📄 শুরুর কথা
হযরত উমর ফারুক রাদি.-এর খিলাফতকালে দু'জন মুসলমান কাফেরদের হাতে বন্দী হন। কাফেররা তাদের বাদশাহকে পরামর্শ দেয় যে, আমরা তাদের চেহারায় যে সাহস ও নির্ভীকতা দেখেছি, তাতে মনে হয় তাদেরকে যদি হত্যা না করে কোনোভাবে আমাদের ধর্মে আনা যায় তাহলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হবে। তাদের পরামর্শে বাদশাহ বন্দী দু'জনকে বললো, 'তোমরা যদি আমাদের ধর্ম গ্রহণ না করো, তাহলে আমি তোমাদেরকে হত্যা করবো।' কিন্তু তারা জবাব দিলো—
ফাক্বদ্বি মা আনতা ক্বদ্বিন ইন্নামা তাক্বদ্বি হাযিহিল হায়াতাদ দুনইয়া।
'তুমি যা কিছু করতে চাও করো, তুমি তো কেবল এ পার্থিব জীবনের উপরই কর্তৃত্ব করতে পারবে।'
বাদশাহ তাদের এ জবাব শুনে বিচলিত হয়ে পড়লো। চিন্তা করতে লাগলো, তাহলে এদেরকে কীভাবে ভয় দেখানো যায়। পরামর্শ হলো, এদের একজনকে যদি গরম তেলে দগ্ধ করা হয় তাহলে একজন আমাদের হাতছাড়া হলেও অন্তত বাকি একজন তো আমাদের করতলগত হবে। পরামর্শ অনুযায়ী তাই করা হলো। তেল গরম করা হলো। একজনকে তেলে ছেড়ে দেয়া হলো। গরম তেলে গোশত ছেড়ে দিলে যেমন গোশত কাবাব হয়ে যায়, ঠিক তেমনিভাবে ওই মুসলমানও তেলে কাবাব হয়ে গেলো। এ দৃশ্য দেখে অপরজন কাঁদতে লাগলো। কাফেররা মনে করলো, সে হয়তো ভয় পেয়েছে। আমাদের কথা মেনে নেবে। তাই বললো, 'আমরা তো আগেই বলেছি, আমাদের কথা মেনে নাও তাহলে মুক্তি পাবে। প্রথম জনের যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন কেঁদে কী হবে। যাহোক, তাহলে তুমি আমাদের কথা মেনে নিলে তো?' তখন তিনি বললেন, 'তোমরা হয়তো ভাবছো, আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি? আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না। বরং আমি এ ভেবে কাঁদছি যে, আমার তো একটা প্রাণ। তোমরা আমাকে তেলে ছেড়ে দিলে সে প্রাণটা বের হয়ে যাবে। কিন্তু আমার দেহে যদি আমার শরীরের পশমের সমপরিমাণ প্রাণ থাকতো, আর তোমরা আমাকে ঠিক ততবার তেলে ছাড়তে, আর প্রতিবারই আমি আমার আল্লাহর জন্য একটি একটি করে প্রাণ উৎসর্গ করতে পারতাম।'
টিকাঃ
১. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ২/১৪৪।
২. সূরা ত্বহা, আয়াত: ৭২।
৩. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/১৪১।
📄 চিকিৎসক হয়েও কেন এ বিষয়ে কলম ধরলাম
অবিচলতা
ইচ্ছাশক্তির উপর খোদায়ি সাহায্য
বাইবেলে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। পবিত্র কুরআন শরিফেও এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে। হযরত দাউদ ও তালুত আলাইহিস সালাম তৎকালীন বাদশাহ জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। জালুত ছিলো বিশাল দেহ ও শক্তির অধিকারী। সে এমন আকার-আকৃতির ছিলো যে, তাকে দেখলেই আতঙ্ক সৃষ্টি হতো। দাউদ ও তালুত আলাইহিস সালাম উভয়ে জালুতকে দেখলেন। তালুত আলাইহিস সালাম বললেন—
"It is very difficult to kill him because he is very big" 'তাকে হত্যা করা খুবই কঠিন। কারণ, সে বিশাল দেহের অধিকারী।' কিন্তু হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম বললেন—
"It is very easy to kill him because he is very big, I never miss him" 'তাকে হত্যা করা খুবই সহজ। কারণ, সে বিশাল দেহের অধিকারী। আমার লক্ষ্য ভুল হয় না।' তিনি জালুত-এর কপাল লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারলেন। ফলে সে মারা গেলো।
মানুষ যখন দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে কোনো কাজ করে তখন আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেন।
📄 ভূমিকা
হাদিসে এসেছে—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মিরাজে গমন করেন। তখন পথিমধ্যে এক উপত্যকা থেকে মেশকের সুঘ্রাণ আসছিলো। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে এ সুঘ্রাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ফিরাউনের দরবারে মুশাতা নামে যে দাসী ছিলো এখানে তাঁর কবর। আর এ কবর থেকেই সুঘ্রাণ আসছে। সুবহানাল্লাহ!
