📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 সমরকন্দি যুবকের দৃঢ়তা ও অবিচলতা

📄 সমরকন্দি যুবকের দৃঢ়তা ও অবিচলতা


সমরকন্দের সফরে এক আলেম এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে এলো। আলেম বললেন, 'এ যুবক খুবই সৌভাগ্যবান। যে রাশিয়ার যুদ্ধের সময় দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত আযান দিয়ে প্রকাশ্যে নামায আদায় করতো।' আমি অবাক হয়ে যুবককে জিজ্ঞাসা করলাম, 'এটা কি করে সম্ভব?' তখন যুবক তাঁর পিঠের জামা সরিয়ে আমাকে দেখালো। আমি দেখলাম, তাঁর পিঠের প্রতি ইঞ্চিতে একটি করে ক্ষত রয়েছে। সে বললো, 'আমি প্রথম আযান দেয়ার পর পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। তারা আমাকে প্রচণ্ড মারধর করে। আমাকে যতো মারতে থাকে আমি ততো হাসতে থাকি। তারা আমাকে বৈদ্যুতিক শক দেয়। কয়েকজন একসাথে মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আমি ক্লান্ত হইনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে বরফের উপর শুইয়ে রেখেছে। সারারাত উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছে। গরম লোহা দ্বারা সেঁক দিয়েছে। আমার নখ তুলে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমি পাগলের মতো আচরণ করেছি। পুলিশ আমাকে একবছর যাবৎ নির্যাতন করে। অবশেষে পাগল হিসেবে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেয়। সেখানেও আমি একবছর অতিবাহিত করি। এখানকার ডাক্তারও লিখিতভাবে জানায়, আমি পাগল। আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়ে গেছে। সে তো কারো ক্ষতি করে না। সুতরাং তাকে দ্বিতীয়বার যেনো গ্রেফতার করা না হয়। এরপর আমাকে মুক্তি দেয়া হলো। আমি মুক্তি পেয়ে এক জায়গায় একটি মসজিদের মতো বানাই এবং সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত আযান দিয়ে নামায পড়তাম।'

এরপর আমি সামনে গিয়ে ওই যুবকের কপালে চুমু খেয়ে বললাম—'ওই জাতির তরবারির প্রয়োজন নেই যে জাতির যুবকদের মধ্যে এমন দৃঢ়তা ও অবিচলতা রয়েছে।' আমি তাঁর দিকে বারবার তাকিয়ে ঈর্ষা অনুভব করছিলাম।

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি.-এর দৃঢ়তা

📄 হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি.-এর দৃঢ়তা


হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি.। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ বলছেন—'আমি তোমাকে আগুনে জ্বালিয়ে দেবো।' কিন্তু দৃঢ়তার মর্তপ্রতীক হযরত সাইদ ইবনে যুবায়ের রাদি. বলছেন— 'আমি তোমাকে জান্নাত-জাহান্নামের মালিক মনে করি না।' তাঁরা ছিলেন এমন নির্ভীক। অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য বলতে দ্বিধাবোধ করতেন না।

টিকাঃ
১২. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৩/৬৯।

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 বেদনাময় ভ্রমণ-কাহিনী

📄 বেদনাময় ভ্রমণ-কাহিনী


মাওলানা জাফর আহমদ থানেশ্বরি রহ. স্বীয় কিতাব 'তারিখে কালাপানি'-তে লিখেছেন— আমাদের আলেমদের একটি কাফেলা ছিলো। ইংরেজরা এ কাফেলাকে দিল্লি থেকে লাহোর পাঠায়। তারা শুধু তাদের হাতকড়া পড়িয়ে দিয়েছিলো, যার ফলে তারা সহজেই লাহোর পৌঁছেন। কিন্তু লাহোরের জেলখানার ইনচার্জ ছিলো বড়ো কঠিন লোক। সে বললো, 'এ মৌলবিরা এতো সহজে দিল্লি থেকে এখানে চলে এলো! আমি এদের আরাম বের করছি।' তারপর সে রেলগাড়ির কেবিনের চারপাশে এক দু' ইঞ্চি পর পর পেরেক লাগিয়ে দেয়। রেলগাড়ি চলার সময় ঝাকুনি হলে ওই পেরেকগুলো আমাদের শরীরে বিদ্ধ হতো। যখন গাড়ি বিভিন্ন জায়গায় বার বার ব্রেক করতো তখন ওই পেরেক গুলো বার বার শরীরের একই জায়গায় বিদ্ধ হতো। ফলে শরীর থেকে ঘামের সাথে রক্ত ঝরতে লাগলো। আমাদেরকে লাহোর থেকে মুলতান পাঠানো হচ্ছিলো। আমরা এ পুরো সফরে রাত-দিন বসেই কাটাতাম। আমাদের প্রস্রাব-পায়খানা সেখানেই হতো। আমাদের জন্য পানির কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। ফলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিলো।

