📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 সে দারুল উলুমের ছাত্র নয়

📄 সে দারুল উলুমের ছাত্র নয়


দারুল উলুমের শুরু লগ্নের দায়িত্বশীলদের মধ্যে একজন ছিলেন শাহ রফিউদ্দিন সাহেব। তিনি ছিলেন সুফি। তিনি সবসময় ইবাদত-বন্দেগি আর যিকিরে মশগুল থাকতেন। একদিন তিনি অযু করতে পুকুরে গেলেন। তখন এক ছাত্র ডাল ভরতি একটি পাত্র নিয়ে এসে বললো— ‘দেখুন! দারুল উলুমের দায়িত্ব আপনার হাতে থাকাকালে মাদরাসায় এমন ডাল রান্না করা হয় যে, তা দ্বারা অযু করা যাবে।’ একথা বলে ছাত্রটি ডালের পাত্রটি হাত থেকে ফেলে দিলো।

তারপর সেই ছাত্রকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ ঘটনা সম্পর্কে যখন অন্যান্য উস্তাদবৃন্দ অবগত হলেন, তখন তাঁরা খুবই লজ্জিত হলেন এই ভেবে যে, এতোবড়ো দুঃসাহস কার, যে হযরতের সাথে এমন বেয়াদবি করেছে। তারপর শিক্ষকরা হযরতের সঙ্গে দেখা করে বললো— ‘হযরত! আমরা আসলেই খুবই লজ্জিত যে, একজন ছাত্র এমনটি করেছে।' তখন রফিউদ্দিন সাহেব বললেন—'সে ছাত্র নয়।' তারপর শিক্ষকরা ভাবলেন, হযরত যেহেতু বলছেন সে ছাত্র নয় তাহলে মাদরাসার বোর্ডিংএ খোঁজ নিলে তার সন্ধান পাওয়া যাবে। কারণ, বোর্ডিং-এর খাতায় সকল ছাত্রদের নাম আছে। বোর্ডিং এর খাতায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো সেখানে তার নাম আছে। এরপর শিক্ষকরা আবার হযরতের কাছে এসে বললেন—'হযরত! বোর্ডিং-এর খাতায় তো তার নাম আছে।' তখনো হযরত বললেন—'না, সে মাদরাসার ছাত্র হতে পারে না।' এরপর শিক্ষকরা চিন্তা করলেন, তাহলে ক্লাসের হাজিরাখাতা দেখলে হয়তো বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাই তারা ক্লাসের হাজিরা খাতা দেখলেন যে, সেখানেও তার নাম আছে। কিন্তু সে ক্লাস করে না। মাঝে মাঝে তার ঘনিষ্ঠ অন্যকোনো ছাত্র তার হাজিরা দিয়ে দেয়। সে শুধু খানা খাওয়ার সময় খাওয়ার জন্য এখানে আসে।

এটা দেখে উস্তাদগণ আরো বেশি অনুতপ্ত হলেন। চিন্তা করলেন, আমরা এখানে সর্বদা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে আছি। তা সত্ত্বেও এমন বেয়াদব ছাত্রকে চিনতে পারলাম না। অথচ হুজুর মাঝে মাঝে মাদরাসায় আসেন। এরপরও তাকে চিনতে পারলেন। তারপর তাঁরা হযরতের কাছে গিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন এবং বললেন—'হযরত! আমরা এখানে সবসময় থেকেও তাকে চিনতে পারলাম না। আর আপনি সবসময় না থেকেই তাকে চিনতে পারলেন। এর কারণ কী?' তখন শাহ সাহেব বললেন— 'যখন আমি এখানের দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন স্বপ্নে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ লাভ করি। তিনি একটি পানির বালতি হাতে দাঁড়িয়ে মাদরাসার সকল ছাত্রকে বালতি থেকে পানি ভরে দিচ্ছিলেন। তখন সেসকল ছাত্রদের মাঝে আমি এ ছাত্রটিকে দেখিনি। তাই আমি তাকে চিনতে পেরেছি যে, সে দারুল উলুমের ছাত্র নয়।'

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 যে গমের বরকত আজো অব্যাহত

📄 যে গমের বরকত আজো অব্যাহত


হযরত খাজা মুহাম্মদ আবদুল মালেক কুরাইশি রহ. নিজেকে বকওয়াল বলতেন। অনেক বড়ো শায়েখ ছিলেন। তিনি এ ঘটনা মসজিদে বসে অযুর সাথে শুনিয়েছিলেন। আর এ অধম মসজিদে বসে অযুর সাথে শুনেছি। এখন মসজিদে বসে অযুর সাথে আপনাদের শোনাচ্ছি পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে। শব্দে একটু পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু মর্মে একটুও পরিবর্তন হবে না।

