📄 তাকওয়া পরহেযগারী বিরাট নেয়ামত
হযরত জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তির ইবাদত ও নেকীর জন্য অনেক চেষ্টা সাধনা করার (কিন্তু তার পাপ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা কম) কথা বলা হলো এবং অন্য এক ব্যক্তির তাকওয়া পরহেযগারীর (হারাম থেকে বেঁচে থাকা কিন্তু ইবাদতের মধ্যে কম লিপ্ততার) কথা বলা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ইবাদত) তাকওয়া ও পরহেযগারীর সমকক্ষ হতে পারবে না।
অর্থাৎ এক ব্যক্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, সে অনেক বড় আবেদ উপাসনাকারী এবং ইবাদতে লিপ্ত থাকে কিন্তু তার তাকওয়া-পরহেযগারী কম, গোনাহ থেকে কম বেঁচে থাকে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির ব্যাপারে এটা বলা হল যে, সে গোনাহ ও হারাম থেকে খুব বেশি বেঁচে থাকে। অবশ্য ইবাদতের দিকে বেশি মনোযোগী নয়। এই দুই ব্যক্তির মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইবাদত কখনো তাকওয়া পরহেযগারীর সমকক্ষ হতে পারে না। তাকওয়া ও পরহেযগারী সমস্ত কিছু থেকে শ্রেয়। আল্লামা রাগেব ইসফাহানী লিখেন, শরী'আতে পরহেযগারী বলে, দুনিয়া পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া না করাকে এবং তা তিন প্রকার (১) ওয়াজিবঃ সেই সমস্ত হারাম কার্যাবলী যা থেকে বিরত থাকা সকলের জন্য সমানভাবে অপরিহার্য, (২) মুস্তাহাবঃ এটা সেই সমস্ত সন্দেহজনক জিনিস বা কার্যাবলী থেকে বিরত থাকার নাম যা মধ্যপন্থা অবলম্বনকারীদের জন্য অপরিহার্য, (৩) ফযীলতঃ এটা হচ্ছে, বহু মুবাহ জিনিস বা কার্যাবলী থেকে বিরত থাকা এবং চাহিদা পূরণের জন্য স্বল্পের উপর সন্তুষ্ট থাকার নাম। এটা আম্বিয়ায়ে কেরাম, সিদ্দীকীন, শূহাদা ও সালেহীনদের জন্য।
📄 সৌভাগ্যজনক পাঁচটি জিনিস
হযরত ওমর বিন মাইমুন (রহঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ব্যক্তিকে উপদেশ দেওয়ার সময় বলতেন, পাঁচটি বস্তুকে পাঁচটির আগে সৌভাগ্য মনে কর। (১) যৌবনকালকে বৃদ্ধ হওয়ার আগে। (২) সুস্থতাকে অসুস্থ হওয়ার আগে। (৩) মালদারীকে দরিদ্র হওয়ার আগে। (৪) অবসর সময়কে ব্যস্ত হওয়ার আগে এবং (৫) নিজের জীবনকে মৃত্যু আসার আগে।
এই হাদীসের মধ্যে সুযোগকে আশীর্বাদ মনে করা এবং সময়কে ভাল কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মানুষ সাধারণতঃ নিজের মূল্যবান সময়কে অমনোযোগিতায় নষ্ট করে দেয়। কিন্তু যখন সময় চলে যায়, তখন আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করে; কিন্তু যখন সময় চলে যায়, তখন আফসোস করে কোন লাভ হয় না। তখন অনুতাপ করলে কি হবে, যখন পাখি শস্য খেয়ে ক্ষেত পরিষ্কার করে দেয়। বুদ্ধিমান তো সেই হয়, যে সময় ব্যবহার করে নিজে উপকৃত হয় এবং সুযোগকে হাতছাড়া করে না। যৌবন হচ্ছে শক্তি সামর্থের কাল। এ সময়ের মধ্যে ইবাদত-বন্দেগী খুব ভালভাবে আদায় করা