📄 চরিত্র হারানো
আমাদের মহানবী সুমহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। আর চরিত্র- গুণেই তিনি মানুষকে মুগ্ধ করেছিলেন। চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। সৎ-চরিত্র গুণেই আসলে মানুষ 'মানুষ' হয়।
আল্লাহর রসূল বলেন, “কিয়ামতের দিন মীযানে (আমল ওজন করার দাঁড়িপাল্লায়) সচ্চরিত্রতার চেয়ে অধিক ভারী আমল আর অন্য কিছু হবে না। আর আল্লাহ অবশ্যই অশ্লীলভাষী চোয়াড়কে ঘৃণা করেন।” (তিরমিযী ২০০৩, ইবনে হিব্বান ৫৬৬৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯ নং)
তিনি আরো বলেন, “আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা, সুন্দর চরিত্র অবলম্বন করা এবং প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার রাখায় দেশ আবাদ থাকে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়।” (আহমাদ, সহীহুল জামে ৩৭৬৭নং)
তিনি আরো বলেন, "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম লোক হল সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হল, একজন মুসলিমের হৃদয়কে খুশীতে পরিপূর্ণ করা অথবা তার কোন কষ্ট দূর ক'রে দেওয়া অথবা তার তরফ থেকে তার ঋণ আদায় ক'রে দেওয়া অথবা (কাপড় দান করে তার ইজ্জত ঢেকে দেওয়া অথবা) তার নিকট থেকে তার ক্ষুধা দূর ক'রে দেওয়া। মসজিদে একমাস ধরে ই'তিকাফ করার চাইতে আমার মুসলিম ভায়ের কোন প্রয়োজন মিটাতে যাওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি নিজ ক্রোধ সংবরণ ক'রে নেবে, আল্লাহ তার দোষ গোপন ক'রে নেবেন। যে ব্যক্তি নিজ রাগ সামলে নেবে; অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, সে ব্যক্তির হৃদয়কে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভায়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাবে এবং তা পূরণ ক'রে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যেদিন পদযুগল পিছল কাটবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে, যেমন সির্কা মধুকে নষ্ট করে ফেলে।” (সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৪৯৪নং, সহীহুল জামে' ১৭৬নং)
জাতির চরিত্র হারিয়ে গেলে তার কোমর ভেঙ্গে যায়, সে জাতি আর সফল হতে পারে না। যে রাষ্ট্রনেতার চরিত্র নষ্ট হয়, সে আর নেতা থাকতে পারে না। যে আলেমের চরিত্র হারিয়ে যায়, তার আর কোন কদর থাকে না। চরিত্র হারানো মানে সব কিছু হারানো। অর্থক্ষয়ে তত ক্ষতি নেই, যত আছে স্বাস্থ্যক্ষয়ে। স্বাস্থ্যক্ষয়ে তত ক্ষতি নেই, যত আছে চরিত্রক্ষয়ে। চরিত্রক্ষয় মানে জীবনটাই ক্ষয়।
দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য লাভের জন্য পবিত্র চরিত্র চাই। যার চরিত্র অপবিত্র, সে আর কোন কাজে লাগে না। যেহেতু চরিত্রহীনরাও চায় না যে, তার মান্য বা ভালবাসার কেউ চরিত্রহীন হোক। সাধারণ মানুষ মানুষের বাহ্যিক চরিত্রটাই দেখে। সুন্দর ব্যবহার দেখলে মুগ্ধ হয়। মানুষ দেখে তার মান্যবর বা প্রিয়পাত্র, বেনামাযী ও দ্বীন-বিরোধী কি না? সে কোন খারাপ নেশায় অভ্যাসী বা মাতাল কি না? লম্পট বা ব্যভিচারী কি না? আমানতে খেয়ানতকারী কি না? চোর-দাগাবাজ কি না? তার পিতামাতার সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার স্ত্রীর সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার সন্তানদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার প্রতিবেশীদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার ম্যানেজার ও নেতার সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার দাস-দাসীর সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার সমাজের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? শিশুদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? কাফেরদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? এ সকলের প্রতি তার ব্যবহার অমিয় কি না? দয়া-মায়াপূর্ণ কি না, ভদ্রতাপূর্ণ কি না?
