📄 স্তর- ৭: মাদ্রাসায় সরাসরি কুরআন ও হাদীস পড়ানোর পরিবর্তে ফিকাহশাস্ত্র পড়িয়ে ইসলাম শিখতে বাধ্য ও উৎসাহিত করা
মাদ্রাসার ছাত্রদের সরাসরি কুরআন ও হাদীস পড়ার পরিবর্তে ফিকাহশাস্ত্র পড়তে বাধ্য করার জন্য গোয়েন্দারা নিচের ব্যবস্থাগুলো করেছে—
১. পরীক্ষা ও ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা: মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশ করার জন্য ফিকাহশাস্ত্রের তথ্য মুখস্থ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফিকাহ শাস্ত্র পড়লেই ইসলাম জানা যায়— এমন ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
২. কুরআন অধ্যয়নে ভীতি প্রদর্শন: তারা ফিকাহর বইয়ে লিখেছে যে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরাসরি সমাধান বের করতে গেলে পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অথচ ফকীহদের কিতাব পড়লে কোনো ঝুঁকি নেই।
৩. উচ্চতর শিক্ষার ধারা: 'দারুল ইফতাহ' নামক উচ্চতর শ্রেণিতে কেবল ফিকাহগ্রন্থের তথ্য মুখস্থ করানো হয়, কুরআন ও হাদীসের কোন তথ্যের ভিত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত এসেছে তা শেখানো হয় না।
৪. সামাজিক মর্যাদা: সমাজে মুফাস্সির বা মুহাদ্দিসদের চেয়ে 'মুফতি'দের সামাজিক মর্যাদা ও গুরুত্ব বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ফিকাহর দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়।
📄 স্তর- ৮:ফিকাহশাস্ত্রের সংস্করণ বন্ধ করে ঢুকিয়ে দেয়া মিথ্যা কথাগুলোর সংস্কারের পথ বন্ধ করা
প্রচলিত ফিকাহশাস্ত্রের এমন কিছু কথা লেখা আছে যার মর্মকথা হলো প্রচলিত ফিকাহগ্রন্থের সংস্করণ করা নিষেধ। এ লক্ষ্যে গোয়েন্দারা যে সকল তথ্য প্রচার করেছে তার কয়েকটি হলো—
১. ইজতিহাদ বা গবেষণা বন্ধ করা: তারা প্রচার করেছে যে, প্রথম ও দ্বিতীয় যুগের মুজতাহিদগণ এমন পূর্ণাঙ্গ ফিকাহশাস্ত্র দান করে গেছেন যেখানে মানব জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান রয়েছে। অতএব নতুন করে গবেষণা (ইজতিহাদ) করা কেবল সময়ের অপচয়। এই তথ্যের মাধ্যমে প্রচলিত ফিকাহ গ্রন্থে থাকা কোনো ভুল বা ষড়যন্ত্রমূলক তথ্য সংশোধনের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।
২. 'সেরা যুগ' হাদীসের অপব্যাখ্যা: জুমআর খুৎবায় প্রায়ই একটি হাদীসের খণ্ডিতাংশ শোনানো হয় যে— 'আমার যুগের মানুষ সবচেয়ে উত্তম, অতঃপর পরবর্তী যুগের...'। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, পূর্বের আলেমদের জ্ঞান পরবর্তী আলেমদের চেয়ে বেশি, তাই ফিকাহর কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন— 'উপস্থিতরা যেন অনুপস্থিতদের নিকট আমার বক্তব্য পৌঁছে দেয়, কেননা পরে পৌঁছানো ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে আসল শ্রোতা অপেক্ষা অধিক উপলব্ধি ও রক্ষাকারী হতে পারে।' (বুখারী: ১৭৪১)। অর্থাৎ পরবর্তী যুগের আলেমগণ সভ্যতার অগ্রগতির কারণে পূর্ববর্তীদের চেয়ে অনেক বিষয় অধিক ভালো বুঝতে পারবেন।
৩. সংস্করণের আবশ্যকতা: পৃথিবীর সকল ব্যবহারিক শাস্ত্রের (যেমন: চিকিৎসাবিদ্যা) নিয়মিত নতুন সংস্করণ বের হয় যেখানে পুরাতন ভুল সংশোধন করে নতুন তথ্য যোগ করা হয়। কিন্তু ফিকাহ শাস্ত্রের ক্ষেত্রে 'পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ' এবং 'গবেষণার দ্বার বন্ধ'— এই নীতিমালার মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের ঢুকিয়ে দেওয়া মিথ্যাগুলোকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। অথচ কুরআন বারবার মানুষকে দেশ ভ্রমণ করে এবং অর্জিত জ্ঞান দিয়ে গবেষণার নির্দেশ দিয়েছে (সূরা হাজ্জ: ৪৬)।
📄 স্তর- ৯: মিথ্যা বা ভুল তথ্যগুলো মুসলিমদের বিনাদ্বিধায় মেনে নেয়ার জন্য অন্ধ অনুসরণ ( তাকলীদ) চালু করা
