📄 অন্তিম মুহূর্তেও ইলমের প্রতি আকর্ষণ
হযরত আবু ইউসুফ রহ. যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তাঁর এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন—'আরোহী অবস্থায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা উত্তম নাকি পায়ে হাঁটা অবস্থায়?' ছাত্র বললো—'আরোহী অবস্থায়।' তিনি বললেন—'না।' তখন ছাত্র আবার বললো—'পায়ে হাঁটা অবস্থায়।' তিনি তখনও বললেন—'না।' এরপর জিজ্ঞাসা করলেন—'আরোহী অবস্থায় কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করা উত্তম আর পায়ে হেঁটে কখন উত্তম?' এ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করতে করতে মৃত্যুবরণ করেন।
মুমূর্ষু অবস্থায় এ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করার কারণ কী? ওলামায়েকেরাম এ প্রশ্ন করেছেন আবার এর জবাবও লিখেছেন। মুমূর্ষু অবস্থায় শয়তান মানুষের কাছে আসে। হয়তো তাঁর কাছেও অভিশপ্ত শয়তান এসেছিলো। যখন তিনি শয়তানকে দেখতে পান তখন মাসআলা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। এ মাসআলার অসিলায় হয়তো আল্লাহ তাআলা তাঁকে শয়তানের ধোঁকা থেকে রক্ষা করেছেন।
📄 যে পথের পথিক আমরা
হযরত বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর ব্যাপারে হযরত জুনাইদ বাগদাদি রহ. বলেন—'আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে যেমন অন্যসকল ফেরেশতাদের উপর মর্যাদাবান করেছেন, তদ্রুপ হযরত বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-কেও আওলিয়াকেরামের উপর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেছেন।'
হযরত জুনাইদ বাগদাদি রহ. আরো বলেন— 'বোস্তামি রহ. যখন শৈশবে পিতাকে হারান, তখন তার মা তাঁকে মাদরাসায় ভর্তি করেন এবং শিক্ষককে বলেন, 'আমার সন্তানকে আপনার নিকটেই রাখবেন। বাড়িতে বেশি যেতে দেবেন না। কারণ, এর দ্বারা তার ইলম থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'
বোস্তামি রহ. এভাবে মাদরাসায় থাকতে লাগলেন। একদিন হঠাৎ মায়ের কথা খুব মনে হলো। মা'কে দেখতে ইচ্ছা হলো। তিনি শিক্ষকের নিকট বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। শিক্ষক বললেন—'যদি তুমি এ পরিমাণ সবক শোনাতে পারো, তাহলে ছুটি পাবে।' তিনি ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। শিক্ষকের নির্ধারিত পরিমাণ সবক শুনিয়ে দিয়ে ছুটি পেলেন। বাড়িতে গিয়ে দরজায় নক করলেন। তখন তাঁর মা অযু করছিলেন। মা জিজ্ঞাসা করলেন—'কে?।' তিনি বললেন—'আমি বায়েজিদ।' মা বললেন—'আমারও একটি ছেলে আছে। তার নামও বায়েজিদ। আমি তাকে আল্লাহর রাস্তায় অর্পণ করেছি। তাহলে তুমি কোন বায়েজিদ?' বালক বায়েজিদ রহ.-এর বুঝতে আর বাকি রইলো না যে, আমি দরজায় কোনো শব্দ করি, এটা মা চান না। বরং মা চান আমি মাদরাসায় ফিরে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। তিনি সোজা মাদরাসায় ফিরে গেলেন। এরপর তিনি 'বায়েজিদ বোস্তামি' হওয়ার আগ পর্যন্ত মাদরাসা থেকে আর কোথাও যাননি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে যামানার বায়েজিদ বানিয়েছিলেন।
📄 ইলমের তৃষ্ণায় জেলখানায় অবস্থান
হযরত ইমাম তাইমিয়া রহ-এর জীবনীতে পাওয়া যায়। একবার তৎকালীন সময়ের বাদশাহ তাঁর নিকট কোনো বিষয়ের ফতওয়া চাইলেন। কিন্তু তিনি ফতওয়া দেন নি। ফলে বাদশাহ তাঁকে জেলখানায় বন্দী করেন।
