📄 উত্তম নারী
হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি বস্তু তার পেছনে পেছনে কবর পর্যন্ত যায়, দুটি (স্ব স্থানে) ফেরত চলে আসে, আর অন্যটি কবরের মধ্যে তার সঙ্গে থাকে। পরিবারস্থ লোকজন আত্মীয়-স্বজন, মাল-দৌলত এবং আমল তার সাথে যাবে। মানুষের পরিবারস্থ লোকজন, আত্মীয়স্বজন এবং তার অর্জিত মাল-দৌলত ফেরৎ আসে, আর তার আমল তার সাথে থাকে।
উল্লেখিত হাদীস অনুযায়ী মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি বস্তু তার সাথে যায়। যার মধ্যে দুটি তার কবর পর্যন্ত সাথী হয়ে থাকে। দাফনের পরে তারা তাকে কোন রকম সাহায্য ছাড়াই চলে আসে। কিন্তু তৃতীয় বস্তু তার উত্তম বন্ধু হয়, যা তাকে ঐ জায়গায়ও একা ফেলে চলে আসে না বরং ঐ জায়গায়ও তার সঙ্গে থেকে তার আতংক ও নির্জনতাকে দূর করতে থাকে। এই তিন সাথীর মধ্যে এক হচ্ছে, তার পরিবার পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং দ্বিতীয় সাথী হচ্ছে তার ধন-সম্পদ, মাল-দৌলত, গোলাম, বাদী ইত্যাদি। তৃতীয় সাথী তার আমল। মানুষের মালের সম্পর্ক মৃত মানুষের দাফন করা পর্যন্ত থাকে। এজন্য যে, সেই মাল থেকে মৃত ব্যক্তির দাফন, কাফন, গোসল ইত্যাদির খরচ বহন করা হবে। যখন মৃত ব্যক্তির দাফন করে দেওয়া হয়, তখন তার মাল-দৌলত থেকে তার সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। তখন এ মাল হয়ে যায় তার ওয়ারিসদের। তৃতীয় সাথী আমল, যদি নেক আমল হয়ে থাকে, তবে তার কবর জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান হবে। যেখানে প্রচুর নিয়ামত ও সুগন্ধি থাকবে। কবরকে দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হবে, সে আরাম ও শান্তির ঘুমে ঘুমাতে থাকবে। আর যদি খোদা না করুন, আমল খারাপ হয়ে থাকে তবে তাকে আযাব দেওয়া হবে। জাহান্নামের অগ্নিশিখা, দুর্গন্ধ ও গরম কবরের মধ্যে দিয়ে দেওয়া হবে। কবর সংকীর্ণ করে দেওয়া হবে, সাপ ও বিচ্ছু ছেড়ে দেওয়া হবে। বলা হয়ে থাকে যে, কবর আমলের সিন্দুক। হাদীসে, বর্ণিত আছে যে, কবর জান্নাতের বাগানের একটি অংশ অথবা জাহান্নামের একটি গর্ত হবে। অতএব তোমাদের যে জায়গা পছন্দ হয়, মৃত্যুর পূর্বেই সে জায়গা তৈরী করার চিন্তা করতে হবে এবং যে সাথী উপকারী ও ফায়দাজনক হবে তাকে বন্ধুত্বের জন্য বাছাই করতে হবে, তাকে চিনতে হবে এবং তাকে সত্যিকার বন্ধু হিসেবে; সাথী হিসেবে বরণ করতে হবে। আর প্রকৃত দোস্ত ও দুশমনকে চিনতে হবে।
📄 নিজের মাল
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কারো কি নিজের মাল অপেক্ষা নিজের উত্তরাধিকারীর মাল অধিক প্রিয়? বলা হল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের মধ্যে তো প্রত্যেকের কাছে নিজের মাল; নিজের উত্তরাধিকারীর মাল থেকে বেশি প্রিয়। ইরশাদ হলো, মানুষের নিজের মাল সেইগুলো, যা সে সদকা ও খয়রাতের দ্বারা আগেই পাঠিয়ে দেয় এবং তার উত্তরাধিকারীর মাল ঐগুলো, যা সে (নিজের মৃত্যুর পরে) রেখে গেল। দুনিয়ার জীবনে মানুষ নিজের টাকা-পয়সা, অর্জিত সম্পদ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে এবং সদকা ও খরচ করে থাকে, আর এটাই তার জন্য লাভজনক এবং এর সওয়াব প্রবাহমান থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন- وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ (البقرة ১১০) “এবং ভাল যা কিছু তোমরা নিজের জন্য পূর্বেই পাঠিয়ে দেবে, তা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট পেয়ে যাবে।” (সূরা বাকারা: ১১০)
যে মাল-দৌলত মানুষের নিকট আছে তা যে কোন সময় শেষ, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, বরবাদ হয়ে যেতে পারে অথবা চুরি হয়ে যেতে পারে। মানুষ যেভাবে নিজের মাল হেফাজতের জন্য ব্যাংকে জমা রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, ঠিক তেমন নিজের মাল যদি চিরস্থায়ীভাবে পেতে চায়, প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারা উপকৃত হতে চায়, সে যেন আল্লাহ্র ব্যাংকে মাল জমা করে রাখে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন- مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ بَاقٍ (النحل ৯৬) “যা কিছু তোমাদের কাছে আছে, তা শেষ হয়ে যাবে এবং যা কিছু আল্লাহ্র নিকট আছে, তা চিরস্থায়ী হবে।” (সূরা নাহল : ৯৬)