যায়। সুতরাং চুল সাদা হওয়ার আগেই নেক ও মঙ্গলজনক কাজ করে নিতে হবে, এজন্য যে, বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক শক্তি কমে যায়। মন চাইবে কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাতে সায় দিবে না, সর্বদাই দুর্বলতা থাকবে। সে সময় দুঃখ-বেদনা ছাড়া অবশিষ্ট আর কিছুই করার থাকবে না। এজন্য বৃদ্ধ বয়সের আগেই যৌবন কালকে ব্যবহার করে লাভবান হয়ে যাও। প্রচুর নেক আমল করে আল্লাহকে রাজি করে নাও এবং আখেরাতকে তৈরী করে নিয়ে যাও।
সুস্থতা অনেক বড় নিয়ামত। যদি দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত ও দান একদিকে রাখা হয়, আর সুস্থতাকে আরেক পাশে রাখা হয়, তবে দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত, ধন-সম্পদ, জমিদারী সুস্থতার সমতুল্য হতে পারবে না। সুস্থতা সহস্র নিয়ামত থেকেও শ্রেয়। সুস্থতার কারণে খাওয়া-দাওয়া, চাল-চলনে, উঠা-বসায়, ইবাদত ও আরাধনায় স্বাদ পাওয়া যায়। সুস্থ ব্যক্তির রক্তে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। কাজেঅসুস্থ হওয়ার পূর্বেই নিজেকে মাওলার রাজি খুশির কাজে ন্যস্ত করে নাও। বেহেস্তকে সাজিয়ে নাও, আখেরাতের প্রস্তুতি নিয়ে নাও।
ধন-সম্পদ থাকা আল্লাহ্ তা'আলার নিয়ামত। এর দরুণ মানুষ একাগ্রতা, নিশ্চিন্ততা লাভ করতে পারে, নির্জনে আল্লাহ্র এবাদত করতে পারে, অভাবগ্রস্থ মানুষের অভাব ও দুঃখ-দুর্দশা দূর করা যায়। ভাল কাজে অংশ নেওয়া যায়। সদকা খয়রাত করা যায়। নিজের জন্য অনেক জিনিস সদকায়ে জারিয়া বানানো যায়। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত স্থায়ী জিনিস নয়। অনেক সময় দুনিয়ার জীবনেই সঙ্গ দেয় না। যদি এটা না হয়, তবে তারা তাকে মৃত্যুর সময় অবশ্যই ত্যাগ করবেই। সিকান্দার বাদশাহ যখন মারা যায়, তখন তার দুই হাত খালি ছিল। বলেন তো, কোন জমিদার তার মাল-দৌলত থেকে কি কখনো এক পয়সা নিজের সাথে নিয়ে যেতে পেরেছে? দুনিয়াতে মানুষ যেরূপ খালি হাতে আসে, ঠিক সেরূপ খালি হাতে চলে যায়। অবশ্য সৌভাগ্যবান লোক তারা, যারা নিজের টাকা-পয়সা নেক কাজে সদকায়ে জারিয়া এবং অন্যান্য খয়রাতের দ্বারা আখেরাতের সম্পদ বানিয়ে নেয়। অতঃপর দারিদ্রতা, অসহায়তা অথবা মৃত্যুর সময় তাদের আর আফসোস করতে হয় না।
মানুষ অবকাশ ও সময় পেয়েও যদি কোন লাভ করতে না পারে তবে তার চেয়ে বড় অধম আর কে হতে পারে? বুদ্ধিমানের কাজ তো এটাই যে, সে আজকের কাজ কালকের জন্য রাখে না। এটাতো জানা নেই যে, কাল কতটুকু কাজ হবে? তবে কেন এই ব্যস্ততা? যদি এজন্য আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে সুযোগ দিয়েই থাকেন তবে আখেরাতের প্রস্তুতিে তা কাজে লাগিয়ে দিন। এ সময়টিকে নেক আমলের জন্য ব্যবহার করে সময়কে মহা মূল্যবান করে নিতে হবে, যতই সময় যেতে থাকবে, ব্যস্ততা ততই বাড়তে থাকবে এবং পার্থিব দায়িত্বও বাড়তেই থাকবে। এজন্য যা কিছু করার আজকেই বরং এখনই করে নিন।
