📄 দুনিয়া খেলখানা
হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুনিয়া ঈমানদারদের জন্য জেলখানা এবং কাফেরদের জন্য বেহেস্ত।
অর্থাৎ আখেরাতে মুমিনদের জন্য যে নিয়ামত, শান্তি, আরাম আয়েশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এর মুকাবেলায় দুনিয়া তার জন্য জেলখানা স্বরূপ। আর আখেরাতে কাফেরদের জন্য যে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে তার তুলনায় দুনিয়া তাদের জন্য বেহেস্ত অথবা মুমিন নিজেকে লাগামবিহীন উটের মত ছেড়ে দেয় না বরং আখেরাতের নিয়ামত ও স্বাদ ভোগ করার জন্য সংকীর্ণতাকে মেনে নেয়, ফলে এ দুনিয়া তার জন্য জেলখানার মত হয়ে যায়। অপরদিকে কাফেররা দুনিয়ার মধ্যে নিজেদের লাগামবিহীন উটের মত ছেড়ে দেয়, দুনিয়ার মধ্যে মত্ত হয় ও তার নিজের আরাম-আয়েশে নিমজ্জিত হয়। এ জন্য দুনিয়া তার নিকট বেহেস্তের মত মনে হয়।
হযরত ফুযায়েল বিন আয়ায (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ার আনন্দদায়ক ও সুস্বাদু বস্তুসমূহ ত্যাগ করে, সে যেমন জেলখানায় আছে। কিন্তু যে ব্যক্তি দুনিয়ার নেয়ামতের মধ্যে মত্ত এবং প্রবৃত্তি পূজায় নিমজ্জিত রইল, তার জন্য বন্ধন বাকী রইল না। যেমনিভাবে কয়েদী জেলখানায় বন্দী থাকে, ঠিক তেমনিভাবে মুসলমানদের দুনিয়ার মধ্যে বাধা ও বাধ্যতার পাবন্দ হয়। আখেরাতের জন্য এমনভাবে চিন্তা ফিকির করতে হবে এবং এমন নেক আমল করতে হবে যা তাকে সেই জেল-হাজত থেকে চিরদিনের জন্য চিরস্থায়ী নিয়ামত ও আরাম দিতে পারে। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়া মোমিনদের নিকট কখনো ভাল লাগে না, ভাল লাগবেই বা কি করে, যখন দুনিয়া তার জন্য জেলখানা এবং পরীক্ষার স্থান।
📄 পূণ্যের প্রতিফল
হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ কোন মুমিন ব্যক্তিকে তার নেকীর পরিবর্তে বেঈনসাফ করবেন না। নেকীর বদলায় তাকে দুনিয়ায় নিয়ামত দেওয়া হয় এবং আখেরাতে তার উত্তম ফল দেওয়া হবে। এবং কাফের যে দুনিয়াতে আল্লাহ্র জন্য ভাল কাজ করে, তার বদলায় সে দুনিয়াতে ফলভোগ করবে কিন্তু আখেরাতে তাকে সওয়াব দেওয়ার মত কোন নেকী থাকবে না।
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা প্রত্যেক বান্দাকে চাই সে মোমিন বা কাফের হোক, প্রত্যেকের ছোট বড় নেকী এবং ভাল-মন্দের বদলা অবশ্যই দেন, চাই সেটা দুনিয়াতে হোক অথবা আখেরাতে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন- فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ মিতকালে জাররাতিন শাররাই ইয়ারাও (زلزال ৭-৮) অর্থ “যে ব্যক্তি অল্প একটুও নেকী করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে অল্প একটু মন্দ করবে, তাও সে দেখে নিবে।”
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন- إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضْعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا (نساء - ٤০) অর্থঃ “অবশ্যই আল্লাহ্ তা'আলা কারো উপর বিন্দু পরিমাণ অত্যাচার করবেন না। আর যদি একটি নেকী হয় উহাকে দ্বিগুণ করে দিবেন এবং নিজ হাতে আরো বেশি বদলা দিবেন।” (সূরা নিসা: ৪০)