আমাদের উপর এ শাস্তির কারণ ছিলো যে, আমরা যেনো তাদের কথা মেনে নিই। কিন্তু আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি, জুলুম সয়েছি। কিন্তু তারপরও তাদের কথা মেনে নিতে পারিনি। দীর্ঘ একমাস সফর করে যখন আমরা মুলতান পৌঁছলাম, তখন সেখানকার হাকিম বললো, 'এদের আগামীকালই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হোক।' আমাদের ফাঁসির কথা শুনে খুবই আনন্দিত হলাম। চেহারায় সজীবতা ফিরে এলো। কারণ, সকল কষ্ট-যন্ত্রণার অবসান ঘটবে। আমাদেরকে যখন ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমাদের চেহারা উজ্জ্বল দেখে একজন বললো, 'তোমাদেরকে আজ এতো খুশি মনে হচ্ছে কেনো?' আমাদের মধ্য থেকে একজন বললেন, 'আজ আমাদের ফাঁসি দেয়া হবে, আর ফাঁসি দেয়া হলে আমরা শাহাদাতবরণ করতে পারবো। তাই আমরা আজ এতো খুশি।'

সে ভিতরে গিয়ে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালো। সে বললো, 'এরা সবাই ফাঁসি দেয়া হবে শুনে অনেক খুশি।' এরপর সে ফিরে এসে বললো, 'তোমরা ফাঁসির কথা শুনে খুশি হচ্ছো। কিন্তু আমরা তোমাদের ফাঁসি দেবো না, বরং আগামীকাল তোমাদের কালাপানি পাঠিয়ে দেবো।'

কালাপানি পৌঁছে হযরত জাফর আহমদ থানেশ্বরি রহ. একটি কবিতা লিখলেন—
مستحق دار کو حکم نظر بندی ملا کیا کہوں کیسے رہائی ہوتے ہوتے رہ گئی
'যে বাড়ি ফিরতে চায়, তাকে বন্দী করা হয়েছে কী-ই বা আর বলার আছে, মুক্তি পেতে-পেতে আর মুক্তি হলো না।'

📘 যে গল্প ঈমান জাগায় 📄 ধৈর্যের কঠিন মুহূর্ত

📄 ধৈর্যের কঠিন মুহূর্ত


তিনি বলেন, 'তারা আমাদেরকে কালাপানি পাঠিয়ে দেয়ার পর আমরা আরো বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম। সেখানে তারা আমাদের হাতে-পায়ে বেড়ি পড়িয়ে আমাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে আমাদের সামনে ডেকে এনে তাদের বললো, 'তোমরা এদের সবাইকে বলে দাও, যদি এরা আমাদের কথা মেনে নেয়, তাহলে এদের সবাইকে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দেবো।' এখন আমাদের স্ত্রী, কন্যা ও পুত্র সবাই কাঁদতে লাগলো। আমার এক শিশুপুত্র আমার বুকে লেগে বলতে লাগলো, 'আব্বু! তুমি একথা কেনো তাদের বলে দাও না, তুমি আমাদের সাথে আমাদের ঘরে ফিরে যাবে।' তিনি বলেন, 'এ পরীক্ষার চেয়ে আর কোনো বড়ো পরীক্ষা আমার জন্য ছিলো না।' আমি আমার স্ত্রীকে ইশারা করে বলে দিলাম যে, তুমি আমার এ ছেলেকে বলে দাও যে, 'তোমার বাবার হায়াত থাকলে অবশ্যই সে আমাদের কাছে ফিরে আসবে। অন্যথায় কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের প্রাঙ্গণে আবার দেখা হবে।'

আমি সালাম জানাই ওই সকল আলেমদের প্রতি, আমি শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের অবিচলতার প্রতি, যারা অসহনীয় কুরবানির মাধ্যমে দীনের হেফাজত করতে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা কত কষ্ট সহ্য করে দীনকে আমাদের কাছে অক্ষতভাবে পৌঁছে দিয়ে গেছেন।

টিকাঃ
১৩. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/১৭৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px