📄 ফারুকে আযম রাদি.-এর ইলম ও ইখলাসের বরকত
সায়্যিদুনা হযরত উমর ফারুক রাদি.-এর ইলম, আমল ও ইখলাস একত্রিত হওয়ার দ্বারা এমনশক্তি অর্জিত হয়েছিলো যে, আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত সে শক্তির দ্বারা তাঁকে রাজমুকুট পরিধান করিয়েছিলেন। তিনি খুব সাদাসিধা জীবন-যাপন করা সত্ত্বেও দুনিয়ার বড়ো বড়ো বাদশাহরা তাঁর সামনে মাথা নত করতো। কিসরা ও কায়সার-এর বাদশাহ। যাদের নাম শুনলে মানুষ কম্পিত হতো তারা পর্যন্ত ফারুকে আযম রাদি.-এর সামনে মাথা নত করেছিলো। কারণ, তাঁর ইলম, আমল ও ইখলাস একত্রিত হয়ে এ শক্তি অর্জিত হয়েছিলো।
📄 ইমাম গাযালি রহ.-এর প্রতি প্রশ্ন—তোমার পড়ার উদ্দেশ্য কী?
ইমাম গাযালি রহ. খাজা বুআলি রহ.-এর থেকে শৈশবে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর শিক্ষার অবস্থা বোঝার জন্য তাঁর ছাত্রজীবনের একটি ঘটনাই যথেষ্ট। তিনি যে মাদরাসায় লেখাপড়া করতেন, সে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তৎকালীন বাদশাহ 'নিযামুল মুলক তুসি'। একবার বাদশাহ-কে অবহিত করা হলো যে, 'জনাব! আপনি যে মাদরাসা নির্মাণ করেছেন সেখানকার ছাত্ররা তো কিতাব পড়ে দুনিয়াদার হয়ে যাচ্ছে।' তখন তিনি ভাবলেন— ছাত্ররা যদি কিতাব পড়ে দুনিয়াদার হয়ে যায়, তাহলে মাদরাসা রেখে আর কী লাভ। তারচে' বন্ধ করে দেয়াই উত্তম। তবে আমি একবার গিয়ে নিজে দেখে আসবো।
বাদশাহ ছদ্মবেশে মাদরাসা পর্যবেক্ষণের জন্য আসলেন। তিনি এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'ভাই! তোমার এখানে লেখাপড়ার করার উদ্দেশ্য কী?' প্রত্যুত্তরে ছাত্র বললো—'আমার পিতা অমুক মাদরাসার মুফতি। তাই আমিও মুফতি হবো। এতে মানুষের মাঝে আমার সম্মান বৃদ্ধি পাবে।'
দ্বিতীয় আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করার পর সে বললো—'আমার পিতা অমুক স্থানের বিচারক। বড়ো হয়ে আমি তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য লেখাপড়া করছি।'
তৃতীয় আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করার পর সে উত্তর দিলো—'বর্তমান বাদশাহ আলেমদের খুব সমীহ করেন। তাই আমি আলেম হবো এবং বাদশাহর একান্ত প্রিয়জন হবো।'
এসকল কথা শুনে বাদশাহ চিন্তা করলেন, আসলেই তো এরা সব দুনিয়াদার। আমার এতো সম্পদ ব্যয় করে কী লাভ। তারচে' মাদরাসা বন্ধ করে দেয়াই ভালো হবে। এ মনোভাব নিয়ে যখন তিনি বের হয়ে যাচ্ছিলেন তখন দরজার পাশে বাতির আলোতে এক ছাত্রকে পড়তে দেখলেন। চিন্তা করলেন, তার সাথেও কিছু কথা বলে যাই। বাদশাহ ছাত্রটির কাছে এসে সালাম দিলেন। ছাত্র সালামের উত্তর দিলেন। ব্যস, এরপর সে আবার মনোযোগসহ পড়তে শুরু করলেন। বাদশাহ বললেন, 'কী ব্যাপার! তুমি কী আমার সঙ্গে কোনো কথা বলবে না?' তখন ছাত্র বললো—'জনাব! আমি এখানে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য আসিনি।' বাদশাহ বললেন—'তাহলে তুমি কীজন্য এসেছো?' ছাত্র বললো—'আমি এসেছি আমার আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করতে। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পদ্ধতি আমার জানা নেই। কিন্তু সে পদ্ধতি এ কিতাবগুলোতে লিপিবদ্ধ আছে। তাই আমি কিতাব পড়ছি এবং সে অনুযায়ী আমল করবো। এভাবে আমি আমার মাওলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবো।'
