📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 আল্লাহর উপর ভরসায় খোদায়ি সাহায্য

📄 আল্লাহর উপর ভরসায় খোদায়ি সাহায্য


ইলম ও জ্ঞানার্জনের জন্য আমাদের পূর্বসূরি মনীষীগণ অনেক ত্যাগ-তীতিক্ষা ও কষ্ট স্বীকার করেছেন। তখন কোনো কিছু এতোটা সহজ ছিলো না। উদাহরণস্বরূপ হযরত সুফিয়ান সাওরি রহ. ও তাঁর দু' সাথির ঘটনা বর্ণনা করছি।

হযরত সুফিয়ান সাওরি রহ. ও তাঁর দু'জন সঙ্গী ইলম অর্জনের জন্য একজন মুহাদ্দিস-এর শরণাপন্ন হলেন। সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন—'আমাদের কাছে আহারের জন্য ছাতু ছিলো। আমরা অল্প অল্প করে প্রতিদিন সে ছাতু আহার করতাম। কিন্তু আমাদের সবক শেষ হওয়ার তিনদিন আগে ছাতু শেষ হয়ে গেলো। তখন আমরা তিনজন পরামর্শ করলাম যে, আমাদের থেকে দু'জন দরসে উপস্থিত হবো। আর বাকি একজন পরিশ্রমের মাধ্যমে খাবারের সংগ্রহে যাবে।

এরপর আমরা দু'জন পূর্বপরামর্শ অনুযায়ী দরসে চলে গেলাম। আর যার উপর সেদিন খাবার আঞ্জামের দায়িত্ব ছিলো বাজারে না গিয়ে মসজিদে চলে গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন, মানুষের মজদুরি করে কী লাভ হবে। তারচে' আল্লাহর মজদুরি করি। কাজের অসিলায় খাবারের ব্যবস্থা না করে মাওলার মজদুরির মাধ্যমে কোনো অসিলা ছাড়াই দেখি খাবার পাওয়া যায় কিনা।

সুতরাং তিনি সারাদিন মসজিদে নফল ইবাদত-বন্দেগি ও দোয়া করে কাটিয়ে দিলেন। সন্ধ্যায় ফিরে আসার পর আমরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম—'কী ভাই! খাবারের কোনো ব্যবস্থা হয়েছে?' তিনি বললেন—'আমি সারাদিন এমন একজন মালিকের মজদুরি করেছি যিনি পরিপূর্ণ হিসাব রাখেন। সুতরাং যথাসময়ে খাবার চলে আসবে।' তাঁর কথা শুনে সকলেই সন্তুষ্ট হলেন।

এরপর দ্বিতীয় দিন আরেকজনের পালা এলো। তিনিও আগের জনের মতো চিন্তা করে মসজিদে গিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করতে লাগলেন। আর দোয়া করতে লাগলেন। সন্ধ্যায় ফিরে আসার পর বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করলে, তিনিও আগেরজনের মতো উত্তর দিলেন—'আমি এমন মালিকের কাজ করেছি যিনি পরিপূর্ণ পাওনা পরিশোধ করেন। তিনি পাওনা পরিশোধ করার ব্যাপারে ওয়াদা করেছেন।' কথা শুনে সকলে খুশি হলেন।

তৃতীয় দিন অপরজনের পালা এলো। তিনিও পূর্বের দু'জনের মতোই করলেন। আল্লাহর কী শান! তৃতীয় দিন সেখানকার বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন যে, একটি ভূতের আকৃতিতে তার উপর হাত উঠিয়ে কেউ তাকে বলছে—'সুফিয়ান সাওরি ও তাঁর দু' সাথির খোঁজ নাও।' এরপর বাদশাহ ঘুম থেকে উঠে কর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন—'যাও, সুফিয়ান সাওরি নামের ব্যক্তি ও তাঁর দু' সঙ্গীকে খুঁজে বের কর। থলি ভরতি দিরহাম-দিনার দিয়ে বললেন, তাঁদের পাওয়ামাত্রই এ থলি প্রদান করবে। এবং আমাকে তাঁদের খবর সম্পর্কে অবহিত করবে। আমি তাঁদের জন্য রাজকোষাগার উন্মুক্ত করে দেবো।

