📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 অবকাশ দানের তাৎপর্য

📄 অবকাশ দানের তাৎপর্য


হযরত উকবা ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমরা দেখ যে, আল্লাহ্ তা'আলা কোন ব্যক্তিকে পাপে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তার পছন্দনীয় জিনিসপত্র দিচ্ছেন, তখন এই দেওয়া প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে অবকাশ ও ঢিল দেওয়া।

অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াত পাঠ করেনঃ فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلُّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ (الانعام ٤٤)

অর্থঃ “অতঃপর তারা যখন সেই উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। তখন আমি তাদের সামনে সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম, এমনকি তাদেরকে প্রদত্ত বিষয়াদির জন্য তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল তখন আমি অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল।"

যদি কোন ব্যক্তি কুফরী ও নাফরমানীতে লিপ্ত থাকে অথবা বদ আমল ও গোনাহর মধ্যে মেতে থাকে, এতদসত্ত্বেও তার সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা পুরা হতে থাকে, ধন-সম্পদের ভাণ্ডার, যা সে চায়, তা হয়ে যায় তবে এর জন্য কেউ যেন ধোঁকায় পড়ে না যায়। নিয়ামতের প্রাচুর্য আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য লাভ অথবা আল্লাহ্ তা'আলার মহব্বতের চিহ্ন নয়। এটা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে অবকাশ মাত্র, তাকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই সমস্ত মানুষের জন্য আখেরাতে কিছুই নেই, যা আছে তা শুধু দুনিয়াতে। অতএব তাদেরকে দেখে ধোঁকায় পড়বেন না, আল্লাহ্ তা'আলার কাছে নিজের পাপের জন্য ক্ষমা চান, আনুগত্য ও সৎকর্মের মধ্যে লেগে থাকুন। আল্লাহ্ এরূপ মানুষদের সম্পর্কে বলেনঃ

سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لا يَعْلَمُونَ (الاعراف ١٠٢)

অর্থঃ "আমি তাদের ক্রমান্বয়ে পাকড়াও করব এমন জায়গা থেকে যার সম্পর্কে তাদের ধারণাও হবে না।”

إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ শদীদ (হুদ ১৮২)

নিশ্চয়ই তার পাকড়াও খুবই মারাত্মক কঠোর, অবশ্যই আল্লাহ্র ধরা পাকড়াও অনেক কষ্টদায়ক, বড় শক্ত, আল্লাহ্ তা'আলা জালেমদের ঢিল দেন, কিন্তু যখন ধরেন তখন তার জন্য পলায়নের স্থান থাকে না, তাকে একটু সময়ও দেন না এবং তাকে কঠিন আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করেন। কুরআনের যে আয়াত দ্বারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টিকে প্রমাণিত করলেন, আল্লাহ্ তা'আলা ঠিক এর মধ্যে এগুলো বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ যখন ঐ নাফরমানরা আমার কথা মানে নাই, ওয়ায নসীহত থেকে দূরে সরে গেছে, গোনাহে ডুবে গেছে, তখন আমি তাদেরকে আরো ঢিল দিয়েছি। তাদের জন্য দুনিয়ার নেয়ামতের ভাণ্ডার খুলে দিয়েছি এবং তারা জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে এবং এ রকম বুঝেছে যে, তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রাজি খুশি আছেন, তাইতো এত নিয়ামত ও সম্মান দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা তাদের ভুল ছিল, এটা তাদের ইয্যত ও সম্মান নয়, বরং ঢিল দেওয়া, ধরার একটা রাস্তা, যখন তারা একেবারেই আত্মহারা হয়ে গেছে। আর অমনি হঠাৎ তাদেরকে ধরা হয়েছে এবং সে অনুশোচনা ও আফসোস এবং নিরাশার সমুদ্রে হতবুদ্ধি ও হতভম্ব হয়ে যেমন থেকেছিল ঠিক তেমনি রয়ে গেল।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 টাকা-পয়সা

📄 টাকা-পয়সা


হযরত আবূ উমামা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত আছে, আসহাবে সুফফা (দ্বীনী ছাত্রদের) একজনের ইন্তিকাল হয়েছিল। তিনি তাঁর উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসেবে এক দিনার রেখে গেলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, দাগ (জাহান্নামের আগুনের দ্বারা জ্বালাইয়া) দেওয়ার উসিলা। পরে অন্য একজনের ইন্তিকাল হয়েছিল, তিনি দুই দিনার রেখে মারা গেলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুই দাগ দেওয়ার কারণ হলো। আহলে সুফফা ছিলেন ঐ সকল ধার্মিক গরীব মুহাজেরীন তাঁদের কোন ঠিকানা এবং মাথা গোঁজার মত আশ্রয় ছিল না, তাঁরা সাধারণতঃ ইলম-অন্বেষণকারী ছিলেন, শিখা ও শিখানোর মধ্যে লিপ্ত থাকতেন এবং খড়ের ছাদের নীচে বাস করতেন। চবুতরার (বাধানো চত্বর) উপর ছাউনীর মত ছিল, সেটাই তাদের ঠিকানা ছিল, এজন্য তাঁদের আসহাবে সুফফা বলা হয়। তাঁদের সংখ্যা সত্তর এর কাছাকাছি ছিল। এতে কম বেশিও হত। তাঁদের থেকে এক বা দুই দেরহাম পাওয়া যাওয়াকে আগুনের দ্বারা দাগ লাগানোর কথা এজন্য বলা হয়েছে, যেহেতু তাঁরা ঐ সমস্ত সাহাবাদের সাথে থাকতেন, যারা গরীব ও ফকির ছিল, মানুষ তাদেরকে মিসকিন মনে করে তাদেরকে সদকা খয়রাত দিতেন। এ অর্থে তারা সায়েলিনদের (ফকির) মত ছিলেন, প্রকাশ্যে যদিও ফকির নয় কিন্তু অবস্থা সায়েলিনদের (ফকির) মত ছিল। মাসআলা এই যে, কারো যদি খানাপিনার কিছু থাকে তার জন্য হাত পাতা জায়েয নয়। তাদের মধ্যে একজনের নিকট এক দিনার, অপর জনের নিকট হতে দুই দিনার বের হয়েছে, তা সত্ত্বেও তারা এই ফকিরদের সঙ্গে থেকে সায়েলিনদের (ফকির) মত ছিলেন এবং মাল থাকতে হাত পাতাও হারাম। এজন্য ঐ দিনারকে আগুনের দাগ লাগানোর কারণ সাব্যস্ত করেছিলেন।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 প্রয়োজন মাফিক দুনিয়া

