📄 এমনও জ্ঞানপিপাসু ছিলো তখন
হযরত শাহ আবদুল কাদের রায়পুরি রহ. বলেন, আমি ভর্তির জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে গেলাম। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর নাযেমে তালিমাত সাহেবের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, ভর্তি বন্ধ হয়ে গেছে। আমি হযরতকে খুব বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলাম, 'হযরত! আমি কী জানতে পারি ভর্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ কী?' নাযেম সাহেব আমাকে বললেন, 'আসলে আমাদের এখানে ছাত্রদের কোনো বোডিং-এর ব্যবস্থা নেই। গ্রামবাসী যে ক'জন ছাত্রের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে, সে ক'জন ছাত্রকেই ভর্তি করি। অন্যদের ফিরিয়ে দিই।' তখন আমি বললাম, 'হযরত! আমার খাবারের দায়িত্ব যদি আমার নিজের উপর থাকে, তাহলে কী আমি ভর্তি হতে পারবো?' তিনি বললেন, 'তাহলে ঠিক আছে।'
অবশেষে আমি ভর্তি হলাম। আর আমি সারাদিন ক্লাস করতাম, রাতে তাকরার করতাম। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়তো, তখন আমি পাশের বস্তিতে অবস্থিত বাজারে যেতাম। বাজারের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে আমের খোসা, তরমুজের খোসা পাওয়া যেতো। আমি সেগুলো কুড়িয়ে এনে ভালো করে পরিষ্কার করে খেয়ে ফেলতাম। এরপর সারাদিন ক্লাস করতাম। এটাই ছিলো আমার সারাদিনের খাবার। এভাবে আমি সারাবছর অতিবাহিত করলাম। কিন্তু কোনোদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতাম না।
টিকাঃ
৩২. তাঁর জন্মের ব্যাপারে সঠিক কোনো তারিখ পাওয়া যায় না। তবে ধারণা মুতাবিক হযরত আলি মিয়া নদবি রহ. লিখেছেন, ১২৯০ হিজরি সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা-মাতা তাঁর নাম রাখেন গোলাম জিলানি। কিন্তু তাঁর মুরশিদ তার নাম রাখেন আবদুল কাদের। লাহোরে তিনি ইনতিকাল করেন। জুমার দিন সুবহেসাদিকের সময় তাকে সমাহিত করা হয়। - سواغ رائے پوری
📄 চিঠির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করতাম না
শাহ আবদুল কাদের রায়পুরি রহ.-এর আত্মজীবনীতে লিখেছেন—ছাত্র জীবনে যখন বাড়ি থেকে কোনো চিঠি আসতো, তখন তা খুলতাম না। কারণ, ভাবতাম যদি চিঠিতে কোনো খুশির খবর থাকে তাহলে বাড়ি যেতে মন চাইবে। পক্ষান্তরে যদি কোনো দুঃখের খবর থাকে তাহলে পড়ালেখায় মন বসবে না। ফলে আমি ইলম থেকে বঞ্চিত হবো।
এভাবে সারাবছরের চিঠিগুলো জমা করে রাখতাম। অবশেষে শাবান মাসে বার্ষিক পরীক্ষার পর যখন অবসর হতাম, তখন সব চিঠিগুলো খুলে পড়তাম এবং এর একটা ফিরিস্তি তৈরি করতাম। যখন বাড়িতে যেতাম তখন খুশির সংবাদদাতাকে অভিনন্দন জানাতাম আর দুঃখের সংবাদদাতাকে সান্ত্বনা দিতাম। ফলে সবাই আমার উপর খুশি হয়ে যেতেন। কিন্তু তাদের তো আর এটা জানা ছিলো না যে, আমি তাদের চিঠি সবেমাত্র পড়েছি।
পৃথিবীতে যারা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁরা ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে এমনই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু বর্তমানে ছাত্রদের তো পড়াশোনার চেয়ে বাইরের কথাবার্তা শোনার প্রতি আগ্রহ বেশি। তাকরার করতে বসলে তাকরারের কথা শোনার চেয়ে বাইরের কথা বেশি শোনে। এমননকি তাকরারে বসে তো দেশের রাজনীতির সব ফয়সালাও হয়ে যায়। এর কারণ হলো—অনর্থক কথাবার্তার মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে ইলম থেকে বঞ্চিত করতে চায়।
📄 যে কলমের বিশ্রাম নেই
এক মুহাদ্দিস সাহেবের জীবনীতে পাওয়া যায়, তিনি তাঁর জীবনে এ পরিমাণ কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন যে, যদি তাঁর গোটা জীবনের দিনগুলো হিসাব করা হয়, আর তাঁর রচিত কিতাবগুলোর পৃষ্ঠা গণনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, প্রতিদিন গড়ে দশপৃষ্ঠা করে লেখা হয়েছে। অথচ এটা কোনো মামুলি বিষয় ছিলো না।
