📄 বিলাসিতা
ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, বিভব ও বিলাসিতার আতিশয্যে বহু জাতি, বহু রাজা ধ্বংস হয়েছে। অতি শৌখিনতার ফলে নিজের গৌরব হারাতে হয়েছে। সুর, সুরা ও সুরমার নেশায় আমীর থেকে ফকীর হতে হয়েছে। সাধারণতঃ এই শ্রেণীর মানুষেরাই মদোন্মত্ত হয় এবং মদ-বিহল হয়ে সত্য প্রত্যাখ্যান করে। উপদেশকারীর উপদেশকে তুচ্ছজ্ঞান করে। ফলে তাদের অনিবার্য পরিণতি হয় অধঃপতন।
এমনই কিছু বিলাসী মানুষের কথা আল-কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে, যারা নবীর দাওয়াত পর্যন্ত উপেক্ষা করেছিল। চিত্ত-বিলাসী বিত্তশালীরা নবীকে অস্বীকার করেছিল। মহান আল্লাহ বলেন,
[وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُم بِهِ كَافِرُونَ] (৩৪)
অর্থাৎ, যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখনই সেখানকার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, 'তুমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।' (সাবা'ঃ ৩৪)
[وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِم مُّقْتَدُونَ] (২৩) سورة الزخرف
অর্থাৎ, এভাবে, তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখনই ওদের মধ্যে যারা বিত্তশালী ছিল তারা বলত, 'আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের অনুসারী পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।' (যুখরুফঃ ২৩)
[وَإِذَا أَرَدْنَا أَن تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا] (১৬) سورة الإسراء
অর্থাৎ, যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন ওর সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিদেরকে (সৎকর্ম করতে) আদেশ করি, অতঃপর তারা সেথায় অসৎকর্ম করে; ফলে ওর প্রতি দন্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং ওটাকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। (বানী ইস্রাঈলঃ ১৬)
অতিরিক্ত সুখ-বিলাস মানুষের মনে মরিচা ধরিয়ে দেয়। প্রবল শৌখিনতা ও বিষয়াসক্তি মানুষকে অন্ধ ও বধির ক'রে তোলে। যার ফলে তার হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, মায়া-মমতা মন থেকে মুছে যায়। আর তখন কোন আর্তের আর্তনাদ তার কর্ণগোচর হয় না, কোন হিতাকাঙ্ক্ষীর হিতোপদেশ তাকে প্রভাবান্বিত করতে পারে না। আনন্দের উন্মত্ততায় সে বুঝতে চেষ্টাও করে না যে, সে ধ্বংসের বিস্ফোরক পদার্থের স্তূপে বসে আনন্দ করছে।
এমন বিলাসী মানুষ বৈষয়িক কোন বিষয়ে তিক্ত-বিরক্ত হয় না। ঘন্টার পর ঘন্টা ধন-মাল ও বিলাস-বিভবের কথায় ক্ষান্ত-클লান্ত হয় না। কিন্তু পরকালের কথা বললে দু-পাঁচ মিনিটেই বিরক্তি আসে। আর মৃত্যুর কথা তো শুনতেই চায় না। ঘন্টার পর ঘন্টা গান শুনেও তার প্রাণ ভরে না, কিন্তু ক্ষণকাল কুরআন শুনতে তার গায়ে জ্বালা ধরে।
অন্তর শক্ত হয়ে যায়, ফলে সেই অবস্থায় কোন আযাব এলে তাতেও নাক সিঁটকায়! ধ্বংসকারিতাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে অবজ্ঞা করে। কিন্তু তাতে তার ধ্বংসের বিধিলিপি অবশ্যই খন্ডন হয় না। মহান আল্লাহ বলেন,
[فَلَمَّا رَأَوْهُ عَارِضًا مُسْتَقْبِلَ أَوْدِيَتِهِمْ قَالُوا هَذَا عَارِضٌ تُمْطِرُنَا بَلْ هُوَ مَا اسْتَعْجَلْتُم بِهِ رِيحٌ فِيهَا عَذَابٌ أَلِيمٌ (২৪) تُدَمِّرُ كُلَّ شَيْءٍ بِأَمْرِ رَبِّهَا فَأَصْبَحُوا لَا يُرَى إِلَّا مَسَاকِنُهُمْ كَذَلِكَ نَجْزِي الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ] (২৫) سورة الأحقاف
অর্থাৎ, অতঃপর যখন তাদের উপত্যকার দিকে তারা মেঘ আসতে দেখল, তখন তারা বলতে লাগল, 'ওটা তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দান করবে।' (হৃদ বলল,) 'বরং ওটাই তো তা, যা তোমরা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছ; এক ঝড়, যাতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। যা তার প্রতিপালকের নির্দেশে সবকিছুকে ধ্বংস ক'রে দেবে।' অতঃপর তাদের পরিণাম এই হল যে, তাদের বাসগৃহগুলো ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান রইল না। এভাবে আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি। (আহক্বাফঃ ২৪-২৫)
এই হল বিলাস-ঘটিত হৃদয় কঠিন হওয়ার শাস্তি, যা বিলাসীদেরকে অবশ্যই ভোগ করতে হয়।
পক্ষান্তরে আযাব দেখে তাদের মনে ভয় হওয়ার কথা ছিল, ভ্রান্তির ঘোর কেটে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা না হয়ে তাদের ভ্রম বৃদ্ধিই পেল। নিজেদের অবলম্বিত পথকেই সঠিক পথ বলেই বিশ্বাস করল। আর তার পরিণাম অবশ্যই ধ্বংস ছিল। মহান আল্লাহ বলেন,
[فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا وَلَكِن قَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ] (৪৩) سورة الأنعাম
অর্থাৎ, সুতরাং আমার শাস্তি যখন তাদের উপর আপতিত হল, তখন তারা বিনীত হল না কেন? অধিকন্তু তাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল এবং তারা যা করছিল, শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করল। (আনআমঃ ৪৩)
মানুষের অর্থনৈতিক ধ্বংসকারিতার মূলে রয়েছে এই বিলাসিতার আতিশয্য। মানুষ মাদক দ্রব্যের পশ্চাতে ফি বছর কোটি কোটি টাকা অপচয় করছে। অপচয় করছে গান-বাজনার পিছনে এবং প্রসাধন ও খেলাধুলা সহ আরো অন্যান্য বিলাস-ব্যসনে। এর পরেও কি ধ্বংসকারিতার জন্য অন্য কিছুকে দায়ী করা চলে? যে মহিলাদের জন্য ওয়াজেব ছিল, কেবল নিজ নিজ স্বামীর জন্য প্রসাধন ও সৌন্দর্য অবলম্বন করবে, সেই মহিলারা বাড়ির বাইরে অন্যের জন্য প্রসাধনে কত শত টাকা নষ্ট করে।
এ স্থলে কারুনের কথা ভেবে দেখা যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, “কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল। আমি তাকে ধনভান্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, 'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।' সে বলল, 'এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।' (ক্বাস্বাসঃ ৭৬-৭৮)
হিতাকাঙ্ক্ষীদের উপদেশের জবাবে সে এ কথা বলেছিল। যার অর্থ হল, উপার্জন ও ব্যবসার যে দক্ষতা আমার রয়েছে এ সম্পদ তো তারই ফসল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দানের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? এর দ্বিতীয় অর্থ হল, আল্লাহ আমাকে এই সম্পদ দিয়েছেন, যেহেতু তিনি জানেন যে, আমি এর উপযুক্ত। আর তিনি আমার জন্য এটি পছন্দ করেছেন। যেমন, অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ মানুষের অন্য একটি কথা উল্লেখ করেছেন, “মানুষকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করলে সে আমাকে আহবান করে; অতঃপর যখন আমি তাকে অনুগ্রহ প্রদান করি তখন সে বলে, 'আমি তো এ আমার জ্ঞানের মাধ্যমে লাভ করেছি।' বস্তুতঃ এ এক পরীক্ষা, কিন্তু ওদের অধিকাংশ জানে না।” (সূরা যুমার ৪৯ আয়াত) অর্থাৎ, আমাকে এই অনুগ্রহ এই জন্যই দান করা হয়েছে যেহেতু আল্লাহর জ্ঞানে আমি এর উপযুক্ত ছিলাম। অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, "দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর যখন আমি তাকে অনুগ্রহের আস্বাদ দিই, তখন সে বলেই থাকে, 'এ আমার প্রাপ্য।” (সূরা হা-মী-ম সাজদাহ ৫০ আয়াত) অর্থাৎ, আমি তো এর উপযুক্ত।
