📄 ঈর্ষার উপযুক্ত যারা
হযরত আবূ উমামা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার বন্ধুদের মধ্যে আমার নিকট সবচাইতে বেশি ঈর্ষা করার মত সেই মুমিন যে হাল্কা-পাতলা হয়, যে নামাযের জন্য অনেক বড় সময় পেয়েছে, আপন প্রভুর ইবাদত পরিপূর্ণভাবে আদায় করে, মানুষ আড়ালেও তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে, মানুষের মাঝে তেমন পরিচিত নয়। হাত দ্বারা তার দিকে ইশারাও করা হয় না। তার আয় প্রয়োজন মত এবং সে তার উপর ধৈর্যের সাথে কাজের সুবিধা করে নিয়েছে। এরপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুড়ি দিলেন এবং বললেন, তার মরণ অতি নিকটে এলে তার জন্য ক্রন্দনকারী কম হবে এবং তার উত্তরাধিকারী/ওয়ারেসী সম্পত্তি কম হবে।
সবচাইতে ঈর্ষার উপযুক্ত এই রকম মুসলমানকে বলা হয়েছে, যার মাল কম, আত্মীয়-স্বজন কম এবং দুনিয়ার সম্পর্ক এবং অন্যান্য উপাদান তাকে তার মাওলা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। সে আপন প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে মজা পায়, নামাযের মধ্যে আনন্দ পায়। ইবাদাতে মনোযোগী হয়। ইবাদাতসমূহের সমস্ত আদব ও শর্ত যথাযথভাবে আদায় করে, যেমনিভাবে প্রকাশ্যে আল্লাহকে মানে, তেমনিভাবে গোপনেও মানে। মানুষের মাঝে সে প্রসিদ্ধ হয় না বরং অপরিচিত থাকে, মানুষ জানেও না যে, এই ব্যক্তি কোন আবেদ, ধার্মিক অথবা বড় আলেম। তার আয় প্রয়োজন মাফিক হয়, নিজের প্রয়োজনও মিটে যায়, অন্যের কাছে হাতও পাতে না। ধন-সম্পদ সংগ্রহ করার চক্করেও পড়ে না। সেই অল্প আয়ের উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং অপরিচিত থাকার মধ্যেই খুশি থাকে এবং তার মৃত্যুও তাড়াতাড়ি আসে, বেশি বয়সও পায় না, এরকম কোন নামী দামীও ছিল না যে, অনেক মানুষই তার জন্য চোখের পানি ফেলবে, তার আয় প্রয়োজন মত থাকে, এ কারণে পরিত্যক্ত সম্পত্তিও রেখে যায়নি। এমন ব্যক্তি বেশি ঈর্ষার উপুক্ত এবং সফল মানুষ। এক হাদীসে আছে, আল্লাহ্ তা'আলা যখন কোন বান্দাকে পছন্দ করেন তখন তাকে নিজের বানিয়ে নেন এবং বিবি বাচ্চার সমস্ত রকম কষ্ট মুসীবত থেকে তাকে মুক্ত রাখেন।
📄 দারিদ্রতা ও উপবাসের ফযীলত
হযরত আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে আমার প্রতিপালক এই অধিকার দিয়েছেন যে, মক্কার সমস্ত মাটি আমার জন্য স্বর্ণ বানিয়ে দেওয়া হবে। আমি আরয করলাম, না, হে পরওয়ারদিগার! বরং আমি একদিন পেট ভরে খাবো আর একদিন ক্ষুধার্ত থাকব। যখন ক্ষুধার্ত থাকব, তখন আপনার কাছে বিনয়, মিনতি করব এবং আপনার নাম স্মরণ করব, আর যখন পেট ভরে যাবে তখন আপনার হামদ্ ও প্রশংসা করব এবং আপনার কৃতজ্ঞতা আদায় করব।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার ধন-সম্পদের চাইতে দারিদ্রতা ও উপবাসকেই বেশী পছন্দ করেছেন এবং সোনা-চান্দির পরিবর্তে প্রয়োজন মত জিনিসকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। ধনাঢ্যতা ও ঐশ্বর্যশীলতা আল্লাহ্ তা'আলার নাফরমানী, অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, অথচ দারিদ্রতা ও উপবাস আল্লাহ্ তা'আলার স্মরণ, বিনয় ও মিনতির কারণ হয়, মুমিন ধৈর্যশীল ও প্রশংসাকারী হয়।
📄 সমস্ত দুনিয়া পেয়ে যাওয়া
হযরত উবায়দুল্লাহ বিন মিহসান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিশ্চিন্ত (পরিবারবর্গ সহ নিঃশঙ্ক ও নিশ্চিন্ত) থাকে, শরীর সুস্থ থাকে, তার কাছে পুরা দিনের খাদ্য থাকে, এরূপ ব্যক্তির জন্য যেন পুরা দুনিয়ার (ঐশ্বর্য) একত্রিত করে দেওয়া হল।