তা না হলে সে বিফল মানুষ। সে পরাজিত ও বিপর্যস্ত। তার দ্বারা কোন বিজয়ের কাজ হবে না। যে জাতির চরিত্র নেই, যে জাতি চরিত্রহীন, সে জাতি কি ধ্বংসোন্মুখ নয়? আরবী কবি বলেছেন,
وإنما الأمم الأخلاق ما بقيت فإن هم ذهبت أخلاقهم ذهبوا
অর্থাৎ, জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে, যতক্ষণ তার চরিত্র থাকে। জাতির চরিত্র গেলে সবাই ধ্বংস হয়ে যায়।
📄 দায়িত্ববোধহীনতা
জাতির বহু মানুষ আছে, যারা জাতির সাফল্যের জন্য নিজেদের ঘাড়ে কোন দায়িত্ব আছে বলে অনুভব করে না। আবার যারা অনুভব করে, তারা সে দায়িত্ব বহন করতে চায় না। তারা জানে না যে, জাতির পরাজয়ের জন্য তারাও বহুলাংশে দায়ী। সাফল্য ও বিজয়ের জন্য তাদের কর্তব্য আছে, সংস্কার ও সংশোধনের জন্য তাদেরও কিছু করণীয় আছে।
বিন্দু-বিন্দু বহু পানি জমে সমুদ্র হয়, ছোট্ট ছোট্ট প্রচুর ধূলিকণা দিয়ে পাহাড় তৈরি হয়, এক-একটি অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি দিয়ে সফল সমাজ তৈরি হয়।
মহিলা গৃহের কর্ত্রী, সে শিশুর সঠিক তরবিয়ত দিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
চাষী সঠিকভাবে প্রচুর ফসল ফলিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
শিক্ষক সঠিক শিক্ষা দিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
লেখক জরুরী বিষয় সঠিকভাবে লিখে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
বক্তা সঠিকভাবে বক্তৃতা পরিবেশন ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
আলেম সঠিকভাবে দ্বীন প্রচার ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ডাক্তার সঠিক চিকিৎসা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ইঞ্জিনিয়ার সঠিকভাবে কর্তব্য পালন ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ব্যবসায়ী হালাল উপায়ে ব্যবসা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ধনী মালের হিসাব দিয়ে আল্লাহর হক আদায়ের মাধ্যমে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
গরীব অপর মানুষকে সহযোগিতা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
নেতা সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
শাসক ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
এইভাবে জাতির প্রত্যেকটি সদস্য নিজ সাধ্যায়ত্তে থাকা দায়িত্ব পালন করবে। তবেই জাতি হবে বিজয়ী ও সমৃদ্ধিশীল। মহানবী বলেন, “প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকেই অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামী ও সন্তানের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অতএব প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
তিনি আরো বলেন, "কল্যাণমূলক কোন কর্মকেই অবজ্ঞা করো না, যদিও তা তোমার ভায়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করেও হয়।” (মুসলিম ২৬২৬ নং)
তিনি আরো বলেন, “প্রত্যেক মুসলমানের উপর সাদকাহ করা জরুরী।” আবু মূসা জিজ্ঞাসা করলেন, 'যদি সে সাদকাহ করার মত কিছু না পায় তাহলে?' তিনি বললেন, “সে তার হাত দ্বারা কাজ করে (পয়সা উপার্জন করবে) অতঃপর তা থেকে সে নিজে উপকৃত হবে এবং সাদকাও করবে।” পুনরায় আবু মুসা বললেন, 'যদি সে তাও না পারে?' তিনি বললেন, “যে কোন অভাবী বিপন্ন মানুষের সাহায্য করবে।” আবু মূসা বললেন, 'যদি সে তাও না পারে?' তিনি বললেন, “সে মানুষকে ভাল কাজের নির্দেশ দেবে।” আবু মুসা বললেন, 'যদি সে এটাও না পারে?' তিনি বললেন, "সে (অপরের) ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ, সেটাও হল সাদকাহ স্বরূপ।” (বুখারী-মুসলিম)
মোটকথা, জাতির প্রত্যেক ব্যক্তির উপর দায়িত্ব আছে, আর সে সাধ্যানুযায়ী সে দায়িত্ব বুঝে পালন করবে। যে যেভাবে পারবে, সে সেইভাবে দ্বীন ও জাতির সহযোগিতা করবে। তবেই জাতি উন্নতির মুখ দেখতে পাবে।