📄 পুস্তিকার তথ্যের উৎসসমূহ
ফিরাউনের দরবারে মুশাতা নামে একজন নারী ছিলেন। যিনি ফিরাউনের মেয়েকে মাথার চুল বিলি করে দিতেন। একদিন ফিরাউনের মেয়ের মাথার চুল বিলি করতে গিয়ে হাত থেকে চিরুনি পড়ে গেলো। তখন তিনি মুসা আলাইহিস সালাম-এর রবের নাম নিয়ে চিরুনি তুললেন। বিষয়টি ফিরাউনের মেয়ে লক্ষ্য করলো। সে বুঝতে পারলো, এ পরিচালিকা আমার বাবাকে খোদা বলে মানে না। বরং সে মুসার আল্লাহকে খোদা মেনে নিয়েছে। সে মুশাতাকে জিজ্ঞাসা করলো, 'তুমি কি আমার বাবাকে খোদা বলে স্বীকার করো না?' মুশাতা বললেন, 'কখনো না। আমি মুসার আল্লাহকে খোদা বলে মেনে নিয়েছি।' মেয়ে তৎক্ষণাৎ গিয়ে ফিরাউনের কাছে ঘটনা খুলে বললো। ফিরাউন তো ঘটনা শুনে রেগে ফেটে পড়লো। ফিরাউন বললো, 'আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে, হয়তো সে আমাকে খোদা বলে মেনে নেবে, অন্যথায় সে প্রাণ হারাবে।'
অবশেষে মুশাতাকে দরবারে ডেকে মুসার রবের উপর থেকে ইমান ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হলো। কিন্তু তিনি বললেন, 'এটা আমি করতে পারবো না।' ফিরাউন তাকে ধমক দিলো। তিনি বললেন, 'আপনার যা করার করতে পারেন। আমি ইমান ছাড়তে পারবো না।' এরপর ফিরাউনের নির্দেশে তাকে মাটিতে শুইয়ে দেয়া হলো। তাঁর একটা ছোট বাচ্চা ছিলো। ফিরাউন চিন্তা করলো তার সামনে যদি তাঁর বাচ্চাকে হত্যা করার হুমকি দেয়া হয়, তাহলে হয়তো সে মাতৃত্বের মমতায় অপারগ হয়ে আমার কথা মেনে নেবে। তখন ফিরাউন তাঁর বাচ্চাকে এনে তার বুকের উপর বসিয়ে দিলো। শিশুবাচ্চা মায়ের বুকের দুধ খেতে শুরু করলো। ফিরাউন বললো, 'এখন তোমার সামনে তোমার বাচ্চাকে হত্যা করা হবে।' মুশাতা বললো, 'এখন আমার ইমান এতোটাই সুদৃঢ় হয়েছে যে, আমি যদি আমার সন্তানকে রক্তের মধ্যে গড়াগড়ি খেতে দেখি তাহলেও আমি একটুও নড়বো না। আমি আমার ইমান ছাড়তে পারবো না।' এরপর তাঁর বুকের উপরই সন্তানের গর্দান উড়িয়ে দেয়া হয়।
চিন্তা করুন, এমন পরিস্থিতিতে একজন মায়ের মনের অবস্থা কেমন হতে পারে? যাহোক, তারপর ফিরাউন বললো, 'এখন তোমাকে হত্যা করবো।' মুশাতা বললো, 'তোমার যা খুশি করতে পারো। আমি ইমান ছাড়তে পারবো না।' এরপর তাকেও শহিদ করে দেয়া হয়।