যদি কেউ পুরা দুনিয়ার ধন ও নিয়ামত পেয়ে যায় কিন্তু নিজ ঘরে অর্থাৎ পারিবারিক জীবনে দুঃখ কষ্ট আর দুর্ভোগের শিকার হয়, বিবি বাচ্চার অনাকাংখিত ব্যবহার থেকে মুক্ত না হয়, রোগ-শোক বা অন্য কোন মুসীবতের শিকার হয়, তবে সে দুনিয়ার এই সমস্ত ধন-সম্পদ ও নেয়ামতের কি মজা পাবে? এমনিভাবে যদি কোন ব্যক্তি দারিদ্রতা ও উপবাসের শিকার হয়, প্রয়োজন মত খাদ্যও যদি তার না থাকে, তবে এমন লোক অন্য নিয়ামত থাকা সত্ত্বেও চিন্তিত ও পেরেশান থাকে। কিন্তু আল্লাহ্ যদি কোন ব্যক্তিকে নিজ ঘরের আরাম, শান্তি বলে বাচ্চার অনাকাংখিত আচার ব্যবহার থেকে মুক্ত রাখেন, ঘরের জীবনও শান্তিময় হয়, কোন রকম শারীরিক রোগও না থাকে এবং পেট ভরার জন্য যদি খাবার থাকে, তবে এরকম মানুষ সত্যি ভাগ্যবান। তার এ ছাড়া আর কি চাই? তাকে যেন সত্যি সত্যি দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজেও নিরাপদ ও শান্ত, বিবি বাচ্চাও ভাল, দারিদ্রতার অভাব থেকেও মুক্ত। সুবহানাল্লাহ, এর চাইতে বেশি নিয়ামত আর কি হবে? এর জন্য আল্লাহ্ তা'আলার কাছে অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে।
📄 কতটুকু খাওয়া উচিত
হযরত মেকদাম বিন মাদি কারাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, কোন মানুষ পেট অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট কোন বরতন খাবার দিয়ে পূর্ণ করেনি। বনি আদমের জন্য (মানুষের জন্য) ঐ অল্প কয়েক লোকমাই যথেষ্ট, যা তার কোমরকে সোজা রাখতে পারে, কিন্তু বেশি যদি খেতেই হয় তবে (এই পরিমাণ খাবে যাতে পেটের) এক তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পান করার জন্য, এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখা উচিত।
মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করা। আর খাওয়া দাওয়া ও নিদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে তার কোমরকে সোজা রাখা এবং ইবাদতের শক্তি পাওয়ার জন্য, আনন্দ স্ফুর্তি ও পশুর মত জীবন যাপনের জন্য নয়। মানুষ ও পশু এবং মুমিন ও কাফেরের মধ্যে একটাই পার্থক্য যে, সে আনন্দ স্ফূর্তি করার জন্য পেট ভরে এবং কাজের মধ্যে মজা ও আকর্ষণের জন্য খায়। আর মুসলমান এজন্য খায়, যাতে সে আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারে এবং আল্লাহ্র নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারে। কিন্তু যদি পশু প্রবৃত্তি কোন ব্যক্তিকে অতিরিক্ত আহারে বাধ্য করেই দেয় এবং সে স্বল্প আহারে চলতে না পারে এবং পেট যদি ভরতেই হয়, তবে দ্বীন ও দুনিয়ার ফায়দা লাভের জন্য তার নিজের পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে নেয়া উচিত। এক অংশ খাওয়ার জন্য, এক অংশ পান করার জন্য এবং অন্য অংশ শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য খালি রাখতে হবে। পশু অথবা ঐ সকল মানুষের মত হওয়া উচিত নয়, যারা বলে যে, দুনিয়ার নিয়ামত থেকে আনন্দ কর, পেট ভরে খাও। পানি নিজের জায়গা নিজেই তৈরী করে নিবে। বাকী থাকল শ্বাস-প্রশ্বাস, সে যদি আসতে চায় তবে আসবে, অন্যথায় না আসবে। আমরা পানাহারের জন্য সৃষ্টি হয়েছি। এই সমস্ত মানুষের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ উলাইকা কাল আনয়ামি বাল হুম আদ্বল্লু (اعراف ১৭৯) “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর।” যারহুম ইয়াকুলু ওয়া ইয়াতামাত্তাউ ওয়া ইয়ুলহিহিমুল আমালু ফাসাওফা ইয়ালামুন (الحجر ৩) "আপনি ছেড়ে দিন তাদেরকে, খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক এবং আশায় ব্যস্ত থাকুক, অতি সত্ত্বর তারা জেনে নিবে।"
এক হাদীসে উল্লেখ আছে যে, মুমিন এক অন্ত্রের দ্বারা খায়, আর কাফের সাত অস্ত্রের দ্বারা খায়। অর্থাৎ মুমিন কম খায়, সে পশুর মত পেট ভরে না। যেরূপ সিন্দুক অথবা একটা বরতন ইত্যাদি মালের হেফাজতের জন্য হয়, তদ্রুপ এটাও একটা বরতন, যার মধ্যে খানা রাখা হয়, যাতে কোমর সোজা থাকে, ইবাদত করা যায়। বেশি ভরলে এই উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যাবে, দ্বীন দুনিয়ার লোকসান হবে। আর এই বরতন কোমরের হেফাজতের পরিবর্তে তাকে ভেঙ্গে দিবে এবং জঘন্য বরতনে পরিণত হয়ে যাবে।