📄 দ্বিতীয় বিষয়: কেন আমাদেরকে কাফিরদের অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে?
শুরুতেই আমাদেরকে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে বুঝতে হবে- নিশ্চয় দীনের মূলভিত্তি হলো 'কায়মনোবাক্যে মেনে নেওয়া'। আল্লাহ তা'আলার নিকট জন্য সবকিছু মেনে নেওয়া এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবকিছু মেনে নেওয়া। আর 'মেনে নেওয়া' এর অর্থ: আল্লাহ তা'আলার কর্তৃক প্রদত্ত সংবাদকে সত্য বলে স্বীকার করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নেওয়া এবং তাঁর নিষেধকৃত বস্তু পরিত্যাগ করা। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত সংবাদকে সত্য বলে স্বীকার করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নেওয়া, তাঁর নিষেধ করা বস্তু বা বিষয় থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর আদর্শ মেনে চলা।
সুতরাং যখন আমরা এ মূলনীতি সম্পর্কে জানতে পারব, তখন প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির জন্য উচিৎ হবে:
প্রথমত: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে যা কিছু এসেছে, তার সবকিছুকে মেনে নেওয়া।
দ্বিতীয়ত: তাঁর আনুগত্য করা এবং কাফিরদের সামঞ্জস্য বিধান করার ব্যাপারে তাঁর পক্ষ থেকে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা মান্য করা।
তৃতীয়ত: আল্লাহর বাণী ও তাঁর শরী'আতের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ, সেগুলোর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন এবং সেগুলোকে মেনে নেওয়ার পর তার জন্য (শরী'আতের বিধি-বিধানের) কারণসমূহ অনুসন্ধান করতে কোনো বাধা নেই।
তাই আমরা বলতে পারি যে, কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কারণসমূহ অনেক; যার অধিকাংশই সুস্থ বিবেক ও সঠিক স্বভাব- প্রকৃতিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ খুব সহজে বুঝতে পারেন।
প্রথমত: কাফিরদের কর্মসমূহের ভিত্তিই হচ্ছে ভ্রষ্টতা ও ফাসাদের ওপর। এটাই হচ্ছে কাফিরদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে মূলনীতি। চাই সেসব কর্ম তোমাকে মুগ্ধ করুক অথবা নাই করুক; সেগুলো ফেতনা- ফাসাদপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্য হউক বা অপ্রকাশ্য হউক; কারণ, কাফিরদের আকীদা-বিশ্বাস, আচার-আচরণ, পূজা-পার্বন, উৎসব ও রীতিনীতিসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের কর্মসমূহ হয়ে থাকে ভ্রষ্টতা, বিকৃতি ও অন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে। তাদের দ্বারা যে সব সৎকর্ম হয়ে থাকে তা হচ্ছে ব্যতিক্রম। সুতরাং যখন তাদের মাঝে কোনো সৎকর্ম দেখতে পাবে, তখন তোমাদের জানা থাকা উচিত যে, এগুলো এমন কর্মের অন্তর্ভুক্ত যার ব্যাপারে তাদের কাউকে কোনো প্রতিদান দেওয়া হবে না; যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿ وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُواْ مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءَ مَّنثُورًا ﴾ [الفرقان: ٢٣]
"আর আমরা তাদের কৃতকর্মের প্রতি অগ্রসর হয়ে সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২৩]
দ্বিতীয়ত: কাফিরদের অনুকরণ করার বিষয়টি মুসলিমগণকে তাদের অনুসারী বানিয়ে ছাড়বে। আর এর মধ্যে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং অবিশ্বাসীদের পথ অনুসরণ করার বিষয় রয়েছে। আর এ ব্যাপারে কঠিন হুমকি প্রদান করা হয়েছে; আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴾ [النساء: ١١٥]
“আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায়, সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস"! [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫]
