📄 কিয়ামতের দিবসে প্রথম প্রশ্ন
হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন বান্দাকে যে নেয়ামতের ব্যাপারে সর্বপ্রথম প্রশ্ন করা হবে, সেটা এই যে, তাকে বলা হবে, আমি কি তোমার শরীরকে শক্তিশালী, বলিষ্ঠ ও সুস্থতা দান করেছিলাম না? এবং তোমাকে ঠান্ডা পানির দ্বারা সতেজ ও উর্বর করেছিলাম না?
কিয়ামতের দিন অনেক জিনিসের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে, তন্মধ্যে অনেক বড় একটা নিয়ামত সুস্থতার ব্যাপারেও প্রশ্ন আছে। কারণ সুস্থতা অনেক বড় নিয়ামত-
তঙ্গ دستی যদি ও হ্যায় গালিব - তন্দুরুস্তি হাজার নেয়ামত হ্যায়
অর্থঃ গালিব! যদিও দরিদ্র হও, সুস্থতা অনেক বড় নিয়ামত।
মানুষ যৌবনকালে সুস্থতা নিরাপত্তা পেয়ে থাকে এবং পান করার জন্য ঠান্ডা পানীয়, আহারের জন্য পবিত্র রিযিক পেয়ে থাকে। কিন্তু এরপরও যদি মানুষ আল্লাহ্ তা'আলার স্বীকারকারী বান্দা না হয়, তবে এটা সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ও বঞ্চিতির কথা। আল্লাহ্ তা'আলার নিয়ামত, সুস্থতা, পানীয় ইত্যাদি রকমের নিয়ামতের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হল এই যে, পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়ে যাওয়া, আল্লাহ্র ইবাদতে লিপ্ত থাকা, ফরযসমূহ আদায় করা, মূল্যবান সময় নষ্ট না করা। মানুষ সাধারণতঃ সুস্থতার সময়কে মূল্য দেয় না। এটা বড়ই খামখেয়ালী ও অবহেলার কথা। অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে আশীর্বাদ মনে করুন এবং সুস্থ অবস্থায় নেকীসমূহ কামাই করে নিবেন, যাতে রুগ্ন অবস্থায় যখন শরীর সুস্থ না থাকে, যখন কোন কাজে ব্যবহৃত না হয়, তখন যেন সুস্থতার সময় কৃত ইবাদতের সওয়াব, অসুস্থ হওয়ার সময় কাজ না করেও পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কৃতজ্ঞতা ইহাই যে, আল্লাহ্র ইবাদতে লেগে থাকুন, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য চেষ্টা করতে থাকুন, গোনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকুন, যাতে কেয়ামতের দিন সমস্ত সৃষ্টির সামনে লজ্জা, অসম্মান, অপমান ও ধ্বংস থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
📄 পাঁচটি বস্তুর ব্যাপারে প্রশ্ন হবে
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন কোন ব্যক্তি তার স্থান থেকে ঐ পর্যন্ত সরতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার থেকে পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করে তার উত্তর নেওয়া হয়। বয়সের ব্যাপারে যে, সে উহাকে কোথায় ব্যয় করেছে; যৌবনের ব্যাপারে যে, সে উহাকে কোথায় নষ্ট করেছে; সম্পদের ব্যাপারে যে, সে উহাকে কোথা থেকে উপার্জন করেছে ও কোথায় উহা ব্যয় করেছে এবং যা শিক্ষা করেছিল সে কি তার উপর আমল করেছিল?