বড় পরাজয়ের কারণ এই যে, জাতির ব্যক্তিরা নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে ব্যাপৃত থাকে এবং নিজ নিজ ভবিষ্যৎ ও সুখ-সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে। আর উম্মাহর কথা ভুলেই যায়। অথচ রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “এক মু'মিন অপর মু'মিনের জন্য অট্টালিকার ন্যায়, যার এক অংশ অন্য অংশকে মজবুত ক'রে রাখে।” তারপর তিনি (বুঝাবার জন্য) তাঁর এক হাতের আঙ্গুলগুলি অপর হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে ঢুকালেন। (বুখারী)
বড় দুঃখের বিষয় যে, সাধারণ কোন শিক্ষিত অথবা আলেমকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, 'আপনার সর্বোচ্চ আশা কী?' উত্তরে তিনি বলেন, 'চাই না আমি রাজা হতে শুধু একটি আশা, এই ধরণীর বুকে হবে আমার একটি বাসা।'
বাস! দেশ ও দশের, দ্বীন ও উম্মাহর উন্নয়নের কোন আশাই তাঁর মনে জাগরিত থাকে না। এই জন্যই অধিকাংশ স্কুল-মাদ্রাসার ছাত্রদের একই উত্তর শোনা যায়, 'মোটা টাকার চাকরি।' অথচ এমন জবাব হল তাদের, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাঁর নবী -কে বলেছেন, [فَأَعْرِضْ عَنْ مَنْ تَوَلَّى عَنْ ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (২৯) ذَلِكَ مَبْلَغُهُمْ مِنْ الْعِلْمِ .... (৩০)] سورة النجم
অর্থাৎ, অতএব তাকে উপেক্ষা ক'রে চল, যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং যে শুধু পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। (নামঃ ২৯-৩০)
চাকরি করলেও চাকরির মাধ্যমেও জাতির উন্নয়নের কথা ভাবা যায়, চাকরির অর্থ দিয়েও উম্মাহর সহযোগিতা করা যায়, নিজের পদ ও গদি দিয়েও উম্মাহর উত্থানের কথা চিন্তা করা যায়। কিন্তু মুশকিল হয় তখনই, যখনই কারো সকল ভাবনা-চিন্তা আত্মকেন্দ্রিক হয়।
আর যদি কেউ চাকরি না পায়, তাহলে সমাজে তাকে 'বেকার' বলা হয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সে 'বিকল' হয়ে যায়। তখন সে না কোন দ্বীনের কাজে থাকে, আর না কোন দুনিয়ার কাজে।
অনেকে কিছু ক'রে খায়, আর তা তো খেতেই হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কেবল চাকরির মাধ্যমেই দ্বীন ও জাতির কাজ হতে পারে, অন্যভাবে নয়। তখন নিজের ইল্ম ও শিক্ষার কথা ভুলে যায়, এমনকি অনেকে আদর্শের কথাও বিস্মৃত হয়। এ ঠিক ঐ ইমাম সাহেবের মতো, যিনি মসজিদে চাকরি নিয়ে ইমামতি করতেন। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরে আর জামাআতে প্রায় শামিলই হন না। যখন তিনি ইমাম ছিলেন, তখন তাঁর উপর ইমামতি ওয়াজেব ছিল। আর এখন ইমামতি করেন না, সুতরাং তাঁর উপর যেন জামাআত ওয়াজেব নয়।
রিটায়ার্ড হওয়ার পর অনেকে একেবারেই 'টায়ার্ড' হয়ে যান, যেন তিনি সকল দায়িত্ব থেকে মুক্তিলাভ করেছেন। শিক্ষকতা না করলে যেন শিক্ষকের কোন কর্তব্যই নেই। মুদারিস না হলে যেন দর্সের কোন দায়িত্বই নেই। বিনিময় না পেলে যেন দ্বীনের কোন দায়িত্বই থাকে না। দায়ীর চাকরি অথবা পদ চলে গেলে যেন দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে হয় না। যিনি চাকরি অথবা পদে থাকা অবস্থায় 'শিখা' ছিলেন, তিনি চাকরি বা পদ হারানোর পর স্তিমিত 'ভষ্ম' হয়ে যান!
অনেকে দায়িত্বমুক্ত হওয়ার জন্য উটপাখীর জবাব দেন, অনেকে নিজেকে বাদ দিয়ে দল গণনা করেন! অনেকে বড় হয়ে ছোট কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিয়ে 'আলিফ-বা' পড়াবার সরকারী চাকরী পেলে আবার কী? দুনিয়া গড়লেই তো হল!
অথচ আল্লাহর রসূল তাঁর দুআয় বলতেন, وَلَا تَجْعَلْ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا .....