তৃতীয়ত: অনুসরণকারী ব্যক্তি ও অনুসৃত ব্যক্তির সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া, যা অনুসরণকারী ব্যক্তি ও অনুসৃত ব্যক্তির মাঝে কোনো না কোনো সামঞ্জস্য সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ পরস্পরের কাঠামোগত সম্পৃক্ততা, আন্তরিক আকর্ষণ এবং কথায় ও কাজে পারস্পরিক মিল -এগুলো হলো এমন বিষয়, যা ঈমান বিনষ্টকারী; তাতে লিপ্ত হওয়া কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য উচিত নয়।
চতুর্থত: অনুকরণ করার বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাফিরদের প্রতি মুগ্ধ বা তুষ্ট থাকার নীতি সৃষ্টি করবে। সেখান থেকে তাদের ধর্ম, আচার- আচরণ, রীতি-নীতি, কর্মকাণ্ড এবং তারা যে অন্যায় ও বিশৃঙ্খলার ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, তার প্রতি মুগ্ধ থাকা, আর এ তুষ্টি অপরিহার্যভাবে সুন্নাতসমূহ এবং সত্য ও হিদায়াত প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করতে বাধ্য করবে, যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছেন এবং যার ওপর পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল ব্যক্তিগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কারণ, যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে ব্যক্তি তাদের মতো হয়ে যায় এবং সে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে; আর এটা তাকে মুগ্ধ ও তুষ্ট করে; আর অপরদিকে বিপরীত কথা ও কাজ তখন আর তাকে আনন্দ দিবে না।
পঞ্চমত: পরস্পরের অনুকরণের বিষয়টি সম্প্রীতি ও ভালবাসা এবং অনুকরণকারীদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধুত্বের সৃষ্টি করে; কারণ, মুসলিম ব্যক্তি যখন কাফিরের অনুসরণ করবে, তখন আবশ্যকীয়ভাবে তার মনের মাঝে তার জন্য বন্ধুত্বের আকর্ষণ পাওয়া যাবে আর এ অন্তরঙ্গতাই নিশ্চিতভাবে মুমিন, সৎকর্মশীল, মুত্তাকী, সুন্নাহর অনুসারী ও দীনের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গকে বাদ দিয়ে অন্যদের জন্য ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও পারস্পরিক বন্ধুত্বের জন্ম দিবে; আর এটা আবশ্যকীয়ভাবেই একটি স্বভাবসুলভ ব্যাপার, যা প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তিই অনুভব করতে পারে; বিশেষ করে যখন অনুসরণকারী নিজে একাকিত্ব অনুভব করে অথবা অনুসরণকারী ব্যক্তি মানসিকভাবে পর্যুদস্ত থাকে, এ কারণে সে যখন অন্যকে অনুসরণ করে, তখন সে অনুসৃত ব্যক্তির মহত্ব, তার প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব এবং উভয়ের মধ্যকার মিল অনুভব করে। এটা যদি কেবল বাহ্যিক মিলেই সীমাবদ্ধ থাকতো তবুও তা হারাম হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতো, অথচ বাহ্যিক মিল, অভ্যাসের মিল, চাল-চলনে মিল থাকা আবশ্যকীয়ভাবে অভ্যন্তরীণ মিল-মহব্বত সৃষ্টি করে।
এখানে আমি পরস্পর পরস্পরের অনুকরণকারীদের মাঝে বিদ্যমান সম্পর্ক, মহব্বত (ভালোবাসা) ও বন্ধুত্বের ব্যাপারে একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছি: যদি কোনো মানুষ ভিন্ন দেশে গমন করে, তবে সে তাতে একাকিত্ব অনুভব করতে থাকে, ফলে সে যদি তার মতো কোনো মানুষকে তার পোষাকের মতো পোষাক পরিধান করে বাজারে চলাফেরা করতে এবং তার ভাষায় কথা বলতে দেখে, তাহলে সে অবশ্যই তার কেন্দ্রিক অনেক বেশি পরিমাণে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা অনুভব করবে। আর এ ভালোবাসা ও হৃদ্যতার পরিমাণ তখন সে অবস্থার চেয়ে বেশি দেখা দিবে যদি এ লোকটিকে সে তার নিজ দেশে প্রত্যক্ষ করত। অতএব, মানুষ যখন অনুভব করে যে, সে অপরের অনুসারী, তখন এ অনুকরণ মনের মধ্যে তার জন্য নিশ্চিতভাবে প্রভাব তৈরি করবে; এটা হচ্ছে স্বাভাবিক অবস্থায়। কিন্তু যদি কোনো মুসলিম কোনো কাফিরের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তার অনুকরণ করে, তাহলে তার অবস্থা কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়! আর এটাই হলো আসল কথা। কারণ কোনো মুসলিম ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো কাফির ব্যক্তির অনুসরণ-অনুকরণ করার বিষয়টি কেবল তখনই সংঘটিত হবে, যখন সে তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে যায়, তার অনুসরণকে নিজের জন্য গৌরবের বিষয় মনে করে, তার মত চাল-চলনকে মনে স্থান দিবে, তার ভালোবাসায় মজে যাবে।
