📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 জিহাদ বর্জন

📄 জিহাদ বর্জন


জিহাদ মানে সংগ্রাম। মুসলিমরা দুনিয়ার জন্য সংগ্রাম করলেও দ্বীনের জন্য সংগ্রাম পরিত্যাগ করেছে। ইসলামকে সঠিক অর্থে দুনিয়ার মানুষের সামনে পেশ করতে শৈথিল্য করেছে, প্রয়োজনে জিহাদে পিছপা থেকেছে, তাই তারা পরাজয়ের শিকার হয়েছে। সঠিক জীবন-পথে জিহাদ নেই, জান-মালের জিহাদ নেই, কলম ও মুখের জিহাদ নেই। পক্ষান্তরে অবৈধ উপায়ে ধন-সংগ্রহে জিহাদ আছে, অবৈধ পার্থিব বিষয়ে জিহাদ আছে। জিহাদ নেই নিজেকে বৈধভাবে বাঁচাবার পথে। জিহাদ নেই জাতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার পথে, জিহাদ নেই জাতির কলঙ্কিত ভাবমূর্তির কলঙ্ক মুছার পথে। তাই তো জাতি অন্য জাতির কাছে অবহেলিত, পদদলিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, ঘৃণিত, অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও নিষ্পিষ্ট।

আল্লাহর রসূল বলেন, “যখন তোমরা 'ঈনাহ' (সূদী) ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” (মুসনাদে আহমদ ২/২৮, ৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২, বাইহাকী ৫/৩১৬)

তিনি আরো বলেন, "---এক জাতি হবে যারা গরুর লেজ ধরে চাষবাস করবে এবং জিহাদে বিমুখতা প্রকাশ করবে, তারা হবে ধ্বংস।” (আবু দাউদ ৪৩০৬, মিশকাত ৫৪৩২ নং)

প্রকাশ থাকে যে, জিহাদ মানে সন্ত্রাস নয় কখনই।

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 অপরাধ দৃষ্টিচ্যুত করা

📄 অপরাধ দৃষ্টিচ্যুত করা


আরবীতে দু'টি বিপরীতমুখী শব্দ আছে, ইফসাদ ও ইসলাহ। 'ইফসাদ' মানে ফাসাদ সৃষ্টি করা, অশান্তি সৃষ্টি করা, অন্যায় ও পাপাচার ক'রে বেড়ানো ইত্যাদি। পক্ষান্তরে 'ইসলাহ' মানে শান্তি স্থাপন করা, সংশোধন করা, সংস্কার করা, সদাচার করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিকার করা, সৎকাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দকাজে বাধা দেওয়া ইত্যাদি। ইফসাদ পরাজয় ও ধ্বংসের কারণ। আর ইসলাহ বিজয় ও সুখলাভের কারণ। জাতির মাঝে যখন ফাসাদ বেশি হয়, অন্যায়, দুর্নীতি, অবিচার ও অশান্তি ব্যাপক হয়, তখনই জাতির জীবনে ধ্বংস ও পরাজয় নেমে আসে।

মা যয়নাব বিন্তে জাহশ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, একদা নবী (সা.) শঙ্কিত অবস্থায় আমার নিকট প্রবেশ ক'রে বললেন, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই।) আসন্ন বিপদের দরুন আরবের মহাসর্বনাশ। আজই ইয়া'জুজ-মা'জুজের প্রাচীরে এই পরিমাণ ছিদ্র হয়ে গেছে।” এ কথা বলার সাথে সাথে তিনি তাঁর বৃদ্ধা ও তর্জনী আঙ্গুল দ্বারা গোলাকার বৃত্তি বানালেন (এবং ঐ ছিদ্রের পরিমাণের প্রতি ইঙ্গিত করলেন)। এ কথা শুনে আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মাঝে নেক লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যখন নোংরামির মাত্রা বেড়ে যাবে।” (বুখারী ৩৩৪৬, মুসলিম ২৮৮০নং)

মানুষ যদি নোংরামিতে রাজি থাকে, অন্যায়ে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি জাতি বাধা না দেয়, তাহলে আল্লাহর আযাব ব্যাপক হয়। মহানবী বলেন, "সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমরা অতি অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে বাধা দান করবে, নতুবা অনতিবিলম্বে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের উপর তাