📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি.-এর দৃঢ়তা

📄 হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি.-এর দৃঢ়তা


হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি.। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ বলছেন—'আমি তোমাকে আগুনে জ্বালিয়ে দেবো।' কিন্তু দৃঢ়তার মর্তপ্রতীক হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি. বলছেন— 'আমি তোমাকে জান্নাত-জাহান্নামের মালিক মনে করি না।' তাঁরা ছিলেন এমন নির্ভীক। অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য বলতে দ্বিধাবোধ করতেন না।

টিকাঃ
১২. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৩/৬৯।

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 বেদনাময় ভ্রমণ-কাহিনী

📄 বেদনাময় ভ্রমণ-কাহিনী


মাওলানা জাফর আহমদ থানেশ্বরি রহ. স্বীয় কিতাব 'তারিখে কালাপানি'-তে লিখেছেন— আমাদের আলেমদের একটি কাফেলা ছিলো। ইংরেজরা এ কাফেলাকে দিল্লি থেকে লাহোর পাঠায়। তারা শুধু তাদের হাতকড়া পড়িয়ে দিয়েছিলো, যার ফলে তারা সহজেই লাহোর পৌঁছেন। কিন্তু লাহোরের জেলখানার ইনচার্জ ছিলো বড়ো কঠিন লোক। সে বললো, 'এ মৌলবিরা এতো সহজে দিল্লি থেকে এখানে চলে এলো! আমি এদের আরাম বের করছি।' তারপর সে রেলগাড়ির কেবিনের চারপাশে এক দু' ইঞ্চি পর পর পেরেক লাগিয়ে দেয়। রেলগাড়ি চলার সময় ঝাকুনি হলে ওই পেরেকগুলো আমাদের শরীরে বিদ্ধ হতো। যখন গাড়ি বিভিন্ন জায়গায় বার বার ব্রেক করতো তখন ওই পেরেক গুলো বার বার শরীরের একই জায়গায় বিদ্ধ হতো। ফলে শরীর থেকে ঘামের সাথে রক্ত ঝরতে লাগলো। আমাদেরকে লাহোর থেকে মুলতান পাঠানো হচ্ছিলো। আমরা এ পুরো সফরে রাত-দিন বসেই কাটাতাম। আমাদের প্রস্রাব-পায়খানা সেখানেই হতো। আমাদের জন্য পানির কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। ফলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিলো।

আমাদের উপর এ শাস্তির কারণ ছিলো যে, আমরা যেনো তাদের কথা মেনে নিই। কিন্তু আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি, জুলুম সয়েছি। কিন্তু তারপরও তাদের কথা মেনে নিতে পারিনি। দীর্ঘ একমাস সফর করে যখন আমরা মুলতান পৌঁছলাম, তখন সেখানকার হাকিম বললো, 'এদের আগামীকালই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হোক।' আমাদের ফাঁসির কথা শুনে খুবই আনন্দিত হলাম। চেহারায় সজীবতা ফিরে এলো। কারণ, সকল কষ্ট-যন্ত্রণার অবসান ঘটবে। আমাদেরকে যখন ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমাদের চেহারা উজ্জ্বল দেখে একজন বললো, 'তোমাদেরকে আজ এতো খুশি মনে হচ্ছে কেনো?' আমাদের মধ্য থেকে একজন বললেন, 'আজ আমাদের ফাঁসি দেয়া হবে, আর ফাঁসি দেয়া হলে আমরা শাহাদাতবরণ করতে পারবো। তাই আমরা আজ এতো খুশি।'

সে ভিতরে গিয়ে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালো। সে বললো, 'এরা সবাই ফাঁসি দেয়া হবে শুনে অনেক খুশি।' এরপর সে ফিরে এসে বললো, 'তোমরা ফাঁসির কথা শুনে খুশি হচ্ছো। কিন্তু আমরা তোমাদের ফাঁসি দেবো না, বরং আগামীকাল তোমাদের কালাপানি পাঠিয়ে দেবো।'