ষষ্ঠত: আমাদেরকে (কাফিরদের) অনুকরণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে; কারণ, মুসলিম কর্তৃক কাফিরের অনুকরণ করার বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে মুসলিমকে নীচ-অপমানিত ও দুর্বল অবস্থানে ফেলবে। ফলে সে নিজেকে হীন ও পরাজিত মনে করতে থাকবে। আর বর্তমানে কাফিরদেরকে অনুসরণকারীদের অনেকেই এ পরিস্থিতির মাঝেই আছে।
📄 তৃতীয় বিষয়: কিছু মূলনীতির প্রতি ইঙ্গিত।
প্রথম মূলনীতি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এমন সত্য ও বাস্তব সংবাদ পরিবেশন করেছেন, যা কখনো না ঘটে থাকতে পারে না। এ উম্মাত অবশ্যই তাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগণের রীতি-নীতির অনুসরণ করবে। আর আমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের অনুসরণ সংক্রান্ত হাদিসটি বিশুদ্ধ হাদিস, যা 'সহীহ' ও 'সুনান' গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: «لتتبعن سنن من قبلكم شبরা بشبر وذراعا بذراع»। “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি পুরোপুরি অনুসরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে"।
আর এ হাদীসটি ছাড়াও আরও অনেক হাদীস রয়েছে, যেগুলো দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, এ উম্মাতের অনেক গোষ্ঠী ও দল কাফিরদের অনুসরণে লিপ্ত হবে। আর তাদের যেসব রীতি-নীতির কথা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেগুলো আকীদা (মৌলিক বিশ্বাস), ইবাদত, বিধি-বিধান, স্বভাব- চরিত্র, আচার-আচরণ ও যাবতীয় উৎসবকেই অন্তর্ভুক্ত করে, যেমনটি আলেমগণ বলেছেন। এখানে আমাদের পূর্ববর্তীগণ বলতে যাদেরকে বুঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত অপরাপর হাদীসসমূহে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে সেগুলো বর্ণনা করার অবকাশ নেই, তবে সেসব হাদীসের কোনো কোনোটিতে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ব্যাখ্যা করেছেন এ বলে যে, তারা হলো পারস্য ও রোমবাসী। আবার কোনো কোনোটিতে তিনি তাদেরকে ব্যাখ্যা করেছেন এ বলে যে, তারা হলো ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানগণ, আবার কোনো কোনোটিতে তিনি তাদেরকে সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এ বলে যে, তারা হলো কাফির এবং কোনোটিতে তিনি তাদেরকে ব্যাখ্যা করেছেন এ বলে যে, তারা হলো মুশরিক। বস্তুত হাদীসের এসব ভাষ্যের এক অংশ অপর অংশকে সমর্থন করে।
অনুরূপভাবে এটা জানাও আবশ্যক যে, উম্মাতের মধ্য থেকে যারা কাফিরদের রীতি-নীতি অনুসরণ করবে, তারা হবে কিছু ফির্কা বা সম্প্রদায়; কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিয়েছেন যে, অবশ্যই এ উম্মাতের মধ্য থেকে একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের ওপর স্পষ্টভাবে অবশিষ্ট (অটল) থাকবে, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত দল, তারা সত্য প্রচার করবে, সৎকাজের আদেশ করবে, অসৎকর্ম থেকে নিষেধ করবে, যে ব্যক্তি তাদেরকে অপমানিত করবে সে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না এবং যে ব্যক্তি তাদের সাথে শত্রুতা করবে, সেও তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আর এসব লোকজনই হলো মুক্তিপ্রাপ্ত দল। এ দলের মুক্তিপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য অন্যতম আবশ্যকীয় বিষয় হলো, তাদের দ্বারা কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণ না ঘটা।
দ্বিতীয় মূলনীতি: নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাদেরকে কাফিরদের রীতি-নীতির অনুকরণ বা অনুসরণ করার ব্যাপারে সংবাদ দিয়েছেন, তখন তিনি এ ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
সংক্ষিপ্তভাবে, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: من تشبه بقوم فهو منهم. “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে চলবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে”। আরও যেমন, এ হাদীসের মতো যা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে, যাতে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: التتبعن سنن من قبلكم ...... "তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি পুরোপুরি অনুসরণ করবে ...।” সুতরাং এটা হলো সতর্ক করার দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং অনুসরণ-অনুকরণ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে সংবাদ প্রদানের পন্থায়। অনুরূপভাবে হাদীসের অনেক ভাষ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: »خالفوا المشركين« (তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধাচরণ কর), »خالفوا اليهود« (তোমরা ইয়াহূদীগণের বিরুদ্ধাচরণ কর), خالفوا المجوس (তোমরা অগ্নিপূজকদের বিরুদ্ধাচরণ কর)।”
তৃতীয় মূলনীতি: নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সংবাদ প্রদান করা যে, তাঁর উম্মাতের মধ্য থেকে একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সত্যকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকবে; যে ব্যক্তি তাদেরকে অপমানিত করবে, সে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না এবং যে ব্যক্তি তাদের সাথে শত্রুতা করবে, সেও তাদের ক্ষতি করতে পারবে না।
তবে অনুকরণ-অনুসরণের বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার সময় এ মূলনীতিগুলোর এক অংশকে অপর অংশ থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়; কারণ, আমরা যদি (হাদীসের) এসব ভাষ্যসমূহের এক অংশকে অপর অংশ থেকে আলাদা করি, তাহলে জনগণের কেউ কেউ ধারণা করবে যে, মুসলিমগণের সকলেই (কাফিরদের) অনুকরণ করার মধ্যে ডুবে যাবে। আর এটা কখনও সম্ভব নয়; কারণ, এটা দীন সংরক্ষণ করার বিপরীত ভূমিকা পালন করবে, অথচ আল্লাহ তা'আলা তা (দীন) সংরক্ষণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
যেমনিভাবে আমরা যদি অপর এ হাদিসটিকে গ্রহণ করি, আর তা হলো: «ستبقي طائفة » (নিশ্চয় একটি দল অবশিষ্ট থাকবে...) এবং যদি প্রথম হাদীসটিকে গ্রহণ না করি, আর তা হলো: « لتتبعن سنن كان من قبلكم...» (তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি পুরোপুরি অনুসরণ করবে), তাহলে জনগণের কেউ কেউ ধারণা করবে যে, এ উম্মাত (জাতি) কাফিরদের অনুকরণ করার মতো কাজে জড়িয়ে পড়া থেকে মুক্ত।
আর প্রকৃত বিষয় এটা বা ওটা কোনোটাই নয়, বরং নিশ্চিতভাবে মধ্যমপন্থী উম্মাত হিসেবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত অবিশিষ্ট থাকবে, যারা (কাফির ও মুশরিকদের) অনুকরণ না করে সুন্নাতের ওপর অটল থাকবে। আর অপরাপর জাতি বা গোষ্ঠীসমূহ, যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, বস্তুত কাফির ও মুশরিকদের অনুসরণ-অনুকরণে জড়িয়ে পড়ার কারণেই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে; সুতরাং যখনই কোনো গোষ্ঠী বা দল সুন্নাহ থেকে বের হয়ে যাবে তখনই তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের রীতি-নীতিগুলোর কোনো কিছুতে জড়িয়ে পড়বে।
টিকাঃ
৪ হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন; 'ফতহুল বারী': ১৩/৩০০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৬৯।
