📄 দুনিয়ার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র
হযরত ওসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আদম সন্তানের জন্য ঐ সমস্ত জিনিস ব্যতীত অন্য কোন জিনিসের দাবী নেই। এক, ঐ স্থান যেখানে সে থাকতে পারে, দ্বিতীয়, ঐ কাপড় যার দ্বারা সে সতর ঢাকতে পারে এবং শুকনা রুটি ও পানি।
অর্থাৎ মানুষের জন্য এগুলো অপেক্ষা অধিক একেবারেই প্রয়োজন নেই। মানুষের দেহের জন্য এগুলো এরকম প্রয়োজনীয় যা তার দ্বীনের উপর আমল করার জন্য সাহায্যকারী ও সহায়ক হয়, যা প্রয়োজন হয়ে থাকে প্রত্যেকের জন্য। মাথা গোঁজার জন্য জায়গা প্রয়োজন হয়, যার কারণে মানুষের দেহ গরম-শীত বৃষ্টি এবং রোদের তাপ থেকে বাঁচাতে পারে। মানুষের সাথে চলাফেরা করার জন্য কিংবা নামায পড়ার জন্য অতটুকু কাপড় প্রয়োজন, যার দ্বারা কমপক্ষে মানুষ তার সতর ঢেকে রাখতে পারে এবং বেঁচে থাকার জন্য ততটুকু খাবার প্রয়োজন যার দ্বারা মানুষের মধ্যে তার প্রাণ থাকতে পারে। এগুলোর জন্য আখেরাতে হিসাব-নিকাশ এবং সওয়াল ও জওয়াব হবে না। যদি হালালভাবে ঐ সমস্ত জিনিস উপার্জন করা যায়, তবে আখেরাতে হিসাব-নিকাশ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এজন্য যে, এই সমস্ত জিনিস দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো ছাড়া অন্যান্য দ্রব্য-সামগ্রী হিসাব-নিকাশের কারণ হবে এজন্য যে, ঐগুলো মানুষের জন্য আবশ্যকীয় নয়, বরং ইহা আশা-আকাঙ্ক্ষা বিলাসের অন্তর্ভুক্ত, আর এগুলোর জন্য জীবন থেমে থাকে না। উদ্দেশ্য হলো যে, মানুষ অল্পতে ও প্রয়োজনমত জিনিসের উপর সন্তুষ্ট থাকুক। নফস ও শয়তানের অনুকরণ অনুসরণ ত্যাগ করে, আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ রাখুক। পোলাও খেলেও পেট ভরবে। জর্দা বিরানী খেলেও পেট ভরবে অথবা বাসি রুটিই খাওয়া হোক না কেন, পেট ভরে যাবে। যে কোন দামী বা সস্তা খাবারই হোক না কেন, পেটে গিয়ে সবই একরকম হয়ে যায়। তাই সামান্য একটু সুখ, শান্তি, বিলাস ও রুচির জন্য সদা ব্যস্ত হয়ে সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহকে ভুলে থাকা কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সতর ঢাকার জন্য যে কাপড়ের দরকার হয়, তার জন্য দোকান থেকে দোকানে, এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে, সুন্দর থেকে সুন্দরতর, টেকসই থেকে অধিকতর টেকসই, দামী থেকে আরো দামী কাপড় পছন্দ করার কি কোন অর্থ হয়? যত নরম কাপড়ই হোক না কেন অথবা খদ্দর কাপড় অথবা মোটা কাপড়ই হোক না কেন, উভয় প্রকার কাপড় দ্বারাই তো সতর ঢাকা যাবে, তাহলে শুধু মনকে খুশি করার জন্য দামী থেকে আরো দামী কাপড়ের সন্ধান কেন? তা আপন মনকে বুঝাতে হবে। আল্লাহ্র দাসত্বকে মেনে নাও, নফসের দাস হইও না। পুরুষ মানুষদের তো সাদাসিধে থাকা দরকার। জাঁকজমক তো মহিলারা ও বাচ্চারা করবে এটা তাদের ব্যাপার। যদি মুমিন হন তাহলে আখেরাত পাওয়ার আশায় থাকেন। মুমিন দুনিয়ার জাঁকজমক পছন্দ করে না।
মাথা গোঁজার জন্য কুঁড়ের ঘর হোক অথবা সরাইখানা হোক অথবা গাছতলা বা ছায়াযুক্ত স্থানের নীচে আরাম আর আয়েশের ব্যবস্থাই হোক না কেন, চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লে বড় বড় অট্টালিকা, সুন্দর পালংক, নরম কোমল বিছানা অথবা প্লাটফরম সরাইখানা কুড়ে ঘরের চাটাই কিংবা শক্ত মাটির বিছানাই হোক না কেন সব এক রকমই হয়ে যায়। তাহলে, অস্থায়ী সুখের জন্য আখেরাতের অতবড় হিসাব-নিকাশের ঝামেলায় পড়া কোন সুবিচারক আর কোন বুদ্ধিমানের কথা? আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ বিন নুরী (রহঃ) বলতেন, একবেলা খাবার গ্রহণ করুন আর অন্য বেলা ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকুন। তখন দেখবেন অন্য বেলা বাসি রুটিও পোলাও বিরিয়ানীর চাইতে বেশি সুস্বাদু মনে হবে। প্রচন্ড রকম ঘুম আসলে মাটিও অনেক ভাল লাগে। অন্যথায় মখমলের নরম বিছানা ও কাঁটার মত বিধতে থাকে।
📄 সুখী ও সুস্থির বন্ধু হওয়ার উপায়
হযরত সাহল বিন সাআদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক লোক আসল এবং আরয করল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে এমন কোন কাজ বলে দিন, যখন আমি এগুলো করব তখন যেন আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে ভালবাসতে থাকেন এবং মানুষ যেন আমাকে চায়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দুনিয়ার বাসনা থেকে দূরে থাক, আল্লাহ্ তোমাকে ভালবাসতে থাকবেন এবং যা কিছু মানুষের কাছে আছে তা থেকে দূরে থাক, মানুষ তোমাকে ভালবাসতে থাকবে।
আল্লাহ্ তা'আলা এবং মানুষের ভালবাসা কিভাবে পাওয়া যায়? এই সাহাবী এই সমস্ত ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল, যার উপায় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বললেন যে, তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার দুশমনদের সহিত বন্ধুত্ব ত্যাগ কর, তাহলে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদেরকে বন্ধু করে নিবেন। দুনিয়াকে অবহেলা কর, দুনিয়ার আসবাবপত্রের প্রতি অমনোযোগী হও। আখেরাতের চিন্তা কর, আখেরাতের নিয়ামত ও দান পাওয়ার চেষ্টা কর, আল্লাহ্র প্রিয়পাত্র হয়ে যাবে। 'যুহৃদ' এই যে, মানুষ দুনিয়ার প্রতি প্রবল আগ্রহকে গ্রাস করে দেয়, দুনিয়ার ধন-সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবেই সে যুহূদের দাবিদার হয়, কিন্তু তার দাবীর সত্যতা তখনই বোঝা যাবে যখন দুনিয়া তার হাতের নাগালে আসে। আর তার তা ধরার শক্তিও থাকে, এরপরও সে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু যার কাছে দুনিয়া আসে নাই, তার কাছে যুহদের কি অর্থ থাকতে পারে? হতে পারে তার নিকট দুনিয়া আসত, আর সে তা আগ্রহে গ্রহণ করত।
আল্লামা তিবী (রহঃ) লিখেনঃ এই হাদীস দ্বারা বুঝা গেল যে, যুহদ সর্বোকৃষ্ট মাকাম, এজন্য যে, এটা আল্লাহ্ তা'আলার মহব্বত পাওয়ার উপায়। যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাকে মহব্বত করে, আল্লাহ্ তাকে পছন্দ করেন না। এক জায়গায় বর্ণিত আছে, দুনিয়ার প্রতি অনীহা আত্মা ও শরীরকে শান্তি দেয়, পক্ষান্তরে দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ চিন্তা ও কষ্টকে বৃদ্ধি করে।
📄 দুনিয়ার উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাটাইয়ের উপর ঘুমিয়েছিলেন। যখন ঘুম হতে উঠলেন, তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর মুবারকের উপর চাটাইয়ের দাগ পড়েছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আরয করলেনঃ হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি যদি আমাদেরকে অনুমতি দান করেন, তবে আমরা আপনার জন্য নরম বিছানা বানিয়ে আনি এবং আরাম-আয়েশের উপকরণ এনে দেই। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, আমার সঙ্গে দুনিয়ার কি সম্পর্ক? আমি ও দুনিয়া তো এরকম যেমন কোন মুসাফির গাছের ছায়ায় আরাম করে তারপর ছায়া ত্যাগ করে ঐ স্থান থেকে চলে যায়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর মুবারকের উপর চাটাইয়ের দাগ দেখে দুঃখিত হলেন। আল্লাহ্র প্রিয় দোস্ত খাতামুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত কষ্টে জীবন যাপন করছেন, খুব আশ্চর্যজনক কথা, অতএব হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নরম বিছানা ও অন্যান্য আরামের উপায়-উপকরণ এনে দেওয়ার অনুমতি চাইলেন। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক কথায় প্রকাশ করে দিলেন যে, এগুলো তো দুনিয়ার জিনিসপত্র, আমার সাথে এগুলোর কি সম্পর্ক? আমি তো দুনিয়াকে মুহাব্বত করি না, আখেরাতের আশা করি, দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ে একে অপরের দুশমন ও সতীন। আমার এবং দুনিয়ার সম্পর্ক শুধু অতটুকু, যতটুকু ছায়াদানকারী গাছ ও আরাম গ্রহণকারী মুসাফিরের সেই গাছের সাথে হয়, যে ক্ষণিকের জন্য আরাম গ্রহণ করে, আবার সামনে চলতে থাকে। সে ঐ গাছ বা ঐ জায়গার সাথে মন লাগায় না বরং তার প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা আদায় করে নেয় এবং যেখানে নিজের কাজ আছে সেখানেই চলে যায়।
📄 ঈর্ষার উপযুক্ত যারা
হযরত আবূ উমামা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার বন্ধুদের মধ্যে আমার নিকট সবচাইতে বেশি ঈর্ষা করার মত সেই মুমিন যে হাল্কা-পাতলা হয়, যে নামাযের জন্য অনেক বড় সময় পেয়েছে, আপন প্রভুর ইবাদত পরিপূর্ণভাবে আদায় করে, মানুষ আড়ালেও তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে, মানুষের মাঝে তেমন পরিচিত নয়। হাত দ্বারা তার দিকে ইশারাও করা হয় না। তার আয় প্রয়োজন মত এবং সে তার উপর ধৈর্যের সাথে কাজের সুবিধা করে নিয়েছে। এরপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুড়ি দিলেন এবং বললেন, তার মরণ অতি নিকটে এলে তার জন্য ক্রন্দনকারী কম হবে এবং তার উত্তরাধিকারী/ওয়ারেসী সম্পত্তি কম হবে।
সবচাইতে ঈর্ষার উপযুক্ত এই রকম মুসলমানকে বলা হয়েছে, যার মাল কম, আত্মীয়-স্বজন কম এবং দুনিয়ার সম্পর্ক এবং অন্যান্য উপাদান তাকে তার মাওলা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। সে আপন প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে মজা পায়, নামাযের মধ্যে আনন্দ পায়। ইবাদাতে মনোযোগী হয়। ইবাদাতসমূহের সমস্ত আদব ও শর্ত যথাযথভাবে আদায় করে, যেমনিভাবে প্রকাশ্যে আল্লাহকে মানে, তেমনিভাবে গোপনেও মানে। মানুষের মাঝে সে প্রসিদ্ধ হয় না বরং অপরিচিত থাকে, মানুষ জানেও না যে, এই ব্যক্তি কোন আবেদ, ধার্মিক অথবা বড় আলেম। তার আয় প্রয়োজন মাফিক হয়, নিজের প্রয়োজনও মিটে যায়, অন্যের কাছে হাতও পাতে না। ধন-সম্পদ সংগ্রহ করার চক্করেও পড়ে না। সেই অল্প আয়ের উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং অপরিচিত থাকার মধ্যেই খুশি থাকে এবং তার মৃত্যুও তাড়াতাড়ি আসে, বেশি বয়সও পায় না, এরকম কোন নামী দামীও ছিল না যে, অনেক মানুষই তার জন্য চোখের পানি ফেলবে, তার আয় প্রয়োজন মত থাকে, এ কারণে পরিত্যক্ত সম্পত্তিও রেখে যায়নি। এমন ব্যক্তি বেশি ঈর্ষার উপুক্ত এবং সফল মানুষ। এক হাদীসে আছে, আল্লাহ্ তা'আলা যখন কোন বান্দাকে পছন্দ করেন তখন তাকে নিজের বানিয়ে নেন এবং বিবি বাচ্চার সমস্ত রকম কষ্ট মুসীবত থেকে তাকে মুক্ত রাখেন।