📄 সর্বাপেক্ষা বিপদজনক বিষয়
হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার তিরোধানের পর তোমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের জিনিস হচ্ছে দুনিয়ার শোভা, সৌন্দর্য এবং সাজসজ্জা ও আরামের বস্তুসমূহ, যার দ্বার তোমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ভাল কি কখনো মন্দের উপায় হতে পারে? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন, যাতে আমরা বুঝতে পারছিলাম যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অহী নাযিল হবে। অতঃপর তিনি নিজ কপালের ঘাম মুছে ইরশাদ করলেন, প্রশ্নকারী কোথায়? অনুমান করা যাচ্ছিল যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ প্রশ্নটা ভাল মনে হয়েছিল। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, ভাল অবশ্য মন্দের উপায় হয় না, তবে বসন্তকালে যখন সবুজ লতাপাতায় গাছপালা পরিপূর্ণ থাকে, তখন জীব-জন্তু সবুজ লতাপাতা এত অধিক খায়, যার ফলে সে জীব-জন্তু মৃত্যু মুখে পতিত হয়, অথবা মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়। কিন্তু যে সকল জীব-জন্তু এই সবুজ লতাপাতা প্রয়োজন অনুপাতে পেট ভরে খায়, তারপর সূর্যের দিকে ফিরে বসে মলমুত্র ত্যাগ করে নিজেকে সতেজ করে, এরপর এরা আবার তাদের খাওয়া শুরু করে। অবশ্যই এই মাল দৌলত অনেক ভাল মনে হয় তার জন্য, যে উহাকে হালাল পদ্ধতিতে উপার্জন করে, হালাল জায়গায় খরচও করে, তবে এই মাল উত্তম সাহায্যকারী হয় এবং যে ব্যক্তি উহাকে নাজায়েজ ও নাহকভাবে অর্জন করবে তার দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত হবে, যে খাবে কিন্তু তার পেট ভরবে না এবং ঐ মাল কেয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার উপমা সবুজ লতাপাতার দ্বারা দিয়ে এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, এটা যদিও অনেক ভাল মনে হয় কিন্তু এটা লাভহীন ও ক্ষণিকের, যা অনেক কম সময়ে শেষ হয়ে যায়, অথবা এটা তুলে নেওয়া হবে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের অর্থ এই ছিল যে, আমার পরে তোমাদের জন্য দুনিয়ার দরজা খুলে দেওয়া হবে। নানা অঞ্চল ও দেশ বিজিত হতে থাকবে, মাল দৌলত রাশি রাশি হয়ে যাবে, যা মানুষকে নেক আমল ও সঠিক শিক্ষা অর্জন থেকে দূরে সরিয়ে দিবে। অপছন্দনীয় রীতিনীতি, আচার ব্যবহার, অহংকার, মাল দৌলতের প্রতি ভালবাসা প্রভৃতি এমন বিষয়াদি সৃষ্টি হবে, যা দুনিয়া ও টাকা-পয়সার অনিবার্য ফল। স্পষ্ট কথা এই যে, যখন এ সমস্ত জিনিস দেখা দিবে, তখন মানুষ মৃত্যুর প্রস্তুতি এবং মৃত্যুর পরবর্তী আখেরাতের জীবনের প্রতি অমনোযোগী হবে এবং সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে।
প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উদ্দেশ্য এই ছিল যে, বিজয়, গণীমতের মাল-সম্পদ ও খাদ্যের প্রাচুর্যও কি মন্দের কারণ হতে পারে? যার কারণে মানুষ আল্লাহ্ তা'আলার ফরমাবরদার ও ইবাদতের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং নেক কাজে পিছে পড়ে থাকবে? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিষ্কারভাবে বলে দিলেন যে, মূলতঃ ভাল, মন্দের উপায় হয় না, অবশ্য কখনও ভাল, মন্দের কারণ হয়ে যায়। অতঃপর এটাকে একটা সুন্দর উপস্থিত দৃষ্টান্ত দিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন, দুনিয়ার ভালকে সতেজ শস্য শ্যামল ও লতাপাতার দ্বারা উদাহরণ দিলেন। যেমনিভাবে আল্লাহ্ তা'আলা একমাত্র স্বীয় ইচ্ছায় শস্য উৎপাদন করেন কিন্তু এই ভাল জিনিসই কখনও কখনও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই অর্থে যে, প্রাণী, শস্য শ্যামল লতাপাতার প্রাচুর্যের কারণে অতিরিক্ত ভক্ষণ করে, পরে বদ হজমের শিকার হয়ে ধ্বংস হয়। শস্য শ্যামল লতাপাতার প্রাচুর্য এই প্রাণীগুলোর ধ্বংসের কারণ নয় বরং এই প্রাণীগুলোরই খাওয়ার পরিমাণের ব্যাপারে ভারসাম্যহীনতা ধ্বংসের কারণ হলো। এমনিভাবে সতর্কতা ব্যতীত জায়েয, না জায়েয উপায়ে মাল দৌলত অর্জন করা, আনন্দ ও বিলাসিতা করা, দুনিয়াতে লিপ্ততা, বেশি খাওয়া এবং অধিক মাল অর্জন করাতে মন শক্ত হয়ে যায় এবং খারাপ আচার ব্যবহার, মানুষের বেইজ্জতি, হকদারের হক আদায় না করা এবং অন্যান্য সমস্ত রূহানী রোগ জন্মে যায়, যার দরুণ দুনিয়াবী বিলাস ও আখেরাতের বরবাদী, ব্যক্তির জন্য শান্তি এবং কঠোর আযাবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু যদি মালের সাথে সাথে উহার হক ও হুকুম আদায় করা হয় এবং নিজের মালের প্রভাব ও মালদারদের দোষসমূহ থেকে নিজেকে হেফাজত করা হয় এবং রূহানী রোগ ও রোগের চিকিৎসার প্রতি দৃষ্টি রেখে রূহানী রোগের চিকিৎসা করা হয়, পবিত্র কুরআন ও মুবারক হাদীসের দ্বারা যদি উপকৃত হতে থাকে, তবে এই মাল অর্জনও ব্যক্তির নাজাতের উপায় হয়ে দাঁড়ায়, এর দ্বারা কুপ্রবৃত্তি দূর করে দেওয়া হয় এবং আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, যেমনিভাবে ঐ প্রাণীগুলো প্রয়োজন মত খাবার খায়, তারপর তা হজম করার জন্য রোদে বসে, অতঃপর হজম হয়ে গেলে উহারা আবার খাওয়া শুরু করে। ঠিক এমনিভাবে টাকা পয়সার আধিক্য যেহেতু মানুষকে স্বাভাবিকভাবে তার সহীহ রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আখেরাত থেকে অমনোযোগী এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, ফলে এটাই বিপদসঙ্কুল ও ভয়ংকর বস্তু হয়। এজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা সাধারণতঃ আম্বিয়ায়ে কেরাম ও নেককারদের জন্য উপবাস ও দারিদ্রতা পছন্দ করেছেন। সুফীয়ায়ে কেরাম ও বহু উলামায়ে কেরাম এটা বলেন যে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনী অপেক্ষা, ধৈর্যশীল গরীব শ্রেয়।
📄 ধ্বংসাত্মক বস্তু ও আসবাব
হযরত ওমর বিন আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাদের দারিদ্রতা ও ক্ষুধার জন্য আমার ভয় হয় না, বরং তোমাদের জন্য আমার এ কারণে ভয় হয় যে, তোমাদের উপর দুনিয়াকে এমনভাবে প্রশস্ত করে দেওয়া হবে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ব পুরুষদের উপরে প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছিল এবং তোমরা এ বিষয়ে এমনিভাবে প্রতিযোগিতা করবে, যেমনিভাবে পূর্বের লোকেরা পরস্পর প্রতিযোগিতা করেছিল। আর ঠিক ঐভাবেই তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিবে, যেমনিভাবে পূর্বের মানুষদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