৫ ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২/৫০; আবু দাউদ রহ. বর্ণনা করেছে উৎকৃষ্ট সনদে, হাদীস নং- ৪০৩১; আর আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, 'সহীহ আল-জামে' আস-সাগীর', হাদীস নং- ৬০২৫।
৬ হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন; 'ফতহুল বারী': ১৩/৩০০; মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৬৯।
৭ অচিরেই তার তথ্যসূত্রের বিবরণ আসছে।
৮ অচিরেই তার তথ্যসূত্রের বিবরণ আসছে।
৯ অচিরেই তার তথ্যসূত্রের বিবরণ আসছে।
📄 চতুর্থ বিষয়: যেসব বিষয়ে কাফিরগণ ও অন্যান্যদের অনুকরণ করার ব্যাপারে ব্যাপক ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আর তা চার চার প্রকার:
প্রথম প্রকার: আকীদার বিষয়সমূহ: আর এগুলো অনুকরণের বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক। বস্তুত এসব ক্ষেত্রে অনুসরণ-অনুকরণ করা কুফরী ও শির্ক। উদাহরণস্বরূপ, সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের পবিত্রতার গুণগান বর্ণনা করা। আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার ইবাদাত করা; আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার সৃষ্ট কাউকে আল্লাহর কন্যা বা পুত্র বলে দাবি করা, যেমন খ্রিষ্টানগণ বলে: মাসীহ আল্লাহর পুত্র এবং ইয়াহূদীগণ বলে: উযায়ের আল্লাহর পুত্র। অনুরূপভাবে দীনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং আল্লাহ তা'আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তা ব্যতীত অন্য কিছু দিয়ে বিচার-ফয়সালা করা। আর এর থেকে যেসব কুফুরী ও শির্কী বিষয়সমূহ শাখা-প্রশাখা হিসেবে বের হয়ে আসবে, সেগুলো সবই আকীদাগত বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয় প্রকার: যা উৎসবের সাথে সংশ্লিষ্ট: আর উৎসবসমূহের অধিকাংশ যদিও ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত, তবে তা কখনও কখনও প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়ে থাকে। সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে শরী'আতের বহু ভাষ্যে বিশেষভাবে সেগুলোতে কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণ করা থেকে জোরালোভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আর তাই দেখা যায় যে, মুসলিমদেরকে বছরে দু'টি 'ঈদ উৎসব পালনের ওপর সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং বাকী যেসব উৎসব রয়েছে যেমন, জন্ম উৎসব, জাতীয় বিভিন্ন উৎসব কিংবা নিয়মিত উৎসবসমূহ, যা বছরে একদিন পালিত হয় অথবা মাসে একদিন পালিত হয় অথবা পালাক্রমে একদিন পালিত হয় অথবা প্রতি সপ্তাহে একদিন পালিত হয়, যা জাতির লোকেরা নিয়ম করে পালন করে থাকে -এ সব উৎসবের সবই সুস্পষ্টভাবে হাদীসে আগত নিষিদ্ধ অনুসরণ-অনুকরণের অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় প্রকার: ইবাদত। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আগত শরী'আতে ইবাদাতের ক্ষেত্রে কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণ করা থেকে নিষিদ্ধ করে বহু বক্তব্য বিস্তারিতভাবে এসেছে। তন্মধ্যে অনেক বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বক্তব্য এসেছে, যাতে আমাদেরকে কাফিরদের অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন, মাগরিবের সালাত বিলম্ব করে আদায় করা, সাহরী না খাওয়া, বিলম্বে ইফতার করা ইত্যাদি, যে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে।
চতুর্থ প্রকার: প্রথা, নৈতিক চরিত্র ও আচার-আচরণ: উদাহরণস্বরূপ পোষাক-পরিচ্ছদ। এটাকে 'প্রকাশ্য আদর্শ বা সুস্পষ্ট রীতি-নীতি' বলা হয়ে থাকে। বস্তুত প্রকাশ্য আদর্শ বলতে বুঝায়, আকার-আকৃতি ও বেশভূষার আদর্শ যেমন পোষাক। অনুরূপভাবে চালচলন ও চারিত্রিক রীতি-নীতি। এসব ক্ষেত্রেও অনুকরণ-অনুসরণের নিষিদ্ধ করে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত উভয়ভাবেই সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। যেমন, দাড়ি মুণ্ডন করা থেকে নিষেধাজ্ঞা, স্বর্ণের পাত্র ব্যবহার করা থেকে নিষেধাজ্ঞা, কাফিরদের ইউনিফর্ম জাতীয় পোষাক পরিধান করা থেকে নিষেধাজ্ঞা, নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করা ও নারী-পুরুষে মেলামেশা করা থেকে এবং পুরুষগণ কর্তৃক নারীদের (বেশভূষার) অনুকরণ করা এবং নারীগণ কর্তৃক পরুষদের অনুকরণ করা, ইত্যাদি বিবিধ প্রথা থেকে নিষেধাজ্ঞা।
টিকাঃ
১০ অর্থাৎ সত্য ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, তবে তা গবেষণাগত বিষয়ে মতবিরোধ করার মধ্যে গণ্য হবে না। কারণ, তাকে দীনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা বলে গণ্য করা হয় না।
📄 পঞ্চম বিষয়: التشبه (অনুকরণ) এর বিধানাবলী প্রসঙ্গে।
অনুসরণ-অনুকরণ সংক্রান্ত সকল বিধান বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান ও পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে একত্রিত করা সম্ভব নয়। কারণ, অনুসরণ-অনুকরণ করার প্রত্যেকটি অবস্থার জন্য একটি বিধান রয়েছে, যা আলেম ও দীনের জ্ঞানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণের পক্ষ থেকে হাদীসের বক্তব্য ও শরী'আতে মূলনীতিসমূহের সামনে পেশ করে গ্রহণ করতে হয়।
কিন্তু এমন কতিপয় সাধারণ বিধান রয়েছে, যা অনুসরণ-অনুকরণের সকল প্রকারকে বিস্তারিতভাবে না হলেও মোটামুটিভাবে বিন্যস্ত করে। যেমন,
প্রথমত: কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণ করার মধ্যে এমন কিছু প্রকার রয়েছে, যা শির্ক অথবা কুফরী; যেমন, আকীদার ক্ষেত্রে অনুসরণ বা অনুকরণ করা এবং কোনো কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে অনুকরণ করা। যেমন তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ ও আকীদা বিনষ্টকারী বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও অগ্নিপূজকের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা। উদাহরণত: 'তা'ত্বীল' নীতিতে বিশ্বাস করা। আর তা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণাবলীকে অস্বীকার করা এবং তাতে বক্রপন্থা অবলম্বন করা। আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক সৃষ্ট কোনো ব্যক্তির মধ্যে তাঁর অবস্থান করার এবং সৃষ্টির সাথে তাঁর মিশে যাওয়ার আকীদা পোষণ করা। নবী ও সৎ ব্যক্তিগণের পবিত্রতা বর্ণনায় গুণাগুণ করা, তাদের পূজা করা এবং আল্লাহ ব্যতীত তাদেরকে আহ্বান করা, আর মানব রচিত আইন-কানুন ও বিধিবিধানকে সালিস মানা -এসব কিছু হয় শির্ক, না হয় কুফরী।
দ্বিতীয়ত: কাফেরদের অনুসরণ-অনুকরণ করার মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা অবাধ্যতা ও ফাসেকী (পাপাচারিতা) হিসেবে গণ্য। যেমন, কোনো কোনো প্রথা ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে কাফিরদের অনুসরণ করা। উদাহরণত, বাম হাতে খাওয়া ও পান করা, পুরুষগণ কর্তৃক স্বর্ণের আংটি ও গহনা ব্যবহার করা, দাঁড়ি মুণ্ডন করা, নারীগণ কর্তৃক পরুষদের (বেশভূষার) অনুকরণ করা এবং পুরুষগণ কর্তৃক নারীদের অনুকরণ করা ইত্যাদি।
তৃতীয়ত: যা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়: আর তা হলো এমন বিষয়, যা নিয়ে সিদ্ধান্ত পেশ করার সময় হালাল ও হারামের মাঝে হুকুম দেওয়ার প্রশ্নে অস্পষ্টতার কারণে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় অর্থাৎ কোনো কোনো অভ্যাস ও চাল-চলন ও পার্থিব বিষয়াদির ব্যাপারে মাকরূহ (অপছন্দনীয়) ও মুবাহ (বৈধ) হওয়ার মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, তখন মুসলিমগণ কর্তৃক (কাফিরদের) অনুকরণে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে প্রতিরোধ করার জন্য তার হুকুমটি মাকরূহ হিসেবে অবশিষ্ট থাকবে।
আর একটি প্রশ্ন অবশিষ্ট থেকে যায়: কাফিরদের এমন কোনো কাজ আছে কিনা, যা বৈধ?
