📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 নিজের মাল

📄 নিজের মাল


হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কারো কি নিজের মাল অপেক্ষা নিজের উত্তরাধিকারীর মাল অধিক প্রিয়? বলা হল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের মধ্যে তো প্রত্যেকের কাছে নিজের মাল; নিজের উত্তরাধিকারীর মাল থেকে বেশি প্রিয়। ইরশাদ হলো, মানুষের নিজের মাল সেইগুলো, যা সে সদকা ও খয়রাতের দ্বারা আগেই পাঠিয়ে দেয় এবং তার উত্তরাধিকারীর মাল ঐগুলো, যা সে (নিজের মৃত্যুর পরে) রেখে গেল। দুনিয়ার জীবনে মানুষ নিজের টাকা-পয়সা, অর্জিত সম্পদ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে এবং সদকা ও খরচ করে থাকে, আর এটাই তার জন্য লাভজনক এবং এর সওয়াব প্রবাহমান থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন- وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ (البقرة ১১০) “এবং ভাল যা কিছু তোমরা নিজের জন্য পূর্বেই পাঠিয়ে দেবে, তা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট পেয়ে যাবে।” (সূরা বাকারা: ১১০)

যে মাল-দৌলত মানুষের নিকট আছে তা যে কোন সময় শেষ, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, বরবাদ হয়ে যেতে পারে অথবা চুরি হয়ে যেতে পারে। মানুষ যেভাবে নিজের মাল হেফাজতের জন্য ব্যাংকে জমা রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, ঠিক তেমন নিজের মাল যদি চিরস্থায়ীভাবে পেতে চায়, প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারা উপকৃত হতে চায়, সে যেন আল্লাহ্র ব্যাংকে মাল জমা করে রাখে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন- مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ بَاقٍ (النحل ৯৬) “যা কিছু তোমাদের কাছে আছে, তা শেষ হয়ে যাবে এবং যা কিছু আল্লাহ্র নিকট আছে, তা চিরস্থায়ী হবে।” (সূরা নাহল : ৯৬)

মৃত্যুর সময় মানুষ যে মাল-দৌলত রেখে যায় তা তার উত্তরাধিকারীদের হয়ে যায়। এজন্য মৃত্যুর সময় মৃত্যু সজ্জায় শায়িত ব্যক্তির মালের এক তৃতীয়াংশের বেশি মালের জন্য অন্তিম অনুরোধ ও অসীয়তও করতে পারে না। এটা মোটেও বলা যায় না যে, উত্তরাধিকারীরা এ মাল কোথায় ব্যয় করবে? এ মাল-দৌলত ও সম্পত্তি এখন এ সকল উত্তরাধিকারীর, মৃত ব্যক্তির অধিকার আর জোর যবরদস্তির বাইরে চলে গেছে।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 ধন-দৌলতের বাস্তবতা

📄 ধন-দৌলতের বাস্তবতা


হযরত মুতরেফ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বীয় পিতা হযরত আব্দুল্লাহ বিন সখির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আমি হুযূরের খেদমতে গেলাম, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা তাকাসুর পাঠ করতেছিলেন, যার অর্থ এই যে, ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের সন্ধান তোমাদেরকে আখেরাত থেকে অমনোযোগী করে দিতেছে। তিনি বলেন, ইবনে আদম বলতে থাকে আমার মাল, আমার মাল। তিনি বলেন, হে ইবনে আদম, তোমার জন্য কি ঐ মাল ছাড়াও অন্য কোন মাল আছে; যা তোমরা খেয়ে, পরিধান করে শেষ করে দিয়েছ অথবা সদকা করে আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে নিয়েছ?

মানুষ ধন-সম্পদ এবং তার প্রাচুর্যের উপর গর্ব করে বলে যে, অনেক ধন-সম্পদ সঞ্চয় করেছি, অনেক বড় ধনী হয়ে গেছি। কখনো কখনো এ মালের কারণে মানুষ ধোঁকায় পড়ে যায়। অথচ ধন-সম্পদের দ্বারা মানুষের কিভাবে লাভ হয়? তার হাকীকত তো শুধু অতটুকুই, যতটুকু সে খেয়ে নিল, পরে নিল আর দুনিয়ার ভোগ বিলাস করে নিল। হয়ত এ মাল তার অথবা ঐ মাল তার যা সে আল্লাহ্র রাস্তায় সদকা খয়রাত করে আল্লাহ্র নিকট পাঠিয়ে দিল। এ মাল তার নিজের মাল, এ ছাড়া আর যা কিছু আছে তা তার নয়, তার উত্তরাধিকারীদের। এরপরও মালের জন্য কিসের খুশি আর কিসেরই বা গর্ব থাকতে পারে? যদি এ মাল নিজের জন্য লাভজনক বানানোর ইচ্ছা থাকে, তবে এ মাল নেক ও ভাল কাজে লাগাতে হবে, দুনিয়া ও আখেরাতের লাভ অর্জন করতে হবে। ইরশাদ হলো-
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضْعِفْهُ لَهُ وَلَهُ أَجْرٌ كَرِيمُ (الحديد ٦১)
“কে সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে উত্তম ধার দিবে, এরপর তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।” (সূরা হাদীদ : ৬১)