মুমিন দুনিয়াতে যে নেক আমলসমূহ করে আল্লাহ্ তা'আলা তার বদলায় তার থেকে বালা-মুসীবত দূর করে দেন। খাদ্য ও রিযিকের মধ্যে প্রশস্ততা দান করেন এবং অন্যান্য নিয়ামত দান করেন। আর আখেরাতে যা দিবেন, তার তো কোন হিসেবই হয় না। কাফের দুনিয়াতে যে সকল ভাল কাজ করে, উদাহরণস্বরূপ গরীবের সাথে ভাল ব্যবহার করা, খাদ্য দান করা, অত্যাচারিত ব্যক্তিকে সাহায্য করা, এতীমদের স্নেহ ও দয়া করা এবং অন্যান্য ভাল কাজ করা অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত অন্যান্য সকল ভাল কাজ করার জন্য (কাফেরদের) দুনিয়াতে বদলা দেওয়া হবে, কিন্তু পরকালে তার নেক আমলের বিনিময়ে কিছুই থাকবে না। মোমিন দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানে বদলা পায়। কাফের শুধু দুনিয়াতে পায় আর আখেরাতে তার কুফরের কারণে জাহান্নামের আগুনই হবে প্রতিফল। সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনের জন্য অনুগ্রহের ব্যবস্থা করেন এবং কাফেরের সাথে সুবিচার ঈনসাফের ব্যবস্থা করেন। মুমিন যদি কোন গোনাহ বা ভুল করে ফেলে, আল্লাহ্ দুনিয়াতে কোন মুসীবত, কষ্ট বা রোগ ইত্যাদির দ্বারা উহা দূর করে দেন এবং আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দেন।
📄 আনন্দদায়ক ও কষ্টের বিষয়াদি
হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জাহান্নামকে লোভনীয় বস্তু সামগ্রী এবং জান্নাতকে মুসীবতের দ্বারা ঢেকে রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ বেহেস্ত পেতে হলে অনেক কষ্ট করতে হয়, নফস ও শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে হয় এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, নেক আমল করতে হয় এবং হারাম দ্রব্যাদি থেকে বাঁচতে হয়। পক্ষান্তরে গোনাহ, নাফরমানী এবং কামনা-বাসনার অনুসরণ এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব জাহান্নামে পৌঁছে দেয়।
📄 টাকা-পয়সার গোলাম
হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ধ্বংস হলো টাকা পয়সার গোলাম, পোশাক পরিচ্ছদের গোলাম। যদি তাকে কিছু দেওয়া হয়, তবে সে খুশী হয় আর যদি কিছু না দেওয়া হয় তবে সে অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। সে ধ্বংস হয়েছে, লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছে। তার যদি কাঁটা বিঁধে যায়, তা যেন বের না করা হয়। মঙ্গল ও কল্যাণ সেই বান্দার জন্য, যে আল্লাহ্র পথে নিজ ঘোড়ার লাগাম ধরে আছে, যার চুল বিক্ষিপ্ত, যার পা ধুলি ধূসরিত, তাকে যদি দারোয়ান বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে তাতে অত্যন্ত ব্যস্ততা ও লিপ্ততার সহিত দায়িত্ব পালন করে। আর যদি মুজাহিদ বাহিনীর শেষ প্রান্তে রাখা হয়, তবে সেখানেও সে সন্তুষ্টি ও প্রস্তুতি নিয়েই থাকে। এবং তার জন্য যদি কোথাও প্রবেশের অনুমতি চাওয়া হয়, তবে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয় না, আর যদি সে কারো জন্য সুপারিশ করে তবে তাও গ্রহণ করা হয় না।
