গায়ই যথেষ্ট, যার মধ্যে তার বিবি বাচ্চার প্রয়োজন মিটে যায়। এর চাইতে বেশী নির্মাণ কাজ প্রভৃতিতে অর্থ ব্যয় করার মানে অর্থ ধ্বংস করা এবং আখেরাতের জবাবদিহীতার কারণ হওয়া।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত যত বেশি অর্থ সম্পদ ব্যয় করা হবে, তার হিসাব দিতে হবে। এই মাল যদি বরকতময় হত, তবে মসজিদ মাদ্রাসাসমূহে এবং অন্য কোন সদকায়ে জারিয়ায় ব্যয় হত এবং আখেরাতের বড় বড় মর্তবা দান করত। কিন্তু তার বদলে ইট কাদায় ব্যয় হয়ে গেছে-এতে না দুনিয়ার লাভ হলো, না আখেরাতের লাভ হলো। আর হিসাব কিতাব জবাবদিহীতা তো রয়েই গেল। এজন্য নির্মাণজনিত কাজ ইত্যাদিতে অর্থ বিনষ্ট ও ধ্বংস করবেন না।
📄 ধ্বংসের মূল
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নির্মাণ কাজে হারাম থেকে বেঁচে থাক। এজন্য যে, এটা ধ্বংসের মূল।
অর্থাৎ অট্টালিকা নির্মাণ ইত্যাদিতে হারাম বা অবৈধ টাকা-পয়সার ব্যবহার অথবা টাকা-পয়সা দ্বারা হারাম বা অবৈধ কাজসমূহ অবলম্বন করা দ্বীনের ধ্বংস অথবা অট্টালিকা ধ্বংসের উসীলা বা কারণ হয়। এতে বোঝা গেল যে, হালাল পয়সা দ্বারা নির্মাণ কাজ জায়েয আছে, এই শর্তে যে, তা নির্মাণের সীমা পর্যন্ত হবে। গর্ব বা অপচয়ের কারণ হবে না। অথবা তার অর্থ এই যে, নির্মাণে পয়সা ব্যয় করা নিষিদ্ধ, তা থেকে বেঁচে থাক। কারণ এতে গর্ব, ঔদ্ধত্য আসে এবং অপচয় হয়। অথবা ভয় প্রদর্শন ও তিরস্কারের জন্য এরূপ বলা হয়েছে অথবা এর অর্থ এই যে, অট্টালিকা ধ্বংসের মূল। যদি অট্টালিকা না হতো তবে ধ্বংস ও ক্ষতি হতো না। দুনিয়াতে জন্ম হয়েছে, অতএব মৃত্যুও হবে। যার নির্মাণ হয়, তার বিনষ্টও রয়েছে। অতএব এই বিষয়ে সতর্কতা এই যে, হে আল্লাহ্র বান্দারা! এগুলো অচিরেই ধ্বংস ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। তবে কেন এরূপ ধ্বংসশীল জিনিসের মধ্যে লিপ্ত থাকা, ব্যস্ত থাকা? এর জন্যে এতো কষ্ট, এত চেষ্টা সাধনা করার কি কারণ আছে? নিজের বিবেক বিবেচনার দ্বারা সকল কাজ করুন এবং সতর্কতা অবলম্বন করুন। অতিরিক্ত যে কোন কিছু সর্বদা এড়িয়ে চলুন।
📄 মাল দৌলত সঞ্চয়কারী আহাম্মক
হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুনিয়া তার ঘর, যার আর কোন ঘর নেই এবং দুনিয়া তার সম্পদ, যার আর কোন সম্পদ নেই এবং একে সে-ই সংগ্রহ করে, যার মধ্যে বুদ্ধি নেই।
অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়াকে বাসস্থান বানিয়ে বসে, সে হচ্ছে বোকা। সে এমন ব্যক্তি যে, তার যেন কোন ঘরই নেই। কেননা, তাকে কিছুক্ষণ পরেই এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতেই হবে। অতএব সে যেহেতু আখেরাতের জন্য ঘর বানায়নি, সেহেতু সে যখন দুনিয়া থেকে সফর করে চলে গেলো, তখন তার জন্য আর কোন ঘর থাকল না। যে ব্যক্তি দুনিয়ার সম্পদ সংগ্রহ করে এবং আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে না, আখেরাতের জন্য প্রথম থেকেই কিছু করেনি, সে একেবারেই রিক্ত হস্ত, তার হাতে কিছুই নেই। কারণ মালের ঐ অংশই কাজে আসবে, যে অংশ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করা হয়, আখেরাতের সঞ্চয় বানানো হয়, অথচ সে এমনটি করেনি। অথবা এর অর্থ এই যে, যার কাছে আখেরাতের সম্পদ ও ঘর নেই, দুনিয়াই তার ঘর ও সম্পদ যা একেবারেই নিরর্থক ও ফায়দাহীন। কারণ চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া মাত্রই ঘর-বাড়ীও ওয়ারেসদের এবং ধন-সম্পদও তাদেরই হয়ে যায়। এখন তুমি (মৃত ব্যক্তি) তাদের দয়া, করুণা ও উদারতার উপর নির্ভরশীল। যদি তারা গোসল ও কাফন না দেয়, তবে খয়রাতি প্রতিষ্ঠানের দ্বারা কাফন দাফনের ব্যবস্থা করাতে হবে। অতএব বিবেকের দ্বারা কাজ কর, আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে নাও এবং আখেরাতের ঘর প্রস্তুত কর। দুনিয়ার স্বাদ, ভোগ, বিলাস ও আনন্দ স্ফূর্তির জন্য, দুনিয়ার মাল ও দৌলত শুধুমাত্র বোকা মানুষই সংগ্রহ করে। এ নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী ঘরকে এমন উত্তমরূপে নির্মাণ করে, মনে হয় যেন এখানেই চিরকাল থাকবে, সরাইখানাকে নিজের স্থায়ী বাড়ী মনে করে। এটা খুবই বোকামী ও বুদ্ধিহীনতার কথা, বুদ্ধিমান কখনোও এমন করে না।