আল্লাহ্ মানুষকে পার্থিব জীবন এই জন্য দান করেছেন যে, সে এ জীবনকে আল্লাহ্র ইবাদত বন্দেগী, আদেশ-নিষেধ ও আনুগত্যের মধ্যে লাগাবে, এমন আমলাদি করবে যা আখেরাতকে গড়ে তুলবে এবং আল্লাহ্ তা'আলার মর্জি ও ইচ্ছানুযায়ী হবে। সময়কে অপচয় এবং জীবনকে খেলাধুলায় ধ্বংস না করে দেয়।
যৌবন অনেক বড় নিয়ামত ও পরিপূর্ণ শক্তি, যৌবনের সময় যৌবনকাল স্বাস্থ্য ও শক্তির বসন্তকাল হয়ে থাকে। তাই নিজের লাগাম নফস ও শয়তানের হাতে না দিয়ে বরং আল্লাহ্ তা'আলার অনুগত আজ্ঞাবহ হোন। এই যৌবনকে নেক আমলাদি উপার্জনে, কালিমাতুল্লাহ্র প্রচার প্রসারে দ্বীন শিক্ষা ও শিখানোর কাজে ব্যয় করুন, উদ্দেশ্যহীনতা ও পশুত্বের মধ্যে কাটাবেন না, অন্যথায় দুনিয়া আখেরাত উভয় স্থানেই অপমান ও বদনামের ভাগী হতে হবে। যে সকল মানুষ নিজের যৌবনকে ধ্বংস করে ব্যভিচার ও কু-নজরে লাগিয়ে থাকে, তাদের আখেরাতে এর কারণে যে শাস্তি পাবার তাতো পাবেই, তদুপরি এ রকম লোক দুনিয়াতেও অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে থাকে। তারা দুনিয়াতেও প্রকৃত যৌবনের স্বাদ ও আনন্দ উপভোগ করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। বিয়ে হলে স্ত্রীর সামনে অপমানিত হয়, তার গোলাম হয়ে থাকবে অথবা সকাল বিকাল ঝগড়া ফাসাদে লিপ্ত থাকবে, এমনকি তালাকের ঘটনা পর্যন্ত ঘটে থাকে। অতএব পাক পবিত্র থাকুন, ধ্যান-ধারণা কল্পনাকে শুদ্ধ করুন, চোখ এবং সমস্ত শরীর ও যৌবনের হেফাজত করুন, উভয় জগতের নিয়ামত পাবার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলুন, সুখী, সুস্থ যৌবন উপভোগ করুন।
আল্লাহ্ যাকে চান গরীব ও ফকির বানান। ধন-সম্পদ যদি নেক কাজের মধ্যে ব্যয় না হয়, সদকায়ে জারিয়ায় ব্যয় না হয়, আর যদি তা অহঙ্কার আল্লাহ্র নাফরমানীতে ব্যয় হয়, তবে তা বড় আযাব ও গ্রেফতার এর কারণ হবে। কিন্তু এই ধন-সম্পদ যদি হালাল উপায়ে অর্জন করা হয়, জায়েয স্থানে ব্যয় করা হয় এবং সমস্ত আহকামাত পুরা করা যায়, তবে তা আল্লাহ্ নৈকট্য লাভের কারণ হয়। যা হোক উপার্জনের পূর্বেই দেখবেন, তা হালাল উপায়ে অর্জন হচ্ছে, না হারাম উপায়ে। আর অর্জন করার পর ব্যয় করার সময় ভালো করে বুঝে শুনে কাঙ্ক্ষিত স্থানে ব্যয় করুন এবং আখেরাতের জন্য আজর ও সাওয়াব বানানোর চেষ্টা করুন। ইলমের ফল হচ্ছে আমল, ইলম শিক্ষা এজন্যই করা হয় যাতে তদানুসারে আমল করা হয়। আমল ছাড়া ইলম এরূপ, যেরূপ ফলহীন গাছ, আমল ছাড়া ইলম বোঝাস্বরূপ, গাঁধার উপর কিতাব রেখে দেওয়ার মত। এই সমস্ত ব্যক্তিদের আরো বেশি শাস্তি দেওয়া হবে, যারা ইলম থাকা সত্ত্বেও আমল করেনি। তাই ইলম শিক্ষা করুন এবং সেই অনুসারে তার উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করুন এবং কেয়ামতের দিন প্রশ্নোত্তরের জন্য প্রস্তুত থাকুন। আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে ঐ দিনের অনুশোচনা ও বদনামী থেকে হেফাজত করুন।
📄 শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি
হযরত আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছেন, তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের কারণ সাদা কালো নয়, বরং তোমরা তাদের অপেক্ষা অধিক ধর্মানুরাগী হও।