এ ছাত্র যখন বড়ো হলো তখন সে যামানার ইমাম গাযালিতে পরিণত হয়েছিলো। এটা উস্তাদের সংস্রবের কারণে হয়েছিলো। কারণ, উস্তাদ শৈশবেই তাঁর অন্তরে একথা বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন যে, ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
টিকাঃ
২৫. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৩/২০১।
📄 উত্তম নিয়তে কিতাব পড়া দরকার
হযরত কাসেম নানুতুবি রহ.-কে একলোক জিজ্ঞাসা করলো— 'হযরত! আপনি যে সমস্ত কিতাব পড়েছেন সে সমস্ত কিতাব তো আপনার সাথিরাও পড়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে সম্মান দান করেছেন তারা তো সে সম্মানের অধিকারী হননি। এর কারণ কী?' নানুতুবি রহ. বললেন—'আমার সাথিরা কুরআনের আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জন ও কুরআনের হাকিকত বুঝার নিয়তে পবিত্র কুরআন শরিফ তিলাওয়াত করেছেন। যা তাঁদের অর্জন হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁরা ওই নিয়ামত লাভ করতে পারেনি যা আল্লাহ তাআলা আমাকে দান করেছেন।'
লোকটি আবার প্রশ্ন করলো—'আপনি এ নিয়ামত কীভাবে অর্জন করলেন?' তিনি বললেন— 'আমি যখন পবিত্র কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করেছি তখন এ নিয়তে তিলাওয়াত করেছি যে, 'হে আল্লাহ! তোমার বান্দা হাজির। আমল করার জন্য তোমার হুকুম জানতে চায়।' সুবহানাল্লাহ! এ গুণটিই সাহাবায়েকেরাম রাদি.-এর মাঝে বিদ্যমান ছিলো। সায়্যিদুনা হযরত আবুবকর রাদি.-এর সুরা বাকারা আত্মস্থ করতে পূর্ণ আড়াই বছর সময় লেগেছে। অথচ তাঁরা আরবদেশের অধিবাসী। আরবি ব্যাকরণ তাঁদের অজানা ছিলো না। তারপরও কেনো আড়াই বছর সময় লেগেছে। বুঝা গেলো তাঁরা এক এক আয়াত পড়তেন এবং তার উপর আমল করতেন। একদিকে সুরা পূর্ণ হতো অপরদিকে সে সুরার সকল আমলও পূর্ণ হয়ে যেতো।
📄 একজন ডক্টরের আফসোস
একজন পি. এইচ. ডি ডিগ্রিধারী ব্যক্তির পিতা ইনতিকাল করলেন। তিনি এক আলেমকে বললেন—'আপনি আমার পিতার জানাযা পড়াবেন।' জানাযা শেষ হওয়ার পর লোকটি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। লোকজন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন—'এ দুঃখ আমাদের সকলের জীবনেই এসে থাকে। সুতরাং ধৈর্য ধরুন।' কিন্তু তিনি কাঁদতেই থাকলেন। অবশেষে মাওলানা সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন—'আপনি এতো কাঁদছেন কেনো?' লোকটি বললেন—'আমি আমার পিতাকে হারানোর জন্য কাঁদছি না। কারণ, মৃত্যু সকলের জন্যই অনিবার্য। বরং আমি কাঁদছি আমার পিতা আমাকে দুনিয়াবি শিক্ষায় পি. এইচ. ডি ডিগ্রি অর্জন করিয়েছেন। কিন্তু ধর্মীয় কোনো শিক্ষা দান করেননি। আজ আমার সামনে আমার পিতার লাশ রয়েছে কিন্তু আমি জানাযা পড়াতে পারলাম না।'
টিকাঃ
২৬. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ১/২৬১।