📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 দুনিয়া ও আখেরাত

📄 দুনিয়া ও আখেরাত


হযরত মাসতুর বিন শাদ্দাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেনঃ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়ার উদাহরণ দিতে শুনেছি যে, দুনিয়া তোমাদের জন্য এ রকম যেমন কোন ব্যক্তি নিজের আঙ্গুল সাগরের পানিতে ডুবায়, অতঃপর উঠিয়ে দেখে, এর মধ্যে কতটুকু পানি লেগেছে।

অর্থাৎ আখেরাতের নিয়ামত, আরাম, আয়েশের তুলনায় দুনিয়ার আরাম ও আয়েশ, দরিয়া বা সাগরের পানির তুলনায় আঙ্গুলে লেগে থাকা অতি সামান্য পানির ন্যায়। বিশাল সমুদ্রের তুলনায় আঙ্গুলে লাগা পানির পরিমাণ কিছুই না, অতি নগণ্য, দুনিয়া মানুষের জন্য তেমনি নগণ্য। তাই দুনিয়ার আসবাব, মান-সম্মান প্রতিপত্তি ও প্রচার-প্রসার লাভে ব্যস্ত থাকা ঠিক নয়। এগুলো আখেরাতের শান্তির জন্য ধোঁকা স্বরূপ মনে করতে হবে। দুনিয়ার কষ্ট, মুসীবতের কারণে পেরেশান বা অস্থির হওয়া ঠিক নয়, আখেরাতের কথা স্মরণ করে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। প্রকৃত সুখ শান্তি, আরাম হলো আখেরাতের জন্য, দুনিয়া হলো আখেরাতের ক্ষেত এবং ইহা ক্ষণিকের তাসের ঘরের ন্যায়। তাই দুনিয়াকে মানুষের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ জানতে হবে, এজন্য যে, এ অল্প সময়ের মধ্যে আখেরাতের প্রকৃত আরাম আয়েশের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়।

অতএব আমাদের উচিত ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবনের ভোগ বিলাসে লেগে না থেকে এবং দুনিয়ার চাকচিক্য পরিহার করে, অনন্ত অসীম চিরস্থায়ী জীবন আখেরাতের ফিকির করা। তাই সকলের উচিত পরকালের শান্তিময় জীবনের জন্য মেহনত ও পরিশ্রম করে প্রকৃত জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও ঈমানদার ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠা।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 দুনিয়ার উপমা

📄 দুনিয়ার উপমা


হযরত জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন একটা মৃত ভেড়ার পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি আছে কি, যে এই মৃত ভেড়াটা এক দেরহাম দিয়ে ক্রয় করবে? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, আমরা কোন মামুলী জিনিস দিয়েও এটা নেওয়া পছন্দ করব না। তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, আল্লাহ্র কসম, আল্লাহ্র নিকট দুনিয়া এর চাইতে ও বেশি ঘৃণিত, যতটা তোমাদের দৃষ্টিতে এই মৃত ভেড়াটি ঘৃণিত।

দুনিয়া এবং তার সমস্ত নিয়ামত নশ্বর ও ধ্বংসশীল। বুদ্ধিমানদের দৃষ্টিতে দুনিয়ার মর্যাদা মৃত জানোয়ার থেকেও খারাপ। এক নেয়ামতের সাথে দশ রকমের বেদনা লেগে থাকে, আরাম আয়েশে থাকার জন্য কতই না কষ্ট করতে হয়। আল্লাহ্ প্রেমিক ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চাকচিক্যে আকৃষ্ট হয় না এবং দুনিয়ার কোন জিনিসের প্রতি মনোযোগী না হয়ে আখেরাতের জীবনের প্রতি মনোযোগী হয়ে থাকে। হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহ্র দৃষ্টিতে দুনিয়ার মূল্য যদি একটা মশার ডানার সমান হত, তাহলে আল্লাহ্ কোন কাফেরকে এক চুমুক পানিও পান করাতেন না। প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার লোভ লালসা সমস্ত পাপের মূল, পক্ষান্তরে দুনিয়া থেকে পরমুখীতা এবং উহার প্রতি অনীহা সমস্ত ইবাদতের ভিত্তি।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 দুনিয়া খেলখানা

📄 দুনিয়া খেলখানা


হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুনিয়া ঈমানদারদের জন্য জেলখানা এবং কাফেরদের জন্য বেহেস্ত।

অর্থাৎ আখেরাতে মুমিনদের জন্য যে নিয়ামত, শান্তি, আরাম আয়েশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এর মুকাবেলায় দুনিয়া তার জন্য জেলখানা স্বরূপ। আর আখেরাতে কাফেরদের জন্য যে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে তার তুলনায় দুনিয়া তাদের জন্য বেহেস্ত অথবা মুমিন নিজেকে লাগামবিহীন উটের মত ছেড়ে দেয় না বরং আখেরাতের নিয়ামত ও স্বাদ ভোগ করার জন্য সংকীর্ণতাকে মেনে নেয়, ফলে এ দুনিয়া তার জন্য জেলখানার মত হয়ে যায়। অপরদিকে কাফেররা দুনিয়ার মধ্যে নিজেদের লাগামবিহীন উটের মত ছেড়ে দেয়, দুনিয়ার মধ্যে মত্ত হয় ও তার নিজের আরাম-আয়েশে নিমজ্জিত হয়। এ জন্য দুনিয়া তার নিকট বেহেস্তের মত মনে হয়।

