📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 ক্ষুধার্ত থাকার লাভ

📄 ক্ষুধার্ত থাকার লাভ


শেখ আবূ হামেদ (রহঃ) লিখেন, ক্ষুধার্ত থাকার দশটি লাভ আছে। একঃ ক্ষুধা মনের পরিচ্ছন্নতা আনয়ন করে, স্বাভাবিক গুণের গতিশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে, অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞানের সীমা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত আহার মানুষকে বেওকুফ আহাম্মক বানিয়ে দেয়। অন্তরকে বোধশূন্য করে দেয়। মাথায় তাপ বেড়ে যায়, যা জালের মত ছড়িয়ে গিয়ে চিন্তা ও কল্পনাকে আচ্ছন্ন করে দেয়, যার ফলে অন্তর ভারী হয়ে যায় এবং স্বীয় দায়িত্ব কর্তব্য ভুলে যায়।

দ্বিতীয়ঃ ক্ষুধার কারণে মানুষের অন্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নরম হয়ে যায়, ফলে মানুষ অন্নদাতার নিকট প্রার্থনা করে আনন্দ পায় এবং আল্লাহ্ তা'আলার যিকিরের প্রভাব নিজের মধ্যে অনুভব করে।

তৃতীয়ঃ মানুষের স্বভাবের মধ্যে অক্ষমতা, অসহায়ত্ব ও দারিদ্রতার ভাব সৃষ্টি হয়, এবং আনন্দ স্ফূর্তি, অহংকার, রিপুর তাড়না শেষ হয়ে যায়, যা নাফরমানীর কারণ হয়ে থাকে। আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ক্ষুধার চাইতে বেশি প্রয়োজনীয় অন্য কোন জিনিস নেই। ক্ষুধার্ত মানুষ অন্নদাতার নিকট স্বীয় অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দারিদ্রতা অবলম্বন করে এবং আল্লাহর সমীপে অক্ষম, অসহায় ও অভাবী হওয়ার ভাব পয়দা হয়।

চতুর্থঃ এই কারণে আল্লাহ্ তা'আলার আযার ও পরীক্ষার কথা স্মরণে থাকে। চিন্তাযুক্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষের মূল্য বুঝে আসে। পক্ষান্তরে যার পেট ভরা থাকে, সে ক্ষুধার্ত ও উপবাসীদের ভুলে যায়।

পঞ্চমঃ ক্ষুধার্ত থাকার সবচাইতে বড় লাভ এই যে, সমস্ত পাপ ও নাফরমানীর উৎস কামভাব ও এর উত্তেজনা শক্তি হ্রাস পায় এবং নফসে আম্মারার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কম আহারের কারণে মানুষের সমস্ত রকম কামভাব ও উত্তেজনা শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। সবচাইতে বড় সৌভাগ্য এই যে, মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা এই যে, অতি আহারের দরুণ মানুষের উপর নফসে আম্মারা প্রভাব বিস্তার করে ফেলতে পারে এবং তার অনুশাসন কায়েম করে ফেলতে পারে।

ষষ্ঠঃ ক্ষুধার্ত থাকার কারণে ঘুম দূরে সরে যায়, নিদ্রাহীনতা সৃষ্টি হয়। কেননা, যে ব্যক্তি বেশি আহার করে, তাকে বেশি পানও করতে হয় এবং যে বেশি পান করে, তাকে বেশি ঘুমে থাকতে হয়। বেশি নিদ্রা মানুষের মূল্যবান সময়কে ধ্বংস করে দেয়। এর কারণে তাহাজ্জুদের ন্যায় নামায থেকে বঞ্চিত হতে হয়, স্থূলবুদ্ধি ও মনের কঠোরতা সৃষ্টি হয়। মানুষের বয়স অত্যন্ত দামী রত্ন। দুনিয়াতে মানুষের প্রকৃত পুঁজি তার মূল্যবান জীবন। এর মধ্যেই মানুষ আখেরাত উপার্জন করার ব্যবসা করে থাকে। ঘুম মৃত্যুর মত। অতএব বেশি নিদ্রা বয়সকে হ্রাস করে দেয়, ছোট করে দেয়।