অর্থাৎ, (হে আল্লাহ!) তুমি দুনিয়াকে আমাদের বৃহত্তম চিন্তার বিষয় এবং আমাদের জ্ঞানের শেষ সীমা করো না। (তিরমিযী ৩৪৯৭নং)
📄 মানসিক পরাজয়
মরার আগে যে রোগী মরে গেছে মনে করে, সে রোগী তাড়াতাড়ি মরে। মানসিক পরাজয়ের শিকার হয়ে বাঁচার আশাটুকুও সে হারিয়ে ফেলে। মুসলিমদের অনেকের মনের অবস্থা তদনুরূপ। মুসলিম আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, আত্মশক্তি নষ্ট ক'রে ফেলেছে, আত্মচেতনাও বিলোপ ক'রে ফেলেছে। যেহেতু যে বলে সে বলিয়ান ছিল, তা ক্ষয় হয়ে গেছে। ঈমানের শক্তিতে সে শক্তিমান ছিল, সে শক্তির বিনাশ ঘটেছে। তাই ভুলে বসেছে মহান আল্লাহর অনুপ্রেরণা,
[وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ] (১৩৯) سورة آل عمران
অর্থাৎ, তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপারি (বিজয়ী); যদি তোমরা ঈমানদার হও। (আলে ইমরানঃ ১৩৯)
পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ মানসিক পরাজয়। হেরে যাওয়ার সবচেয়ে বড় হেতু নিরাশাবাদিতা। অধোগতির সবচেয়ে বড় কারণ হীনমন্যতা। জাতির মনে এই ব্যাধি প্রবেশ হওয়ার ফলেই বিজয়ের আশা মন থেকে মুছে গেছে। কীভাবে বিজয় লাভ সম্ভব? তারা তো আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ করছে। কীভাবে আমরা জিতব? তাদের কাছে অত্যাধুনিক যন্ত্র ও অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। কীভাবে আমরা বাঁচব? তারা ঘরে বসে উপগ্রহের মাধ্যমে আমাদের গতিবিধি প্রত্যক্ষ করছে। কীভাবে আমরা সফল হব? যাবতীয় প্রচার মাধ্যম তাদেরই হাতে। আর ভুলে বসেছে যে,
[إِن يَنصُرْكُمُ اللهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِن يَخْذُلْكُمْ فَمَن ذَا الَّذِي يَنصُرُكُم مِّن بَعْدِهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ] (১৬০) سورة آل عمران
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করলে কেউই তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না। আর তিনি তোমাদের সাহায্য না করলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে তোমাদেরকে সাহায্য করবে? এবং মু'মিনদের উচিত, কেবল আল্লাহরই উপর নির্ভর করা। (ঐঃ ১৬০)
[وَمَن يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ] (৫৬) المائدة
অর্থাৎ, যে কেউ আল্লাহ তাঁর রসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, (সে হবে আল্লাহর দলভুক্ত।) নিশ্চয় আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে। (মাইদাহঃ ৫৬)
[وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ] (১৭৩) سورة الصافات
অর্থাৎ, নিঃসন্দেহে আমার বাহিনীই বিজয়ী হবে। (স্বাফফাতঃ ১৭৩)
[إِنَّا لَنَنصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ] (৫১) غافر
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে ও বিশ্বাসীদেরকে পার্থিব জীবনে ও সাক্ষিগণের দন্ডায়মান (কিয়ামত) দিনে সাহায্য করব। (মু'মিনঃ ৫১)
ভুলে বসেছে মহান আল্লাহর ওয়াদা ও কুদরত।
[هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِن دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ مَا ظَنَنتُمْ أَن يَخْرُجُوا وَظَنُّوا أَنَّهُم مَّانِعَتُهُمْ حُصُونُهُم مِّنَ الله فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُم بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ] (২) سورة الحشر
অর্থাৎ, তিনিই আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী, তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছেন। তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা নির্বাসিত হবে এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহ (এর শাস্তি) হতে রক্ষা করবে; কিন্তু আল্লাহ (এর শাস্তি) এমন এক দিক হতে এল, যা ছিল তাদের ধারণার বাইরে এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। তারা তাদের বাড়ী-ঘর ধ্বংস করছিল নিজেদের হাতে এবং মুমিনদের হাতেও। অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (হাশরঃ ২)
