📄 সমস্ত দুনিয়া পেয়ে যাওয়া
হযরত উবায়দুল্লাহ বিন মিহসান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিশ্চিন্ত (পরিবারবর্গ সহ নিঃশঙ্ক ও নিশ্চিন্ত) থাকে, শরীর সুস্থ থাকে, তার কাছে পুরা দিনের খাদ্য থাকে, এরূপ ব্যক্তির জন্য যেন পুরা দুনিয়ার (ঐশ্বর্য) একত্রিত করে দেওয়া হল।
যদি কেউ পুরা দুনিয়ার ধন ও নিয়ামত পেয়ে যায় কিন্তু নিজ ঘরে অর্থাৎ পারিবারিক জীবনে দুঃখ কষ্ট আর দুর্ভোগের শিকার হয়, বিবি বাচ্চার অনাকাংখিত ব্যবহার থেকে মুক্ত না হয়, রোগ-শোক বা অন্য কোন মুসীবতের শিকার হয়, তবে সে দুনিয়ার এই সমস্ত ধন-সম্পদ ও নেয়ামতের কি মজা পাবে? এমনিভাবে যদি কোন ব্যক্তি দারিদ্রতা ও উপবাসের শিকার হয়, প্রয়োজন মত খাদ্যও যদি তার না থাকে, তবে এমন লোক অন্য নিয়ামত থাকা সত্ত্বেও চিন্তিত ও পেরেশান থাকে। কিন্তু আল্লাহ্ যদি কোন ব্যক্তিকে নিজ ঘরের আরাম, শান্তি বলে বাচ্চার অনাকাংখিত আচার ব্যবহার থেকে মুক্ত রাখেন, ঘরের জীবনও শান্তিময় হয়, কোন রকম শারীরিক রোগও না থাকে এবং পেট ভরার জন্য যদি খাবার থাকে, তবে এরকম মানুষ সত্যি ভাগ্যবান। তার এ ছাড়া আর কি চাই? তাকে যেন সত্যি সত্যি দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজেও নিরাপদ ও শান্ত, বিবি বাচ্চাও ভাল, দারিদ্রতার অভাব থেকেও মুক্ত। সুবহানাল্লাহ, এর চাইতে বেশি নিয়ামত আর কি হবে? এর জন্য আল্লাহ্ তা'আলার কাছে অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে।
📄 কতটুকু খাওয়া উচিত
হযরত মেকদাম বিন মাদি কারাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, কোন মানুষ পেট অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট কোন বরতন খাবার দিয়ে পূর্ণ করেনি। বনি আদমের জন্য (মানুষের জন্য) ঐ অল্প কয়েক লোকমাই যথেষ্ট, যা তার কোমরকে সোজা রাখতে পারে, কিন্তু বেশি যদি খেতেই হয় তবে (এই পরিমাণ খাবে যাতে পেটের) এক তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পান করার জন্য, এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখা উচিত।
মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করা। আর খাওয়া দাওয়া ও নিদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে তার কোমরকে সোজা রাখা এবং ইবাদতের শক্তি পাওয়ার জন্য, আনন্দ স্ফুর্তি ও পশুর মত জীবন যাপনের জন্য নয়। মানুষ ও পশু এবং মুমিন ও কাফেরের মধ্যে একটাই পার্থক্য যে, সে আনন্দ স্ফূর্তি করার জন্য পেট ভরে এবং কাজের মধ্যে মজা ও আকর্ষণের জন্য খায়। আর মুসলমান এজন্য খায়, যাতে সে আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারে এবং আল্লাহ্র নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারে। কিন্তু যদি পশু প্রবৃত্তি কোন ব্যক্তিকে অতিরিক্ত আহারে বাধ্য করেই দেয় এবং সে স্বল্প আহারে চলতে না পারে এবং পেট যদি ভরতেই হয়, তবে দ্বীন ও দুনিয়ার ফায়দা লাভের জন্য তার নিজের পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে নেয়া উচিত। এক অংশ খাওয়ার জন্য, এক অংশ পান করার জন্য এবং অন্য অংশ শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য খালি রাখতে হবে। পশু অথবা ঐ সকল মানুষের মত হওয়া উচিত নয়, যারা বলে যে, দুনিয়ার নিয়ামত থেকে আনন্দ কর, পেট ভরে খাও। পানি নিজের জায়গা নিজেই তৈরী করে নিবে। বাকী থাকল শ্বাস-প্রশ্বাস, সে যদি আসতে চায় তবে আসবে, অন্যথায় না আসবে। আমরা পানাহারের জন্য সৃষ্টি হয়েছি। এই সমস্ত মানুষের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ উলাইকা কাল আনয়ামি বাল হুম আদ্বল্লু (اعراف ১৭৯) “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর।” যারহুম ইয়াকুলু ওয়া ইয়াতামাত্তাউ ওয়া ইয়ুলহিহিমুল আমালু ফাসাওফা ইয়ালামুন (الحجر ৩) "আপনি ছেড়ে দিন তাদেরকে, খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক এবং আশায় ব্যস্ত থাকুক, অতি সত্ত্বর তারা জেনে নিবে।"