সপ্তমঃ ক্ষুধা মানুষকে সর্বদা ইবাদতে মগ্ন থাকা সহজ করে দেয়। অতিরিক্ত আহার ইবাদতের আধিক্যে বাধা দেয়, এজন্য যে, প্রথমতঃ আহার করার জন্য বেশি সময় দরকার। তার কেনাকাটার জন্য সময় দরকার, তার রান্নাবান্নার জন্য সময় দরকার, আবার হাত মুখ ধোয়া ও টয়লেটে যাওয়ার জন্য আলাদা সময় দরকার হয়। যদি এগুলোর পরিবর্তে এই সময়টুকু আল্লাহ্ তা'আলার ধ্যানে, প্রার্থনায় ও ইবাদতে, কুরআনে কারীমের তেলাওয়াতের মধ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে কতই না লাভ হয়। হযরত সিররি (রহঃ) বলেন, আমি হযরত আলী জুরজানির নিকট ছাতু দেখেছি, যা হাতের তালু দ্বারা গোল্লা বানিয়ে মুখে দিচ্ছিলেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, এরূপ কেন করলেন? উত্তর করলেন, আমি এরূপ গিলে খাওয়া ও চিবিয়ে খাওয়ার মধ্যে সময়ের হিসাব করে দেখেছি যে, গিলে খাওয়ার মধ্যে সত্তর বার সোবহানাল্লাহ্ বেশি পড়া যায়। এই জন্য আমি চল্লিশ বছর ধরে রুটি চিবাই না, ছাতু খেয়েই থাকছি, যাতে এইটুকু সময় বেশি আল্লাহ্র ধ্যানে লাগিয়ে দিতে পারি।

অষ্টমঃ স্বল্প আহারে শরীর সুস্থ থাকে, রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ কারণে অতিরিক্ত আহার করলে নানা রোগের সৃষ্টি হয়, অতিরিক্ত আহারে পাকস্থলী ও রগের মধ্যে দুষিত রক্ত সৃষ্টি হয়ে নানা রকমের রোগের উৎপত্তি হয়। অসুস্থতার কারণে মানুষ ইবাদত থেকে বিরত থাকে। অন্তরের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দেয় এবং চিকিৎসার দরকার হয়। হাকীম ডাক্তারের পিছনে ছুটতে হয়। আর এই ছোটাছুটির জন্য সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়, ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ক্ষুধার্ত থাকা এই সমস্ত দুঃখ মুসীবত ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়।

নবমঃ স্বল্প আহারের কারণে খরচও কম হয়ে থাকে, স্বল্প আহারে যে অভ্যস্ত হয়, অল্প মাল তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়, দীর্ঘ কামনা ও অনর্থক ঝামেলায় তাকে আটকাতে হয় না অথবা অনর্থক ঝামেলায় জড়িত হতে হয় না।

দশমঃ স্বল্প আহারে অভ্যস্ত ব্যক্তি ইছার (অপরকে নিজ হতে শ্রেষ্ঠতর বলে ভাবা এবং অপরকে নিজের উপর প্রাধান্য দেয়া।) ও সদকা খয়রাত করে সওয়াব পাওয়ার উপযুক্ত হয়। এ কারণে যে, তার অতিরিক্ত খানাপিনা গরীব ও অভাবীদের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়, যা তার জন্য কেয়ামতের দিন ছাউনীর কাজে আসবে। মানুষ যা কিছু খায় তা টয়লেটের উপঢৌকন হয়ে যায়। কিন্তু যা কিছু সে সদকা-খয়রাত করে, আল্লাহ্র নিকট আখেরাতের ভাণ্ডারে অর্জিত সম্পদ হয়ে যায়, আর তা কেয়ামতের দিন কাজে আসবে।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 অতিরিক্ত আহারের কুফল

📄 অতিরিক্ত আহারের কুফল


হযরত ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে ঢেকুর (খাওয়ার পর খাদ্যনালীর উদগীরণ) নিতে শুনেছেন, তখন ইরশাদ করলেনঃ নিজের ঢেকুর একটু খাট কর, এজন্য যে, কেয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি ঐ সমস্ত মানুষ ক্ষুধার্ত থাকবে, যাদের পেট দুনিয়াতে বেশি ভরা থাকত।