অর্থাৎ তোমাদের দারিদ্রতা ও ক্ষুধার জন্য আমার ভয় হয় না। এজন্য যে, দারিদ্রতা সাধারণতঃ গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায় হয়। ধনাঢ্যতা অপেক্ষা দারিদ্রতা অনেক বেশি উপকারী। দৌলত সাধারণতঃ আল্লাহ্ তা'আলার নাফরমানী ও গোনাহের কারণ হয়ে থাকে। আমার ভয় এই যে, দুনিয়ার নিয়ামত ও মাল দৌলত তোমাদের দিয়ে দেওয়া হবে এবং তোমরা অন্য সকল মূর্খ জাহেল মালদারদের ন্যায় আরাম ও আয়েশের মধ্যে লিপ্ত হয়ে ফিতনা ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে যাবে এবং মাল সংগ্রহ ও লাভ করার জন্য অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়বে। আর যেরূপভাবে তারা ধ্বংস হয়েছে তোমরাও সেরূপভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। সাধারণতঃ এমন হয় যে, মাল-দৌলতের লালসা মানুষকে নেক আমল থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং টাকা-পয়সা বেশি হওয়ার কারণে মানুষ নাফরমানী ও গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। নিয়ামত দানকারী খালেক ও মালেককে ভুলে যায়। নিজের উপর ভরসা, তাকাব্বুর এবং ভোগের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে যায়, যার ফলাফল ধ্বংস ও বরবাদী ছাড়া আর কিছুই নয়।
📄 স্বল্প মালের জন্য দু'আ
হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহ্! আলে মুহাম্মাদের প্রয়োজন মিটে এবং যথেষ্ট হয়, সেই পরিমাণ রিযিক নির্ধারণ করে দিন।
আলে মুহাম্মাদ কথাটি দ্বারা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহলে বাইত ও বংশধরদের বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ এবং তাঁকে ভালবাসে এমন লোকদের বুঝানো হয়েছে। প্রয়োজন মত কথাটি দ্বারা ঐ পরিমাণ রিযিক বুঝানো হয়েছে, যেই পরিমাণ দ্বারা প্রয়োজন মিটে যায় এবং বেঁচে থাকা যায় এবং নেক আমল ও ইবাদত করতে পারা যায় তা অধিক উত্তম সেই প্রচুর মাল অপেক্ষা, যা তোমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নাফরমান বানিয়ে দেয়। ঐ অল্প মাল যার দ্বারা প্রয়োজন মিটে যায় তা ঐ অধিক মাল থেকে উত্তম, যে মাল মানুষকে বেখেয়াল ও জ্ঞানশূন্য করে দেয়।
📄 অল্পে পরিতুষ্টি অতি বড় নেয়ামত
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সেই ব্যক্তি সফলতা পেয়েছে, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তাকে প্রয়োজন মত রিযিক দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ঐটুকুর উপরে সন্তুষ্ট থাকার তাওফীক দিয়েছেন, যতটুকু তাকে দেওয়া হয়েছে।
অল্পে সন্তুষ্ট হওয়া অনেক বড় সৌভাগ্য। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা দুনিয়া ও আখেরাতের গ্যারান্টি। প্রয়োজন মত হালাল রিযিক লাভ করা এবং তার উপরে সন্তুষ্ট থাকা আল্লাহ্ তা'আলার বিরাট অনুগ্রহ। সকল অবস্থায় আল্লাহ্র শোকর আদায় করতে হবে এবং প্রয়োজন অপেক্ষা বেশি পাওয়ার জন্য ও বেশি থেকে বেশি সুযোগের জন্য প্রচেষ্টায় মত্ত হওয়া ঠিক নয়। কয়েক দিনের জীবন যাপনের জন্য শত বছরের আসবাব সংগ্রহ করাটা কোন বুদ্ধিমত্তার কাজ হতে পারে না। আল্লাহ্ তা'আলার ফয়সালা ও তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকাটাই সর্বাপেক্ষা বড় সফলতা।