জন্মের পর থেকেই তো আর মানুষ লিখতে পারে না। বরং বারো/তেরো বছর জ্ঞানার্জনের পর থেকে হয়তো লেখেন। সুতরাং জ্ঞানার্জনের এ বছরগুলো যদি বাদ দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে দশের পরিবর্তে প্রতিদিন বিশপৃষ্ঠা হয়ে যাবে। আমাদের দ্বারা বিশপৃষ্ঠা লেখা তো দূরের কথা বিশপৃষ্ঠা ভালোভাবে বুঝে পড়াই তো অসম্ভব। যারা লেখক, তারা হয়তো জানেন যে, দিনে একপৃষ্ঠা লেখা কতো কঠিন। সুতরাং চিন্তা করুন, তাঁরা কী পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন।
📄 সফরের প্রবল আগ্রহ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে
মুহাম্মদ ইবনে কাসিম সতেরো বছরের যুবক। এখনকার সময়ের সতেরো বছরের কোনো যুবককে যদি ঘরের দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়, তাহলে সে হয়তো তা ঠিকমতো পালন করতে পারবে না, অথচ সতেরো বছরের যুবক মুহাম্মদ ইবনে কাসিম ছিলেন প্রধান সেনাপতি।
আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, রাজা দাহিরের মতো প্রতাপশালী শাসকের বিরুদ্ধে তিনি সৈন্যসামন্ত নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। আমি সিন্ধু এলাকায় সেই স্থান দেখেছি যেখানে মুহাম্মদ ইবনে কাসিম ও রাজা দাহির যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। যুদ্ধের ময়দান এতোটাই বিস্তৃত যে, ময়দান দেখে আমি বিস্মিত হই। আমি চিন্তা করলাম, এ নওজোয়ান কীভাবে এখানে এসেছিলেন? তাঁর সাথে তো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তেমন কোনো সৈন্যদলও ছিলো না।
যখন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ বললেন, এখন আমাদের সকল সৈন্যরা বিভিন্ন অভিযানে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, আমাদের কিছু সংখ্যক মহিলা সমুদ্রপথে আসছিলো। পথিমধ্যে রাজা দাহিরের জলদস্যুবাহিনী তাদের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। তারা চিৎকার করে বলছিলো— 'আমাদের বাঁচাও', 'আমাদের বাঁচাও'। এ বাক্যগুলো শুনে মুহাম্মদ ইবনে কাসিম নওজোয়ানদের একত্র করলেন। তারা যদিও যুদ্ধে পরিপক্ক ছিলেন না কিন্তু ইমানি বলে বলীয়ান ছিলেন। তাই তারা ইমানের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বললেন— 'হে মুহাম্মদ ইবনে কাসিম! আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আমরা যাবো।' ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে যে, মুসলিম বোনদের আকুতির এ বাক্যগুলো মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের মাথায় এমনভাবে বিদ্ধ ছিলো যে, তিনি হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার করে বলতেন— لبيك يا اختى لبيك يا اختى 'আমার বোন! আমি উপস্থিত। আমার বোন! আমি উপস্থিত।' একপর্যায়ে তিনি মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে রাজা দাহিরের এলাকায় পৌঁছেন এবং রাজা দাহিরের সুসজ্জিত সৈন্যদের ছিন্নভিন্ন করে দেন। তিনি রাজা দাহিরকে পরাস্ত করেই ক্ষান্ত হননি বরং নিজের আস্থাভাজনকে সেখানকার স্থলাভিষিক্ত করে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। এমনকি তিনি সিন্ধু থেকে মুলতান পর্যন্ত ইসলামের বিজয়ী কেতন উড্ডীন করেন।
আজ আমাদের যুবকদের মধ্যে যদি এমন চেতনা বিরাজ করতো, তাহলে পৃথিবীর কোনো অপশক্তিই আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকাবার সাহস পেতো না। সুতরাং আমাদের শ্রম ও মেহনতকে কাজে লাগাতে হবে। আরাম-আয়েশের জীবন মূলত সফলতার জীবন নয় বরং সফল জীবন তো হলো চেষ্টা-মুজাহাদা ও কর্মময় জীবন।
টিকাঃ
৩৩. মুহাম্মদ ইবনে কাসিম ছিলেন সিন্ধু-বিজেতা। ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক-এর ইনতিকাল পর তিনি জুলুমের শিকার হন। এবং সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক-এর যামানায় তাঁকে শহিদ করে দেয়া হয়। তারিখে মিল্লাত, ১/৬৩৮।