📄 দুনিয়ার উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাটাইয়ের উপর ঘুমিয়েছিলেন। যখন ঘুম হতে উঠলেন, তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর মুবারকের উপর চাটাইয়ের দাগ পড়েছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আরয করলেনঃ হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি যদি আমাদেরকে অনুমতি দান করেন, তবে আমরা আপনার জন্য নরম বিছানা বানিয়ে আনি এবং আরাম-আয়েশের উপকরণ এনে দেই। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, আমার সঙ্গে দুনিয়ার কি সম্পর্ক? আমি ও দুনিয়া তো এরকম যেমন কোন মুসাফির গাছের ছায়ায় আরাম করে তারপর ছায়া ত্যাগ করে ঐ স্থান থেকে চলে যায়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর মুবারকের উপর চাটাইয়ের দাগ দেখে দুঃখিত হলেন। আল্লাহ্র প্রিয় দোস্ত খাতামুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত কষ্টে জীবন যাপন করছেন, খুব আশ্চর্যজনক কথা, অতএব হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নরম বিছানা ও অন্যান্য আরামের উপায়-উপকরণ এনে দেওয়ার অনুমতি চাইলেন। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক কথায় প্রকাশ করে দিলেন যে, এগুলো তো দুনিয়ার জিনিসপত্র, আমার সাথে এগুলোর কি সম্পর্ক? আমি তো দুনিয়াকে মুহাব্বত করি না, আখেরাতের আশা করি, দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ে একে অপরের দুশমন ও সতীন। আমার এবং দুনিয়ার সম্পর্ক শুধু অতটুকু, যতটুকু ছায়াদানকারী গাছ ও আরাম গ্রহণকারী মুসাফিরের সেই গাছের সাথে হয়, যে ক্ষণিকের জন্য আরাম গ্রহণ করে, আবার সামনে চলতে থাকে। সে ঐ গাছ বা ঐ জায়গার সাথে মন লাগায় না বরং তার প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা আদায় করে নেয় এবং যেখানে নিজের কাজ আছে সেখানেই চলে যায়।
📄 ঈর্ষার উপযুক্ত যারা
হযরত আবূ উমামা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার বন্ধুদের মধ্যে আমার নিকট সবচাইতে বেশি ঈর্ষা করার মত সেই মুমিন যে হাল্কা-পাতলা হয়, যে নামাযের জন্য অনেক বড় সময় পেয়েছে, আপন প্রভুর ইবাদত পরিপূর্ণভাবে আদায় করে, মানুষ আড়ালেও তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে, মানুষের মাঝে তেমন পরিচিত নয়। হাত দ্বারা তার দিকে ইশারাও করা হয় না। তার আয় প্রয়োজন মত এবং সে তার উপর ধৈর্যের সাথে কাজের সুবিধা করে নিয়েছে। এরপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুড়ি দিলেন এবং বললেন, তার মরণ অতি নিকটে এলে তার জন্য ক্রন্দনকারী কম হবে এবং তার উত্তরাধিকারী/ওয়ারেসী সম্পত্তি কম হবে।
সবচাইতে ঈর্ষার উপযুক্ত এই রকম মুসলমানকে বলা হয়েছে, যার মাল কম, আত্মীয়-স্বজন কম এবং দুনিয়ার সম্পর্ক এবং অন্যান্য উপাদান তাকে তার মাওলা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। সে আপন প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে মজা পায়, নামাযের মধ্যে আনন্দ পায়। ইবাদাতে মনোযোগী হয়। ইবাদাতসমূহের সমস্ত আদব ও শর্ত যথাযথভাবে আদায় করে, যেমনিভাবে প্রকাশ্যে আল্লাহকে মানে, তেমনিভাবে গোপনেও মানে। মানুষের মাঝে সে প্রসিদ্ধ হয় না বরং অপরিচিত থাকে, মানুষ জানেও না যে, এই ব্যক্তি