📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 ধ্বংসের নানা কারণ

📄 ধ্বংসের নানা কারণ


১। অনর্থক প্রশ্ন করা

সমাজে ক্রিটিক্যাল কিছু লোক থাকে, যারা অযথা প্রশ্ন করে, কথায় কথায় ক্রিটিসাইজ করে। যদিও শরীয়তে এই শ্রেণীর প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন,

[يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُواْ لاَ تَسْأَلُواْ عَنْ أَشْيَاء إِن تُবْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ] (১০১) سورة المائدة

অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সে সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা প্রকাশিত হলে তোমাদেরকে খারাপ লাগবে। (মাইদাহঃ ১০১)

মহানবী বলেন, “অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের জন্য (তিনটি কর্মকে) হারাম করেছেন; মায়ের অবাধ্যাচরণ করা, অধিকার প্রদানে বিরত থাকা ও অনধিকার কিছু প্রার্থনা করা এবং কন্যা জীবন্ত প্রোথিত করা। আর তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন (তিনটি কর্ম); ভিত্তিহীন বাজে কথা বলা (বা জনরবে থাকা), অধিক (অনাবশ্যক) প্রশ্ন করা (অথবা অপ্রয়োজনে যাজ্ঞা করা) এবং ধন-মাল বিনষ্ট (অপচয়) করা।” (বুখারী ৫৯৭৫নং ও মুসলিম)

দ্বীনী বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করার ধ্বংসের একটি কারণ। আবু হুরাইরা বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাদের সামনে ভাষণ দানকালে বললেন, “হে লোক সকল! আল্লাহ তোমাদের উপর (বায়তুল্লাহর) হজ্জ ফরয করেছেন, অতএব তোমরা হজ্জ পালন কর।” একটি লোক বলে উঠল, 'হে আল্লাহর রসূল! প্রতি বছর তা করতে হবে কি?' তিনি নিরুত্তর থাকলেন এবং লোকটি শেষ পর্যন্ত তিনবার জিজ্ঞাসা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, "যদি আমি বলতাম, হ্যাঁ। তাহলে (প্রতি বছরে) হজ্জ ফরয হয়ে যেত। আর তোমরা তা পালন করতে অক্ষম হতে।” অতঃপর তিনি বললেন, "তোমরা আমাকে (আমার অবস্থায়) ছেড়ে দাও, যতক্ষণ আমি তোমাদেরকে (তোমাদের স্ব স্ব অবস্থায়) ছেড়ে রাখব। কেননা, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা অতি মাত্রায় জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুন ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোন কিছু করার আদেশ দেব, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন করবে। আর যা করতে নিষেধ করব, তা থেকে বিরত থাকবে।” (মুসলিম)

২। কুরআন বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করা

কুরআন বিষয়ে মতভেদ হলে তা নিয়ে তর্ক-বিবাদ ও ঝগড়া করা ধ্বংসের একটি কারণ। আল্লাহর রসূল বলেন, কুরআন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা কুফরী।” (আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ১৩৮নং)

একদা কিছু সাহাবা নবী -এর (হুজরার) দরজার নিকট বসে (কুরআনের বিভিন্ন আয়াত নিয়ে) আলাপ-আলোচনা করছিলেন; কুরআনের আয়াত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছিল। এমন সময় আল্লাহর রসূল এমতাবস্থায় তাঁদের নিকট বের হয়ে এলেন, যেন তাঁর চেহারায় বেদানার দানা নিংড়ে দেওয়া হয়েছে। (অর্থাৎ রাগে তাঁর চেহারা লাল হয়ে গেছে।) অতঃপর তিনি বললেন, "আরে! তোমরা কি এই করার জন্য প্রেরিত হয়েছ? তোমরা কি এই করতে আদিষ্ট হয়েছ?! তোমরা আমার পরে পুনরায় এমন কুফরী অবস্থায় ফিরে যেও না, যাতে একে অপরকে হত্যা করতে শুরু কর।” (ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ১৩৫ নং)