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 প্রকৃত ধনাঢ্যতা

📄 প্রকৃত ধনাঢ্যতা


হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুনিয়ায় অনেক বেশি জিনিস হওয়ার নাম মালদারী বা ধনাঢ্যতা নয়, প্রকৃত মালদারী হচ্ছে আত্মাকে ঐশ্বর্যশালী রাখা।

দুনিয়ার ধন-সম্পদের প্রাচুর্য, জমিদারী এবং টাকা-পয়সার মালিক হওয়া প্রকৃত মালদারী (ধনী) নয়, বরং প্রকৃত মালদারী মনের ঐশ্বর্য ও সন্তুষ্টি। আল্লাহ্ তা'আলা যা কিছু দিয়েছেন তার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং দুনিয়ার জন্য লোভ না করা; কিন্তু কারো নিকট বে-হিসেব ধন-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সে যদি (অবস্থার উপর) সন্তুষ্ট না হয় তবে সে প্রকৃত ফকীর ও গরীব। এজন্য যে, তার মন বেশি থেকে বেশির লোভ করে, বুক ভরা আশা রাখে এবং বেশি থেকে বেশি লাভের ইচ্ছা রাখে। সন্তুষ্টিপ্রিয় লোকেরা আল্লাহ্র দানের উপর ধৈর্যশীল ও প্রশংসাকারী হয়। তার মন দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় না, মানুষের ধন-সম্পদের প্রতি তার কোন আকর্ষণ থাকে না। তার হাতে টাকা-পয়সা থাকুক বা না থাকুক, সে সব সময় খুশি থাকে। পূণ্যের উদ্দেশ্যে অল্প মালের উপরেই সন্তুষ্ট থাকে। হাদীসে বর্ণিত সন্তুষ্টি এত বড় নিয়ামত যা কখনো শেষ হয় না।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 পাঁচটি উপদেশ

📄 পাঁচটি উপদেশ


হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি আমার এ কথাগুলো নিয়ে নিজে আমল করবে? অথবা এমন লোকদের বলবে, যারা তার উপর আমল করবে? আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি করব। অতঃপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে পাঁচটি বস্তু গণনা করিয়ে বললেন,
এক. হারাম থেকে বেঁচে থাকবে, দেখবে তুমি লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা আবেদ হয়ে যাবে।
দুই. আল্লাহ্ তোমার জন্য যা ফায়সালা ও মীমাংসা করে দিয়েছেন তার উপর সন্তুষ্ট (খুশি) থাক, দেখবে তুমি সর্বাপেক্ষা বড় ধনী হয়ে যাবে।
তিন. নিজের প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার কর, দেখবে তুমি পরিপূর্ণ মুমিন হয়ে যাবে।
চার. মানুষের জন্য ঐ সমস্ত জিনিস পছন্দ কর যা নিজের জন্য পছন্দ কর, ফলে তুমি পরিপূর্ণ মুসলমান হয়ে যাবে এবং
পাঁচ. বেশি হাসি হেসোনা, এজন্য যে, বেশি হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।

