📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 প্রকৃত ধনাঢ্যতা

📄 প্রকৃত ধনাঢ্যতা


হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুনিয়ায় অনেক বেশি জিনিস হওয়ার নাম মালদারী বা ধনাঢ্যতা নয়, প্রকৃত মালদারী হচ্ছে আত্মাকে ঐশ্বর্যশালী রাখা।

দুনিয়ার ধন-সম্পদের প্রাচুর্য, জমিদারী এবং টাকা-পয়সার মালিক হওয়া প্রকৃত মালদারী (ধনী) নয়, বরং প্রকৃত মালদারী মনের ঐশ্বর্য ও সন্তুষ্টি। আল্লাহ্ তা'আলা যা কিছু দিয়েছেন তার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং দুনিয়ার জন্য লোভ না করা; কিন্তু কারো নিকট বে-হিসেব ধন-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সে যদি (অবস্থার উপর) সন্তুষ্ট না হয় তবে সে প্রকৃত ফকীর ও গরীব। এজন্য যে, তার মন বেশি থেকে বেশির লোভ করে, বুক ভরা আশা রাখে এবং বেশি থেকে বেশি লাভের ইচ্ছা রাখে। সন্তুষ্টিপ্রিয় লোকেরা আল্লাহ্র দানের উপর ধৈর্যশীল ও প্রশংসাকারী হয়। তার মন দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় না, মানুষের ধন-সম্পদের প্রতি তার কোন আকর্ষণ থাকে না। তার হাতে টাকা-পয়সা থাকুক বা না থাকুক, সে সব সময় খুশি থাকে। পূণ্যের উদ্দেশ্যে অল্প মালের উপরেই সন্তুষ্ট থাকে। হাদীসে বর্ণিত সন্তুষ্টি এত বড় নিয়ামত যা কখনো শেষ হয় না।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 পাঁচটি উপদেশ

📄 পাঁচটি উপদেশ


হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি আমার এ কথাগুলো নিয়ে নিজে আমল করবে? অথবা এমন লোকদের বলবে, যারা তার উপর আমল করবে? আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি করব। অতঃপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে পাঁচটি বস্তু গণনা করিয়ে বললেন,
এক. হারাম থেকে বেঁচে থাকবে, দেখবে তুমি লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা আবেদ হয়ে যাবে।
দুই. আল্লাহ্ তোমার জন্য যা ফায়সালা ও মীমাংসা করে দিয়েছেন তার উপর সন্তুষ্ট (খুশি) থাক, দেখবে তুমি সর্বাপেক্ষা বড় ধনী হয়ে যাবে।
তিন. নিজের প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার কর, দেখবে তুমি পরিপূর্ণ মুমিন হয়ে যাবে।
চার. মানুষের জন্য ঐ সমস্ত জিনিস পছন্দ কর যা নিজের জন্য পছন্দ কর, ফলে তুমি পরিপূর্ণ মুসলমান হয়ে যাবে এবং
পাঁচ. বেশি হাসি হেসোনা, এজন্য যে, বেশি হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।