মৃত্যুর সময় মানুষ যে মাল-দৌলত রেখে যায় তা তার উত্তরাধিকারীদের হয়ে যায়। এজন্য মৃত্যুর সময় মৃত্যু সজ্জায় শায়িত ব্যক্তির মালের এক তৃতীয়াংশের বেশি মালের জন্য অন্তিম অনুরোধ ও অসীয়তও করতে পারে না। এটা মোটেও বলা যায় না যে, উত্তরাধিকারীরা এ মাল কোথায় ব্যয় করবে? এ মাল-দৌলত ও সম্পত্তি এখন এ সকল উত্তরাধিকারীর, মৃত ব্যক্তির অধিকার আর জোর যবরদস্তির বাইরে চলে গেছে।
📄 ধন-দৌলতের বাস্তবতা
হযরত মুতরেফ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বীয় পিতা হযরত আব্দুল্লাহ বিন সখির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আমি হুযূরের খেদমতে গেলাম, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা তাকাসুর পাঠ করতেছিলেন, যার অর্থ এই যে, ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের সন্ধান তোমাদেরকে আখেরাত থেকে অমনোযোগী করে দিতেছে। তিনি বলেন, ইবনে আদম বলতে থাকে আমার মাল, আমার মাল। তিনি বলেন, হে ইবনে আদম, তোমার জন্য কি ঐ মাল ছাড়াও অন্য কোন মাল আছে; যা তোমরা খেয়ে, পরিধান করে শেষ করে দিয়েছ অথবা সদকা করে আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে নিয়েছ?
মানুষ ধন-সম্পদ এবং তার প্রাচুর্যের উপর গর্ব করে বলে যে, অনেক ধন-সম্পদ সঞ্চয় করেছি, অনেক বড় ধনী হয়ে গেছি। কখনো কখনো এ মালের কারণে মানুষ ধোঁকায় পড়ে যায়। অথচ ধন-সম্পদের দ্বারা মানুষের কিভাবে লাভ হয়? তার হাকীকত তো শুধু অতটুকুই, যতটুকু সে খেয়ে নিল, পরে নিল আর দুনিয়ার ভোগ বিলাস করে নিল। হয়ত এ মাল তার অথবা ঐ মাল তার যা সে আল্লাহ্র রাস্তায় সদকা খয়রাত করে আল্লাহ্র নিকট পাঠিয়ে দিল। এ মাল তার নিজের মাল, এ ছাড়া আর যা কিছু আছে তা তার নয়, তার উত্তরাধিকারীদের। এরপরও মালের জন্য কিসের খুশি আর কিসেরই বা গর্ব থাকতে পারে? যদি এ মাল নিজের জন্য লাভজনক বানানোর ইচ্ছা থাকে, তবে এ মাল নেক ও ভাল কাজে লাগাতে হবে, দুনিয়া ও আখেরাতের লাভ অর্জন করতে হবে। ইরশাদ হলো-
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضْعِفْهُ لَهُ وَلَهُ أَجْرٌ كَرِيمُ (الحديد ٦১)
“কে সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে উত্তম ধার দিবে, এরপর তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।” (সূরা হাদীদ : ৬১)
📄 প্রকৃত ধনাঢ্যতা
হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুনিয়ায় অনেক বেশি জিনিস হওয়ার নাম মালদারী বা ধনাঢ্যতা নয়, প্রকৃত মালদারী হচ্ছে আত্মাকে ঐশ্বর্যশালী রাখা।
দুনিয়ার ধন-সম্পদের প্রাচুর্য, জমিদারী এবং টাকা-পয়সার মালিক হওয়া প্রকৃত মালদারী (ধনী) নয়, বরং প্রকৃত মালদারী মনের ঐশ্বর্য ও সন্তুষ্টি। আল্লাহ্ তা'আলা যা কিছু দিয়েছেন তার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং দুনিয়ার জন্য লোভ না করা; কিন্তু কারো নিকট বে-হিসেব ধন-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সে যদি (অবস্থার উপর) সন্তুষ্ট না হয় তবে সে প্রকৃত ফকীর ও গরীব। এজন্য যে, তার মন বেশি থেকে বেশির লোভ করে, বুক ভরা আশা রাখে এবং বেশি থেকে বেশি লাভের ইচ্ছা রাখে। সন্তুষ্টিপ্রিয় লোকেরা আল্লাহ্র দানের উপর ধৈর্যশীল ও প্রশংসাকারী হয়। তার মন দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় না, মানুষের ধন-সম্পদের প্রতি তার কোন আকর্ষণ থাকে না। তার হাতে টাকা-পয়সা থাকুক বা না থাকুক, সে সব সময় খুশি থাকে। পূণ্যের উদ্দেশ্যে অল্প মালের উপরেই সন্তুষ্ট থাকে। হাদীসে বর্ণিত সন্তুষ্টি এত বড় নিয়ামত যা কখনো শেষ হয় না।