📄 মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত
মাওলানা আহমাদুল্লাহ গুযরাটি রহ. ছিলেন অনেক বড়ো আলেম। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতের আন্দোলন চলাকালে এক ইংরেজ তাঁর কাছে আরবি শিখতো। যেসকল ইংরেজ আলেমদের সম্মান ও কদর করতো, সে ইংরেজ ছিলো তাদের মধ্যে একজন। সে একদিন গুযরাটি রহ.-কে বললো, 'হযরত! আপনি শুধু একবার বলুন, এ আন্দোলনে আমি শরিক নই। তাহলে আপনি সকলপ্রকার জুলুম থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন।' তখন মাওলানা আহমাদুল্লাহ গুযরাটি রহ. বললেন, 'আমি পছন্দ করি না যে, একথা বলার দ্বারা আল্লাহর দফতর থেকে আমার নাম কেটে দেয়া হোক।' সুবহানাল্লাহ! দীনের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত; কিন্তু ইংরেজদের সাথে হাত মিলাতে রাজি নন।
টিকাঃ
*. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৬/৯৪।
📄 শাহি দরবারে আলফেসানি রহ.-এর বীরত্ব
ইমামে রব্বানি হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানি রহ. হিন্দুস্থানের সেরহিন্দ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর যুগে বাদশাহ আকবর ধর্মকে বিকৃতি করে 'দীনে ইলাহি'-র প্রবর্তন করে। যা ছিলো বিভিন্ন রুসুম ও প্রথার সমষ্টি। এদিকে বাদশাহর ছেলে জাহাঙ্গীর আলেমদের উপর ফরমান জারি করে যে, বাদশাহকে সম্মানসূচক সিজদা বৈধ ফতওয়া দিতে হবে। সেসময় কয়েকজন ব্যক্তি দীনের হেফাজতের জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। কারণ, তাদের দায়িত্বই ছিলো দীনের হেফাজত করা।
আলফেসানি রহ. অকাট্যভাবে এ সম্মানসূচক সিজদা হারাম ফতওয়া দিলেন। এ সত্যবাণী উচ্চারণের ফলে তাঁকে গ্রেফতার করে গোয়ালিয়র দূর্গে বন্দী করা হয়। তাঁর পায়ে শেকল পড়ানো হয়। এরপরও তিনি বিচলিত হননি। কারণ, তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্যকারো সামনে মাথা নত করবেন না। একপর্যায়ে তাঁর এ দৃঢ়তার ফলাফল এই হলো যে, জাহাঙ্গীর তাঁর সামনে মাথা নত করলো এবং বললো, 'আপনি যা বলবেন, তা-ই হবে।' এভাবে বিদআত নির্মূল হয়ে সুন্নত প্রতিষ্ঠিত হলো। এ কারণেই তাকে বলা হয়, মুজাদ্দিদে আলফেসানি তথা যামানার সংস্কারক।
টিকাঃ
১০. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৩/১৮৪।
📄 আল্লাহর তরবারির দৃঢ়তায় কুফর ছিন্নভিন্ন
সাহাবায়েকেরাম রাদি.-দের জীবনী পড়লে বিস্মিত হতে হয়। একবার পরামর্শ চলছিলো। এতোজন কাফেরের বিরুদ্ধে কতোজন সৈন্য পাঠানো যায়? কেউ বললো—'সত্তরজন।' কেউ বললো—'চল্লিশজন।' কেউ বললো—'দশজন।' খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদি.-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন—'আমাকে একাই পাঠিয়ে দিন।' এতে কেউ কেউ বলে উঠলেন—'খালিদ! একথা থেকে অহংকারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।' তিনি বললেন—'কিছুতেই না। আমার দৃষ্টান্ত হলো বাজপাখির মতো। আর কাফেরদের দৃষ্টান্ত হলো, শিকারির ফাঁদে পড়া চড়ুইয়ের মতো। সুতরাং চড়ুই বাজপাখির সঙ্গে কী লড়বে?' তিনি আরো বললেন—'কাফেররা হলো মৃত। আর মুমিন হলো জীবিত। সুতরাং লক্ষ লক্ষ মৃত কখনো একজন জীবিত ব্যক্তিরও ক্ষতি করতে পারে না।' বাস্তবেও তাই হলো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিজয় দান করলেন।
টিকাঃ
১১. খুতুবাতে যুলফিকার, পৃ. ৮/৯৩।
📄 সমরকন্দি যুবকের দৃঢ়তা ও অবিচলতা
সমরকন্দের সফরে এক আলেম এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে এলো। আলেম বললেন, 'এ যুবক খুবই সৌভাগ্যবান। যে রাশিয়ার যুদ্ধের সময় দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত আযান দিয়ে প্রকাশ্যে নামায আদায় করতো।' আমি অবাক হয়ে যুবককে জিজ্ঞাসা করলাম, 'এটা কি করে সম্ভব?' তখন যুবক তাঁর পিঠের জামা সরিয়ে আমাকে দেখালো। আমি দেখলাম, তাঁর পিঠের প্রতি ইঞ্চিতে একটি করে ক্ষত রয়েছে। সে বললো, 'আমি প্রথম আযান দেয়ার পর পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। তারা আমাকে প্রচণ্ড মারধর করে। আমাকে যতো মারতে থাকে আমি ততো হাসতে থাকি। তারা আমাকে বৈদ্যুতিক শক দেয়। কয়েকজন একসাথে মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আমি ক্লান্ত হইনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে বরফের উপর শুইয়ে রেখেছে। সারারাত উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছে। গরম লোহা দ্বারা সেঁক দিয়েছে। আমার নখ তুলে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমি পাগলের মতো আচরণ করেছি। পুলিশ আমাকে একবছর যাবৎ নির্যাতন করে। অবশেষে পাগল হিসেবে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেয়। সেখানেও আমি একবছর অতিবাহিত করি। এখানকার ডাক্তারও লিখিতভাবে জানায়, আমি পাগল। আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়ে গেছে। সে তো কারো ক্ষতি করে না। সুতরাং তাকে দ্বিতীয়বার যেনো গ্রেফতার করা না হয়। এরপর আমাকে মুক্তি দেয়া হলো। আমি মুক্তি পেয়ে এক জায়গায় একটি মসজিদের মতো বানাই এবং সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত আযান দিয়ে নামায পড়তাম।'
এরপর আমি সামনে গিয়ে ওই যুবকের কপালে চুমু খেয়ে বললাম—'ওই জাতির তরবারির প্রয়োজন নেই যে জাতির যুবকদের মধ্যে এমন দৃঢ়তা ও অবিচলতা রয়েছে।' আমি তাঁর দিকে বারবার তাকিয়ে ঈর্ষা অনুভব করছিলাম।