জবাবে আমি বলব: পার্থিব কর্মকাণ্ডসমূহের মধ্য থেকে যা তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা বৈধ বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ যার মধ্যে এমন কোনো লক্ষণ নেই, যা তাদেরকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করে এবং তাদেরকে সৎকর্মশীল মুসলিমগণের মধ্য থেকে আলাদা করে দেয়। আরও বৈধ বলে গণ্য হবে তা, যা মুসলিমগণের ওপর বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় টেনে আনবে না অথবা যা কাফিরদের জন্য এমন কোনো সুবিধা টেনে আনবে না, যা মুসলিমগণকে অপদস্থ করার দিকে ধাবিত করে এবং এইরূপ অন্যান্য বিষয়াদি। অনুরূপভাবে কাফেরদের দ্বারা উৎপাদিত বা প্রস্তুতকৃত নির্ভেজাল বস্তুও বৈধ, যাতে তাদের অনুসরণ বা অনুকরণ করার ক্ষেত্রে মুসলিমগণ কোনো প্রকার ক্ষতির শিকার হবে না। তদ্রূপ শুধু দুনিয়াবী জ্ঞান-বিজ্ঞান, যা আকীদা ও নৈতিক চরিত্রকে আক্রান্ত করে না, তা বৈধ কর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আবার কখনও কখনও কাফিরদের নিকট যে নির্ভেজাল দুনিয়াবী জ্ঞান-বিজ্ঞান রয়েছে, তা থেকে ফায়দা হাসিল করা মুসলিমগণের ওপর আবশ্যকও হয়ে যায়। এখানে 'নির্ভেজাল' শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: এমন জ্ঞান, যাতে তাদের এমন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি অথবা নিদর্শন পাওয়া যায় না, যা (কুরআন ও সুন্নাহর) বক্তব্যসমূহে অথবা শরী'আতের মূলনীতিমালায় আঘাত করে অথবা মুসলিমগণকে অপমান ও লাঞ্ছনার মধ্যে নিক্ষেপ করে। এগুলো ছাড়া বাকি সব বৈধ বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত হবে।
অতএব, আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত ও উৎসবসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কাফেরদের অনুসরণ-অনুকরণ হারাম হওয়ার বিষয়টি অকাট্য! অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে কাফিরদের অনুকরণ করা হারাম হওয়ার বিষয়টি অকাট্যভাবে সাব্যস্ত! এগুলোর নিম্ন পর্যায়ে যা রয়েছে, সেটি হয় তাদের প্রথার শ্রেণিভুক্ত হবে। তখন যদি দেখা যায় যে, তা তাদের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত, তাহলে তা হারাম বলে গণ্য হবে! আর যদি তা তাদের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত না হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে বিধানটি হারাম (নিষিদ্ধ), মাকরূহ (অপছন্দনীয়) ও মুবাহ (বৈধ) হওয়ার মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। আর তা যদি সাধারণ শিল্প ও অস্ত্র শিল্প প্রভৃতির মতো বিজ্ঞান ও স্রেফ পার্থিব বিষয়াদির পর্যায়ভুক্ত হয়, তাহলে এ ধরনের বিষয় বৈধ বলে গণ্য হবে, যখন তাকে পূর্বে উল্লিখিত শর্তসমূহের সাথে শর্তযুক্ত করা হবে।
টিকাঃ
১১ মুসলিমগণের আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো কাফিরগণের দ্বারস্থ হওয়া থেকে দূরে থাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টাসাধনা করা; মুসলিমগণের মৌলিক কর্তব্য যেমন জিহাদ, সৎকাজের আদেশ, অশ্লীল কাজে নিষেধ, দাওয়াত ও দীন প্রতিষ্ঠার কাজের মত মৌলিক দায়িত্ব পালনের উপর প্রভাব বিস্তার না করে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। শরী'আতের নিয়ম-কানুনের নিরাপদ সীমানায় অবস্থান করে যে কোনো জাতি বা যে কোনো দেশের নিকট থেকে শিল্পের মতো পার্থিব বিষয়াদি থেকে মুসলিমগণ কর্তৃক ফায়দা হাসিল করতে কোনো ক্ষতি নেই। যেমনটি করতেন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবীগণ ও উম্মাতের পূর্ববর্তী আলেমগণ। তাদের কোনো শিল্প, পেশা, বস্তুগত যোগ্যতা বা দক্ষতা থেকে ফায়দা হাসিল করতে তাঁরা ততক্ষণ পর্যন্ত বারণ করতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মুসলিমগণের ওপর অপমান ও লাঞ্ছনাকে অবশ্যম্ভাবী করে না তোলে। আর আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, আজকের দিনের মুসলিমগণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য হল সাধারণভাবে বস্তুগত অগ্রগতির জন্য চেষ্টাসাধনা করা; কিন্তু এটা তাদের দীন প্রতিষ্ঠার সাথে শর্তযুক্ত। আর প্রথমেই জরুরি হলো তার শরী'আত সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো, তারপর তারা বস্তুগত উন্নতির জন্য চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে, তবে যুক্তিসঙ্গত বিষয় হলো, দীন প্রতিষ্ঠা আবশ্যকীয়ভাবেই পার্থিব উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহই মহাজ্ঞানী।