কোন আবেদ, ধার্মিক অথবা বড় আলেম। তার আয় প্রয়োজন মাফিক হয়, নিজের প্রয়োজনও মিটে যায়, অন্যের কাছে হাতও পাতে না। ধন-সম্পদ সংগ্রহ করার চক্করেও পড়ে না। সেই অল্প আয়ের উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং অপরিচিত থাকার মধ্যেই খুশি থাকে এবং তার মৃত্যুও তাড়াতাড়ি আসে, বেশি বয়সও পায় না, এরকম কোন নামী দামীও ছিল না যে, অনেক মানুষই তার জন্য চোখের পানি ফেলবে, তার আয় প্রয়োজন মত থাকে, এ কারণে পরিত্যক্ত সম্পত্তিও রেখে যায়নি। এমন ব্যক্তি বেশি ঈর্ষার উপুক্ত এবং সফল মানুষ। এক হাদীসে আছে, আল্লাহ্ তা'আলা যখন কোন বান্দাকে পছন্দ করেন তখন তাকে নিজের বানিয়ে নেন এবং বিবি বাচ্চার সমস্ত রকম কষ্ট মুসীবত থেকে তাকে মুক্ত রাখেন।
📄 দারিদ্রতা ও উপবাসের ফযীলত
হযরত আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে আমার প্রতিপালক এই অধিকার দিয়েছেন যে, মক্কার সমস্ত মাটি আমার জন্য স্বর্ণ বানিয়ে দেওয়া হবে। আমি আরয করলাম, না, হে পরওয়ারদিগার! বরং আমি একদিন পেট ভরে খাবো আর একদিন ক্ষুধার্ত থাকব। যখন ক্ষুধার্ত থাকব, তখন আপনার কাছে বিনয়, মিনতি করব এবং আপনার নাম স্মরণ করব, আর যখন পেট ভরে যাবে তখন আপনার হামদ্ ও প্রশংসা করব এবং আপনার কৃতজ্ঞতা আদায় করব।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার ধন-সম্পদের চাইতে দারিদ্রতা ও উপবাসকেই বেশী পছন্দ করেছেন এবং সোনা-চান্দির পরিবর্তে প্রয়োজন মত জিনিসকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। ধনাঢ্যতা ও ঐশ্বর্যশীলতা আল্লাহ্ তা'আলার নাফরমানী, অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, অথচ দারিদ্রতা ও উপবাস আল্লাহ্ তা'আলার স্মরণ, বিনয় ও মিনতির কারণ হয়, মুমিন ধৈর্যশীল ও প্রশংসাকারী হয়।
📄 সমস্ত দুনিয়া পেয়ে যাওয়া
হযরত উবায়দুল্লাহ বিন মিহসান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিশ্চিন্ত (পরিবারবর্গ সহ নিঃশঙ্ক ও নিশ্চিন্ত) থাকে, শরীর সুস্থ থাকে, তার কাছে পুরা দিনের খাদ্য থাকে, এরূপ ব্যক্তির জন্য যেন পুরা দুনিয়ার (ঐশ্বর্য) একত্রিত করে দেওয়া হল।
যদি কেউ পুরা দুনিয়ার ধন ও নিয়ামত পেয়ে যায় কিন্তু নিজ ঘরে অর্থাৎ পারিবারিক জীবনে দুঃখ কষ্ট আর দুর্ভোগের শিকার হয়, বিবি বাচ্চার অনাকাংখিত ব্যবহার থেকে মুক্ত না হয়, রোগ-শোক বা অন্য কোন মুসীবতের শিকার হয়, তবে সে দুনিয়ার এই সমস্ত ধন-সম্পদ ও নেয়ামতের কি মজা পাবে? এমনিভাবে যদি কোন ব্যক্তি দারিদ্রতা ও উপবাসের শিকার হয়, প্রয়োজন মত খাদ্যও যদি তার না থাকে, তবে এমন লোক অন্য নিয়ামত থাকা সত্ত্বেও চিন্তিত ও পেরেশান থাকে। কিন্তু আল্লাহ্ যদি কোন ব্যক্তিকে নিজ ঘরের আরাম, শান্তি বলে বাচ্চার অনাকাংখিত আচার ব্যবহার থেকে মুক্ত রাখেন, ঘরের জীবনও শান্তিময় হয়, কোন রকম শারীরিক রোগও না থাকে এবং পেট ভরার জন্য যদি খাবার থাকে, তবে এরকম মানুষ সত্যি ভাগ্যবান। তার এ ছাড়া আর কি চাই? তাকে যেন সত্যি সত্যি দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজেও নিরাপদ ও শান্ত, বিবি বাচ্চাও ভাল, দারিদ্রতার অভাব থেকেও মুক্ত। সুবহানাল্লাহ, এর চাইতে বেশি নিয়ামত আর কি হবে? এর জন্য আল্লাহ্ তা'আলার কাছে অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে।