📄 তালিবে ইলমের দোয়ার বরকত
সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. ছিলেন একজন প্রতাপশালী বাদশাহ। তিনটি বিষয়ে তাঁর মনে সন্দেহ ছিলো।
এক. আমি তো সুবক্তগিনের ছেলে। সুবক্তগিন প্রথমে ছিলেন একজন সাধারণ সিপাহি। তারপর বাদশাহ হয়েছেন। পিতার দিক থেকে আমার সম্পর্ক সঠিক নাকি অন্যকিছু। এ বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিলো।
দুই. পৃথিবীতে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক রয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে সর্বোত্তম লোক কারা?
তিন. অনেকদিন যাবৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত আমার নসিব হয়নি। আমার যেনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত নসিব হয়।
এমতাবস্থায় তিনি একদিন বাইরে ঘোরাফেরা করছিলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন এক তালিবুল ইলম বাতির নিচে পড়াশোনা করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—'তুমি মসজিদে গিয়ে পড় না কেনো?' ছাত্রটি উত্তর দিলো, 'মসজিদে আলোর ব্যবস্থা নেই। এখানে আল্লাহর একবান্দার ঘরের আলো এসে পড়েছে। সেই আলোতে আমি পড়ছি।' তখন সুলতান মাহমুদ গযনবি রহ. বললেন—'ঠিক আছে যাও। কাল থেকে তুমি আলো পাবে।' এরপর তিনি আলোর ব্যবস্থা করলেন। ছাত্রটি আলো দেখতে পেয়ে তাঁর জন্য দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি তাঁর মনের আশা পূর্ণ করে দাও।' এরপর গজনবি রহ. স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত লাভ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে সুবক্তগিনের পুত্র! তুমি আমার ওয়ারিসকে সম্মান করেছো। আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাকে সম্মান দান করুন।'
সুবহানাল্লাহ! একজন তালিবুল ইলম-এর দোয়ার বরকতে সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ.-এর মনস্কাম পূর্ণ হলো। এমনকি তাঁর পিতৃ পরিচয়ের ব্যাপারে মনে যে সন্দেহ ছিলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাও দূর করে দিলেন। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সুবক্তগিনের বেটা বলে সম্বোধন করেছেন। তৃতীয়তঃ তিনি একথাও বুঝতে পাললেন যে, দুনিয়াতে ওলামায়েকেরাম সর্বোত্তম মানুষ। যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওয়ারিস।
📄 নববি ইলম অন্বেষণকারীদের দোয়াগ্রহণ
আল্লাহর কাছে ইলম অন্বেষণকারীর মর্যাদা অনেক বেশি। হযরত বাকিবিল্লাহ রহ. ছিলেন হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানি রহ.-এর পির ও মুরশিদ। তাঁর একটি কথা মনে পড়লো। যা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি—
একবার খাজা বাকিবিল্লাহ রহ.-এর সামনে কোনো মুরিদ বললো, আমাদের শায়েখকে আল্লাহ তাআলা অনেক বড়ো বড়ো মুরিদ দান করেছেন। অনেক উঁচু মর্যাদা দান করেছেন। শায়েখ তখন চুপ ছিলেন। তাঁর এই চুপ থাকার দরুন আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা শুরু হলো। কেননা প্রবাদ আছে— ‘হাসানাতুল আবরার সাইয়্যিআতুল মুকাররাবীন’ (সাধারণ নেককারদের নেককাজ নৈকট্যশীলদের অপরাধ)। বড়োদের সঙ্গে যখন সম্পর্ক গভীর হয়, তখন আল্লাহর নিয়ামত বেড়ে যায়। এটাও মনের তৃপ্তির অন্তর্ভূক্ত যে, কেউ আপনার প্রশংসা করবে আর আপনি চুপ থাকবেন। কিছু বলবেন না।
সুতরাং পরীক্ষাস্বরূপ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর উপর বিপদ আসতে শুরু করলো। অন্তরের সকল ক্ষমতা উঠিয়ে নেয়া হলো। সকল নিয়ামত তাঁর থেকে ছিনিয়ে নেয়া হলো। ফলে তিনি কয়েকদিন যাবৎ অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন—'হে আল্লাহ! আমার যে ভুলের কারণে আমার উপর এ পরীক্ষা এলো সে ভুল সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। যাতে আমি নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারি।'
অবশেষে তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে অবহিত করা হলো যে, তোমার অমুক ভুলের কারণে তোমার আজ এ অবস্থা। আর এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হলো, তুমি অমুক মাদরাসায় যাও। সেখানে ছোট ছোট ছাত্ররা রয়েছে। তাদেরকে দিয়ে দোয়া করালে দোয়া কবুল করা হবে। তোমার পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে দেয়া হবে।
তিনি সকালে উঠে মাদরাসায় গেলেন। তাঁকে দেখে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক তাঁর সম্মানার্থে সকলেই দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন তিনি বললেন, আপনারা আমাকে আল্লাহর অলি ভেবে দাঁড়িয়ে গেলেন। অথচ অবস্থা হলো—আমার ভুলের জন্য স্বপ্নের মাধ্যমে আমাকে জানানো হয়েছে যে, এখানকার ছাত্রদের দিয়ে দোয়া করালে দোয়া কবুল করা হবে। তাই আমি আপনাদের নিকট এসেছি। আল্লাহর কাছে আপনাদের মর্যাদা অনেক বেশি। ছোট ছোট ছাত্রদের দ্বারা দোয়া করানোর পর আল্লাহ দোয়া কবুল করেন এবং তাঁর পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে দেন।
টিকাঃ
২২. অর্থাৎ তাঁর সামনে তাঁর প্রশংসা করা হয়েছে। অথচ তিনি বাধা দিলেন না। তিনি এক ধরণের আত্মতৃপ্তি অনুভব করেছেন। যেটা আল্লাহর কাছে পছন্দ হয়নি। অনুবাদক।
📄 তালিবুল ইলমকে আপ্যায়ন করানো যেনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেই আপ্যায়ন করানো
হযরত তাওয়াক্কুল শাহ আম্বালুবি রহ.-এর দরস্তরখান ছিলো অনেক লম্বা। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর সৃষ্টিকে খানা খাওয়াতেন। সাধারণ লোকদের খানা খাওয়ার জন্য তাঁর পক্ষ থেকে অনুমতি ছিলো। যে আসবে সেই খানা খেতে পারবে। তাই ফকির-মিসকিন, পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সকলেই খানা খেয়ে যেতেন। একদিন তিনি স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ লাভ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, 'হে তাওয়াক্কুল শাহ! তুমি তো প্রতিদিনই আল্লাহর দাওয়াত কর। কিন্তু আমার দাওয়াতের ব্যবস্থা তো একদিনও করলে না।'
ঘুম থেকে উঠে তিনি পেরেশান হয়ে গেলেন। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে অস্থির হয়ে যান। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন—'হে আল্লাহ! তুমি আমার কাছে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা পরিষ্কার করে দাও।' তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর অন্তরে ইলহাম হলো যে, তুমি আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে প্রতিদিনই খানা খাওয়াও। কিন্তু রাসুলের ওয়ারিস তথা তালিবুল ইলম, আলেম, কুরআন তিলাওয়াতকারীদেরকে গুরুত্বের সাথে কখনো দাওয়াত করোনি।' এরপর তিনি শহরের সকল আলেম-ওলামা, তালিবুল ইলম ও কুরআন তিলাওয়াতকারীদেরকে দাওয়াত করলেন।
📄 হাদিস মুখস্থ করার বরকত
আমার এক প্রিয়বন্ধু আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে হাদিছের হাফেয ছিলেন। একবার আমি তাকে বললাম, 'আপনি তো বুখারি শরিফের হাফেয! আপনি কি এ মুবারক হাদিছসমূহের কোনো বরকত প্রত্যক্ষ করেছেন?' তিনি বললেন, 'হযরত! এ মুবারক হাদিছ মুখস্থ করার পর আমার উপর আল্লাহর এমন অনুগ্রহ হয়েছে যে, আমি প্রতিরাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত লাভ করছি। কখনো একবার, কখনো একাধিকবার। আল্লাহর শুকরিয়া। এখনো তিনি জীবিত আছেন। হাদিছের মহব্বত তাঁকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এতো নিকটবর্তী করেছে যে, প্রতিসপ্তাহে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত লাভ করেন।'