📄 কিয়ামত বা প্রলয় সৃষ্টি হওয়ার রহস্য
হযরত আবূ যর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি যখন দিল থেকে দুনিয়াকে বের করে দেয়, তখন আল্লাহ্পাক তার অন্তরে হিকমত পয়দা করে দেন এবং তার প্রকাশ তার ভাষার মাধ্যমে করান এবং তার সামনে দুনিয়ার খারাবী ও অসারতা এবং রোগ ও রোগের চিকিৎসা খুলে ধরেন এবং তাকে এই জায়গা থেকে দারুসসালাম বেহেস্ত পর্যন্ত সঠিকভাবে নিরাপদে পৌঁছে দেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার সাথে বড়ই আজীব মুআমালা (ব্যবহার) করেন। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত ধন-সম্পদ ও উচ্চপদের প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য লালায়িত না হয়ে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য ঐ সমস্ত জিনিস ত্যাগ করবে, আল্লাহ্ তার অন্তরে হিকমত ও বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করে দিবেন। সত্যিই সে খুবই বুদ্ধিমানের ন্যায় কাজ করেছে, যে ঐ সকল বস্তু ত্যাগ করেছে।
দুনিয়া এ রকম জিনিস নয় যে, তার দিকে সর্বদা চোখ লাগিয়ে রাখতে হবে। সাধারণ প্রয়োজন মিটানোর জন্য তার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সংগ্রহ করার মধ্যে কোন অসুবিধা নেই। নৌকা পানি ছাড়া চলতে পারে না কিন্তু ঐ পানি নৌকার বাইরেই থাকতে হবে। যদি পানি নৌকার ভেতরে এসে পড়ে তবে নৌকা অবশ্যই ডুবে যাবে। যারা নিজেকে দুনিয়া থেকে বাঁচিয়ে নিবেন তারা আল্লাহ্র রহমতের যোগ্য হবেন। আল্লাহ্ তাদের অন্তরে হিকমত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করে দিবেন এবং তার মুখ থেকে তখন শুধু হিকমতের কথাই বের হবে। দুনিয়ার খারাবী, অসারতা ও নশ্বরতা এবং চিন্তা-ভাবনার অধিকার, দুনিয়াদারদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, দুনিয়াতে ক্ষণস্থায়িত্ব হওয়া এবং অল্প সম্পদের জন্য অধিক কষ্ট স্বীকার করা, তার চিন্তা ভাবনা নিজের উপর আরোপ করা, তার মধ্যে অন্তর লেগে থাকা, প্রভৃতি বিষয় তার সামনে ফুটে উঠে, সে দুনিয়া-প্রীতির রোগ ও তার চিকিৎসা বুঝে নেয় যে, ইলম ও আমল এবং দুনিয়া লিপ্ততা থেকে বেঁচে থেকে ধৈর্য ও সন্তুষ্টি এবং তাকদীরে রাজি খুশী থেকে এই ধ্বংসশীল দুনিয়ার ভালোবাসার চিকিৎসা করে এবং এরূপে আল্লাহ্ তাকে দুনিয়া ও তার সমস্ত রকম পরীক্ষা থেকে পাক-পবিত্র করে সহীহ-শুদ্ধভাবে বেহেস্ত পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন।
📄 সফল ব্যক্তি
হযরত আবূ যর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঐ ব্যক্তি সফল হয়ে গেছে, যার অন্তরকে আল্লাহ্ তা'আলা ঈমানের জন্য ফারেগ ও একনিষ্ঠ করে নিয়েছেন এবং তার দিলকে (ঘৃণা ও হিংসা থেকে) নিরাপদ রেখেছেন এবং তার মুখকে সত্যবাদী ও আত্মাকে শান্তি, তার স্বভাবকে উত্তম, তার কানকে হক শ্রবণকারী, তার চোখকে বৈধ জিনিস দর্শনকারী বানিয়েছেন। কান হচ্ছে চুঙ্গির (চোং) মত এবং চোখ সেই বস্তুকে স্থায়ী রাখে, যাকে অন্তর সংরক্ষণ করে এবং সফল হয়ে গিয়েছে সেই ব্যক্তি, যে নিজের অন্তরকে সংরক্ষণকারী রূপে গড়ে তোলে।