অবশ্য সে ওয়াদা ও কুদরতী শক্তি পাওয়ার শর্তাবলী পূরণ না হলে বিজয় আগমনের আশা করা ভুল। বড় দুঃখের বিষয় যে, যে জাতির উত্থান ঘটেছিল চুম্বক স্বরূপ, যে জাতি অপরকে আকর্ষণ ক'রে সত্যের সন্ধান দিত, সেই জাতি পরিণত হয়েছে লোহাতে। সেই জাতি আজ বিজাতিকে চুম্বক ধারণা ক'রে আকৃষ্ট হচ্ছে বিজাতির সভ্যতায়। আর যে আকৃষ্ট হয়, সে অবশ্যই আকর্ষক অপেক্ষা দুর্বল হয়। পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শীকে বিশাল ভাবলেও নিজের কাছে যে বিশাল সম্পদ আছে, তা বিস্মৃত হয়। আর তার জন্যই সে পরাভবের শিকার।
যে জাতি বিজাতিকে নিয়ে গর্ব করে, বিজাতির উপর পূর্ণ ভরসা রাখে, অথচ স্বজাতির প্রতি ভরসা ও আস্থা রাখতে পারে না, সে অবশ্যই মানসিক পরাজয়ের শিকার। মহান আল্লাহ বলেন,
[وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُوْلَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ] (২২১) سورة البقرة
অর্থাৎ, অংশীবাদী পুরুষ তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাস তার থেকেও উত্তম। কারণ, ওরা তোমাদের আগুনের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় ইচ্ছায় বেহেশ ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। (বাক্বারাহঃ ২২১)
বিজাতির লেবেল লাগিয়ে অনেকে বড় জাতে উঠতে চায়, বিজাতির সনদে অনেকে বড় চাকরিও পায়, চাকরি দেয় জাতির লোকেই। স্বজাতির লোক অপেক্ষা বিজাতির লোককে বেশি প্রাধান্য দেয়, তাদেরকে বেতনও দেয় বেশি, অথচ যোগ্যতায় কোন পার্থক্য থাকে না। এ আচরণও মানসিক পরাজয়েরই নিদর্শন।
জাতির যুবক-যুবতীরা হিরো-হিরোইনদের অনুকরণ করে। কারো আদর্শ মাইকেল জ্যাকশন, কারো আদর্শ মারাদোনা, কারো আরো কেউ, কারো আরো কেউ। তারা পার্থিব দৃষ্টিকোণে পরিবেশ দূষণে দুষ্ট হয়ে ধারণা করে, গান-বাজনা ও খেলাধূলার উন্নতিই জাতির বড় উন্নতি।
জাতির নবী অনেকের আদর্শ নয়। যদিও মহান আল্লাহ বলেছেন,
[لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لَّن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا] (২১) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (আহযাবঃ ২১)
বিজাতির দেশে সফর করলে জাতি নিজের লেবাস পরে সফর করতে লজ্জানুভব করে! পর্দা-বিবিও এয়ারপোর্টে বোরকা ব্যাগে ভরে প্লেনে চড়ে! কত দাড়ি-ওয়ালাও দাড়ি চেঁছে ফেলে! নিজের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে অপরের মাঝে প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করে। কারণ সে তার সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে সন্তুষ্ট নয় তাই। সে হয়তো ওদেরই মতো ধারণা করে যে, সে সব ইসলামী প্রতীক মানুষের প্রগতির প্রতিকুল!
বিজাতির মাঝে ফরয আদায় করতে সংকোচ করে। বিজাতির মাঝে আল্লাহকে 'আল্লাহ' বলতে দ্বিধা করে। বিজাতির সাথে কথোপকথনে পানিকে 'পানি', চাচাকে 'চাচা', বড় ভাইকে 'বড় ভাই' বলতে সংকোচ ক'রে 'জল, কাকা ও দাদা' বলে। এইভাবে নিজে বিজাতির ছাঁচে গলিত ধাতুর মতো গড়িয়ে যায়! মানসিক পরাজয়ের এটিও একটি বড় নিদর্শন।
জাতির উচিত ছিল, সর্ববিষয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-কে আদর্শ ও পথিকৃৎ মান্য করা। তাঁকে আদর্শ মানলে ইহ-পরকাল উভয়ের বিজয় সম্ভব। নচেৎ পৃথিবীর কোন দুনিয়াদারকে নিজের আদর্শ মানলে দুনিয়ার কোন বিষয়ে সফল হলেও বৃহত্তর ক্ষতি রয়েই যাবে।
আশা করলে বড় আশা করতে হয়। ছোট আশা করা ছোট মনের পরিচয়। অবশ্য সে আশা পূরণ যদি সম্ভব হয় তবে। ছোট আশা করলে অনেক সময়, সে আশার কিছুটাও পূরণ হয় না। আর বড় আশা করলে সবটুক না হলেও অন্ততঃ কিছুটা পূরণ হয়। বড়কে আদর্শ মানলে ছোট কারো মতোও হওয়া যায়।
একদা আলী বিন আবী তালেব তাঁর এক ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কার মতো হতে চাও?' উত্তরে সে বলল, 'আমি আপনার মতো হতে চাই।' আলী বললেন, 'না, বরং তুমি বল, আমি আল্লাহর রসূল -এর মতো হতে চাই। কারণ, যদি তোমার লক্ষ্য থাকে, তুমি আলীর মতো হবে, তাহলে এমনও হতে পারে, তুমি তার মতো হবে না। পক্ষান্তরে যদি তুমি তোমার লক্ষ্য হয়, তুমি রাসূলুল্লাহ-এর মতো হবে, তাহলে সম্ভবতঃ তুমি আলীর থেকেও বড় হবে।'
কিন্তু যে জাতি মুহাম্মাদের জীবনী ও ইতিহাসই জানে না, সে জাতি তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করবে কীভাবে? অন্ধভাবে কি কারো মতো হতে পারা যায়? কোন জিনিসের নমুনা না দেখেই কি কেবল তার নাম শুনে অনুরূপ কিছু গড়া যায়?