এই পাঁচটি উপদেশ ও অসীয়ত স্বর্ণাক্ষরে লেখার যোগ্য। এতে যেন সাগরের পানিকে একটি কলসিতে ভরে দেওয়া হল। প্রথম উপদেশ এই করলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে হারামকৃত জিনিসগুলো থেকে বেঁচে থাকতে হবে। যে সকল জিনিস নিষেধ করা হয়েছে, সে সব জিনিস থেকে দূরে থাকা, আর যে সব জিনিসের জন্য আদেশ করা হয়েছে সেগুলো করা। যেভাবে নিষেধকৃত জিনিসগুলো করা নিষিদ্ধ, ঠিক তেমনিভাবে আদেশকৃত জিনিসগুলো না করাও নিষিদ্ধ এবং শক্ত গোনাহ। অতএব যদি কেউ এরূপ যথাযথভাবে কাজ করল, তবে সে অতি বড় আবেদ বলে আখ্যায়িত হবে। কেননা সর্বাপেক্ষা বড় ইবাদত এটাই যে, মানুষ যেন ফরযসমূহ (আবশ্যকীয় কার্যসমূহ) সঠিকভাবে আদায় করে। মানুষ সাধারণত: ফরযসমূহের তুলনায় নাওয়াফিলের (নফলের) জন্য বেশি যত্নবান থাকে। ফরয কাজসমূহে শিথিল এবং নফল ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকে। মানুষের হকসমূহ আদায় করে না, যাকাত দেয় না; কিন্তু গরীব মিসকীনদের সে খানা খাওয়ায়। মানুষের হক নষ্ট করে, তাদের অর্জিত অর্থ খেয়ে ফেলে, আমানতের অর্থ আত্মসাৎ করতে থাকে, মানুষের সম্পূর্ণ পাওনা দেয় না, কিন্তু মসজিদে ও মাদ্রাসায় প্রচুর টাকা পয়সা দান করে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলার ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকুন। মানুষের মধ্যে বড় মালদার হয়ে যাবেন। আসল কথা হলো, আপনি ততটুকুই পাবেন যতটুকু আল্লাহ্ তা'আলা আপনার তকদিরে লিখে রেখেছেন। যদি তার উপর সন্তুষ্ট না হন, তবে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেই থাকবেন, জায়েয নাজায়েয পন্থা অবলম্বন করবেন, দারিদ্রতা ও লোভ আরো বৃদ্ধি পাবে; কিন্তু ফল কিছুই পাবেন না। অন্তর ধনী থাকলে মানুষও ধনী, অন্তর লোভী হলে মানুষ যতই টাকা-পয়সার মালিক হোক না কেন তার আশা-আকাঙ্ক্ষা অপূরণ রয়েই যাবে। তার লোভ-লালসা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হবে না।

পরিপূর্ণ মুমিন ব্যক্তি নিজের পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করে। অন্যেরা তার প্রতি যেরূপ ব্যবহারই করুক না কেন; কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার ভয় থাকায় সে খারাপ ব্যবহারের প্রতিউত্তর ভাল ব্যবহার দ্বারাই দিয়ে থাকে। নিজের বদ স্বভাব ও খারাবী থেকে নিজের পাড়া পড়শীদের নিরাপদে রাখে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে যে, “তোমাদের কেউ ঐ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার পাড়া প্রতিবেশী তার অন্যায় ও বিপদ থেকে নিরাপদ ও রক্ষা পায়।” তোমাদের নিজেদের জন্য যেরূপ ভালটা পছন্দ কর, ঠিক সেরূপ নিজের মুসলমান ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করবে। এটা তোমাদের মুসলমান হওয়ার চিহ্ন। কাফেরদেরকে মুসলমান বানানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে এবং ফাজের ও ফাসেক দুশ্চরিত্র ও গোনাহগারদেরকে সত্যবাদী নেক্কার ও সংযমী বানানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। যেরূপ তুমি চাও যে, দুনিয়া ও আখেরাতের সব রকমের বিপদাপদ হতে নিরাপদ থাক, ঠিক ঐরূপ নিজের মুসলমান ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ কর। বেশি হাসা অমনোযোগীর লক্ষণ। অতিরিক্ত হাসার কারণে অন্তর মরে যেতে থাকে। যদি নিজের বদ আমল, অসতর্কতা এবং ভুল ত্রুটির উপর দৃষ্টি দেওয়া যায়, তাহলে এর জন্য যে আল্লাহ্ তা'আলা ধর-পাকড় করছেন না, আমাদের অবাধ্যতার কারণে আযাবে শিথিলতা এবং আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষমার উপর চিন্তা করা যায়। তবে মানুষ লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারবে না, কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে যাবে এই ভেবে যে, তিনি এ রকম মহান উদারচেতা, প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক, আর আমি এমন নালায়েক তার এতবড় উপকারের কৃতজ্ঞতা কিভাবে আদায় করতেছি? আমার মত এতবড় গোনাহগার ও পাপীর পক্ষে হাসা কিভাবে শোভা পায়?

ফন্ট সাইজ
15px
17px