এরপর জেলখানায় কেটে গেলো টানা তিনটি দিন। একদিন বাদশাহ সিংহাসনে বসে আছেন। এমন সময় রাজদরবারে কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করলো এক তালেবে ইলম। সে ছিলো সুন্দর, সুদর্শন যুবক। তার চেহারায় ছিলো মায়াবি ছাপ। তাকে দেখামাত্র রাজদরবারে উপস্থিত সকলেরই মায়ার উদ্রেক হলো। এমনকি রাজার মনেও তার প্রতি মায়া জন্মালো। রাজা তাকে অভয় দিয়ে বললেন—'হে যুবক! তুমি কাঁদছো কেনো? তুমি এভাবে কেঁদো না। এখানে তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি কী চাও বল, আমি তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করবো।'
বাদশাহর অভয়বাণী শুনে যুবক বললো—'বাদশাহ সালামত! আপনি আমাকে জেলখানায় বন্দী করুন।' তার কথা শুনে বাদশাহ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন—'জেলখানায় যাওয়ার জন্য তুমি এমন উৎসুক কেনো?' যুবক বললো—'আজ তিনদিন হলো আপনি আমার উস্তাদকে জেলখানায় বন্দী করে রেখেছেন। যার ফলে আমি আমার উস্তাদের নিকট থেকে সবক পড়তে পারছি না। আপনি যদি আমাকে জেলখানায় বন্দী করেন, তাহলে আমি সেখানে আমার উস্তাদের নিকট থেকে সবক পড়তে পারবো। কারাবরণ করার কষ্ট আমার কাছে কোনো কষ্টই মনে হবে না।'
এ তালিবুল ইলম ছিলো হযরত তাইমিয়া রহ.-এর ছাত্র। কিন্তু আফসোস! বর্তমানে এমন দৃশ্য দেখা যায় না। এমন চরিত্র আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছে। আমাদের সম্পর্ক বর্তমানে টিভি ও ছবির সঙ্গে। কুরআনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কুরআন খুলে দেখার সময়ও আমাদের নেই। কিছু পরিবার তো এমন রয়েছে, যাদের কুরআন শরিফ খুলে দেখার সময়ই হয় না।
📄 ইলমের পিপাসা এমনও হয়?
হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. যখন শেষ বয়সে উপনীত হলেন, তখন একদিন তাঁর ছেলে হযরত শাহ আবদুল আজিজ রহ. ক্লাসে পাঠ দান করা অবস্থায় পানি চাইলেন। একছাত্র দৌড়ে তাঁর ঘরে গিয়ে বললো, শাহ সাহেব পানি চেয়েছেন। তখন শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ. বললেন, আফসোস! আমার বংশ থেকে ইলম উঠে গেছে। তখন তাঁর স্ত্রী বললেন, আপনি একথা বলার ব্যাপারে এতো ত্বরা করবেন না। আগে বাস্তব অবস্থা পরীক্ষা করে দেখি। এরপর তিনি পানির গ্লাসে কিছু সিরকা মিশিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। সিরকা সাধারণত তিক্ত ও ভিন্ন স্বাদের হয়ে থাকে। যা পানির স্বাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানির গ্লাস শাহ আবদুল আজিজ রহ.-এর হাতে দেয়ার পর তিনি তা পান করলেন। তারপর ক্লাস শেষ হওয়ার পর যখন ঘরে এলেন, তখন তাঁর মা জিজ্ঞাসা করলেন, 'বেটা! তুমি যে পানি পান করেছো, তার স্বাদ কেমন ছিলো? তিনি বললেন, 'মা! তা তো বলতে পারবো না।' তখন মা, বাবার কাছে গিয়ে বললেন, 'দেখলেন তো! আবদুল আজিজ ইলমের প্রতি গাফলতির কারণে পানি পান করেনি বরং সে তীব্র পানির পিপাসার কারণেই পানি পান করেছে। যা তার আসলেই প্রয়োজন ছিলো। অন্যথায় হয়তো সে ক্লাস করাতে পারতো না। সুতরাং আমাদের বংশ থেকে এখনো ইলমের আদব উঠে যায়নি।' তখন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. একটি তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন এবং দোয়া করলেন—'হে আল্লাহ! তুমি আমার বংশে সর্বদা ইলম ও ইলমের আদব জারি রেখো।'