আল্লাহ বলেন, “সে (কারূন) কি জানত না যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার থেকেও শক্তিতে ছিল প্রবল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশালী? আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাও করা হবে না। কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।' আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, 'ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।' অতঃপর আমি কারুনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না। পূর্বদিন যারা তার (মত) মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল, 'দেখ, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন। দেখ, অকৃতজ্ঞরা সফলকাম হয় না।' (ঐঃ ৭৮-৮২)
কারুনের মত ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার অভিলাষী ব্যক্তিরা যখন কারুনের শিক্ষণীয় করুণ পরিণতি দেখল, তখন তারা বুঝল যে, ধন-দৌলত এই কথার প্রমাণ নয় যে, ধনবান ব্যক্তির উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট। সুতরাং দেখা যায় যে, আল্লাহ কাউকে মাল বেশি দেন, আবার কাউকেও কম। এর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের সাথে, যা একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানেন না। মালের আধিক্য তাঁর সন্তুষ্টির ও মাল না থাকা তাঁর অসন্তুষ্টির প্রমাণ বহন করে না। যেমন এসব মান-ইজ্জতের মাপকাঠিও নয়। পক্ষান্তরে মাল নিয়ে বিলাস-ব্যসনে মত্ত হয়ে অহংকার প্রদর্শন করলে, আল্লাহর ধ্বংস নেমে আসে।
যে জাতি পার্থিব ভোগ-বিলাসের মোহে পরকাল ভুলে যায়, সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু কবি বলেন, আমরা সে জাতি নই। তবুও আমরা সেই জাতিতে পরিণত হয়ে ধ্বংস হয়েছি এবং হতে চলেছি।
'নাহি মোরা জীব ভোগ-বিলাসের, শাহাদত ছিল কাম্য মোদের
ভিখারীর বেশে খলীফা যাদের শাসন করিল আধা জাহান।
তারা আজ পড়ে ঘুমায়ে বেহুশ বাহিরে বহিছে ঝড়-তুফান।।'
📄 বিষয়াসক্তি
জাতির জীবনে পরাজয় আসার একটি কারণ হল দুনিয়ার মহব্বত। আমরা ভাবি, আমরা দুনিয়ায় চিরস্থায়ী বেঁচে থাকব। তাই দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের মায়ায় ভুলে সেই মাছির মতো হয়ে যাই, যে মাছি রসগোল্লার ঝোলের মাঝে বসে অনেক বেশি পরিমাণে রস শোষণ করতে চায়! পরিশেষে তার পরিণাম এই হয় যে, রস ছেড়ে সে আর উঠতে পারে না, বরং তাতে ডুবেই সে নিজের জীবন-লীলা সাঙ্গ করে।
কিছু সাহাবার সামান্য দুনিয়ার লোভ আল্লাহর রসূল-কে কতই না বিভ্রাটে ফেলেছিল! মুসলিমদের বিজয় দেখে গনীমতের মাল সংগ্রহের জন্য নিজেদের ঘাঁটি ছেড়ে চলে গেলে পিছন থেকে মুসলমানদের উপর পাল্টা আক্রমণ হল। তাতে কত হতাহত হল। খোদ মহানবী জখম হলেন! মহান আল্লাহ সেদিনকার পরীক্ষার কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
[وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُم مِّن بَعْدِ مَا أَرَاكُم مَّا تُحِبُّونَ مِنكুম مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ] (১৫২)
অর্থাৎ, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন, যখন তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশক্রমে হত্যা করছিলে। অবশেষে যখন তোমরা সাহস হারিয়েছিলে এবং (রসূলের) নির্দেশ সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছিলেন এবং যা তোমরা পছন্দ কর তা (বিজয়) তোমাদেরকে দেখানোর পরে তোমরা অবাধ্য হয়েছিলে (তখন বিজয় রহিত হল)। তোমাদের কতক লোক ইহকাল কামনা করেছিল এবং কতক লোক পরকাল কামনা করেছিল। অতঃপর তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি তোমাদেরকে তাদের মোকাবেলায় পশ্চাতে ফিরিয়ে দিলেন। তবুও (কিন্তু) তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল। (আলে ইমরানঃ ১৫২)