অন্ধ অনুসরণ বা তাকলীদ হলো— কারো কথা বা লেখনীকে বিনা বাক্যে বা বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া। ষড়যন্ত্রকারীরা ফিকাহগ্রন্থে থাকা ভুল তথ্যগুলো মুসলিমদের গেলাতে নিচের পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করেছে—
১. তাকলীদকে ফরজ করা: তারা প্রচার করেছে যে, ইমামদের মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ করা প্রত্যেকের জন্য অবশ্য কর্তব্য (ফরজ)। মাযহাবের বাইরে কুরআন-হাদীস থেকে সরাসরি জ্ঞান নেওয়া বা গবেষণা করা বৈধ নয়।
২. যোগ্যতার অভাবের দোহাই: তারা দাবি করেছে যে, বর্তমান বা পরবর্তী যুগের আলেমদের ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই। তারা কেবল ইতিহাসের মতো মাসয়ালা বর্ণনা করবেন, ফতোয়া দেওয়ার কোনো যোগ্যতা তাদের নেই।
৩. কুরআন-হাদীসের আগে ফিকাহর শর্ত: তারা এমন ভ্রান্ত নীতিমালা তৈরি করেছে যে— মাযহাবের ইমামরা কুরআনের কোথায় কী ব্যাখ্যা করেছেন তা না জেনে সরাসরি কুরআন-হাদীস চর্চা করা যাবে না। এর ফলে সাধারণ মুসলিম তো বটেই, এমনকি আলেমরাও সরাসরি কুরআন থেকে হিদায়াত নেওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন।
৪. তাকলীদের পরিণাম: কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আল্লাহ এবং রাসূল (সা.) ভিন্ন অন্য কাউকে নির্ভুল মনে করে অন্ধ অনুসরণ করা শিরক। কারণ নির্ভুলতা কেবল আল্লাহর গুণ (সূরা তাওবা: ৩১)। আবার নিজের বুদ্ধি বা common sense-কে কাজে না লাগিয়ে অন্যের অন্ধ অনুসরণ করা কুফরী, কারণ এতে আল্লাহর দেওয়া একটি বড় নিয়ামতকে অস্বীকার করা হয়। ষড়যন্ত্রকারীরা এই তাকলীদ প্রথা চালু করে মুসলিম উম্মাহকে শত শত বছর ধরে ভ্রান্তির অন্ধকারে আটকে রেখেছে।
📄 শেষ কথা
সুধী পাঠকবৃন্দ, পুস্তিকায় উল্লিখিত তথ্যসমূহ জানার পর আশা করি সবাই বুঝতে পেরেছেন যে— গভীর এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মূল শিক্ষায় ভুল ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। জ্ঞানের ঐ মৌলিক ভুলগুলোই মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অধঃপতনের মূল কারণ। যেহেতু বর্তমান মুসলিমদেরই মূল শিক্ষায় অনেক ভুল আছে, তাই অমুসলিমদের মধ্যে থাকা ভুল জ্ঞান শুধরানোর যোগ্যতাও তারা হারিয়ে ফেলেছে। মুসলিম ও অমুসলিম সকল দেশে আজ যে অশান্তি, অন্যায়, অবিচার ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে তার আসল কারণ হলো, জীবন পরিচালনার মূল শিক্ষায় ভুল থাকা।
মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়া একজন ছাত্র সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশুনা করতে বাধ্য। সিলেবাসের বইয়ের তথ্য সঠিক কিনা সেটি যাচাই করা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং এটি তার দায়িত্বও নয়। তাই যারা মাদ্রাসায় পড়ে 'আলিম' হিসেবে বের হয়ে আসছেন, তাদের প্রায় সবাই ঐ ভুল তথ্যগুলো সঠিক বলে জানেন এবং খালিস নিয়তে সেগুলো অনুসরণ করেন ও সমাজে প্রচার করেন। এদিক দিয়ে আমরা যারা মাদ্রাসায় পড়েছি, তারা জ্ঞানের দিক দিয়ে চরমভাবে প্রতারণার শিকার হওয়া ব্যক্তি।
অন্যদিকে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ মাদ্রাসায় পড়া আলিমদের ইসলামের জ্ঞানী লোক হিসেবে জানে এবং তাদের নিকট থেকেই ইসলাম শেখে। তাই ঐ মৌলিক ভুল কথাগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং পাচ্ছে। এজন্যে আমাদের বিরাট দায়িত্ব হলো বিষয়টি সবাইকে বিশেষ করে আলিমদের জানানো।
ষড়যন্ত্রকারীরা প্রধানত ফিকাহশাস্ত্র এবং মাদ্রাসা ও স্কুলের সিলেবাসে ঢুকিয়ে ভুল তথ্যগুলো প্রচার করেছে। তাই যারা উপযুক্ত স্থানে আছেন তাদেরও দায়িত্ব হবে ফিকাহ শাস্ত্রের সংস্কার করা এবং শিক্ষা সিলেবাস থেকে ভুল তথ্যগুলো বাদ দিয়ে সঠিক তথ্যগুলো স্থাপন করার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ মুসলিম জাতিকে এটি করার সাহস ও ক্ষমতা দিন। আল্লাহ হাফিজ!
সমাপ্ত