📄 ফিরাউন হযরত আসিয়াকে টলাতে পারলো না
ফিরাউন হযরত মুশাতাকে শহিদ করে ঘরে ফিরে হযরত আসিয়াকে বলতে লাগলো-'আজ এ মহিলাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছি।' হযরত আসিয়া বললেন-'তুমি ধ্বংস হও। তুমি একটি নিষ্পাপ সন্তানসহ মাকে হত্যা করেছো।' ফিরাউন বললো-'সে আমাকে খোদা বলে স্বীকার না করার কারণে আমি তাকে হত্যা করেছি।' একথা শুনে হযরত আসিয়া বললেন-'তোমাকে খোদা বলে আমিও স্বীকার করি না। কারণ, তুমি একজন সাধারণ মানুষ।' ফিরাউন নিজের স্ত্রীর মুখে একথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো। কারণ, সে আসিয়াকে খুবই ভালোবাসতো। আসিয়াকে আল্লাহ তাআলা অসাধারণ রূপ-লাবণ্য দান করেছিলেন। শত শত সুন্দরী নারীদের মাঝ থেকে তাকে বেছে নেয়া হয়েছিলো। ফিরাউন বললো-'তুমি এ কী বলছো?' আসিয়া বললেন-'আমি ঠিকই বলছি। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যার বার্তা নিয়ে এসেছেন তিনিই আল্লাহ।' এতে ফিরাউন ক্রুদ্ধ হয়ে বললো- 'দেখো আসিয়া! তোমার পরিণামও কিন্তু আমি মুশাতার মতো করবো।' আসিয়া বললেন-'তোমার যা করার করতে পারো। আমি তোমার সবকিছু ছাড়তে পারি। কিন্তু আমার আল্লাহকে ছাড়তে পারবো না।'
ফিরাউন দরবারের সকল লোকদের ডেকে বললো- 'দেখো! মুসা কতো বড়ো ষড়যন্ত্র করেছে? সে তো আমার স্ত্রীকেও বশ করে নিয়েছে। আজ সে হয়তো ফিরে আসবে না হয় আমি তাকে হত্যা করবো।' ফিরাউন হযরত আসিয়াকে গ্রেফতার করে দরবারে হাজির করলো। কিছুক্ষণ আগেও যে ছিলো রাণী। যাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হতো। যার নির্দেশে চাকর-বাকররা দৌড়ে দৌড়ে কাজ করতো। চোখ তুলে কেউ তাকাতো না। সে এখন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। ফিরাউন বললো— 'তুমি এ মহলের রাণী। এতো নাজ-নেয়ামত তোমার পায়ের কাছে। আমি তোমাকে ভালোবেসে রাণী বানিয়েছি। কিন্তু আজ এ সবকিছু থেকে তোমাকে বঞ্চিত করা হবে। তোমার কল্যাণ চাও তো এখনো সময় আছে, আমাকে খোদা বলে স্বীকার করে নাও।'
আসিয়া বললেন—'আমি ইমান এনেছি। এ থেকে পিছু হটবো না।' ফিরাউন তখন তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলো। সর্বপ্রথম তাকে অপমান করার সিদ্ধান্ত নিলো। সে নির্দেশ দিলো সর্বপ্রথম তাকে উলঙ্গ করা হোক। এখন চিন্তা করুন, কোনো পুরুষকে যদি বলা হয় তোমাকে বিবস্ত্র করা হবে তাহলে তার মনে হয়, এরচে' আমার মরণ ভালো। আমি যেনো হারিয়ে যাই। আর আসিয়া তো ছিলেন নারী। স্বভাবতই নারীরা বেশি লজ্জাশীল। তাহলে তার অবস্থা কীরূপ হতে পারে?
অবশেষে তাকে বিবস্ত্র করা হলো। চিন্তা করুন, কেমন অপমানের শিকার তিনি। একদিকে ইমান অপরদিকে লজ্জা-শরমের পরীক্ষার সম্মুখীন। ফিরাউন তাকে বললো—'এখনো সময় আছে তুমি ফিরে এসো। অন্যথায় তোমার জন্য অপেক্ষা করছে মহাশাস্তি।' কিন্তু আসিয়া পাহাড়ের মতো অটল। ফিরাউন নির্দেশ দিলো—'তাকে এ মহলের দিকে মুখ করে শোয়াও।' নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে শোয়ানো হলো। তারপর তাঁর হাতে-পায়ে পেরেক মারা হলো। যাতে সে নড়াচড়া করতে না পারে। তারপর নির্দেশ দেয়া হলো—'তার শরীর থেকে চামড়া তুলে নাও।' চামড়া তোলা শুরু করা হলো। এবার চিন্তা করুন, জীবন্ত একজন নারীর শরীর থেকে চামড়া তোলা হচ্ছে। আর তিনি তা সহ্য করে যাচ্ছেন। আল্লাহর নাম নেয়ার অপরাধে তাঁকে এ শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। তাঁর সমস্ত শরীর থেকে চামড়া তুলে ফেলা হলো। কিন্তু আল্লাহর কী হিকমত! তিনি এরপরও জীবিত। বেঁচে আছেন।
ফিরাউনের পাষণ্ড হৃদয় তখনো ঠাণ্ডা হয়নি। সে মরিচ আনার জন্য আদেশ দিলো। সমস্ত শরীরে মরিচ লাগিয়ে দেয়া হলো। তিনি কাটা মাছের মতো লাফাতে লাগলেন। কিন্তু এমন অবস্থাতেও তিনি দোয়া করছেন—
رَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ ، وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ.