এই পাঁচটি উপদেশ ও অসীয়ত স্বর্ণাক্ষরে লেখার যোগ্য। এতে যেন সাগরের পানিকে একটি কলসিতে ভরে দেওয়া হল। প্রথম উপদেশ এই করলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে হারামকৃত জিনিসগুলো থেকে বেঁচে থাকতে হবে। যে সকল জিনিস নিষেধ করা হয়েছে, সে সব জিনিস থেকে দূরে থাকা, আর যে সব জিনিসের জন্য আদেশ করা হয়েছে সেগুলো করা। যেভাবে নিষেধকৃত জিনিসগুলো করা নিষিদ্ধ, ঠিক তেমনিভাবে আদেশকৃত জিনিসগুলো না করাও নিষিদ্ধ এবং শক্ত গোনাহ। অতএব যদি কেউ এরূপ যথাযথভাবে কাজ করল, তবে সে অতি বড় আবেদ বলে আখ্যায়িত হবে। কেননা সর্বাপেক্ষা বড় ইবাদত এটাই যে, মানুষ যেন ফরযসমূহ (আবশ্যকীয় কার্যসমূহ) সঠিকভাবে আদায় করে। মানুষ সাধারণত: ফরযসমূহের তুলনায় নাওয়াফিলের (নফলের) জন্য বেশি যত্নবান থাকে। ফরয কাজসমূহে শিথিল এবং নফল ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকে। মানুষের হকসমূহ আদায় করে না, যাকাত দেয় না; কিন্তু গরীব মিসকীনদের সে খানা খাওয়ায়। মানুষের হক নষ্ট করে, তাদের অর্জিত অর্থ খেয়ে ফেলে, আমানতের অর্থ আত্মসাৎ করতে থাকে, মানুষের সম্পূর্ণ পাওনা দেয় না, কিন্তু মসজিদে ও মাদ্রাসায় প্রচুর টাকা পয়সা দান করে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলার ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকুন। মানুষের মধ্যে বড় মালদার হয়ে যাবেন। আসল কথা হলো, আপনি ততটুকুই পাবেন যতটুকু আল্লাহ্ তা'আলা আপনার তকদিরে লিখে রেখেছেন। যদি তার উপর সন্তুষ্ট না হন, তবে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেই থাকবেন, জায়েয নাজায়েয পন্থা অবলম্বন করবেন, দারিদ্রতা ও লোভ আরো বৃদ্ধি পাবে; কিন্তু ফল কিছুই পাবেন না। অন্তর ধনী থাকলে মানুষও ধনী, অন্তর লোভী হলে মানুষ যতই টাকা-পয়সার মালিক হোক না কেন তার আশা-আকাঙ্ক্ষা অপূরণ রয়েই যাবে। তার লোভ-লালসা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হবে না।

পরিপূর্ণ মুমিন ব্যক্তি নিজের পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করে। অন্যেরা তার প্রতি যেরূপ ব্যবহারই করুক না কেন; কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার ভয় থাকায় সে খারাপ ব্যবহারের প্রতিউত্তর ভাল ব্যবহার দ্বারাই দিয়ে থাকে। নিজের বদ স্বভাব ও খারাবী থেকে নিজের পাড়া পড়শীদের নিরাপদে রাখে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে যে, “তোমাদের কেউ ঐ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার পাড়া প্রতিবেশী তার অন্যায় ও বিপদ থেকে নিরাপদ ও রক্ষা পায়।” তোমাদের নিজেদের জন্য যেরূপ ভালটা পছন্দ কর, ঠিক সেরূপ নিজের মুসলমান ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করবে। এটা তোমাদের মুসলমান হওয়ার চিহ্ন। কাফেরদেরকে মুসলমান বানানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে এবং ফাজের ও ফাসেক দুশ্চরিত্র ও গোনাহগারদেরকে সত্যবাদী নেক্কার ও সংযমী বানানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। যেরূপ তুমি চাও যে, দুনিয়া ও আখেরাতের সব রকমের বিপদাপদ হতে নিরাপদ থাক, ঠিক ঐরূপ নিজের মুসলমান ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ কর। বেশি হাসা অমনোযোগীর লক্ষণ। অতিরিক্ত হাসার কারণে অন্তর মরে যেতে থাকে। যদি নিজের বদ আমল, অসতর্কতা এবং ভুল ত্রুটির উপর দৃষ্টি দেওয়া যায়, তাহলে এর জন্য যে আল্লাহ্ তা'আলা ধর-পাকড় করছেন না, আমাদের অবাধ্যতার কারণে আযাবে শিথিলতা এবং আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষমার উপর চিন্তা করা যায়। তবে মানুষ লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারবে না, কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে যাবে এই ভেবে যে, তিনি এ রকম মহান উদারচেতা, প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক, আর আমি এমন নালায়েক তার এতবড় উপকারের কৃতজ্ঞতা কিভাবে আদায় করতেছি? আমার মত এতবড় গোনাহগার ও পাপীর পক্ষে হাসা কিভাবে শোভা পায়?