📄 প্রয়োজন মাফিক দুনিয়া


হযরত মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত যে, নিজের আত্মীয় মামা আবূ হাসেম বিন ওতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তাঁর অসুস্থতার খবর নিতে গেলেন। আবু হাসেম তখন কাঁদতে লাগলেন। তিনি আরয করলেন, মামা কি ব্যাপার? আপনি কি ব্যথার জন্য পেরেশান? নাকি দুনিয়ার চিন্তায় পেরেশান? আবু হাসেম বললেন, না, একটুকুও না বরং হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে একটা শপথ নিয়েছিলেন, আমি তার উপর আমল করতে পারলাম না। তিনি আরয করলেন, কি শপথ নিয়েছিলেন? আবু হাসেম বললেন, আমি হুযূরকে এটা বলতে শুনেছি যে, তোমাদের জন্য ধন-সম্পদ থেকে এতটুকু সংগ্রহ করা যথেষ্ট যে, একটি খাদেম হবে এবং আল্লাহ্র রাস্তার জন্য একটি যানবাহন হবে, কিন্তু আমি মনে করি যে, আমি ধন-সম্পদ (এরচেয়ে বেশী জমা) করেছি।

তাঁদের যুহদ ও দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ততার অবস্থা এই ছিল যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যেক আদেশের উপর আমল করতে আগ্রহী ছিলেন। যদি কোন কথার উপর কোন রকম আমল হতে না দেখতেন, তবে এটাকে তাঁরা অনেক খারাপ জানতেন এবং সে জন্যে আফসোস করতেন। তাঁদের নিকট কোন বড় রকমের ধন-সম্পদ বা জমিদারী ছিল না। অবশ্য অল্প সম্পদ ছিল, কিন্তু এটাকেও নবীর ইচ্ছার খেলাফ মনে করে তার জন্য দুঃখ, অনুশোচনা ও আফসোসের মধ্যে পড়ে থাকতেন।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 শয়তানের কষ্টের ঘাঁটি

📄 শয়তানের কষ্টের ঘাঁটি


পারাপারে কষ্টকর ঘাটি
হযরত উম্মে দারদা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন যে, আমি আবূ দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশ্ন করেছিলাম, কি কারণে আপনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ঐ রকম ধন-সম্পদ চান না, যেভাবে অমুক সাহেব চান? উনি বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এটা বলতে শুনেছি, তোমাদের সম্মুখে একটা কষ্টদায়ক ঘাটি আসছে, তোমরা অতিরিক্ত বোঝা বহন করে উহা পার হতে পারবে না। এজন্য আমি চাই যে, ঐ ঘাটি পার হওয়ার জন্য হালকা পাতলা থাকি।

অর্থাৎ তোমাদের ও জান্নাতের প্রবেশের মধ্যে একটা খুব শক্ত ও পারাপারে কঠিন ঘাটি প্রতিবন্ধক রয়েছে, ওটা পার হয়েই জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে। এই ঘাটির দ্বারা কি উদ্দেশ্য; আল্লামা তিবী (রহঃ) বলেন, এর দ্বারা মৃত্যু, কবর, হাশর এবং তার অবস্থা ও কঠোরতা উদ্দেশ্য। যেমনিভাবে ঘাটি পার হওয়া কঠিন কাজ তেমনিভাবে বেহেস্তে প্রবেশের মধ্যে প্রতিবন্ধক ঐ মধ্যবর্তী স্থানগুলো পার হওয়াও কঠিন। পার্থিব ধন-সম্পদ, দুনিয়ার দায়িত্ব সম্পর্কে সওয়াল-জওয়াব এবং হিসাব কিতাব, কবরের আজাব থেকে বাঁচার মত কাজকাম করা, হাশরের অবস্থা, কঠোরতা থেকে রক্ষা পাওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার। এটা অনেক কঠিন সফর, এজন্য খুব মেহনত ও চেষ্টা সাধনার প্রয়োজন, আমি দুনিয়ার আসবাবপত্রের মধ্যে জড়িয়ে নিজের পেরেশানী (দুঃখ কষ্ট দুশ্চিন্তা) বাড়াতে চাই না। মালের চিন্তাও থাকবে না, তার জন্য গ্রেফতার হওয়ার চিন্তাও নেই, দুনিয়াও হবে না। দুনিয়ার উপাদান হবে না এবং তার জন্য আখেরাতের জবাবদিহীতার চিন্তাও থাকবে না। যেভাবে ঐ ব্যক্তি, যার কাছে কিছু থাকে না, সে কাস্টম থেকে কোন রকম কষ্ট ও বিড়ম্বনা ছাড়াই বাইরে এসে পড়ে। এমনিভাবে সেই ব্যক্তি যে দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকে, সে আখেরাতের জবাবদিহী থেকে তাড়াতাড়ি মুক্তি পেয়ে যাবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px