আল্লাহ্ দুনিয়ার জীবন দিয়েছেন যাতে এ জীবনটাকে আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতে ব্যবহার করা যায়। এ জীবনটাকে আল্লাহ্ তা'আলাকে খুশি করার মত কাজেই ব্যবহার করতে হবে। মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই এটা যে, সে নিজে নিজে আল্লাহ্ তা'আলার যিকির-আযকার, ইবাদত ও নেক আমলের মধ্যে মগ্ন থাকবে। যৌবনকাল হোক বা বৃদ্ধকালই হোক না কেন, সুস্থতা বা অসুস্থতার মধ্যে যা কামাই করা যায়, তা কামাতে হবে, অন্যথায় চোখ বন্ধ হলেই এ সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যাবে, আমলের সময় শেষ হয়ে যাবে। অতএব, হে মানুষ! বুদ্ধিমানের মত কাজ করে যাও এবং আখেরাতের প্রস্তুতি নাও, মৃত্যুর আগে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে হবে যাতে আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।
📄 কিসের অপেক্ষা?
হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ অপেক্ষা করে না, কিন্তু এরূপ সম্পদের যা তাকে নাফরমান বানিয়ে দেয় অথবা এরূপ দারিদ্রের যা তাকে ভুলিয়ে দেয় অথবা এরূপ রোগের যা তাকে বিবাদের মধ্যে নিক্ষেপ করে অথবা এরূপ বয়সের যা তাকে অকেজো করে দেয় অথবা এরূপ মৃত্যুর যা তাকে ঠিকানায় নিয়ে যায় অথবা দাজ্জালের, দাজ্জাল এক অনুপস্থিত জঘন্য ব্যক্তি যার অপেক্ষা করা হচ্ছে অথবা কেয়ামতের, কেয়ামত অনেক ভয়ংকর জিনিস।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীনের ব্যাপারে সংকীর্ণতা, অলসতা ও ভুলত্রুটি দেখে এই ইরশাদ করলেনঃ বল, তোমরা আপন খোদার ইবাদত কখন করবে? যখন শক্তি ও সামর্থ থাকা সত্ত্বেও তোমরা মা'বুদের ইবাদত কর না, তবে ব্যস্ততা বেড়ে গেলে শারীরিক শক্তি বল কমে গেলে কি ভাল আমল করবে? মনে হয়, তোমরা এমন ধনাধ্যতার অপেক্ষায় আছ যা তোমাদেরকে নাফরমান ও অবাধ্য এবং বিদ্রোহী বানিয়ে দিবে অথবা এমন অসুস্থতা যা শরীরকে দুর্বল করে দিবে অথবা এরূপ অসুস্থতার কারণে ধীরগতি ও অলসতার জন্ম হয়, যা আমল না করার কারণে দ্বীনকে বরবাদ করে দেয় অথবা এরূপ বৃদ্ধ বয়স যা শরীরকে অকেজো করে দেয়, কোন নেক কাজে অংশ নিতে দেয় না, বুদ্ধি বিবেচনায় দোষ ত্রুটির জন্ম দেয় অথবা এরূপ মৃত্যু যা হঠাৎ আসে আর মানুষকে তাওবা বা অসীয়ত করার সুযোগ দেয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খুন হয়ে যাওয়া, ডুবে মরে যাওয়া, উপর থেকে পড়ে মরে যাওয়া, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মরে যাওয়া অথবা দাজ্জালের আগমনের প্রতীক্ষায় আছ যা অতি বড় ফিতনা ও পরীক্ষার বিষয় হবে, তার জন্য অনেকেরই ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। অথবা কেয়ামতের প্রতীক্ষায় আছ? মনে রেখ, কেয়ামত অনেক বড় বিপদসংকুল ভীতি, ভয়াল ভয়ংকর। মানুষের দুনিয়াতে যে কষ্ট ও মুসীবত