হযরত ফুযায়েল বিন আয়ায (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ার আনন্দদায়ক ও সুস্বাদু বস্তুসমূহ ত্যাগ করে, সে যেমন জেলখানায় আছে। কিন্তু যে ব্যক্তি দুনিয়ার নেয়ামতের মধ্যে মত্ত এবং প্রবৃত্তি পূজায় নিমজ্জিত রইল, তার জন্য বন্ধন বাকী রইল না। যেমনিভাবে কয়েদী জেলখানায় বন্দী থাকে, ঠিক তেমনিভাবে মুসলমানদের দুনিয়ার মধ্যে বাধা ও বাধ্যতার পাবন্দ হয়। আখেরাতের জন্য এমনভাবে চিন্তা ফিকির করতে হবে এবং এমন নেক আমল করতে হবে যা তাকে সেই জেল-হাজত থেকে চিরদিনের জন্য চিরস্থায়ী নিয়ামত ও আরাম দিতে পারে। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়া মোমিনদের নিকট কখনো ভাল লাগে না, ভাল লাগবেই বা কি করে, যখন দুনিয়া তার জন্য জেলখানা এবং পরীক্ষার স্থান।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 পূণ্যের প্রতিফল

📄 পূণ্যের প্রতিফল


হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ কোন মুমিন ব্যক্তিকে তার নেকীর পরিবর্তে বেঈনসাফ করবেন না। নেকীর বদলায় তাকে দুনিয়ায় নিয়ামত দেওয়া হয় এবং আখেরাতে তার উত্তম ফল দেওয়া হবে। এবং কাফের যে দুনিয়াতে আল্লাহ্র জন্য ভাল কাজ করে, তার বদলায় সে দুনিয়াতে ফলভোগ করবে কিন্তু আখেরাতে তাকে সওয়াব দেওয়ার মত কোন নেকী থাকবে না।

অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা প্রত্যেক বান্দাকে চাই সে মোমিন বা কাফের হোক, প্রত্যেকের ছোট বড় নেকী এবং ভাল-মন্দের বদলা অবশ্যই দেন, চাই সেটা দুনিয়াতে হোক অথবা আখেরাতে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন- فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ মিতকালে জাররাতিন শাররাই ইয়ারাও (زلزال ৭-৮) অর্থ “যে ব্যক্তি অল্প একটুও নেকী করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে অল্প একটু মন্দ করবে, তাও সে দেখে নিবে।”

আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন- إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضْعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا (نساء - ٤০) অর্থঃ “অবশ্যই আল্লাহ্ তা'আলা কারো উপর বিন্দু পরিমাণ অত্যাচার করবেন না। আর যদি একটি নেকী হয় উহাকে দ্বিগুণ করে দিবেন এবং নিজ হাতে আরো বেশি বদলা দিবেন।” (সূরা নিসা: ৪০)

মুমিন দুনিয়াতে যে নেক আমলসমূহ করে আল্লাহ্ তা'আলা তার বদলায় তার থেকে বালা-মুসীবত দূর করে দেন। খাদ্য ও রিযিকের মধ্যে প্রশস্ততা দান করেন এবং অন্যান্য নিয়ামত দান করেন। আর আখেরাতে যা দিবেন, তার তো কোন হিসেবই হয় না। কাফের দুনিয়াতে যে সকল ভাল কাজ করে, উদাহরণস্বরূপ গরীবের সাথে ভাল ব্যবহার করা, খাদ্য দান করা, অত্যাচারিত ব্যক্তিকে সাহায্য করা, এতীমদের স্নেহ ও দয়া করা এবং অন্যান্য ভাল কাজ করা অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত অন্যান্য সকল ভাল কাজ করার জন্য (কাফেরদের) দুনিয়াতে বদলা দেওয়া হবে, কিন্তু পরকালে তার নেক আমলের বিনিময়ে কিছুই থাকবে না। মোমিন দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানে বদলা পায়। কাফের শুধু দুনিয়াতে পায় আর আখেরাতে তার কুফরের কারণে জাহান্নামের আগুনই হবে প্রতিফল। সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনের জন্য অনুগ্রহের ব্যবস্থা করেন এবং কাফেরের সাথে সুবিচার ঈনসাফের ব্যবস্থা করেন। মুমিন যদি কোন গোনাহ বা ভুল করে ফেলে, আল্লাহ্ দুনিয়াতে কোন মুসীবত, কষ্ট বা রোগ ইত্যাদির দ্বারা উহা দূর করে দেন এবং আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px