'হে আল্লাহ! ফিরাউন আমাকে তার প্রাসাদ থেকে বের করে দিয়েছে। আজকের পর থেকে আমি আর এ প্রাসাদে প্রবেশ করতে পারবো না। হে আল্লাহ! এ প্রাসাদের পরিবর্তে আমি জান্নাতে একটি প্রাসাদ চাই। আর আমাকে ফিরাউন ও তার শাস্তি থেকে মুক্তি দান করো।' আল্লাহ তাআলা তাকে সে অবস্থাতেই শাহাদাত দান করলেন।
টিকাঃ
১৪ খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/২০০।
📄 ঘোড়ার দৃঢ়তা
একজন মুজাহিদ যখন একটি ঘোড়া প্রতিপালন করেন এই উদ্দেশ্যে যে, এর পিঠে চড়ে আমি যুদ্ধ করবো। তখন ঘোড়াও বুঝতে পারে যে, আমাকে আদর-যত্নে প্রতিপালন করা হচ্ছে আমার দ্বারা জিহাদ করার জন্য। এরপর যখন মালিক যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে তার উপর আরোহণ করে এবং ঘোড়াকে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখন ঘোড়া বুঝতে পারে যে, আমার মালিকের উদ্দেশ্য পূরণের সময় হয়ে এসেছে। সুতরাং ঘোড়া প্রস্তুত হয়ে যায়। তখন সে শত্রুর তীর-বর্শা, তরবারি সবকিছুকে উপেক্ষা করে শত্রুর মাঝে ঢুকে যায়। মালিক সামনে অগ্রসর হতে বললে জীবন বাজি রেখে সামনে অগ্রসর হয়। মালিকের চোখের ইশারায় নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কারিমে ঘোড়ার দৃঢ়তা ও অবিচলতার শপথ করেছেন—
وَالْعُدِيْتِ ضَبْحًا فَالْمُورِيتِ قَدْحًا فَالْمُغِيرَتِ صُبْحًا .
'প্রভাতে আক্রমণকারী ঘোড়ার শপথ।' সুবহানাল্লাহ!
টিকাঃ
১৫ খুতাবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/২০০১।
📄 রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফুফুর ধৈর্য
উহুদযুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আপন চাচা হামযা রাদি.-এর লাশ দেখতে পেলেন— তাঁর লাশ বিকৃত করা হয়েছে, তাঁর কলিজা বের করে ফেলা হয়েছে, চক্ষু উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং কান কেটে ফেলা হয়েছে, আর হিন্দা তার কর্তিত অঙ্গ দিয়ে মালা বানিয়ে পরিধান করেছে; চিন্তা করে দেখুন, সেই লাশের অবস্থা কি বীভৎস! তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই মর্মাহত হলেন। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। তিনি সাহাবায়েকেরামকে বললেন, 'আমার ফুফু যেনো আপন ভাইয়ের লাশ দেখতে না পারে।'
রাসুলের ফুফু অন্যান্য নারীদের সাথে হামযার লাশ দেখতে এলেন। সাহাবায়েকেরাম রাদি. তাকে জানালেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে তাঁর লাশ দেখতে নিষেধ করেছেন। তিনি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কেনো আমাকে আমার ভাইয়ের লাশ দেখতে নিষেধ করেছেন?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তার লাশ দেখে হয়তো আপনি সহ্য করতে পারবেন না, তাই নিষেধ করেছি।' তখন তিনি বললেন, 'আমি তো আমার ভাইয়ের লাশ দেখে কাঁদতে আসিনি; আমি এসেছি আমার ভাইকে শাহাদাতবরণের মুবারকবাদ জানাতে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এরূপ সাহসী কথা শুনে লাশ দেখার অনুমতি দিলেন।'