"নবীদের ব্যাপারে মতভেদ এবং কিতাবের একাংশকে অন্য অংশের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি ক'রে তোমাদের পূর্বের বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। কুরআন এভাবে অবতীর্ণ হয়নি যে, তার একাংশ অন্য অংশকে মিথ্যায়ন করবে। বরং তার একাংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা তোমরা বুঝতে পার, তার উপর আমল কর এবং যা বুঝতে পার না, তা তার জ্ঞানীর দিকে ফিরিয়ে দাও।” (শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ ১/২১৮)

৩। কৃপণতা

প্রয়োজন মোতাবেক যথাস্থানে ধন-সম্পদ ব্যয় না করা ধ্বংসের একটি কারণ। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “অত্যাচার করা থেকে বাঁচ। কেননা, অত্যাচার কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল ক'রে নিয়েছিল।” (মুসলিম)

তিনি আরো বলেন, "---আর ধ্বংসকারী কর্মাবলী হল; এমন কৃপণতা যার অনুসরণ করা হয়, এমন প্রবৃত্তি যার আনুগত্য করা হয় এবং নিজের মনে গর্ব অনুভব করা।” (বায্যার, বাইহাকী প্রমুখ, সহীহ তারগীব ৫০নং)

তিনি আরো বলেন, “প্রতিদিন সকালে দু'জন ফিরিস্তা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন বলেন, 'হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের বিনিময় দিন।' আর অপরজন বলেন, 'হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস দিন।” (বুখারী ও মুসলিম)

৪। ধন-দৌলত

পৃথিবীর ইতিহাসে ধন-দৌলত যে ধ্বংসকারী জিনিস, তার বহু প্রমাণ রয়েছে। অর্থ-সম্পদের মোহে মানুষ ধ্বংস হয়, তার উপার্জনের পথে মানুষ হালাক হয়ে যায়। তা রক্ষা করার পথে মানুষ জীবন বিসর্জন দেয়। যেহেতু 'অতি লোভে, তাঁতি ডোবে।'

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ লোকেদেরকে তাদের প্রাপ্য দান করতেন। একদা এক ব্যক্তি এলে তাকে তার দান দিয়ে বললেন, আমি আল্লাহর রসূল-এর নিকট শুনেছি, “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিকে দীনার ও দিরহাম ধ্বংস করেছে। আর সেই দু'টি তোমাদেরকেও ধ্বংস করবে।” (বায্যার, সহীহ তারগীব ৩/১৪৬)

উকুবাহ ইবনে আমের বলেন, রাসূলুল্লাহ (একবার) উহুদের শহীদদের (কবরস্থানের) দিকে বের হলেন এবং যেন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদেরকে বিদায় জানাবার উদ্দেশ্যে আট বছর পর তাঁদের জন্য দুআ করলেন। তারপর (ফিরে এসে) মিম্বরে চড়ে বললেন, “আমি পূর্বে গমনকারী তোমাদের জন্য সুব্যবস্থাপক এবং সাক্ষীও। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান হওযে (কাউষার)। আমি অবশ্যই ওটাকে আমার এই স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। শোনো! তোমাদের ব্যাপারে আমার এ আশংকা নেই যে, তোমরা শির্ক করবে। তবে তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।” (বুখারী-মুসলিম)

অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, "কিন্তু তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং সে জন্য পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং (পরিণামে) তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।” উকুবা বলেন, 'মিম্বরের উপরে রাসূলুল্লাহ-কে এটাই ছিল আমার শেষ দর্শন।'

অপর এক বর্ণনায় আছে, "আমি তোমাদের অগ্রদূত এবং তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর শপথ! আমি এই মুহূর্তে আমার হওয (হওযে কাওসার) দেখছি। আমাকে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহের চাবিগুচ্ছ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি তোমাদের ব্যাপারে এ জন্য শংকিত নই যে, তোমরা আমার (তিরোধানের) পর শির্ক করবে; বরং এ আশংকা বোধ করছি যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদের ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।”