তিনি বলেছিলেন, আমি শায়েখের ছাগল চরাতাম আর আল্লাহ আল্লাহ করতাম। ছাগলগুলো নিজেরাও চরত আর আমিও ঘাস কেটে সেগুলো খাওয়াতাম। সন্ধ্যায় যখন ছাগলগুলো নিয়ে আসতাম, তখনো কিছু ঘাস আমি মাথায় করে আনতাম। আমার বন্ধুরা শায়েখের মজলিসে বসতেন আর আমি শায়েখের ছাগল চরাতাম। একবার হযরত খাজা ফজল আলি কুরাইশির কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা হলো, তুমি আবদুল মালেককে খেলাফত দিয়ে দাও। তিনি বলেন, যখন খেলাফত দেয়া হলো, তখন আমি অবাক হয়ে গেলাম যে, আমি তো এর উপযুক্ত নই। এক-দু ঘণ্টা শুধু কাঁদতেই ছিলাম। অন্যান্য খলিফাগণ এ বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা যখন একটি দায়িত্ব দিয়েছেন, তখন তা বহন করার শক্তিও দিবেন। তিনি বলেন, আমি মনে মনে এরাদা করে ফেললাম যে, আমি তো এর উপযুক্ত নই, তবুও হযরত আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। যেহেতু আর কাউকে সেটা দেয়ার মতো যোগ্যতা রাখি না, তাই আমি কাউকে বাইয়াত করবো না। এভাবে হযরতের খেদমতে একবছর অতিবাহিত হয়ে গেলো।

একবার শীত-মৌসুমে তিনি আগুন পোহাচ্ছিলেন। আমার দিকে গোস্বার সাথে তাকালেন। হযরতের এরকম দৃষ্টি দেখে আমার অবস্থা তো কাহিল, যেনো আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হযরত! সব ঠিক ঠাক আছে তো?' তিনি বললেন, 'এইমাত্র কাশফের মাধ্যমে আমি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছি। তিনি বলছিলেন, আবদুল মালেককে বলো, সে যেনো তাকে দেয়া নিয়ামত মানুষের মধ্যে বণ্টন করে। তা না হলে আমি তার নিয়ামত ছিনিয়ে নেবো। এ আদেশ যেহেতু মাহবুবের পক্ষ থেকে এসেছে, তুমি আর দেরি করো না। রাতের আধার শেষ হওয়ার আগে-আগে বিছানাপত্র নিয়ে বাড়িতে চলে যাও। সেখানে গিয়ে লোকদেরকে আল্লাহ, আল্লাহ শেখাও।' আমি তো কাঁদতেই ছিলাম, হযরত নিজেই আমার ছামানাপত্র এনে আমার মাথায় তুলে দিয়ে বললেন, 'যাও, বাড়িতে চলে যাও।' আমি বললাম, 'হযরত! আমি এখনো কোনো কাজের নই? এতো বছর জিকির-আজকারে কাটিয়ে দিয়েছি। দুনিয়ার কোনো কাজই শিখিনি। আমার জন্য আপনি রিযিকের দোয়া করুন।' তিনি বললেন— إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।'

আমার আত্মীয়-স্বজনেরা আমার বিয়ের জন্য আগে থেকে আমার এক আত্মীয়ের মেয়ে নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। সুতরাং বাড়িতে আসতেই তারা আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেললেন। বিয়ে হয়ে গেলো। কিন্তু প্রায় সময় ঘরে খাবারের কোনো ব্যবস্থা থাকতো না। তবে স্ত্রী ছিলেন বেশ ধৈর্যশীল। সে বলতো, 'আপনি গাছের পাতা নিয়ে আসুন, আমরা তা-ই খাবো।' আমি তা-ই নিয়ে আসতাম। আর দু'জনে সেগুলো খেয়ে দিন কাটিয়ে দিতাম।

একদিন আমার এক পিরভাই আমার বাড়িতে আসলেন। তিনি হযরতের খানকায় গিয়েছিলেন। ওখান থেকে ফেরার সময় হযরত তাঁকে দশ কিলো ওজনের একটি গমের থলে দিয়েছিলেন। আর সাথে একটি চিঠি দিয়ে বলেছেন, 'এগুলো আবদুল মালেকের কাছে পৌঁছে দিও।' তিনি দুপুরের সময় আমার বাড়িতে পৌঁছে দরজার কড়া নাড়লেন। আমি দরজা খুলে তার সাথে কুশলাদি বিনিময় করলাম। হাতে গমের থলে দেখে আমি মনে করলাম, উনি হয়তো খানকায় যাবেন। খানকার জন্যই হয়তো গম নিয়ে আসছেন।

