📄 প্রয়োজন মাফিক দুনিয়া
হযরত মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত যে, নিজের আত্মীয় মামা আবূ হাসেম বিন ওতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তাঁর অসুস্থতার খবর নিতে গেলেন। আবু হাসেম তখন কাঁদতে লাগলেন। তিনি আরয করলেন, মামা কি ব্যাপার? আপনি কি ব্যথার জন্য পেরেশান? নাকি দুনিয়ার চিন্তায় পেরেশান? আবু হাসেম বললেন, না, একটুকুও না বরং হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে একটা শপথ নিয়েছিলেন, আমি তার উপর আমল করতে পারলাম না। তিনি আরয করলেন, কি শপথ নিয়েছিলেন? আবু হাসেম বললেন, আমি হুযূরকে এটা বলতে শুনেছি যে, তোমাদের জন্য ধন-সম্পদ থেকে এতটুকু সংগ্রহ করা যথেষ্ট যে, একটি খাদেম হবে এবং আল্লাহ্র রাস্তার জন্য একটি যানবাহন হবে, কিন্তু আমি মনে করি যে, আমি ধন-সম্পদ (এরচেয়ে বেশী জমা) করেছি।
তাঁদের যুহদ ও দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ততার অবস্থা এই ছিল যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যেক আদেশের উপর আমল করতে আগ্রহী ছিলেন। যদি কোন কথার উপর কোন রকম আমল হতে না দেখতেন, তবে এটাকে তাঁরা অনেক খারাপ জানতেন এবং সে জন্যে আফসোস করতেন। তাঁদের নিকট কোন বড় রকমের ধন-সম্পদ বা জমিদারী ছিল না। অবশ্য অল্প সম্পদ ছিল, কিন্তু এটাকেও নবীর ইচ্ছার খেলাফ মনে করে তার জন্য দুঃখ, অনুশোচনা ও আফসোসের মধ্যে পড়ে থাকতেন।
📄 শয়তানের কষ্টের ঘাঁটি
পারাপারে কষ্টকর ঘাটি
হযরত উম্মে দারদা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন যে, আমি আবূ দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশ্ন করেছিলাম, কি কারণে আপনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ঐ রকম ধন-সম্পদ চান না, যেভাবে অমুক সাহেব চান? উনি বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এটা বলতে শুনেছি, তোমাদের সম্মুখে একটা কষ্টদায়ক ঘাটি আসছে, তোমরা অতিরিক্ত বোঝা বহন করে উহা পার হতে পারবে না। এজন্য আমি চাই যে, ঐ ঘাটি পার হওয়ার জন্য হালকা পাতলা থাকি।
অর্থাৎ তোমাদের ও জান্নাতের প্রবেশের মধ্যে একটা খুব শক্ত ও পারাপারে কঠিন ঘাটি প্রতিবন্ধক রয়েছে, ওটা পার হয়েই জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে। এই ঘাটির দ্বারা কি উদ্দেশ্য; আল্লামা তিবী (রহঃ) বলেন, এর দ্বারা মৃত্যু, কবর, হাশর এবং তার অবস্থা ও কঠোরতা উদ্দেশ্য। যেমনিভাবে ঘাটি পার হওয়া কঠিন কাজ তেমনিভাবে বেহেস্তে প্রবেশের মধ্যে প্রতিবন্ধক ঐ মধ্যবর্তী স্থানগুলো পার হওয়াও কঠিন। পার্থিব ধন-সম্পদ, দুনিয়ার দায়িত্ব সম্পর্কে সওয়াল-জওয়াব এবং হিসাব কিতাব, কবরের আজাব থেকে বাঁচার মত কাজকাম করা, হাশরের অবস্থা, কঠোরতা থেকে রক্ষা পাওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার। এটা অনেক কঠিন সফর, এজন্য খুব মেহনত ও চেষ্টা সাধনার প্রয়োজন, আমি দুনিয়ার আসবাবপত্রের মধ্যে জড়িয়ে নিজের পেরেশানী (দুঃখ কষ্ট দুশ্চিন্তা) বাড়াতে চাই না। মালের চিন্তাও থাকবে না, তার জন্য গ্রেফতার হওয়ার চিন্তাও নেই, দুনিয়াও হবে না। দুনিয়ার উপাদান হবে না এবং তার জন্য আখেরাতের জবাবদিহীতার চিন্তাও থাকবে না। যেভাবে ঐ ব্যক্তি, যার কাছে কিছু থাকে না, সে কাস্টম থেকে কোন রকম কষ্ট ও বিড়ম্বনা ছাড়াই বাইরে এসে পড়ে। এমনিভাবে সেই ব্যক্তি যে দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকে, সে আখেরাতের জবাবদিহী থেকে তাড়াতাড়ি মুক্তি পেয়ে যাবে।