অতিরিক্ত আহারের দরুণ পাকস্থলী ভরে যাওয়ার কারণে ঢেকুর আসে। ঢেকুর কমাবার অর্থ হলো খানা কম খাওয়া। ঢেকুরের কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত খানাপিনা করা। বর্ণিত আছে যে, এই ব্যক্তি ছিলেন আবূ হুজায়ফা ওহাব বিন আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বলেন, একদিন আমি ছরিদ খেয়েছিলাম। যখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলাম, তখন আমার ঢেকুর আসতে থাকল, এরপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত কথা বললেন। বর্ণিত আছে যে, এরপর হযরত আবূ হুজায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু কখনো পেট ভরে খানা খাননি। তিনি এ রকম নিয়ম করে নিয়েছিলেন যে, যদি দুপুরে খানা খেতেন, তাহলে রাতে না খেয়ে থাকতেন, আবার রাতে খেলে দুপুরে না খেয়ে থাকতেন। অন্যত্র বর্ণিত আছে, হযরত আবূ হুজায়ফা বলেন, আমি ত্রিশ বছর ধরে পেট ভরে খানা খাইনি।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 ধন-সম্পদের ফিতনা

📄 ধন-সম্পদের ফিতনা


হযরত কা'ব বিন আয়ায রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ বলতে শুনেছি, প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটা পরীক্ষা ও ফিতনা থাকে। আমার উম্মতের পরীক্ষার বস্তু হলো সম্পদ।

বিভিন্ন বিষয়বস্তুর কারণে মানুষ পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং আল্লাহ্র নাফরমানী ও নানা প্রকার পাপ করে থাকে। টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ মানুষকে নানা রকম পরীক্ষা ও ফিতনায় পতিত করে। সাধারণতঃ এরূপ দেখা গেছে যে, ধন-সম্পদের কারণে গর্ব, অহংকার এবং ইবাদতে অনীহা সৃষ্টি হয়, গোনাহ ও নাফরমানীর কারণ হয় এবং মানুষ তার স্রষ্টা ও মালিককে ভুলে যায়। টাকা-পয়সাকেই সব কিছু মনে করতে শুরু করে, ফলে এটাকে সর্বাপেক্ষা বড় ফিৎনা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যদি গভীরভাবে চিন্তা করা যায়, তবে সহজেই বুঝা যাবে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ইরশাদ-পুরোপুরি সত্য ও সহীহ এবং যথোপযুক্ত। এর কারণে বহু নেককার মুত্তাকী ও আবেদ টাকা-পয়সার ফাঁদে গ্রেফতার হয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে। এই একই কারণে বহু লোক দ্বীন ও ধর্মকে ত্যাগ করেছে। এই কারণে বহু লোক ঈমান আকীদা বিক্রি করে দিয়েছে, সামান্য কিছু পাওয়ার জন্য মানুষ জায়েয ও না জায়েয পন্থা অবলম্বন করেছে।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 মাল-দৌলতের ষষ্ঠ দুর্গতি

📄 মাল-দৌলতের ষষ্ঠ দুর্গতি


ধন-সম্পদের ফিতনা
মাল-দৌলতের সৃষ্ট দুর্ভোগ
হযরত কা'ব বিন আয়ায রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ বলতে শুনেছি, প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটা পরীক্ষা ও ফিতনা থাকে। আমার উম্মতের পরীক্ষার বস্তু হলো সম্পদ।

বিভিন্ন বিষয়বস্তুর কারণে মানুষ পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং আল্লাহ্র নাফরমানী ও নানা প্রকার পাপ করে থাকে। টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ মানুষকে নানা রকম পরীক্ষা ও ফিতনায় পতিত করে। সাধারণতঃ এরূপ দেখা গেছে যে, ধন-সম্পদের কারণে গর্ব, অহংকার এবং ইবাদতে অনীহা সৃষ্টি হয়, গোনাহ ও নাফরমানীর কারণ হয় এবং মানুষ তার স্রষ্টা ও মালিককে ভুলে যায়। টাকা-পয়সাকেই সব কিছু মনে করতে শুরু করে, ফলে এটাকে সর্বাপেক্ষা বড় ফিৎনা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যদি গভীরভাবে চিন্তা করা যায়, তবে সহজেই বুঝা যাবে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ইরশাদ-পুরোপুরি সত্য ও সহীহ এবং যথোপযুক্ত। এর কারণে বহু নেককার মুত্তাকী ও আবেদ টাকা-পয়সার ফাঁদে গ্রেফতার হয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে। এই একই কারণে বহু লোক দ্বীন ও ধর্মকে ত্যাগ করেছে। এই কারণে বহু লোক ঈমান আকীদা বিক্রি করে দিয়েছে, সামান্য কিছু পাওয়ার জন্য মানুষ জায়েয ও না জায়েয পন্থা অবলম্বন করেছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px