জাতির শক্তি আছে, সম্পদ আছে। কিন্তু 'আছে' কথাটায় বিশ্বাস নেই। সারকাসের যে হাতি ছোটবেলা থেকে শিকলে বাঁধা থাকে। সে সামান্য টানেই আটকে যায়। সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে, তার মধ্যে এমন শক্তি আছে, যার দ্বারা সে শিকল ছিঁড়ে স্বাধীন হতে পারে।
জাতির জীবনে এটি একটি বড় ত্রুটি। আরবী কবি মুতানাব্বী বলেছেন,
وَلَمْ أَرَ فِي عُيُوْبِ النَّاسِ عَيْباً ... كَنَقْصِ الْقَادِرِيْنَ عَلَى التَّمَامِ
অর্থাৎ, মানুষের সবচেয়ে বড় ত্রুটি এই যে, পূর্ণতা লাভের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে অপূর্ণ থেকে যায়। আল্লাহ এ পরাজিত জাতিকে সুমতি দেন। আমীন।
📄 ধ্বংসের নানা কারণ
১। অনর্থক প্রশ্ন করা
সমাজে ক্রিটিক্যাল কিছু লোক থাকে, যারা অযথা প্রশ্ন করে, কথায় কথায় ক্রিটিসাইজ করে। যদিও শরীয়তে এই শ্রেণীর প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন,
[يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُواْ لاَ تَسْأَلُواْ عَنْ أَشْيَاء إِن تُবْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ] (১০১) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সে সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা প্রকাশিত হলে তোমাদেরকে খারাপ লাগবে। (মাইদাহঃ ১০১)
মহানবী বলেন, “অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের জন্য (তিনটি কর্মকে) হারাম করেছেন; মায়ের অবাধ্যাচরণ করা, অধিকার প্রদানে বিরত থাকা ও অনধিকার কিছু প্রার্থনা করা এবং কন্যা জীবন্ত প্রোথিত করা। আর তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন (তিনটি কর্ম); ভিত্তিহীন বাজে কথা বলা (বা জনরবে থাকা), অধিক (অনাবশ্যক) প্রশ্ন করা (অথবা অপ্রয়োজনে যাজ্ঞা করা) এবং ধন-মাল বিনষ্ট (অপচয়) করা।” (বুখারী ৫৯৭৫নং ও মুসলিম)
দ্বীনী বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করার ধ্বংসের একটি কারণ। আবু হুরাইরা বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাদের সামনে ভাষণ দানকালে বললেন, “হে লোক সকল! আল্লাহ তোমাদের উপর (বায়তুল্লাহর) হজ্জ ফরয করেছেন, অতএব তোমরা হজ্জ পালন কর।” একটি লোক বলে উঠল, 'হে আল্লাহর রসূল! প্রতি বছর তা করতে হবে কি?' তিনি নিরুত্তর থাকলেন এবং লোকটি শেষ পর্যন্ত তিনবার জিজ্ঞাসা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, "যদি আমি বলতাম, হ্যাঁ। তাহলে (প্রতি বছরে) হজ্জ ফরয হয়ে যেত। আর তোমরা তা পালন করতে অক্ষম হতে।” অতঃপর তিনি বললেন, "তোমরা আমাকে (আমার অবস্থায়) ছেড়ে দাও, যতক্ষণ আমি তোমাদেরকে (তোমাদের স্ব স্ব অবস্থায়) ছেড়ে রাখব। কেননা, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা অতি মাত্রায় জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুন ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোন কিছু করার আদেশ দেব, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন করবে। আর যা করতে নিষেধ করব, তা থেকে বিরত থাকবে।” (মুসলিম)
২। কুরআন বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করা
কুরআন বিষয়ে মতভেদ হলে তা নিয়ে তর্ক-বিবাদ ও ঝগড়া করা ধ্বংসের একটি কারণ। আল্লাহর রসূল বলেন, কুরআন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা কুফরী।” (আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ১৩৮নং)
একদা কিছু সাহাবা নবী -এর (হুজরার) দরজার নিকট বসে (কুরআনের বিভিন্ন আয়াত নিয়ে) আলাপ-আলোচনা করছিলেন; কুরআনের আয়াত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছিল। এমন সময় আল্লাহর রসূল এমতাবস্থায় তাঁদের নিকট বের হয়ে এলেন, যেন তাঁর চেহারায় বেদানার দানা নিংড়ে দেওয়া হয়েছে। (অর্থাৎ রাগে তাঁর চেহারা লাল হয়ে গেছে।) অতঃপর তিনি বললেন, "আরে! তোমরা কি এই করার জন্য প্রেরিত হয়েছ? তোমরা কি এই করতে আদিষ্ট হয়েছ?! তোমরা আমার পরে পুনরায় এমন কুফরী অবস্থায় ফিরে যেও না, যাতে একে অপরকে হত্যা করতে শুরু কর।” (ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ১৩৫ নং)