এদিকে তাঁদের সবক শেষ হয়ে গেলো, অপরদিকে বাদশাহর কর্মচারীরাও তাঁদেরকে খুঁজতে খুঁজতে মসজিদে এসে হাজির হলো। জিজ্ঞাসা করলো—'এখানে সুফিয়ান সাওরি নামে কেউ আছেন? বর্তমান বাদশাহ আমাদের পাঠিয়েছেন। তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছেন। সে স্বপ্নের আদেশ রক্ষার্থেই আমরা এখানে এসেছি।' তখন সুফিয়ান সাওরি রহ. ও তাঁর সাথিরা পরামর্শ করলেন যে, আমাদের সামনে এখন দু'টি দরজা খোলা আছে। এক. আল্লাহর দরজা। দুই. বাদশাহর দরজা। কিন্তু আমরা যেহেতু ইলম অর্জন করেছি সেহেতু আমরা বাদশাহর দরজায় যেতে পারি না। কেননা, তাতে ইলমের অমর্যাদা করা হবে। ধরনা যদি দিতেই হয় তাহলে আমাদের মালিক আল্লাহর ধরনা দেবো।

আল্লাহু আকবার! তিনদিন অনাহারে থেকেও বাদশাহর দরবারে যাওয়া তাঁরা পছন্দ করলেন না। বরং ওই অবস্থাতেই দেশে ফিরে গেলেন। যাঁদের দৃষ্টি আল্লাহর পবিত্র সত্তার সাথে সম্পৃক্ত তাঁদের প্রতি নুসরাতে ইলাহ বর্ষিত হয়।

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 দুনিয়া বিমুখতা

📄 দুনিয়া বিমুখতা


ভাওয়ালপুরে এক নওয়াব সাহেব একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর তিনি স্থানীয় ওলামায়েকেরামের সঙ্গে মাদরাসা পরিচালনার ব্যাপারে পরামর্শ করলেন। ওলামায়েকেরাম বললেন—'আমরা আপনাকে এমন একজন ব্যক্তির সন্ধান দিতে পারবো যাকে আনতে পারলে মাদরাসা খুব ভালো চলবে।' নওয়াব বললেন— 'হীরা-মুক্তা আপনারা সংগ্রহ করুন। মূল্য আমি পরিশোধ করবো।' নওয়াব ছিলো একটু অহংকারী। সে জানতে চাইলো—'তাঁর বেতন কতো দেয়া লাগবে?' ওলামায়েকেরাম বললেন—'চার-পাঁচ রুপি।' সেসময়ে সাধারণত এমনই বেতন ধার্য করা হতো। তিনি বললেন—'আপনারা আমার পক্ষ থেকে তাঁর জন্য একশ' রুপি বেতনের প্রস্তাব রাখবেন।' তখন পাঁচ রুপির পরিবর্তে একশ' রুপি বেতন পাওয়া ছিলো সকলের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। তাই ওলামায়েকেরামও বেশ খুশি হলেন। ভাবলেন, নানুতুবি রহ. হয়তো এখানে যোগদান করবেন। তাঁরা দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়ে হযরতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং বললেন—'হযরত! আমাদের ওখানে নতুন একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আপনি সেখানে তাশরিফ নিলে ভালো হয়। আপনার বেতন একশ' রুপি ধার্য করা হয়েছে। তখন নানুতুবি রহ. বললেন—'আমি এখানে পাঁচ রুপি বেতন পাই। যার তিন রুপি আমার সংসারে খরচ হয়। বাকি দু' রুপি আমি গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দেই। এখন যদি আমার বেতন একশ' রুপি হয় তাহলে আমার তো তিন রুপিই লাগবে বাকি সাতানব্বই রুপি গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার জন্য সারাদিন গরিবদের খুঁজতে হবে। যার ফলে আমার পড়ানোর মাঝে ঘাটতি দেখা দিবে। তাই আমি ওখানে যাবো না।'

তাঁর একথা শুনে ওলামায়েকেরাম বিস্মিত হলেন। তাঁদের মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। এ হলো দুনিয়াবিমুখতা। আল্লাহু আকবার কাবিরা।

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 পাগড়ি গ্রহণে হযরত থানবি রহ.-এর অনীহা

📄 পাগড়ি গ্রহণে হযরত থানবি রহ.-এর অনীহা


হযরত আশরাফ আলি থানবি রহ. দাওরায়ে হাদিছ সমাপ্ত করলেন। তখন মাদরাসার পক্ষ থেকে তাঁদেরকে পাগড়ি প্রদানের জন্য মাহফিলের আয়োজন করা হলো। থানবি রহ. এ খবর জানতে পেরে কিছু সাথিদের নিয়ে হযরত শায়খুল হিন্দ রহ.-এর কাছে গিয়ে বললেন ‘হযরত! আমরা জানতে পারলাম, আমাদেরকে নাকি সম্মানের প্রতীক-স্বরূপ পাগড়ি প্রদান করা হবে।’ শায়খ বললেন—'হ্যাঁ। তোমরা ঠিকই শুনেছো।’ তখন থানবি রহ. বললেন—'হযরত! আমাদের বিনীত নিবেদন হলো আমাদের পাগড়ি না দেয়া হোক। কারণ, মানুষ যেনো এটা মনে না করে যে, অযোগ্য ছাত্রদের পাগড়ি প্রদান করা হয়েছে। এতে মাদরাসার বদনামি হবে।’