আমরা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে ভালবাসি। দুনিয়ার ঘর-বাড়ি, মায়ার সংসার, স্ত্রী-পরিজন সব আসলে ছবির মতো। এ সবের কোন প্রকৃতত্ব নেই। প্রকৃত ঘর-বাড়ি ও স্ত্রী-সুখ আছে আখেরাতে। তবুও আমরা ইহকালকে পরকালের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকি, আর তারই জন্য আমাদের পরাজয়। আল্লাহর রসূল বলেন, "অনতি দূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজপাত্রের উপর একত্রিত হয়। (এবং চারিদিক থেকে ভোজন ক'রে থাকে।)” একজন বলল, 'আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।” এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! দুর্বলতা কী?' তিনি বললেন, “দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া।” (আবু দাউদ ৪২৯৭, মুসনাদে আহমাদ ৫/২৭৮)
তিনি আরো বলেন, “যখন তোমরা 'ঈনাহ' (সূদী) ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ ক'রে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” (মুসনাদে আহমদ ২/২৮, ৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২, বাইহাকী ৫/৩১৬) আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
[قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ] (২৪)
অর্থাৎ, বল, তোমাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, স্ত্রী ও আত্মীয়গণ, অর্জিত ধনরাশি এবং সেই ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার অচল হওয়ার ভয় কর এবং প্রিয় বাসস্থানসমূহ যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর আদেশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। বস্তুতঃ আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। (তাওবাহঃ ২৪)
বেঁচে থাকার অধিকার তাদেরই আছে, যারা আসলেই মরতে জানে। এ জন্যই মহান আল্লাহ বাঁচার মতো বাঁচতে আহবান ক'রে বলেছেন,
[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا الله وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُم لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمُرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ] (২৪) سورة الأنفال
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! রসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করে, যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সাড়া দাও এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে। (আনফালঃ ২৪)
📄 চরিত্র হারানো
আমাদের মহানবী সুমহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। আর চরিত্র- গুণেই তিনি মানুষকে মুগ্ধ করেছিলেন। চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। সৎ-চরিত্র গুণেই আসলে মানুষ 'মানুষ' হয়।
আল্লাহর রসূল বলেন, “কিয়ামতের দিন মীযানে (আমল ওজন করার দাঁড়িপাল্লায়) সচ্চরিত্রতার চেয়ে অধিক ভারী আমল আর অন্য কিছু হবে না। আর আল্লাহ অবশ্যই অশ্লীলভাষী চোয়াড়কে ঘৃণা করেন।” (তিরমিযী ২০০৩, ইবনে হিব্বান ৫৬৬৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯ নং)
তিনি আরো বলেন, “আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা, সুন্দর চরিত্র অবলম্বন করা এবং প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার রাখায় দেশ আবাদ থাকে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়।” (আহমাদ, সহীহুল জামে ৩৭৬৭নং)
