📄 ফতওয়া পড়তে পড়তে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে গেলেন
দারুল উলুম দেওবন্দের এক মুফতি সাহেবের জীবনালেখ্য পাওয়া যায় যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বুকের উপর একটি ফতওয়ার কাগজ পাওয়া গিয়েছিলো। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ফতওয়া পড়ছিলেন। ফতওয়া পড়া অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আর ফতওয়ার কাগজটি তাঁর হাত থেকে বুকের উপর পড়ে যায়।
আমাদের আকাবিরে দীন এভাবেই সময়কে গনিমত মনে করতেন। ইবাদতের মাধ্যমে সময়কে ব্যয় করতেন।
📄 এমনও জ্ঞানপিপাসু ছিলো তখন
হযরত শাহ আবদুল কাদের রায়পুরি রহ. বলেন, আমি ভর্তির জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে গেলাম। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর নাযেমে তালিমাত সাহেবের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, ভর্তি বন্ধ হয়ে গেছে। আমি হযরতকে খুব বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলাম, 'হযরত! আমি কী জানতে পারি ভর্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ কী?' নাযেম সাহেব আমাকে বললেন, 'আসলে আমাদের এখানে ছাত্রদের কোনো বোডিং-এর ব্যবস্থা নেই। গ্রামবাসী যে ক'জন ছাত্রের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে, সে ক'জন ছাত্রকেই ভর্তি করি। অন্যদের ফিরিয়ে দিই।' তখন আমি বললাম, 'হযরত! আমার খাবারের দায়িত্ব যদি আমার নিজের উপর থাকে, তাহলে কী আমি ভর্তি হতে পারবো?' তিনি বললেন, 'তাহলে ঠিক আছে।'
অবশেষে আমি ভর্তি হলাম। আর আমি সারাদিন ক্লাস করতাম, রাতে তাকরার করতাম। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়তো, তখন আমি পাশের বস্তিতে অবস্থিত বাজারে যেতাম। বাজারের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে আমের খোসা, তরমুজের খোসা পাওয়া যেতো। আমি সেগুলো কুড়িয়ে এনে ভালো করে পরিষ্কার করে খেয়ে ফেলতাম। এরপর সারাদিন ক্লাস করতাম। এটাই ছিলো আমার সারাদিনের খাবার। এভাবে আমি সারাবছর অতিবাহিত করলাম। কিন্তু কোনোদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতাম না।
টিকাঃ
৩২. তাঁর জন্মের ব্যাপারে সঠিক কোনো তারিখ পাওয়া যায় না। তবে ধারণা মুতাবিক হযরত আলি মিয়া নদবি রহ. লিখেছেন, ১২৯০ হিজরি সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা-মাতা তাঁর নাম রাখেন গোলাম জিলানি। কিন্তু তাঁর মুরশিদ তার নাম রাখেন আবদুল কাদের। লাহোরে তিনি ইনতিকাল করেন। জুমার দিন সুবহেসাদিকের সময় তাকে সমাহিত করা হয়। - سواغ رائے پوری
📄 চিঠির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করতাম না
শাহ আবদুল কাদের রায়পুরি রহ.-এর আত্মজীবনীতে লিখেছেন—ছাত্র জীবনে যখন বাড়ি থেকে কোনো চিঠি আসতো, তখন তা খুলতাম না। কারণ, ভাবতাম যদি চিঠিতে কোনো খুশির খবর থাকে তাহলে বাড়ি যেতে মন চাইবে। পক্ষান্তরে যদি কোনো দুঃখের খবর থাকে তাহলে পড়ালেখায় মন বসবে না। ফলে আমি ইলম থেকে বঞ্চিত হবো।
এভাবে সারাবছরের চিঠিগুলো জমা করে রাখতাম। অবশেষে শাবান মাসে বার্ষিক পরীক্ষার পর যখন অবসর হতাম, তখন সব চিঠিগুলো খুলে পড়তাম এবং এর একটা ফিরিস্তি তৈরি করতাম। যখন বাড়িতে যেতাম তখন খুশির সংবাদদাতাকে অভিনন্দন জানাতাম আর দুঃখের সংবাদদাতাকে সান্ত্বনা দিতাম। ফলে সবাই আমার উপর খুশি হয়ে যেতেন। কিন্তু তাদের তো আর এটা জানা ছিলো না যে, আমি তাদের চিঠি সবেমাত্র পড়েছি।
পৃথিবীতে যারা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁরা ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে এমনই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু বর্তমানে ছাত্রদের তো পড়াশোনার চেয়ে বাইরের কথাবার্তা শোনার প্রতি আগ্রহ বেশি। তাকরার করতে বসলে তাকরারের কথা শোনার চেয়ে বাইরের কথা বেশি শোনে। এমননকি তাকরারে বসে তো দেশের রাজনীতির সব ফয়সালাও হয়ে যায়। এর কারণ হলো—অনর্থক কথাবার্তার মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে ইলম থেকে বঞ্চিত করতে চায়।
📄 যে কলমের বিশ্রাম নেই
এক মুহাদ্দিস সাহেবের জীবনীতে পাওয়া যায়, তিনি তাঁর জীবনে এ পরিমাণ কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন যে, যদি তাঁর গোটা জীবনের দিনগুলো হিসাব করা হয়, আর তাঁর রচিত কিতাবগুলোর পৃষ্ঠা গণনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, প্রতিদিন গড়ে দশপৃষ্ঠা করে লেখা হয়েছে। অথচ এটা কোনো মামুলি বিষয় ছিলো না।
জন্মের পর থেকেই তো আর মানুষ লিখতে পারে না। বরং বারো/তেরো বছর জ্ঞানার্জনের পর থেকে হয়তো লেখেন। সুতরাং জ্ঞানার্জনের এ বছরগুলো যদি বাদ দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে দশের পরিবর্তে প্রতিদিন বিশপৃষ্ঠা হয়ে যাবে। আমাদের দ্বারা বিশপৃষ্ঠা লেখা তো দূরের কথা বিশপৃষ্ঠা ভালোভাবে বুঝে পড়াই তো অসম্ভব। যারা লেখক, তারা হয়তো জানেন যে, দিনে একপৃষ্ঠা লেখা কতো কঠিন। সুতরাং চিন্তা করুন, তাঁরা কী পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন।