📄 ইজ্জত কাপড়ে নয়—ইলমের খাজানায়
একবার ইমাম শাফি রহ. চুল কাটাতে নাপিতের দোকানে গেলেন। তখন তাঁর গায়ে ছিলো পুরাতন ও ময়লা কাপড়। এমন সময় একজন ধনী ব্যক্তিও আসলেন। তার গায়ে ছিলো মূল্যবান পোশাক। নাপিত ভাবলো ধনী লোকটি হয়তো বেশি পয়সা দেবে। তাই সে ইমাম শাফি রহ.-এর চুল কাটতে অস্বীকৃতি জানায়। বললো— 'আমি প্রথমে ওনার চুল কাটবো। তারপর আপনার।' তখন ইমাম শাফি রহ. খাদেমকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'থলিতে কী পয়সা আছে?' খাদেম বললেন, 'জী, আছে। তিনশ' দিরহাম আছে।' ইমাম শাফি রহ. বললেন, 'এ তিনশ' দিরহামই নাপিতকে দিয়ে দাও।' নাপিত চুল না কেটে তিনশ' দিরহাম পেয়ে বিস্মিত হলো। সে বললো, 'আপনার গায়ে রয়েছে ছেঁড়া জামা। কিন্তু এরমধ্যে যে এতো সম্পদ রয়েছে তা তো বুঝতে পারিনি।' এরপর ইমাম শাফি রহ. বাইরে এসে একটি কবিতা পাঠ করলেন—
على ثياب لو جميعها بفلس لكان الفلس منهন أكثরা
'আমার শরীরে যে পোশাক রয়েছে তা যদি এক দিরহামের বিনিময়েও বিক্রি করি তাহলে পোশাকের চেয়ে দিরহামের মূল্য বেশি হবে।' কিন্তু সেই কাপড়ের ভেতরে এমন একটি প্রাণ রয়েছে, যা সারা পৃথিবী খুঁজলেও পাওয়া যাবে না।
📄 ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর সাথে ভুল বোঝাবুঝির কারণ
ইমাম আওযায়ি রহ. ছিলেন সিরিয়ার বাসিন্দা। তিনি ইমাম আযম রহ.-এর কিছু সমালোচনা শুনতে পেয়েছিলেন। একবার ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর বিশিষ্ট ছাত্র আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. ইমাম আওযায়ি রহ.-এর দরবারে গেলেন। তখন ইমাম আওযায়ি রহ. আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'হে খুরাসানি! আবু হানিফা নামের লোকটি কে? শুনেছি সে নাকি মারাত্মক পথভ্রষ্ট?'
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন— একথা শুনে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। অবশেষে আমি ইমাম আযম-এর লেখা একটি মাসআলার কিতাব হযরত ইমাম আওযায়িকে দিলাম। তিনি তা পাঠ করে বললেন, 'হে খুরাসানি! এ নুমান নামের লোকটি কে? তাঁর ইলমি যোগ্যতা অনেক উপরে। তাঁর থেকে ইলমি-ফায়দা হাসিল করো।' তখন আমি বললাম, এ নুমানই সেই আবু হানিফা রহ. যাঁর সম্পর্কে আপনি আপত্তিকর কথা শুনেছেন। বাস্তবে তিনি অনেক উঁচুস্তরের। এ কথা শুনে তাঁর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি বললেন, 'হে খুরাসানি! তাঁর সান্নিধ্য অর্জন করো এবং তাঁর থেকে ইলমি-ফায়দা হাসিল করো।'
টিকাঃ
*. আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের নিসবত। কারণ, খুরাসান ছিলো তাঁর এলাকার নাম।
২০. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৪/২৫।
📄 দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন
সম্মানিত শ্রোতামণ্ডলী! ইলম অর্জনের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থেকে কেউ বেশি গুরুত্বারোপ করেননি। আমি একবার Effective Manager-এর উপর একটি কোর্স করেছিলাম। সেই কোর্সের শিক্ষক ছিলেন Mr. Borrodi। যিনি সেসময়ে ক্যালিফোর্নিয়া, ইংল্যান্ড, জার্মানি, হল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিসহ কয়েকটি ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এমন যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি আমাদের লেকচারার ছিলেন। একদিন তিনি লেকচার দিতে গিয়ে বললেন 'এখন আমাদের শিক্ষাবিজ্ঞানিগণ বুঝতে পেরেছেন যে, শুধু ছাত্র বয়সেই লেখাপড়া করলে হবে না। বরং কর্মজীবনেও লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে হবে।' তিনি এ কথাটি খুব গুরুত্বের সাথে বললেন। এরপর আমি দাঁড়িয়ে বললাম—'আমি কী এ বিষয়ে আপনাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিছ শোনাবো?' তিনি বললেন—'অবশ্যই।' তখন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ হাদিছটি তাকে শোনালাম—'তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত ইলম অর্জন করো।' হাদিছটি শুনে তিনি লেকচার বন্ধ করে দিলেন। তিনি ডায়েরি বের করে বললেন—'আমাকে এ হাদিছটি লিখে দাও। আমি লেকচারের মাঝে এ হাদিছটি অন্যদের শোনাবো যে, চৌদ্দ শ' বছর আগে যেকথা মুসলমানদের নবি বলে গেছেন সে বিষয়টি বর্তমান শিক্ষাবিজ্ঞানিগণ অনুভব করছেন।'
টিকাঃ
২১. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ১/৪১।
📄 তালিবে ইলমের দোয়ার বরকত
সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. ছিলেন একজন প্রতাপশালী বাদশাহ। তিনটি বিষয়ে তাঁর মনে সন্দেহ ছিলো।
এক. আমি তো সুবক্তগিনের ছেলে। সুবক্তগিন প্রথমে ছিলেন একজন সাধারণ সিপাহি। তারপর বাদশাহ হয়েছেন। পিতার দিক থেকে আমার সম্পর্ক সঠিক নাকি অন্যকিছু। এ বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিলো।
দুই. পৃথিবীতে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক রয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে সর্বোত্তম লোক কারা?
তিন. অনেকদিন যাবৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত আমার নসিব হয়নি। আমার যেনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত নসিব হয়।
এমতাবস্থায় তিনি একদিন বাইরে ঘোরাফেরা করছিলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন এক তালিবুল ইলম বাতির নিচে পড়াশোনা করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—'তুমি মসজিদে গিয়ে পড় না কেনো?' ছাত্রটি উত্তর দিলো, 'মসজিদে আলোর ব্যবস্থা নেই। এখানে আল্লাহর একবান্দার ঘরের আলো এসে পড়েছে। সেই আলোতে আমি পড়ছি।' তখন সুলতান মাহমুদ গযনবি রহ. বললেন—'ঠিক আছে যাও। কাল থেকে তুমি আলো পাবে।' এরপর তিনি আলোর ব্যবস্থা করলেন। ছাত্রটি আলো দেখতে পেয়ে তাঁর জন্য দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি তাঁর মনের আশা পূর্ণ করে দাও।' এরপর গজনবি রহ. স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত লাভ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে সুবক্তগিনের পুত্র! তুমি আমার ওয়ারিসকে সম্মান করেছো। আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাকে সম্মান দান করুন।'
সুবহানাল্লাহ! একজন তালিবুল ইলম-এর দোয়ার বরকতে সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ.-এর মনস্কাম পূর্ণ হলো। এমনকি তাঁর পিতৃ পরিচয়ের ব্যাপারে মনে যে সন্দেহ ছিলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাও দূর করে দিলেন। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সুবক্তগিনের বেটা বলে সম্বোধন করেছেন। তৃতীয়তঃ তিনি একথাও বুঝতে পাললেন যে, দুনিয়াতে ওলামায়েকেরাম সর্বোত্তম মানুষ। যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওয়ারিস।