তিনি আরো বলেন, "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম লোক হল সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হল, একজন মুসলিমের হৃদয়কে খুশীতে পরিপূর্ণ করা অথবা তার কোন কষ্ট দূর ক'রে দেওয়া অথবা তার তরফ থেকে তার ঋণ আদায় ক'রে দেওয়া অথবা (কাপড় দান করে তার ইজ্জত ঢেকে দেওয়া অথবা) তার নিকট থেকে তার ক্ষুধা দূর ক'রে দেওয়া। মসজিদে একমাস ধরে ই'তিকাফ করার চাইতে আমার মুসলিম ভায়ের কোন প্রয়োজন মিটাতে যাওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি নিজ ক্রোধ সংবরণ ক'রে নেবে, আল্লাহ তার দোষ গোপন ক'রে নেবেন। যে ব্যক্তি নিজ রাগ সামলে নেবে; অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, সে ব্যক্তির হৃদয়কে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভায়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাবে এবং তা পূরণ ক'রে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যেদিন পদযুগল পিছল কাটবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে, যেমন সির্কা মধুকে নষ্ট করে ফেলে।” (সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৪৯৪নং, সহীহুল জামে' ১৭৬নং)
জাতির চরিত্র হারিয়ে গেলে তার কোমর ভেঙ্গে যায়, সে জাতি আর সফল হতে পারে না। যে রাষ্ট্রনেতার চরিত্র নষ্ট হয়, সে আর নেতা থাকতে পারে না। যে আলেমের চরিত্র হারিয়ে যায়, তার আর কোন কদর থাকে না। চরিত্র হারানো মানে সব কিছু হারানো। অর্থক্ষয়ে তত ক্ষতি নেই, যত আছে স্বাস্থ্যক্ষয়ে। স্বাস্থ্যক্ষয়ে তত ক্ষতি নেই, যত আছে চরিত্রক্ষয়ে। চরিত্রক্ষয় মানে জীবনটাই ক্ষয়।
দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য লাভের জন্য পবিত্র চরিত্র চাই। যার চরিত্র অপবিত্র, সে আর কোন কাজে লাগে না। যেহেতু চরিত্রহীনরাও চায় না যে, তার মান্য বা ভালবাসার কেউ চরিত্রহীন হোক। সাধারণ মানুষ মানুষের বাহ্যিক চরিত্রটাই দেখে। সুন্দর ব্যবহার দেখলে মুগ্ধ হয়। মানুষ দেখে তার মান্যবর বা প্রিয়পাত্র, বেনামাযী ও দ্বীন-বিরোধী কি না? সে কোন খারাপ নেশায় অভ্যাসী বা মাতাল কি না? লম্পট বা ব্যভিচারী কি না? আমানতে খেয়ানতকারী কি না? চোর-দাগাবাজ কি না? তার পিতামাতার সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার স্ত্রীর সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার সন্তানদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার প্রতিবেশীদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার ম্যানেজার ও নেতার সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার দাস-দাসীর সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? তার সমাজের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? শিশুদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? কাফেরদের সাথে তার ব্যবহার কেমন আছে? এ সকলের প্রতি তার ব্যবহার অমিয় কি না? দয়া-মায়াপূর্ণ কি না, ভদ্রতাপূর্ণ কি না?
তা না হলে সে বিফল মানুষ। সে পরাজিত ও বিপর্যস্ত। তার দ্বারা কোন বিজয়ের কাজ হবে না। যে জাতির চরিত্র নেই, যে জাতি চরিত্রহীন, সে জাতি কি ধ্বংসোন্মুখ নয়? আরবী কবি বলেছেন,
وإنما الأمم الأخلاق ما بقيت فإن هم ذهبت أخلاقهم ذهبوا
অর্থাৎ, জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে, যতক্ষণ তার চরিত্র থাকে। জাতির চরিত্র গেলে সবাই ধ্বংস হয়ে যায়।
📄 দায়িত্ববোধহীনতা