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 মালদার (ধনী) হওয়ার রহস্য

📄 মালদার (ধনী) হওয়ার রহস্য


হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ বলেন, হে বনী আদম! তুমি আমার ইবাদতের জন্য অবসর হয়ে যাও, ফলে তোমার দিলকে মালদার (ধনী) করব এবং স্বচ্ছলতায় ভরে দিব এবং তোমার দারিদ্রতা দূর করে দেব। আর যদি এরূপ না কর তবে আমি তোমার হাতগুলোকে অনর্থক কাজে জড়িত করে দেব এবং তোমার দারিদ্রতাও দূর করব না।

মানুষ যদি নিজেকে আল্লাহ্র ইবাদতের জন্য উৎসর্গ করে দেয়, তবে আল্লাহ্ তা'আলা তার হৃদয়কে আকুল বুদ্ধি দ্বারা পূর্ণ করে দেবেন। যা তাকে অন্যদের থেকে স্বাধীন ও বেপরোয়া করে দেয়। কিন্তু মানুষ যদি দুনিয়ার বাসনা ত্যাগ না করে এবং আল্লাহ্র ইবাদতে মগ্ন না হয় তবে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে অকেজো করে দিবেন এবং তার দারিদ্রতা ও ক্ষুধা দূর করবেন না। মানুষ শুধু শুধু অনর্থক বেহুদা ধন-সম্পদের লালসায় মত্ত হয় এবং দ্বারে দ্বারে ফিরে বেড়ায়, কিন্তু সে ততটুকুই পাবে, যা তার তকদীরে আল্লাহ্ তা'আলা লিখে রেখেছেন। অতএব বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী তো সে-ই, যে অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বেঁচে থাকে, দুনিয়ার জন্য উন্মুখ না হয় বরং নিজেকে প্রকৃত কাজে ব্যবহার করে, যা আল্লাহ্র ইবাদত।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنْسَ إِلا لِيَعْبُدُونَ (الذاريات ৫৬) “আমি জ্বিন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সূরা যারিয়াত: ৫৬)

হাদীস শরীফে আছে- যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদতে একাগ্রচিত্ত হয়ে যায়, আল্লাহ্ তা'আলা তার প্রত্যেক জটিল কাজ (সমাধানের জন্য) যথেষ্ট হবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দিবেন যেখান থেকে রিযিক পাওয়ার ধারণাও তার হয় না। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে এবং দুনিয়ার ফাঁদে পড়বে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দুনিয়ার হাতে সমর্পণ করে দিবেন।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 তাকওয়া পরহেযগারী বিরাট নেয়ামত

📄 তাকওয়া পরহেযগারী বিরাট নেয়ামত


হযরত জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তির ইবাদত ও নেকীর জন্য অনেক চেষ্টা সাধনা করার (কিন্তু তার পাপ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা কম) কথা বলা হলো এবং অন্য এক ব্যক্তির তাকওয়া পরহেযগারীর (হারাম থেকে বেঁচে থাকা কিন্তু ইবাদতের মধ্যে কম লিপ্ততার) কথা বলা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ইবাদত) তাকওয়া ও পরহেযগারীর সমকক্ষ হতে পারবে না।

অর্থাৎ এক ব্যক্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, সে অনেক বড় আবেদ উপাসনাকারী এবং ইবাদতে লিপ্ত থাকে কিন্তু তার তাকওয়া-পরহেযগারী কম, গোনাহ থেকে কম বেঁচে থাকে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির ব্যাপারে এটা বলা হল যে, সে গোনাহ ও হারাম থেকে খুব বেশি বেঁচে থাকে। অবশ্য ইবাদতের দিকে বেশি মনোযোগী নয়। এই দুই ব্যক্তির মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইবাদত কখনো তাকওয়া পরহেযগারীর সমকক্ষ হতে পারে না। তাকওয়া ও পরহেযগারী সমস্ত কিছু থেকে শ্রেয়। আল্লামা রাগেব ইসফাহানী লিখেন, শরী'আতে পরহেযগারী বলে, দুনিয়া পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া না করাকে এবং তা তিন প্রকার (১) ওয়াজিবঃ সেই সমস্ত হারাম কার্যাবলী যা থেকে বিরত থাকা সকলের জন্য সমানভাবে অপরিহার্য, (২) মুস্তাহাবঃ এটা সেই সমস্ত সন্দেহজনক জিনিস বা কার্যাবলী থেকে বিরত থাকার নাম যা মধ্যপন্থা অবলম্বনকারীদের জন্য অপরিহার্য, (৩) ফযীলতঃ এটা হচ্ছে, বহু মুবাহ জিনিস বা কার্যাবলী থেকে বিরত থাকা এবং চাহিদা পূরণের জন্য স্বল্পের উপর সন্তুষ্ট থাকার নাম। এটা আম্বিয়ায়ে কেরাম, সিদ্দীকীন, শূহাদা ও সালেহীনদের জন্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px