যদি আল্লাহ্ তা'আলা কারো অন্তরকে সঠিক ঈমানের দ্বারা ভরে দেন, যদি সে আন্তরিকতার সহিত পরিপূর্ণ মুসলমান রূপে গড়ে উঠে, তার অন্তর শত্রুতা, হিংসা, পাপ, মিথ্যা ও নিফাক ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়, মুখ সত্য বলার জন্য প্রস্তুত হয়, তার মুখ থেকে সত্য কথা বের হয়। মিথ্যা থেকে সতর্ক থাকে। সব সময় আল্লাহ্র ধ্যানে লেগে থাকে। তার মধ্যে খুশি ও শান্তি পয়দা হতে থাকে, মেযাজ ও স্বভাব উত্তম হতে থাকে। কান সত্য ও হক শুনতে এবং দ্বীন ও ইলম রক্ষণের মাধ্যম হয়, চোখ হারাম ও নাজায়েয দেখা ও গোনাহ করার পরিবর্তে আল্লাহ্ তা'আলার আকাশ ও ভূখন্ডসমূহে সৃষ্ট প্রমাণ ও দলীলসমূহ দেখায় লেগে থাকে, এমন ব্যক্তি খুবই ভাগ্যবান ও সফলকাম। মনে রাখবেন, চুঙ্গি দ্বারা যেমনিভাবে কোন জিনিস বোতলে ভরা হয়, ঠিক তেমনিভাবে কান দ্বারা অন্তরের ভিতরে ইলম ও হিকমত ভরার কাজ হয় এবং চোখ অন্তরের মধ্যে সংরক্ষিত জিনিসগুলো দেখে তাকে নিরাপদে রাখার দায়িত্ব পালন করে। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার তাওহীদের দলীল প্রমাণের অনুভূতি হাসিল করে নিবে, চাই তা অন্তরের দ্বারা হোক বা চোখের দ্বারা হোক, সে সফলকাম হবে।
📄 অবকাশ দানের তাৎপর্য
হযরত উকবা ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমরা দেখ যে, আল্লাহ্ তা'আলা কোন ব্যক্তিকে পাপে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তার পছন্দনীয় জিনিসপত্র দিচ্ছেন, তখন এই দেওয়া প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে অবকাশ ও ঢিল দেওয়া।
অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াত পাঠ করেনঃ فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلُّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ (الانعام ٤٤)
অর্থঃ “অতঃপর তারা যখন সেই উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। তখন আমি তাদের সামনে সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম, এমনকি তাদেরকে প্রদত্ত বিষয়াদির জন্য তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল তখন আমি অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল।"
যদি কোন ব্যক্তি কুফরী ও নাফরমানীতে লিপ্ত থাকে অথবা বদ আমল ও গোনাহর মধ্যে মেতে থাকে, এতদসত্ত্বেও তার সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা পুরা হতে থাকে, ধন-সম্পদের ভাণ্ডার, যা সে চায়, তা হয়ে যায় তবে এর জন্য কেউ যেন ধোঁকায় পড়ে না যায়। নিয়ামতের প্রাচুর্য আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য লাভ অথবা আল্লাহ্ তা'আলার মহব্বতের চিহ্ন নয়। এটা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে অবকাশ মাত্র, তাকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই সমস্ত মানুষের জন্য আখেরাতে কিছুই নেই, যা আছে তা শুধু দুনিয়াতে। অতএব তাদেরকে দেখে ধোঁকায় পড়বেন না, আল্লাহ্ তা'আলার কাছে নিজের পাপের জন্য ক্ষমা চান, আনুগত্য ও সৎকর্মের মধ্যে লেগে থাকুন। আল্লাহ্ এরূপ মানুষদের সম্পর্কে বলেনঃ
سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لا يَعْلَمُونَ (الاعراف ١٠٢)
অর্থঃ "আমি তাদের ক্রমান্বয়ে পাকড়াও করব এমন জায়গা থেকে যার সম্পর্কে তাদের ধারণাও হবে না।”
إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ শদীদ (হুদ ১৮২)
নিশ্চয়ই তার পাকড়াও খুবই মারাত্মক কঠোর, অবশ্যই আল্লাহ্র ধরা পাকড়াও অনেক কষ্টদায়ক, বড় শক্ত, আল্লাহ্ তা'আলা জালেমদের ঢিল দেন, কিন্তু যখন ধরেন তখন তার জন্য পলায়নের স্থান থাকে না, তাকে একটু সময়ও দেন না এবং তাকে কঠিন আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করেন। কুরআনের যে আয়াত দ্বারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টিকে প্রমাণিত করলেন, আল্লাহ্ তা'আলা ঠিক এর মধ্যে এগুলো বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ যখন ঐ নাফরমানরা আমার কথা মানে নাই, ওয়ায নসীহত থেকে দূরে সরে গেছে, গোনাহে ডুবে গেছে, তখন আমি তাদেরকে আরো ঢিল দিয়েছি। তাদের জন্য দুনিয়ার নেয়ামতের ভাণ্ডার খুলে দিয়েছি এবং তারা জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে এবং এ রকম বুঝেছে যে, তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রাজি খুশি আছেন, তাইতো এত নিয়ামত ও সম্মান দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা তাদের ভুল ছিল, এটা তাদের ইয্যত ও সম্মান নয়, বরং ঢিল দেওয়া, ধরার একটা রাস্তা, যখন তারা একেবারেই আত্মহারা হয়ে গেছে। আর অমনি হঠাৎ তাদেরকে ধরা হয়েছে এবং সে অনুশোচনা ও আফসোস এবং নিরাশার সমুদ্রে হতবুদ্ধি ও হতভম্ব হয়ে যেমন থেকেছিল ঠিক তেমনি রয়ে গেল।
📄 টাকা-পয়সা
হযরত আবূ উমামা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত আছে, আসহাবে সুফফা (দ্বীনী ছাত্রদের) একজনের ইন্তিকাল হয়েছিল। তিনি তাঁর উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসেবে এক দিনার রেখে গেলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, দাগ (জাহান্নামের আগুনের দ্বারা জ্বালাইয়া) দেওয়ার উসিলা। পরে অন্য একজনের ইন্তিকাল হয়েছিল, তিনি দুই দিনার রেখে মারা গেলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুই দাগ দেওয়ার কারণ হলো। আহলে সুফফা ছিলেন ঐ সকল ধার্মিক গরীব মুহাজেরীন তাঁদের কোন ঠিকানা এবং মাথা গোঁজার মত আশ্রয় ছিল না, তাঁরা সাধারণতঃ ইলম-অন্বেষণকারী ছিলেন, শিখা ও শিখানোর মধ্যে লিপ্ত থাকতেন এবং খড়ের ছাদের নীচে বাস করতেন। চবুতরার (বাধানো চত্বর) উপর ছাউনীর মত ছিল, সেটাই তাদের ঠিকানা ছিল, এজন্য তাঁদের আসহাবে সুফফা বলা হয়। তাঁদের সংখ্যা সত্তর এর কাছাকাছি ছিল। এতে কম বেশিও হত। তাঁদের থেকে এক বা দুই দেরহাম পাওয়া যাওয়াকে আগুনের দ্বারা দাগ লাগানোর কথা এজন্য বলা হয়েছে, যেহেতু তাঁরা ঐ সমস্ত সাহাবাদের সাথে থাকতেন, যারা গরীব ও ফকির ছিল, মানুষ তাদেরকে মিসকিন মনে করে তাদেরকে সদকা খয়রাত দিতেন। এ অর্থে তারা সায়েলিনদের (ফকির) মত ছিলেন, প্রকাশ্যে যদিও ফকির নয় কিন্তু অবস্থা সায়েলিনদের (ফকির) মত ছিল। মাসআলা এই যে, কারো যদি খানাপিনার কিছু থাকে তার জন্য হাত পাতা জায়েয নয়। তাদের মধ্যে একজনের নিকট এক দিনার, অপর জনের নিকট হতে দুই দিনার বের হয়েছে, তা সত্ত্বেও তারা এই ফকিরদের সঙ্গে থেকে সায়েলিনদের (ফকির) মত ছিলেন এবং মাল থাকতে হাত পাতাও হারাম। এজন্য ঐ দিনারকে আগুনের দাগ লাগানোর কারণ সাব্যস্ত করেছিলেন।