হয় সমস্ত কিছু হতে কেয়ামত অধিক ভয়ংকর হবে ঐ ব্যক্তির জন্য, যে তার প্রস্তুতি নিতে পারেনি, ভাল আমল করতে পারেনি। অতএব ভাগ্যবান লোক তারা, যারা সুযোগকে হাতছাড়া করেনি, বরং সময় থেকে ফায়দা তুলে নিয়েছে এবং ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ও মুস্তাহাবসমূহ ঠিকমত আদায় করেছে এবং মৃত্যুর পূর্বেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।
📄 অভিশপ্ত দুনিয়া
হযরত আবূ হুরায়রা সাল্লাল্লাহু রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শুনে রাখ, দুনিয়া অভিশপ্ত এবং প্রত্যেক সেই সমস্ত জিনিস অভিশপ্ত যা কিছু দুনিয়াতে আছে। একমাত্র আল্লাহ্র উৎকৃষ্ট যিকির এবং সেই সমস্ত নেক আমল যা আল্লাহ্ নিকট প্রিয় এবং (দ্বীনী) আলেম অথবা (দ্বীনী) ছাত্র।
দুনিয়া অভিশপ্ত এজন্য যে, এটা আল্লাহ্ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং উপস্থিত যা কিছু দুনিয়াতে আছে তা আল্লাহ্ তা'আলার যিকির থেকে অমনোযোগী করে দেয় এবং আল্লাহ্র রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ব্যতিক্রম শুধু আল্লাহ্র যিকির এবং সেই সমস্ত নেক আমল, যা আল্লাহ্র অতি প্রিয়। এমনিভাবে দ্বীনী আলেম ও ছাত্ররাও আল্লাহ্ তা'আলার রহমত থেকে দূরে হবেন না। তারা আল্লাহ্র যিকিরে নিজেও ব্যস্ত থাকেন এবং অপরকে ব্যস্ত রাখেন। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকেন এবং গোনাহের কাজে অন্যকেও বাধা প্রদান করুন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহ্ দুনিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এক অংশ মুমিনদের জন্য, এক অংশ কাফেরদের জন্য, এক অংশ মুনাফিকদের জন্য। মুমিন নিজের অংশকে আখেরাতের সম্পদ বানায় এবং মুনাফিক তার অংশ দিয়ে দুনিয়ার সৌন্দর্য লাভ করে এবং কাফের তার অংশ দিয়ে দুনিয়াতে সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে। পরিশেষে আলেম ও ছাত্রদের উল্লেখ করতঃ তাদের সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশ করলেন, যাতে এ কথা বলে দেওয়া যায় যে, আলেম ও ছাত্রদের ছাড়া অন্যসব কিছু বেকার এবং এটাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আলেম ও ছাত্রের দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সকল আল্লাহভীরু (মুখলেস) আলেম যারা ইলম ও আমল দুটিই হাসেল করেছে। জাহেল এবং ঐ সকল লোক উদ্দেশ্য নয় যারা দুনিয়াবী শিক্ষা শিখে অথবা এ রকম শিক্ষা হাসেল করে যা দ্বীনের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না। হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহ্র যিক্র খায়ের, সমস্ত ইবাদতের মূল এবং সমস্ত সুখের ভিত্তি, অধিকন্তু ওটা এ রকম, যেমন- শরীরের জন্য আত্মা এবং মানুষের জন্য প্রাণ। মানুষের জন্য জীবন কি কখনো অপ্রয়োজনীয় হতে পারে এবং আত্মা থেকে দেহ কি দূরে থাকার কোন জায়গা আছে?