কালাপানি পৌঁছে হযরত জাফর আহমদ থানেশ্বরি রহ. একটি কবিতা লিখলেন—
مستحق دار کو حکم نظر بندی ملا کیا کہوں کیسے رہائی ہوتے ہوتے رہ گئی
'যে বাড়ি ফিরতে চায়, তাকে বন্দী করা হয়েছে কী-ই বা আর বলার আছে, মুক্তি পেতে-পেতে আর মুক্তি হলো না।'

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 ধৈর্যের কঠিন মুহূর্ত

📄 ধৈর্যের কঠিন মুহূর্ত


তিনি বলেন, 'তারা আমাদেরকে কালাপানি পাঠিয়ে দেয়ার পর আমরা আরো বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম। সেখানে তারা আমাদের হাতে-পায়ে বেড়ি পড়িয়ে আমাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে আমাদের সামনে ডেকে এনে তাদের বললো, 'তোমরা এদের সবাইকে বলে দাও, যদি এরা আমাদের কথা মেনে নেয়, তাহলে এদের সবাইকে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দেবো।' এখন আমাদের স্ত্রী, কন্যা ও পুত্র সবাই কাঁদতে লাগলো। আমার এক শিশুপুত্র আমার বুকে লেগে বলতে লাগলো, 'আব্বু! তুমি একথা কেনো তাদের বলে দাও না, তুমি আমাদের সাথে আমাদের ঘরে ফিরে যাবে।' তিনি বলেন, 'এ পরীক্ষার চেয়ে আর কোনো বড়ো পরীক্ষা আমার জন্য ছিলো না।' আমি আমার স্ত্রীকে ইশারা করে বলে দিলাম যে, তুমি আমার এ ছেলেকে বলে দাও যে, 'তোমার বাবার হায়াত থাকলে অবশ্যই সে আমাদের কাছে ফিরে আসবে। অন্যথায় কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের প্রাঙ্গণে আবার দেখা হবে।'

আমি সালাম জানাই ওই সকল আলেমদের প্রতি, আমি শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের অবিচলতার প্রতি, যারা অসহনীয় কুরবানির মাধ্যমে দীনের হেফাজত করতে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা কত কষ্ট সহ্য করে দীনকে আমাদের কাছে অক্ষতভাবে পৌঁছে দিয়ে গেছেন।

টিকাঃ
১৩. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/১৭৪।

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 ফিরাউন হযরত আসিয়াকে টলাতে পারলো না

📄 ফিরাউন হযরত আসিয়াকে টলাতে পারলো না


ফিরাউন হযরত মুশাতাকে শহিদ করে ঘরে ফিরে হযরত আসিয়াকে বলতে লাগলো-'আজ এ মহিলাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছি।' হযরত আসিয়া বললেন-'তুমি ধ্বংস হও। তুমি একটি নিষ্পাপ সন্তানসহ মাকে হত্যা করেছো।' ফিরাউন বললো-'সে আমাকে খোদা বলে স্বীকার না করার কারণে আমি তাকে হত্যা করেছি।' একথা শুনে হযরত আসিয়া বললেন-'তোমাকে খোদা বলে আমিও স্বীকার করি না। কারণ, তুমি একজন সাধারণ মানুষ।' ফিরাউন নিজের স্ত্রীর মুখে একথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো। কারণ, সে আসিয়াকে খুবই ভালোবাসতো। আসিয়াকে আল্লাহ তাআলা অসাধারণ রূপ-লাবণ্য দান করেছিলেন। শত শত সুন্দরী নারীদের মাঝ থেকে তাকে বেছে নেয়া হয়েছিলো। ফিরাউন বললো-'তুমি এ কী বলছো?' আসিয়া বললেন-'আমি ঠিকই বলছি। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যার বার্তা নিয়ে এসেছেন তিনিই আল্লাহ।' এতে ফিরাউন ক্রুদ্ধ হয়ে বললো- 'দেখো আসিয়া! তোমার পরিণামও কিন্তু আমি মুশাতার মতো করবো।' আসিয়া বললেন-'তোমার যা করার করতে পারো। আমি তোমার সবকিছু ছাড়তে পারি। কিন্তু আমার আল্লাহকে ছাড়তে পারবো না।'