আম্র ইবনে আউফ আনসারী বলেন, রাসূলুল্লাহ একবার আবু উবাইদাহ ইবনে জারাহকে জিযিয়া (ট্যাক্স) আদায় করার জন্য বাহরাইন পাঠালেন। অতঃপর তিনি বাহরাইন থেকে (প্রচুর) মাল নিয়ে এলেন। আনসারগণ তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে ফজরের নামাযে রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে শরীক হলেন। যখন তিনি নামায পড়ে (নিজ বাড়ি) ফিরে যেতে লাগলেন, তখন তারা তাঁর সামনে এলেন। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে দেখে হেসে বললেন, "আমার মনে হয়, তোমরা আবু উবাইদাহ বাহরাইন থেকে কিছু (মাল) নিয়ে এসেছে, তা শুনেছ।” তারা বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন, “সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং তোমরা সেই আশা রাখ, যা তোমাদেরকে আনন্দিত করবে। তবে আল্লাহর কসম! তোমাদের উপর দারিদ্র্য আসবে আমি এ আশংকা করছি না। বরং আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ন্যায় তোমাদেরও পার্থিব জীবনে প্রশস্ততা আসবে। আর তাতে তোমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যেমন তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অতঃপর তা তোমাদেরকে ধ্বংস ক'রে দেবে, যেমন তাদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছিল।” (বুখারী ও মুসলিম)

আবু হুরাইরাহ হতে বর্ণিত, নবী বলেছেন, “ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়।” (বুখারী)

৫। মহিলাদের অতিরিক্ত সাজ-সজ্জা

রূপচর্চা মহিলাদের একটি প্রকৃতিগত ধর্ম। অলংকার তাদের অহংকার। কিন্তু তারা প্রসাধনের ব্যাপারে যখন বেশি বাড়াবাড়ি করে, তখন ধ্বংস বলে, 'পেলাম কাছে।'

স্তন না থাকলে নকল স্তন, কেশ না থাকলে নকল কেশ (পরচুলা), সাইজে ছোট হলে হাই-হিল জুতা ইত্যাদি ব্যবহার ক'রে যুবককে ধোঁকা দেওয়া অনেক মহিলার স্বভাব। তা নিশ্চয়ই ভাল নয়।

হুমাইদ ইবনে আব্দুর রাহমান থেকে বর্ণিত, তিনি হজ্জ করার বছরে মুআবিয়া-কে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন---ঐ সময়ে তিনি জনৈক দেহরক্ষীর হাত থেকে এক গোছা চুল নিজ হাতে নিয়ে বললেন, 'হে মদীনাবাসীগণ! তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি রসূলল্লাহ-কে এরূপ জিনিস (ব্যবহার) নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলতেন, “বানী ইস্রাঈল তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন তাদের মহিলারা এই জিনিস ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছিল।” (বুখারী ও মুসলিম)

৬। আল্লাহর বিধানে চালবাজি করা

মহানবী মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় ঘোষণা করেন যে, “অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রসূল মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তির ব্যবসাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।” বলা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! মৃত প্রাণীর চর্বি সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী? যেহেতু তা দিয়ে পানি-জাহাজ ও চামড়া তেলানো হয় এবং লোকেরা বাতি জ্বালায়?' উত্তরে তিনি বললেন, “না, তা হারাম।” আর এই সময় তিনি বললেন, "আল্লাহ ইয়াহুদ জাতিকে ধ্বংস করুন। আল্লাহ যখন তাদের উপর মৃত প্রাণীর চর্বি হারাম করলেন, তখন তারা তা গলিয়ে বিক্রি ক'রে তার মূল্য ভক্ষণ করল!” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ২৭৬৬নং)

বর্তমানেও অনেকে মদ, বিড়ি-সিগারেট খায় না, কিন্তু তার মূল্য খায়। মদ খায় না, ড্রিঙ্ক করে! সূদ খায় না, ইন্টারেস্ট খায়! ব্যভিচার করে না, ভালবাসা করে!

আল্লাহ মুসলিম জাতিকে সুমতি দিন। আমীন।

সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00