এরপর আমি ঘরে গিয়ে আমার স্ত্রীকে বললাম, 'মেহমানের জন্য খানাপিনার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কী?' স্ত্রী বললো, 'ঘরে তো খাবার কিছুই নেই।' তবে আমার স্ত্রী ছিলো বুদ্ধিমতী। সে বললো, 'আপনি এক কাজ করুন, উনি খানকা শরিফের লঙ্গরখানার জন্য যে গম নিয়ে আসছেন, তার অনুমতি নিয়ে সেখান থেকে কিছু গম নিয়ে আসুন। আমি পিষে রুটি বানিয়ে দিই। এতে শরমের কী আছে? গিয়ে বলে দেখুন।' আমি গিয়ে তার অনুমতি নিয়ে সেখান থেকে কিছু গম নিয়ে রুটির ব্যবস্থা করলাম। খাবার শেষে মেহমানকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। ঘুম থেকে উঠে তিনি আমাকে একটি চিঠি দিয়ে বললেন, 'এটা হযরত দিয়েছেন।' তখন বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার হলো। বুঝতে পারলাম, হযরত এ গম অধমের জন্যই পাঠিয়েছেন। চিঠিটি খুলে পড়লাম। তাতে লেখা আছে—'আবদুল মালেক! তুমি আল্লাহ আল্লাহ কর এবং আল্লাহ আল্লাহ করাও। এ গমগুলো শক্ত কোনো বন্ধ পাত্রে রেখে দেবে। আর পাত্রের নিচে ছিদ্র করে সেখান থেকে গম বের করে ব্যবহার করবে। এটা তোমার লঙ্গরখানার জন্য। নিচে লেখা ছিলো— إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।'

আমার স্ত্রী গমগুলো একটি শক্ত বন্ধপাত্রে রেখে দিলো। ভালোভাবে ঢাকনা বন্ধ করে দিলো। আর নিচের দিক থেকে একটি ছিদ্র করে নিলো। প্রয়োজনমতো সেখান থেকে গম নিয়ে রুটি বানাতো। আলহামদুলিল্লাহ! এ গম আমরা এখনো চল্লিশ বছর যাবৎ ব্যবহার করছি। এখনো আমার খানকাতে দু'তিন শ' মানুষ সবসময় থাকে। এ গম থেকেই সকলের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। বছরের শেষে হাজারের অধিক মানুষ হয়। তাদের খানাও সেই গম থেকে ব্যবস্থা করা হয়। চল্লিশ বছর ধরে এভাবেই সেই গম আমরা ব্যবহার করে আসছি।

টিকাঃ
২৭. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/১৭৯।

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 ইমাম শাফি রহ.-এর জ্ঞানের পূর্ণতা

📄 ইমাম শাফি রহ.-এর জ্ঞানের পূর্ণতা


ওলামায়েকেরামের মাঝে যেসকল মহা মনীষী অল্প বয়সে জ্ঞানের অমীয় সুধা পান করেছেন, ইমাম শাফি রহ. তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর জীবনী-গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে যামানার ইমাম শাফি হয়েছিলেন। সেই বয়সেই তিনি পবিত্র কুরআনের দরস দান করতেন এবং পাকা চুলবিশিষ্ট শায়েখরা তাঁর দরসে বসতেন। একবার তিনি দরসদান কালে দু'টি চড়ুই পাখি লড়াই করতে করতে তাঁর সামনে এসে পড়লো। তাঁর বয়স কম হওয়ায় তিনি শিশুসুলভ আচরণ করে ফেললেন। তিনি পাগড়ি খুলে পাখি দু'টির উপর রেখে দিলেন। কিন্তু এ কাজটি দরসে অংশগ্রহণকারী বৃদ্ধ শায়েখদের পছন্দ হলো না। তাঁরা চিন্তা করলেন যে, এটা কুরআনের দরসের আদবের পরিপন্থী।

তখন তিনি পাগড়ি মাথায় বেঁধে বললেন— الصَّبِيُّ صَبِيٌّ وَلَوْ كَانَ نَبِيٌّ. 'শিশু সে তো শিশুই যদিও সে নবি হয়' ।

একথা শোনার পর শায়েখগণ বুঝতে পারলেন যে, বয়সের স্বল্পতার দরুন তিনি এমনটি করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px