এক হাদীসে উল্লেখ আছে যে, মুমিন এক অন্ত্রের দ্বারা খায়, আর কাফের সাত অস্ত্রের দ্বারা খায়। অর্থাৎ মুমিন কম খায়, সে পশুর মত পেট ভরে না। যেরূপ সিন্দুক অথবা একটা বরতন ইত্যাদি মালের হেফাজতের জন্য হয়, তদ্রুপ এটাও একটা বরতন, যার মধ্যে খানা রাখা হয়, যাতে কোমর সোজা থাকে, ইবাদত করা যায়। বেশি ভরলে এই উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যাবে, দ্বীন দুনিয়ার লোকসান হবে। আর এই বরতন কোমরের হেফাজতের পরিবর্তে তাকে ভেঙ্গে দিবে এবং জঘন্য বরতনে পরিণত হয়ে যাবে।
📄 ক্ষুধার্ত থাকার লাভ
শেখ আবূ হামেদ (রহঃ) লিখেন, ক্ষুধার্ত থাকার দশটি লাভ আছে। একঃ ক্ষুধা মনের পরিচ্ছন্নতা আনয়ন করে, স্বাভাবিক গুণের গতিশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে, অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞানের সীমা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত আহার মানুষকে বেওকুফ আহাম্মক বানিয়ে দেয়। অন্তরকে বোধশূন্য করে দেয়। মাথায় তাপ বেড়ে যায়, যা জালের মত ছড়িয়ে গিয়ে চিন্তা ও কল্পনাকে আচ্ছন্ন করে দেয়, যার ফলে অন্তর ভারী হয়ে যায় এবং স্বীয় দায়িত্ব কর্তব্য ভুলে যায়।
দ্বিতীয়ঃ ক্ষুধার কারণে মানুষের অন্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নরম হয়ে যায়, ফলে মানুষ অন্নদাতার নিকট প্রার্থনা করে আনন্দ পায় এবং আল্লাহ্ তা'আলার যিকিরের প্রভাব নিজের মধ্যে অনুভব করে।
তৃতীয়ঃ মানুষের স্বভাবের মধ্যে অক্ষমতা, অসহায়ত্ব ও দারিদ্রতার ভাব সৃষ্টি হয়, এবং আনন্দ স্ফূর্তি, অহংকার, রিপুর তাড়না শেষ হয়ে যায়, যা নাফরমানীর কারণ হয়ে থাকে। আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ক্ষুধার চাইতে বেশি প্রয়োজনীয় অন্য কোন জিনিস নেই। ক্ষুধার্ত মানুষ অন্নদাতার নিকট স্বীয় অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দারিদ্রতা অবলম্বন করে এবং আল্লাহর সমীপে অক্ষম, অসহায় ও অভাবী হওয়ার ভাব পয়দা হয়।
চতুর্থঃ এই কারণে আল্লাহ্ তা'আলার আযার ও পরীক্ষার কথা স্মরণে থাকে। চিন্তাযুক্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষের মূল্য বুঝে আসে। পক্ষান্তরে যার পেট ভরা থাকে, সে ক্ষুধার্ত ও উপবাসীদের ভুলে যায়।
পঞ্চমঃ ক্ষুধার্ত থাকার সবচাইতে বড় লাভ এই যে, সমস্ত পাপ ও নাফরমানীর উৎস কামভাব ও এর উত্তেজনা শক্তি হ্রাস পায় এবং নফসে আম্মারার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কম আহারের কারণে মানুষের সমস্ত রকম কামভাব ও উত্তেজনা শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। সবচাইতে বড় সৌভাগ্য এই যে, মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা এই যে, অতি আহারের দরুণ মানুষের উপর নফসে আম্মারা প্রভাব বিস্তার করে ফেলতে পারে এবং তার অনুশাসন কায়েম করে ফেলতে পারে।
ষষ্ঠঃ ক্ষুধার্ত থাকার কারণে ঘুম দূরে সরে যায়, নিদ্রাহীনতা সৃষ্টি হয়। কেননা, যে ব্যক্তি বেশি আহার করে, তাকে বেশি পানও করতে হয় এবং যে বেশি পান করে, তাকে বেশি ঘুমে থাকতে হয়। বেশি নিদ্রা মানুষের মূল্যবান সময়কে ধ্বংস করে দেয়। এর কারণে তাহাজ্জুদের ন্যায় নামায থেকে বঞ্চিত হতে হয়, স্থূলবুদ্ধি ও মনের কঠোরতা সৃষ্টি হয়। মানুষের বয়স অত্যন্ত দামী রত্ন। দুনিয়াতে মানুষের প্রকৃত পুঁজি তার মূল্যবান জীবন। এর মধ্যেই মানুষ আখেরাত উপার্জন করার ব্যবসা করে থাকে। ঘুম মৃত্যুর মত। অতএব বেশি নিদ্রা বয়সকে হ্রাস করে দেয়, ছোট করে দেয়।