একে অপর থেকে শ্রেষ্ঠত্বের কারণ রং ও রূপ নয়। গোত্র বা বংশ নয়, জাতি কিংবা দেশ নয়, ভ্রাতৃত্ব বা বংশাবলী নয়, বরং শ্রেষ্ঠত্বের কারণ ও ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ্র ভয়-ভীতি ও তাকওয়াহ পরহেযগারী। কালো কিংবা সুন্দর, ছোট অথবা বড়, আল্লাহ্র নিকট সকলেই সমান, আরব-অনারব, মনীব বা দাস যেই হোক। বাহ্যিক আকার আকৃতি এবং বংশ ও আভিজাত্যের কারণে কাউকে কারো অপেক্ষা বেশি সম্মান দেওয়া হবে না, বরং সম্মান তাকওয়াহ্ ও খোদাভীতির কারণে দেওয়া হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন- يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ (الحجرات ١٣)
অর্থঃ “হে মানব সকল! আমি তোমাদের সবাইকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ্র কাছে সে-ই সর্বাধিক অভিজাত যে সর্বাধিক পরহেযগার।”
অতএব টিপ-টপ ত্যাগ করুন, বাহ্যিকতায় আকৃষ্ট হবেন না, ফ্যাশন ও লোক দেখানো পোশাক পরিচ্ছদ, আচার আচরণ থেকে নিজেকে হেফাজত করুন, হৃদয়কে স্বচ্ছ ও পবিত্র করুন। এটাই শ্রেয় এবং আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য লাভের কারণ হয়ে যাবে।
📄 কিয়ামত বা প্রলয় সৃষ্টি হওয়ার রহস্য
হযরত আবূ যর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি যখন দিল থেকে দুনিয়াকে বের করে দেয়, তখন আল্লাহ্পাক তার অন্তরে হিকমত পয়দা করে দেন এবং তার প্রকাশ তার ভাষার মাধ্যমে করান এবং তার সামনে দুনিয়ার খারাবী ও অসারতা এবং রোগ ও রোগের চিকিৎসা খুলে ধরেন এবং তাকে এই জায়গা থেকে দারুসসালাম বেহেস্ত পর্যন্ত সঠিকভাবে নিরাপদে পৌঁছে দেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার সাথে বড়ই আজীব মুআমালা (ব্যবহার) করেন। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত ধন-সম্পদ ও উচ্চপদের প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য লালায়িত না হয়ে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য ঐ সমস্ত জিনিস ত্যাগ করবে, আল্লাহ্ তার অন্তরে হিকমত ও বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করে দিবেন। সত্যিই সে খুবই বুদ্ধিমানের ন্যায় কাজ করেছে, যে ঐ সকল বস্তু ত্যাগ করেছে।
দুনিয়া এ রকম জিনিস নয় যে, তার দিকে সর্বদা চোখ লাগিয়ে রাখতে হবে। সাধারণ প্রয়োজন মিটানোর জন্য তার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সংগ্রহ করার মধ্যে কোন অসুবিধা নেই। নৌকা পানি ছাড়া চলতে পারে না কিন্তু ঐ পানি নৌকার বাইরেই থাকতে হবে। যদি পানি নৌকার ভেতরে এসে পড়ে তবে নৌকা অবশ্যই ডুবে যাবে। যারা নিজেকে দুনিয়া থেকে বাঁচিয়ে নিবেন তারা আল্লাহ্র রহমতের যোগ্য হবেন। আল্লাহ্ তাদের অন্তরে হিকমত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করে দিবেন এবং তার মুখ থেকে তখন শুধু হিকমতের কথাই বের হবে। দুনিয়ার খারাবী, অসারতা ও নশ্বরতা এবং চিন্তা-ভাবনার অধিকার, দুনিয়াদারদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, দুনিয়াতে ক্ষণস্থায়িত্ব হওয়া এবং অল্প সম্পদের জন্য অধিক কষ্ট স্বীকার করা, তার চিন্তা ভাবনা নিজের উপর আরোপ করা, তার মধ্যে অন্তর লেগে থাকা, প্রভৃতি বিষয় তার সামনে ফুটে উঠে, সে দুনিয়া-প্রীতির রোগ ও তার চিকিৎসা বুঝে নেয় যে, ইলম ও আমল এবং দুনিয়া লিপ্ততা থেকে বেঁচে থেকে ধৈর্য ও সন্তুষ্টি এবং তাকদীরে রাজি খুশী থেকে এই ধ্বংসশীল দুনিয়ার ভালোবাসার চিকিৎসা করে এবং এরূপে আল্লাহ্ তাকে দুনিয়া ও তার সমস্ত রকম পরীক্ষা থেকে পাক-পবিত্র করে সহীহ-শুদ্ধভাবে বেহেস্ত পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন।