📄 সম্পত্তি ও জমিদারী
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সম্পত্তি বানিও না, অন্যথায় দুনিয়াদারীতে ব্যস্ত হয়ে যাবে।
উদ্দেশ্য এই যে, কারবার, ব্যবসা, জমিদারী, ক্ষেত-খামার ইত্যাদিতে এরূপ ব্যস্ত হওয়া ঠিক নয়, যা দোজাহানের বাদশাহর ইবাদতকেই ভুলিয়ে দেয় এবং যেরূপভাবে আখেরাতের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ঠিক সেরূপভাবে প্রস্তুতি না নেওয়া হয়। দুনিয়াদারীতে এরূপ ব্যস্ত হয়ো না যে যিকিরকেই ভুলে যাও। কুরআন শরীফে আছে- রূজালুন লা তুলহীহিম তিজারাতুন ওয়ালা বায়উ আন যিকরিল্লাহ (النور ৩৮)
“এমন লোকেরা, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহ্র স্মরণ থেকে বিরত রাখে না।”
📄 দুনিয়ার ভালবাসা
হযরত আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালবেসেছে, সে নিজের আখেরাতের ক্ষতি করল এবং যে ব্যক্তি আখেরাতকে ভালবাসল, সে নিজের দুনিয়াকে আঘাত ও নষ্ট করল। অতএব তোমরা ধ্বংসশীল জিনিসের উপর চিরস্থায়ী জিনিসকে পছন্দ কর।
অর্থাৎ দুনিয়াকে এত ভালবাসতে নেই যে, সে ভালবাসা আল্লাহ্ তা'আলার ভালবাসার উপর প্রবল হয়ে যায়। যদি তদ্রুপ হয় তবে তোমরা দুনিয়ার ব্যস্ততার কারণে আখেরাতের কাজের জন্য আর অবসর হতে পারবে না, আল্লাহ্র ইবাদতের জন্য সময় পাবে না। এটা আখেরাতের জন্যে ধ্বংসকারী। আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে বানানোর চিন্তায় ব্যস্ত হবে, তার আর দুনিয়া বানানোর চিন্তা আসবে না। দুনিয়ার জন্য সে সুযোগও পাবে না। আর এ কথাও পরিষ্কার যে, এতে তার দুনিয়ার ব্যাপারে ক্ষতি হবে। অতএব তোমাদের যখন এটা জানা হয়ে গেল যে, দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে একটি অন্যটির বিপরীত এবং এক সাথে দু'টির সমন্বয়ও করতে পারবে না, সুতরাং আখেরাতই বানানোর ফিকির কর। দুনিয়া তো সাময়িক ও অস্থায়ী বস্তু, অতএব দুনিয়ার দিকে মনকে লাগিয়ে রাখা কেন? দুনিয়া বানানোর জন্য তবে কেন এত ব্যস্ততা? এই জন্য হাদীসে উল্লেখ আছেঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি দুনিয়াতে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে সে আখেরাতে বেশি তৃপ্ত হবে এবং দুনিয়াতে বেশি পোষাক পরিধানকারী কেয়ামতে উলঙ্গ হবে।
কুরআন পাকে আল্লাহ্ বলেনঃ خَافِضَةٌ রফিয়াহ (واقعه ৩) অর্থঃ “এটা নীচু করে দেবে (এবং) সমুন্নত করে দেবে।”
অতএব দুনিয়াকে ত্যাগ কর ও আখেরাতকে ধর। তাকে তৈরী করার চেষ্টা কর। ঈমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেন, যথেষ্ট পরিমাণ ইলম, যথেষ্ট পরিমাণ ঈমান তার থেকেও অধিক যথেষ্ট পরিমাণ জ্ঞান এই যে, মানুষ জানে যে, দুনিয়া ধ্বংসশীল, আখেরাত চিরস্থায়ী, যার ফল এটা হওয়া উচিত ছিল যে, মানুষ ধ্বংসশীল বস্তুকে ত্যাগ করে, চিরস্থায়ী বস্তুকে ধরবে এবং আখেরাতের দিকে মনোযোগী হবে। দুনিয়া থেকে পরাম্মুখতার চিহ্ন এই যে, মানুষ মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় আসার পূর্বেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিবে।