📄 ধন-সম্পদ ও দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া
হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি কি এমন আছে, যে পানির উপর চলে; কিন্তু তার পা পানিতে ভিজে না? আরয করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! এমন কোন ব্যক্তি নেই। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এমনিভাবে দুনিয়াদারও গোনাহ থেকে বাঁচতে পারে না।
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সহজবোধ্য ও সুস্পষ্ট উদাহরণ দ্বারা দুনিয়া এবং তার কিছু আনুষঙ্গিক বিষয়াদি, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও গোনাহসমূহের উদাহরণ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, যেরূপ কখনো কোন ব্যক্তি পানিতে পদচারণা করে তখন তার পা অবশ্যই পানিতে ভিজে। এমনিভাবে যে ব্যক্তি দুনিয়ার সহিত সম্পৃক্ত, দুনিয়া অর্জন করবে, দুনিয়ার সাথে বন্ধুত্ব রাখবে, সেও গোনাহ থেকে বাঁচতে পারবে না। অতএব যদি আখেরাতকে গড়তে হয়, দুনিয়ার গ্রেফতারী থেকে বাঁচতে চাও, তবে অল্পে সন্তুষ্টির সাথে যা আছে তা দিয়েই কাজ শেষ করে নাও এবং প্রয়োজন মাফিক উপার্জনকে যথেষ্ট মনে করো। অতিরিক্ত সম্পদ, আরাম, আয়েশ এবং পজিশন ও দায়িত্বের পিছনে পড়বে না। নতুবা এই পরিমাণ জবাবদিহীতা, সওয়াল ও জওয়াব এবং দুঃখ-দুর্দশা, দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। এরূপ ব্যক্তি খুবই ভাগ্যবান ও ধন্য, যার নিকট জরুরত পরিমাণ যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে এবং তার নিকট অল্পে সন্তুষ্টির দৌলতও আছে। তার মৃত্যুতে ক্রন্দনকারী খুব কম হয় এবং তার দায়-দায়িত্বও কম হয়।
📄 ঈমানতে লিপ্ত থাকা
ইবাদতে লিপ্ত থাকুন
হযরত জুবায়ের বিন নুফায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার নিকট এই ওহী নাযিল হয়নি যে, আমি সম্পদ জমা করব এবং ব্যবসায়ী হবো; বরং এই ওহী নাযিল হয়েছে-
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ وَاعْبُدْ رَبِّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
অর্থঃ “অতএব আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন, প্রশংসা করুন এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান এবং পালনকর্তার এবাদত করতে থাকুন, যে পর্যন্ত না আপনার কাছে নিশ্চিন্তের কথা আসে।”
মানুষকে দুনিয়াতে ব্যবসায়ী, জমিদার বা ঠিকাদার, মালদার, কারিগর হওয়ার জন্য পাঠানো হয়নি বরং সৃষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করা। অবশ্য দুনিয়ার প্রয়োজন মিটানোর জন্য ব্যবসা, দোকানদারী অথবা অন্য কোন কাজ করতে অসুবিধা নেই। কিন্তু মানুষ যেন এসবকে প্রকৃত উদ্দেশ্য বানিয়ে তার মধ্যে এমনভাবে লিপ্ত না হয়ে যায়, যাতে সে আখেরাত থেকেই অমনোযোগী হয়ে যায়। আসল উদ্দেশ্য আল্লাহ্ ইবাদত, ফরমাবরদারী এবং সমস্ত হুকুম-আহকাম পালন করা, মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, সেকেণ্ড, মিনিট যেন কোন না কোন ইবাদতের মধ্যে কাটে। আর এটাই আসল উদ্দেশ্য। এটাই এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। অবশ্য হালাল রিযিকের তালাশের জন্য বের হওয়া শরীঅত বিরোধী নয়। এখানে এটা বলা হয়েছে যে, এটাকে যেন আসল উদ্দেশ্য বানিয়ে না নেওয়া হয়।