সপ্তমঃ ক্ষুধা মানুষকে সর্বদা ইবাদতে মগ্ন থাকা সহজ করে দেয়। অতিরিক্ত আহার ইবাদতের আধিক্যে বাধা দেয়, এজন্য যে, প্রথমতঃ আহার করার জন্য বেশি সময় দরকার। তার কেনাকাটার জন্য সময় দরকার, তার রান্নাবান্নার জন্য সময় দরকার, আবার হাত মুখ ধোয়া ও টয়লেটে যাওয়ার জন্য আলাদা সময় দরকার হয়। যদি এগুলোর পরিবর্তে এই সময়টুকু আল্লাহ্ তা'আলার ধ্যানে, প্রার্থনায় ও ইবাদতে, কুরআনে কারীমের তেলাওয়াতের মধ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে কতই না লাভ হয়। হযরত সিররি (রহঃ) বলেন, আমি হযরত আলী জুরজানির নিকট ছাতু দেখেছি, যা হাতের তালু দ্বারা গোল্লা বানিয়ে মুখে দিচ্ছিলেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, এরূপ কেন করলেন? উত্তর করলেন, আমি এরূপ গিলে খাওয়া ও চিবিয়ে খাওয়ার মধ্যে সময়ের হিসাব করে দেখেছি যে, গিলে খাওয়ার মধ্যে সত্তর বার সোবহানাল্লাহ্ বেশি পড়া যায়। এই জন্য আমি চল্লিশ বছর ধরে রুটি চিবাই না, ছাতু খেয়েই থাকছি, যাতে এইটুকু সময় বেশি আল্লাহ্র ধ্যানে লাগিয়ে দিতে পারি।
অষ্টমঃ স্বল্প আহারে শরীর সুস্থ থাকে, রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ কারণে অতিরিক্ত আহার করলে নানা রোগের সৃষ্টি হয়, অতিরিক্ত আহারে পাকস্থলী ও রগের মধ্যে দুষিত রক্ত সৃষ্টি হয়ে নানা রকমের রোগের উৎপত্তি হয়। অসুস্থতার কারণে মানুষ ইবাদত থেকে বিরত থাকে। অন্তরের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দেয় এবং চিকিৎসার দরকার হয়। হাকীম ডাক্তারের পিছনে ছুটতে হয়। আর এই ছোটাছুটির জন্য সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়, ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ক্ষুধার্ত থাকা এই সমস্ত দুঃখ মুসীবত ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়।
নবমঃ স্বল্প আহারের কারণে খরচও কম হয়ে থাকে, স্বল্প আহারে যে অভ্যস্ত হয়, অল্প মাল তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়, দীর্ঘ কামনা ও অনর্থক ঝামেলায় তাকে আটকাতে হয় না অথবা অনর্থক ঝামেলায় জড়িত হতে হয় না।
দশমঃ স্বল্প আহারে অভ্যস্ত ব্যক্তি ইছার (অপরকে নিজ হতে শ্রেষ্ঠতর বলে ভাবা এবং অপরকে নিজের উপর প্রাধান্য দেয়া।) ও সদকা খয়রাত করে সওয়াব পাওয়ার উপযুক্ত হয়। এ কারণে যে, তার অতিরিক্ত খানাপিনা গরীব ও অভাবীদের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়, যা তার জন্য কেয়ামতের দিন ছাউনীর কাজে আসবে। মানুষ যা কিছু খায় তা টয়লেটের উপঢৌকন হয়ে যায়। কিন্তু যা কিছু সে সদকা-খয়রাত করে, আল্লাহ্র নিকট আখেরাতের ভাণ্ডারে অর্জিত সম্পদ হয়ে যায়, আর তা কেয়ামতের দিন কাজে আসবে।
📄 অতিরিক্ত আহারের কুফল
হযরত ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে ঢেকুর (খাওয়ার পর খাদ্যনালীর উদগীরণ) নিতে শুনেছেন, তখন ইরশাদ করলেনঃ নিজের ঢেকুর একটু খাট কর, এজন্য যে, কেয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি ঐ সমস্ত মানুষ ক্ষুধার্ত থাকবে, যাদের পেট দুনিয়াতে বেশি ভরা থাকত।
অতিরিক্ত আহারের দরুণ পাকস্থলী ভরে যাওয়ার কারণে ঢেকুর আসে। ঢেকুর কমাবার অর্থ হলো খানা কম খাওয়া। ঢেকুরের কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত খানাপিনা করা। বর্ণিত আছে যে, এই ব্যক্তি ছিলেন আবূ হুজায়ফা ওহাব বিন আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বলেন, একদিন আমি ছরিদ খেয়েছিলাম। যখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলাম, তখন আমার ঢেকুর আসতে থাকল, এরপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত কথা বললেন। বর্ণিত আছে যে, এরপর হযরত আবূ হুজায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু কখনো পেট ভরে খানা খাননি। তিনি এ রকম নিয়ম করে নিয়েছিলেন যে, যদি দুপুরে খানা খেতেন, তাহলে রাতে না খেয়ে থাকতেন, আবার রাতে খেলে দুপুরে না খেয়ে থাকতেন। অন্যত্র বর্ণিত আছে, হযরত আবূ হুজায়ফা বলেন, আমি ত্রিশ বছর ধরে পেট ভরে খানা খাইনি।