আল্লামা তিবী (রহঃ) বলেন, এ দুটি যেন তুলাদণ্ডের দুই দাড়ির পাল্লা, যখন একটা নীচু হবে তখন অন্যটি স্বাভাবিকভাবে উপরে উঠে যাবে। দুনিয়ার ভালবাসা, দুনিয়াতে ব্যস্ত ও লিপ্ত হওয়ার কারণ, যা আখেরাত থেকে অমনোযোগী করে দেয়, যার কারণে যিকির ও ফিকিরের তাওফীক হয় না এবং আখেরাতের আজর ও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়, যেটা অনেক বড় ক্ষতি। এ ছাড়াও দুনিয়াবী ধন-সম্পদ জমা করার জন্য এবং এটাকে নিরাপদ রাখার জন্য যত কিছু করা হয়, তার কষ্ট মুসীবত, দুশমনের দুশমনি ইত্যাদি তো রয়েছেই।
📄 টাকা-পয়সার দাসত্বের উপর অভিশাপ
হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সোনার দাসত্বের উপর অভিশাপ হোক এবং রূপা চান্দির দাসত্বের উপর অভিশাপ হোক।
এ বিষয়ে আগের হাদীসে (টাকা-পয়সার দাসত্বের আলোচনায়) বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে, দেখে নিন।
📄 ধন-সম্পদের লোভ-লালসা
হযরত কা'ব ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু'টি ক্ষুধার্ত নেকড়েকে যদি ভেড়ার পালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে এ দু'টি ভেড়াদের এই পরিমাণ ক্ষতি করবে না, যেই পরিমাণ ক্ষতি ধন-সম্পদ এবং সম্মান ও গৌরবের মোহ মানুষের দ্বীনকে করে।
ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘ, ভেড়া, দুম্বা, বকরির পালকে এত ক্ষতি করে না, যত ক্ষতি লোভ-লালসা মানুষের দ্বীনকে করে থাকে। এটা নেকড়ে বাঘের চাইতেও হিংস্র ও ধ্বংসকারী। মানুষ ধন-সম্পদ এবং সম্মান ও গৌরবের লোভ-লালসায় হালাল-হারামের মধ্যে পার্থক্য ও বিবেচনা ভুলে যায় এবং দ্বীন ও ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। ধন-সম্পদ পেয়ে মানুষ আত্মহারা হয়ে যায়, আইন অনুমোদিত নয় এমন দ্রব্য-সামগ্রীর পিছনে পড়ে যায় এবং পরবর্তীতে আনন্দ উল্লাসে জীবন কাটানো তার অভ্যাস ও রীতিনীতি হয়ে যায় এবং হালালের পরিবর্তে হারাম উপার্জনের চক্করে পড়ে যায়। আল্লাহকে স্মরণ করতে ভুলে যায়। মান, ইজ্জত, গৌরব হাসিলের জন্য নিজেকে ব্যবহার করে। মানুষ রিয়াকারী ও নেফাকের মধ্যে জড়িয়ে যায়, যার কারণে মানুষ অসংখ্য হীন ও নীচ আচার-ব্যবহার শিখে যায়। মানুষ ফেরাউনের মত হয়ে যায়। অত্যাচার করতে থাকে, অন্যের হক মেরে খায়, সম্মান ও গৌরবের জন্য ফেরাউন হয়ে উঠে এবং তা আখেরাতকে ধ্বংস করে দেয়। বলা হয়ে থাকে যে, মানুষের মাথা থেকে সম্মান, ইজ্জত ও গৌরবের আকাংখা সর্বশেষে বের হয়ে থাকে। 'রবিউল আবরার' গ্রন্থে সাহেবে কাসাফ হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, মানুষ ইহজীবনেও রিয়াকার হয় এবং মৃত্যুর পরও রিয়াকার হয়। তাঁকে প্রশ্ন করা হল, এটা কিভাবে? উত্তর হলো যে, সে এটা পছন্দ করে যে তার মৃত্যুর পরে তার জানাযায় অনেক মানুষ অংশগ্রহণ করুক।