"নবীদের ব্যাপারে মতভেদ এবং কিতাবের একাংশকে অন্য অংশের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি ক'রে তোমাদের পূর্বের বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। কুরআন এভাবে অবতীর্ণ হয়নি যে, তার একাংশ অন্য অংশকে মিথ্যায়ন করবে। বরং তার একাংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা তোমরা বুঝতে পার, তার উপর আমল কর এবং যা বুঝতে পার না, তা তার জ্ঞানীর দিকে ফিরিয়ে দাও।” (শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ ১/২১৮)
৩। কৃপণতা
প্রয়োজন মোতাবেক যথাস্থানে ধন-সম্পদ ব্যয় না করা ধ্বংসের একটি কারণ। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “অত্যাচার করা থেকে বাঁচ। কেননা, অত্যাচার কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল ক'রে নিয়েছিল।” (মুসলিম)
তিনি আরো বলেন, "---আর ধ্বংসকারী কর্মাবলী হল; এমন কৃপণতা যার অনুসরণ করা হয়, এমন প্রবৃত্তি যার আনুগত্য করা হয় এবং নিজের মনে গর্ব অনুভব করা।” (বায্যার, বাইহাকী প্রমুখ, সহীহ তারগীব ৫০নং)
তিনি আরো বলেন, “প্রতিদিন সকালে দু'জন ফিরিস্তা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন বলেন, 'হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের বিনিময় দিন।' আর অপরজন বলেন, 'হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস দিন।” (বুখারী ও মুসলিম)
৪। ধন-দৌলত
পৃথিবীর ইতিহাসে ধন-দৌলত যে ধ্বংসকারী জিনিস, তার বহু প্রমাণ রয়েছে। অর্থ-সম্পদের মোহে মানুষ ধ্বংস হয়, তার উপার্জনের পথে মানুষ হালাক হয়ে যায়। তা রক্ষা করার পথে মানুষ জীবন বিসর্জন দেয়। যেহেতু 'অতি লোভে, তাঁতি ডোবে।'
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ লোকেদেরকে তাদের প্রাপ্য দান করতেন। একদা এক ব্যক্তি এলে তাকে তার দান দিয়ে বললেন, আমি আল্লাহর রসূল-এর নিকট শুনেছি, “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিকে দীনার ও দিরহাম ধ্বংস করেছে। আর সেই দু'টি তোমাদেরকেও ধ্বংস করবে।” (বায্যার, সহীহ তারগীব ৩/১৪৬)
উকুবাহ ইবনে আমের বলেন, রাসূলুল্লাহ (একবার) উহুদের শহীদদের (কবরস্থানের) দিকে বের হলেন এবং যেন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদেরকে বিদায় জানাবার উদ্দেশ্যে আট বছর পর তাঁদের জন্য দুআ করলেন। তারপর (ফিরে এসে) মিম্বরে চড়ে বললেন, “আমি পূর্বে গমনকারী তোমাদের জন্য সুব্যবস্থাপক এবং সাক্ষীও। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান হওযে (কাউষার)। আমি অবশ্যই ওটাকে আমার এই স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। শোনো! তোমাদের ব্যাপারে আমার এ আশংকা নেই যে, তোমরা শির্ক করবে। তবে তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।” (বুখারী-মুসলিম)
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, "কিন্তু তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং সে জন্য পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং (পরিণামে) তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।” উকুবা বলেন, 'মিম্বরের উপরে রাসূলুল্লাহ-কে এটাই ছিল আমার শেষ দর্শন।'
অপর এক বর্ণনায় আছে, "আমি তোমাদের অগ্রদূত এবং তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর শপথ! আমি এই মুহূর্তে আমার হওয (হওযে কাওসার) দেখছি। আমাকে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহের চাবিগুচ্ছ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি তোমাদের ব্যাপারে এ জন্য শংকিত নই যে, তোমরা আমার (তিরোধানের) পর শির্ক করবে; বরং এ আশংকা বোধ করছি যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদের ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।”