জাতির বহু মানুষ আছে, যারা জাতির সাফল্যের জন্য নিজেদের ঘাড়ে কোন দায়িত্ব আছে বলে অনুভব করে না। আবার যারা অনুভব করে, তারা সে দায়িত্ব বহন করতে চায় না। তারা জানে না যে, জাতির পরাজয়ের জন্য তারাও বহুলাংশে দায়ী। সাফল্য ও বিজয়ের জন্য তাদের কর্তব্য আছে, সংস্কার ও সংশোধনের জন্য তাদেরও কিছু করণীয় আছে।
বিন্দু-বিন্দু বহু পানি জমে সমুদ্র হয়, ছোট্ট ছোট্ট প্রচুর ধূলিকণা দিয়ে পাহাড় তৈরি হয়, এক-একটি অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি দিয়ে সফল সমাজ তৈরি হয়।
মহিলা গৃহের কর্ত্রী, সে শিশুর সঠিক তরবিয়ত দিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
চাষী সঠিকভাবে প্রচুর ফসল ফলিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
শিক্ষক সঠিক শিক্ষা দিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
লেখক জরুরী বিষয় সঠিকভাবে লিখে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
বক্তা সঠিকভাবে বক্তৃতা পরিবেশন ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
আলেম সঠিকভাবে দ্বীন প্রচার ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ডাক্তার সঠিক চিকিৎসা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ইঞ্জিনিয়ার সঠিকভাবে কর্তব্য পালন ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ব্যবসায়ী হালাল উপায়ে ব্যবসা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
ধনী মালের হিসাব দিয়ে আল্লাহর হক আদায়ের মাধ্যমে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
গরীব অপর মানুষকে সহযোগিতা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
নেতা সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিয়ে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
শাসক ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা ক'রে জাতির প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করবে।
এইভাবে জাতির প্রত্যেকটি সদস্য নিজ সাধ্যায়ত্তে থাকা দায়িত্ব পালন করবে। তবেই জাতি হবে বিজয়ী ও সমৃদ্ধিশীল। মহানবী বলেন, “প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকেই অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামী ও সন্তানের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অতএব প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
তিনি আরো বলেন, "কল্যাণমূলক কোন কর্মকেই অবজ্ঞা করো না, যদিও তা তোমার ভায়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করেও হয়।” (মুসলিম ২৬২৬ নং)
তিনি আরো বলেন, “প্রত্যেক মুসলমানের উপর সাদকাহ করা জরুরী।” আবু মূসা জিজ্ঞাসা করলেন, 'যদি সে সাদকাহ করার মত কিছু না পায় তাহলে?' তিনি বললেন, “সে তার হাত দ্বারা কাজ করে (পয়সা উপার্জন করবে) অতঃপর তা থেকে সে নিজে উপকৃত হবে এবং সাদকাও করবে।” পুনরায় আবু মুসা বললেন, 'যদি সে তাও না পারে?' তিনি বললেন, “যে কোন অভাবী বিপন্ন মানুষের সাহায্য করবে।” আবু মূসা বললেন, 'যদি সে তাও না পারে?' তিনি বললেন, “সে মানুষকে ভাল কাজের নির্দেশ দেবে।” আবু মুসা বললেন, 'যদি সে এটাও না পারে?' তিনি বললেন, "সে (অপরের) ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ, সেটাও হল সাদকাহ স্বরূপ।” (বুখারী-মুসলিম)
মোটকথা, জাতির প্রত্যেক ব্যক্তির উপর দায়িত্ব আছে, আর সে সাধ্যানুযায়ী সে দায়িত্ব বুঝে পালন করবে। যে যেভাবে পারবে, সে সেইভাবে দ্বীন ও জাতির সহযোগিতা করবে। তবেই জাতি উন্নতির মুখ দেখতে পাবে।