টাকা-পয়সার দাস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহকে রাজি খুশি করার পরিবর্তে টাকা-পয়সার বেড়াজালে পড়ে এবং সে টাকা-পয়সার জন্য এমন উম্মাদ হয়ে যায় যে, হারাম হালালের পার্থক্যও থাকে না। যেখান থেকেই ধন-সম্পদ হাসিল হোক তার পেছনে লেগে যায়। উপার্জিত অর্থ হালাল বা জায়েয পথে ব্যয় না করে, হারাম পথে ব্যয় করে। উদাহরণস্বরূপ টাকা-পয়সার নাম এ কারণে নেওয়া হয়েছে যে, ইহাই ধন-সম্পদের মূল। নফস ও শয়তান এই দুই জিনিসের দ্বারাই নিজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ হাসিল করে থাকে। দুনিয়াদার ও অহংকারীরা কাপড়-চোপড়ের প্রতি অত্যন্ত খেয়াল রাখে, পোষাকের জাকজমক ও প্রভাব প্রকাশ এবং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার জন্য পোষাক পরে থাকে। আর এই সমস্ত কাপড়-চোপড় ছাড়তেও পারে না, মনে হয় যেন সে তার (কাপড়-চোপড়ের) গোলাম হয়ে গেছে। পোষাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার রাখার চিন্তা নিষিদ্ধ নহে, ভাল পোষাক পরাও নিন্দনীয় কাজ নহে। আল্লাহ্ তা'আলা মাল দৌলত দিয়ে থাকলে তার শুকরিয়া এভাবে হতে হবে যে, সে ভাল খাবে ও ভাল পোষাক পরিধান করবে। ভিক্ষুকদের মত ছেড়া ফাঁড়া কাপড়-চোপড় পরিধান করবে না। আল্লাহ্র নিয়ামতসমূহের চিহ্ন নিজের মধ্যে প্রকাশ হতে হবে। তবে সেই সাথে এ খেয়ালও থাকতে হবে যে, মানুষ যেন পোষাক পরিচ্ছদের গোলামী না করে, এরূপে যে, সব সময় উত্তম থেকে উত্তমটা, নতুন থেকে নতুনের অন্বেষণে থাকে, যার কারণে সে আত্মগৌরব ও আত্মপ্রশংসায় মত্ত হয়, আর হালাল হারামের কোন পার্থক্য না থাকে, এটাই নিষিদ্ধ। পুরুষদের জন্য রেশমের কাপড় পরিধান করা হারাম, বেশি পাতলা কাপড় পরিধান করা অপছন্দনীয়। অহংকারবশতঃ আস্তিন লম্বা রাখা অথবা টাখনুর নীচে কাপড় লটকানো নাজায়েয। অহংকারের নিয়ত যদি না হয়ে থাকে, তবুও মাকরূহ। হাদীস শরীফে এটাকে জাহান্নামের আগুনের দ্বারা জ্বালানোর ধমকি দেওয়া হয়েছে।
টাকা-পয়সার গোলাম বলে এ কথা বোঝানো হয়েছে যে, দুনিয়ায় কামাই করা, টাকা-পয়সা লাভ করা নিষিদ্ধ নহে। প্রয়োজন মাফিক টাকা-পয়সা থাকতে হবে, কিন্তু তার অর্থ, দৌলতের গোলাম হওয়া যাবে না। গোলাম হলে, যেরূপে গোলামী থেকে বের হওয়া যায় না, ঠিক তদ্রূপ এই ব্যক্তিও টাকা-পয়সার এমন গোলাম যে, সে আর তার থেকে বের হয়ে আসতে বা ছুটে আসতে পারে না। যে ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে আল্লাহ্র বান্দা হবে, সে যেন নিজের জানকে প্রস্তুত রাখে, সব সময় আল্লাহ্র দ্বীনের উন্নতির খাতিরে জিহাদের জন্য প্রস্তুত থাকে। তাকে সেনা কমান্ডার, দারোয়ান বা খাদেম, যে কোন অবস্থায় রাখা হোক, সে খুশি থাকে এবং আল্লাহর জন্য এখলাসের সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু এ রকম সাদাসিধে হয় যে, সে যদি কোন মাহফিলে যায় তবে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। আর যদি সে কারোর জন্য সুপারিশ করে, তবে সে সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না, এজন্য যে, তার নিকট দুনিয়ার কোন খবরই থাকে না এবং দুনিয়াদারদের থেকেও সে দূরে থাকে। প্রতি মুহূর্তে নিজের সংশোধন এবং আখেরাত উন্নতির চিন্তায় থাকে। মাল দৌলত ও ইজ্জতের সহিত তার কোন সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু আল্লাহ্র নিকট সে অনেক সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন হয়। দুনিয়াদার তার সুপারিশ গ্রহণ করবে না, কিন্তু আল্লাহ্র দরবারে তার সুপারিশ গৃহীত হবে।