📄 ইলমের আকর্ষণে ঘুম উড়ে যায়
ইমাম মুহাম্মদ রহ. ছিলেন ইমাম শাফি রহ.-এর উস্তাদ। ইমাম শাফি রহ. বলেন—'একবার আমার উস্তাদ ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর কাছে রাত্রি যাপনের সুযোগ হয়েছিলো। আমি দেখলাম, তিনি ইশার নামাযের পর বাতি জ্বালিয়ে কিছু সময় কিতাব অধ্যয়নের পর শুয়ে পড়লেন। এরপর কিছু সময় পরে তিনি উঠে বাতি জ্বালিয়ে কিছু সময় পড়লেন এবং বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন। আমি সারারাত জেগেছিলাম। আমি দেখলাম তিনি সারারাতে সতেরো বার বিছানা থেকে উঠলেন এবং বাতি জ্বালিয়ে কিছু সময় কিতাব পড়ে আবার বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন।'
ইমাম শাফি রহ. বলেন— 'আমি সকালে হযরতকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'হযরত! আপনি সারারাতে সতেরো বার জাগ্রত হয়েছেন। তাহলে ঘুমিয়েছেন কখন?' আমার প্রিয়শায়েখ তখন বললেন—'আমি তো রাতে ঘুমাইনি। বরং সারারাতে এক হাজার মাসআলার সমাধান বের করেছি।' আল্লাহু আকবার! এখন চিন্তা করুন তাঁর অবস্থা। আর তিনি যে বারে বারে বাতি নিভিয়ে দিচ্ছিলেন, এর কারণ হলো—যাতে অযথা তেল না ফুরায়। অপচয় থেকে বাঁচা যায়।
📄 জ্ঞানার্জনের মেহনত
আমাদের পূর্বসূরিগণ এ ইলম অর্জনের জন্য এতো পরিশ্রম করেছেন যে, আজ আমরা তাঁদের পরিশ্রম ও কীর্তি শুনে বিস্মিত হই। চিন্তা করা যায়! ইমাম শাফি রহ. মাত্র তেরো বছর বয়সে 'ইমাম' হয়েছিলেন। তেরো বছর বয়সে কুরআন-হাদিছের জ্ঞানার্জন করে মানুষকে হাদিছের দরস প্রদান করেছিলেন। এ ছিলো তাঁদের ইলম অর্জনের মেহনত। ঐকান্তিক চেষ্টার ফলেই তাঁরা জ্ঞানের সমুদ্রে পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
📄 অন্তিম মুহূর্তেও ইলমের প্রতি আকর্ষণ
হযরত আবু ইউসুফ রহ. যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তাঁর এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন—'আরোহী অবস্থায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা উত্তম নাকি পায়ে হাঁটা অবস্থায়?' ছাত্র বললো—'আরোহী অবস্থায়।' তিনি বললেন—'না।' তখন ছাত্র আবার বললো—'পায়ে হাঁটা অবস্থায়।' তিনি তখনও বললেন—'না।' এরপর জিজ্ঞাসা করলেন—'আরোহী অবস্থায় কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করা উত্তম আর পায়ে হেঁটে কখন উত্তম?' এ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করতে করতে মৃত্যুবরণ করেন।
মুমূর্ষু অবস্থায় এ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করার কারণ কী? ওলামায়েকেরাম এ প্রশ্ন করেছেন আবার এর জবাবও লিখেছেন। মুমূর্ষু অবস্থায় শয়তান মানুষের কাছে আসে। হয়তো তাঁর কাছেও অভিশপ্ত শয়তান এসেছিলো। যখন তিনি শয়তানকে দেখতে পান তখন মাসআলা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। এ মাসআলার অসিলায় হয়তো আল্লাহ তাআলা তাঁকে শয়তানের ধোঁকা থেকে রক্ষা করেছেন।
📄 যে পথের পথিক আমরা
হযরত বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর ব্যাপারে হযরত জুনাইদ বাগদাদি রহ. বলেন—'আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে যেমন অন্যসকল ফেরেশতাদের উপর মর্যাদাবান করেছেন, তদ্রুপ হযরত বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-কেও আওলিয়াকেরামের উপর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেছেন।'
হযরত জুনাইদ বাগদাদি রহ. আরো বলেন— 'বোস্তামি রহ. যখন শৈশবে পিতাকে হারান, তখন তার মা তাঁকে মাদরাসায় ভর্তি করেন এবং শিক্ষককে বলেন, 'আমার সন্তানকে আপনার নিকটেই রাখবেন। বাড়িতে বেশি যেতে দেবেন না। কারণ, এর দ্বারা তার ইলম থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'
বোস্তামি রহ. এভাবে মাদরাসায় থাকতে লাগলেন। একদিন হঠাৎ মায়ের কথা খুব মনে হলো। মা'কে দেখতে ইচ্ছা হলো। তিনি শিক্ষকের নিকট বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। শিক্ষক বললেন—'যদি তুমি এ পরিমাণ সবক শোনাতে পারো, তাহলে ছুটি পাবে।' তিনি ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। শিক্ষকের নির্ধারিত পরিমাণ সবক শুনিয়ে দিয়ে ছুটি পেলেন। বাড়িতে গিয়ে দরজায় নক করলেন। তখন তাঁর মা অযু করছিলেন। মা জিজ্ঞাসা করলেন—'কে?।' তিনি বললেন—'আমি বায়েজিদ।' মা বললেন—'আমারও একটি ছেলে আছে। তার নামও বায়েজিদ। আমি তাকে আল্লাহর রাস্তায় অর্পণ করেছি। তাহলে তুমি কোন বায়েজিদ?' বালক বায়েজিদ রহ.-এর বুঝতে আর বাকি রইলো না যে, আমি দরজায় কোনো শব্দ করি, এটা মা চান না। বরং মা চান আমি মাদরাসায় ফিরে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। তিনি সোজা মাদরাসায় ফিরে গেলেন। এরপর তিনি 'বায়েজিদ বোস্তামি' হওয়ার আগ পর্যন্ত মাদরাসা থেকে আর কোথাও যাননি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে যামানার বায়েজিদ বানিয়েছিলেন।