বড় পরাজয়ের কারণ এই যে, জাতির ব্যক্তিরা নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে ব্যাপৃত থাকে এবং নিজ নিজ ভবিষ্যৎ ও সুখ-সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে। আর উম্মাহর কথা ভুলেই যায়। অথচ রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “এক মু'মিন অপর মু'মিনের জন্য অট্টালিকার ন্যায়, যার এক অংশ অন্য অংশকে মজবুত ক'রে রাখে।” তারপর তিনি (বুঝাবার জন্য) তাঁর এক হাতের আঙ্গুলগুলি অপর হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে ঢুকালেন। (বুখারী)
বড় দুঃখের বিষয় যে, সাধারণ কোন শিক্ষিত অথবা আলেমকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, 'আপনার সর্বোচ্চ আশা কী?' উত্তরে তিনি বলেন, 'চাই না আমি রাজা হতে শুধু একটি আশা, এই ধরণীর বুকে হবে আমার একটি বাসা।'
বাস! দেশ ও দশের, দ্বীন ও উম্মাহর উন্নয়নের কোন আশাই তাঁর মনে জাগরিত থাকে না। এই জন্যই অধিকাংশ স্কুল-মাদ্রাসার ছাত্রদের একই উত্তর শোনা যায়, 'মোটা টাকার চাকরি।' অথচ এমন জবাব হল তাদের, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাঁর নবী -কে বলেছেন, [فَأَعْرِضْ عَنْ مَنْ تَوَلَّى عَنْ ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (২৯) ذَلِكَ مَبْلَغُهُمْ مِنْ الْعِلْمِ .... (৩০)] سورة النجم
অর্থাৎ, অতএব তাকে উপেক্ষা ক'রে চল, যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং যে শুধু পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। (নামঃ ২৯-৩০)
চাকরি করলেও চাকরির মাধ্যমেও জাতির উন্নয়নের কথা ভাবা যায়, চাকরির অর্থ দিয়েও উম্মাহর সহযোগিতা করা যায়, নিজের পদ ও গদি দিয়েও উম্মাহর উত্থানের কথা চিন্তা করা যায়। কিন্তু মুশকিল হয় তখনই, যখনই কারো সকল ভাবনা-চিন্তা আত্মকেন্দ্রিক হয়।
আর যদি কেউ চাকরি না পায়, তাহলে সমাজে তাকে 'বেকার' বলা হয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সে 'বিকল' হয়ে যায়। তখন সে না কোন দ্বীনের কাজে থাকে, আর না কোন দুনিয়ার কাজে।
অনেকে কিছু ক'রে খায়, আর তা তো খেতেই হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কেবল চাকরির মাধ্যমেই দ্বীন ও জাতির কাজ হতে পারে, অন্যভাবে নয়। তখন নিজের ইল্ম ও শিক্ষার কথা ভুলে যায়, এমনকি অনেকে আদর্শের কথাও বিস্মৃত হয়। এ ঠিক ঐ ইমাম সাহেবের মতো, যিনি মসজিদে চাকরি নিয়ে ইমামতি করতেন। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরে আর জামাআতে প্রায় শামিলই হন না। যখন তিনি ইমাম ছিলেন, তখন তাঁর উপর ইমামতি ওয়াজেব ছিল। আর এখন ইমামতি করেন না, সুতরাং তাঁর উপর যেন জামাআত ওয়াজেব নয়।
রিটায়ার্ড হওয়ার পর অনেকে একেবারেই 'টায়ার্ড' হয়ে যান, যেন তিনি সকল দায়িত্ব থেকে মুক্তিলাভ করেছেন। শিক্ষকতা না করলে যেন শিক্ষকের কোন কর্তব্যই নেই। মুদারিস না হলে যেন দর্সের কোন দায়িত্বই নেই। বিনিময় না পেলে যেন দ্বীনের কোন দায়িত্বই থাকে না। দায়ীর চাকরি অথবা পদ চলে গেলে যেন দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে হয় না। যিনি চাকরি অথবা পদে থাকা অবস্থায় 'শিখা' ছিলেন, তিনি চাকরি বা পদ হারানোর পর স্তিমিত 'ভষ্ম' হয়ে যান!
অনেকে দায়িত্বমুক্ত হওয়ার জন্য উটপাখীর জবাব দেন, অনেকে নিজেকে বাদ দিয়ে দল গণনা করেন! অনেকে বড় হয়ে ছোট কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিয়ে 'আলিফ-বা' পড়াবার সরকারী চাকরী পেলে আবার কী? দুনিয়া গড়লেই তো হল!
অথচ আল্লাহর রসূল তাঁর দুআয় বলতেন, وَلَا تَجْعَلْ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا .....
অর্থাৎ, (হে আল্লাহ!) তুমি দুনিয়াকে আমাদের বৃহত্তম চিন্তার বিষয় এবং আমাদের জ্ঞানের শেষ সীমা করো না। (তিরমিযী ৩৪৯৭নং)