তখন শায়খুল হিন্দ রহ. বললেন—'প্রিয় বৎসগণ! এখন তোমরা উস্তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছো। তাই নিজেদের কদর বুঝতে পারো না।'

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 সে দারুল উলুমের ছাত্র নয়

📄 সে দারুল উলুমের ছাত্র নয়


দারুল উলুমের শুরু লগ্নের দায়িত্বশীলদের মধ্যে একজন ছিলেন শাহ রফিউদ্দিন সাহেব। তিনি ছিলেন সুফি। তিনি সবসময় ইবাদত-বন্দেগি আর যিকিরে মশগুল থাকতেন। একদিন তিনি অযু করতে পুকুরে গেলেন। তখন এক ছাত্র ডাল ভরতি একটি পাত্র নিয়ে এসে বললো— ‘দেখুন! দারুল উলুমের দায়িত্ব আপনার হাতে থাকাকালে মাদরাসায় এমন ডাল রান্না করা হয় যে, তা দ্বারা অযু করা যাবে।’ একথা বলে ছাত্রটি ডালের পাত্রটি হাত থেকে ফেলে দিলো।

তারপর সেই ছাত্রকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ ঘটনা সম্পর্কে যখন অন্যান্য উস্তাদবৃন্দ অবগত হলেন, তখন তাঁরা খুবই লজ্জিত হলেন এই ভেবে যে, এতোবড়ো দুঃসাহস কার, যে হযরতের সাথে এমন বেয়াদবি করেছে। তারপর শিক্ষকরা হযরতের সঙ্গে দেখা করে বললো— ‘হযরত! আমরা আসলেই খুবই লজ্জিত যে, একজন ছাত্র এমনটি করেছে।' তখন রফিউদ্দিন সাহেব বললেন—'সে ছাত্র নয়।' তারপর শিক্ষকরা ভাবলেন, হযরত যেহেতু বলছেন সে ছাত্র নয় তাহলে মাদরাসার বোর্ডিংএ খোঁজ নিলে তার সন্ধান পাওয়া যাবে। কারণ, বোর্ডিং-এর খাতায় সকল ছাত্রদের নাম আছে। বোর্ডিং এর খাতায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো সেখানে তার নাম আছে। এরপর শিক্ষকরা আবার হযরতের কাছে এসে বললেন—'হযরত! বোর্ডিং-এর খাতায় তো তার নাম আছে।' তখনো হযরত বললেন—'না, সে মাদরাসার ছাত্র হতে পারে না।' এরপর শিক্ষকরা চিন্তা করলেন, তাহলে ক্লাসের হাজিরাখাতা দেখলে হয়তো বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাই তারা ক্লাসের হাজিরা খাতা দেখলেন যে, সেখানেও তার নাম আছে। কিন্তু সে ক্লাস করে না। মাঝে মাঝে তার ঘনিষ্ঠ অন্যকোনো ছাত্র তার হাজিরা দিয়ে দেয়। সে শুধু খানা খাওয়ার সময় খাওয়ার জন্য এখানে আসে।

এটা দেখে উস্তাদগণ আরো বেশি অনুতপ্ত হলেন। চিন্তা করলেন, আমরা এখানে সর্বদা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে আছি। তা সত্ত্বেও এমন বেয়াদব ছাত্রকে চিনতে পারলাম না। অথচ হুজুর মাঝে মাঝে মাদরাসায় আসেন। এরপরও তাকে চিনতে পারলেন। তারপর তাঁরা হযরতের কাছে গিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন এবং বললেন—'হযরত! আমরা এখানে সবসময় থেকেও তাকে চিনতে পারলাম না। আর আপনি সবসময় না থেকেই তাকে চিনতে পারলেন। এর কারণ কী?' তখন শাহ সাহেব বললেন— 'যখন আমি এখানের দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন স্বপ্নে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ লাভ করি। তিনি একটি পানির বালতি হাতে দাঁড়িয়ে মাদরাসার সকল ছাত্রকে বালতি থেকে পানি ভরে দিচ্ছিলেন। তখন সেসকল ছাত্রদের মাঝে আমি এ ছাত্রটিকে দেখিনি। তাই আমি তাকে চিনতে পেরেছি যে, সে দারুল উলুমের ছাত্র নয়।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px