আম্র ইবনে আউফ আনসারী বলেন, রাসূলুল্লাহ একবার আবু উবাইদাহ ইবনে জারাহকে জিযিয়া (ট্যাক্স) আদায় করার জন্য বাহরাইন পাঠালেন। অতঃপর তিনি বাহরাইন থেকে (প্রচুর) মাল নিয়ে এলেন। আনসারগণ তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে ফজরের নামাযে রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে শরীক হলেন। যখন তিনি নামায পড়ে (নিজ বাড়ি) ফিরে যেতে লাগলেন, তখন তারা তাঁর সামনে এলেন। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে দেখে হেসে বললেন, "আমার মনে হয়, তোমরা আবু উবাইদাহ বাহরাইন থেকে কিছু (মাল) নিয়ে এসেছে, তা শুনেছ।” তারা বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন, “সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং তোমরা সেই আশা রাখ, যা তোমাদেরকে আনন্দিত করবে। তবে আল্লাহর কসম! তোমাদের উপর দারিদ্র্য আসবে আমি এ আশংকা করছি না। বরং আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ন্যায় তোমাদেরও পার্থিব জীবনে প্রশস্ততা আসবে। আর তাতে তোমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যেমন তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অতঃপর তা তোমাদেরকে ধ্বংস ক'রে দেবে, যেমন তাদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছিল।” (বুখারী ও মুসলিম)
আবু হুরাইরাহ হতে বর্ণিত, নবী বলেছেন, “ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়।” (বুখারী)
৫। মহিলাদের অতিরিক্ত সাজ-সজ্জা
রূপচর্চা মহিলাদের একটি প্রকৃতিগত ধর্ম। অলংকার তাদের অহংকার। কিন্তু তারা প্রসাধনের ব্যাপারে যখন বেশি বাড়াবাড়ি করে, তখন ধ্বংস বলে, 'পেলাম কাছে।'
স্তন না থাকলে নকল স্তন, কেশ না থাকলে নকল কেশ (পরচুলা), সাইজে ছোট হলে হাই-হিল জুতা ইত্যাদি ব্যবহার ক'রে যুবককে ধোঁকা দেওয়া অনেক মহিলার স্বভাব। তা নিশ্চয়ই ভাল নয়।
হুমাইদ ইবনে আব্দুর রাহমান থেকে বর্ণিত, তিনি হজ্জ করার বছরে মুআবিয়া-কে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন---ঐ সময়ে তিনি জনৈক দেহরক্ষীর হাত থেকে এক গোছা চুল নিজ হাতে নিয়ে বললেন, 'হে মদীনাবাসীগণ! তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি রসূলল্লাহ-কে এরূপ জিনিস (ব্যবহার) নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলতেন, “বানী ইস্রাঈল তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন তাদের মহিলারা এই জিনিস ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছিল।” (বুখারী ও মুসলিম)
৬। আল্লাহর বিধানে চালবাজি করা
মহানবী মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় ঘোষণা করেন যে, “অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রসূল মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তির ব্যবসাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।” বলা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! মৃত প্রাণীর চর্বি সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী? যেহেতু তা দিয়ে পানি-জাহাজ ও চামড়া তেলানো হয় এবং লোকেরা বাতি জ্বালায়?' উত্তরে তিনি বললেন, “না, তা হারাম।” আর এই সময় তিনি বললেন, "আল্লাহ ইয়াহুদ জাতিকে ধ্বংস করুন। আল্লাহ যখন তাদের উপর মৃত প্রাণীর চর্বি হারাম করলেন, তখন তারা তা গলিয়ে বিক্রি ক'রে তার মূল্য ভক্ষণ করল!” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ২৭৬৬নং)
বর্তমানেও অনেকে মদ, বিড়ি-সিগারেট খায় না, কিন্তু তার মূল্য খায়। মদ খায় না, ড্রিঙ্ক করে! সূদ খায় না, ইন্টারেস্ট খায়! ব্যভিচার করে না, ভালবাসা করে!
আল্লাহ মুসলিম জাতিকে সুমতি দিন। আমীন।
সমাপ্ত