ফিরাউন দরবারের সকল লোকদের ডেকে বললো- 'দেখো! মুসা কতো বড়ো ষড়যন্ত্র করেছে? সে তো আমার স্ত্রীকেও বশ করে নিয়েছে। আজ সে হয়তো ফিরে আসবে না হয় আমি তাকে হত্যা করবো।' ফিরাউন হযরত আসিয়াকে গ্রেফতার করে দরবারে হাজির করলো। কিছুক্ষণ আগেও যে ছিলো রাণী। যাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হতো। যার নির্দেশে চাকর-বাকররা দৌড়ে দৌড়ে কাজ করতো। চোখ তুলে কেউ তাকাতো না। সে এখন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। ফিরাউন বললো— 'তুমি এ মহলের রাণী। এতো নাজ-নেয়ামত তোমার পায়ের কাছে। আমি তোমাকে ভালোবেসে রাণী বানিয়েছি। কিন্তু আজ এ সবকিছু থেকে তোমাকে বঞ্চিত করা হবে। তোমার কল্যাণ চাও তো এখনো সময় আছে, আমাকে খোদা বলে স্বীকার করে নাও।'

আসিয়া বললেন—'আমি ইমান এনেছি। এ থেকে পিছু হটবো না।' ফিরাউন তখন তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলো। সর্বপ্রথম তাকে অপমান করার সিদ্ধান্ত নিলো। সে নির্দেশ দিলো সর্বপ্রথম তাকে উলঙ্গ করা হোক। এখন চিন্তা করুন, কোনো পুরুষকে যদি বলা হয় তোমাকে বিবস্ত্র করা হবে তাহলে তার মনে হয়, এরচে' আমার মরণ ভালো। আমি যেনো হারিয়ে যাই। আর আসিয়া তো ছিলেন নারী। স্বভাবতই নারীরা বেশি লজ্জাশীল। তাহলে তার অবস্থা কীরূপ হতে পারে?

অবশেষে তাকে বিবস্ত্র করা হলো। চিন্তা করুন, কেমন অপমানের শিকার তিনি। একদিকে ইমান অপরদিকে লজ্জা-শরমের পরীক্ষার সম্মুখীন। ফিরাউন তাকে বললো—'এখনো সময় আছে তুমি ফিরে এসো। অন্যথায় তোমার জন্য অপেক্ষা করছে মহাশাস্তি।' কিন্তু আসিয়া পাহাড়ের মতো অটল। ফিরাউন নির্দেশ দিলো—'তাকে এ মহলের দিকে মুখ করে শোয়াও।' নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে শোয়ানো হলো। তারপর তাঁর হাতে-পায়ে পেরেক মারা হলো। যাতে সে নড়াচড়া করতে না পারে। তারপর নির্দেশ দেয়া হলো—'তার শরীর থেকে চামড়া তুলে নাও।' চামড়া তোলা শুরু করা হলো। এবার চিন্তা করুন, জীবন্ত একজন নারীর শরীর থেকে চামড়া তোলা হচ্ছে। আর তিনি তা সহ্য করে যাচ্ছেন। আল্লাহর নাম নেয়ার অপরাধে তাঁকে এ শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। তাঁর সমস্ত শরীর থেকে চামড়া তুলে ফেলা হলো। কিন্তু আল্লাহর কী হিকমত! তিনি এরপরও জীবিত। বেঁচে আছেন।

ফিরাউনের পাষণ্ড হৃদয় তখনো ঠাণ্ডা হয়নি। সে মরিচ আনার জন্য আদেশ দিলো। সমস্ত শরীরে মরিচ লাগিয়ে দেয়া হলো। তিনি কাটা মাছের মতো লাফাতে লাগলেন। কিন্তু এমন অবস্থাতেও তিনি দোয়া করছেন—
رَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ ، وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ.
'হে আল্লাহ! ফিরাউন আমাকে তার প্রাসাদ থেকে বের করে দিয়েছে। আজকের পর থেকে আমি আর এ প্রাসাদে প্রবেশ করতে পারবো না। হে আল্লাহ! এ প্রাসাদের পরিবর্তে আমি জান্নাতে একটি প্রাসাদ চাই। আর আমাকে ফিরাউন ও তার শাস্তি থেকে মুক্তি দান করো।' আল্লাহ তাআলা তাকে সে অবস্থাতেই শাহাদাত দান করলেন।

টিকাঃ
১৪ খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/২০০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px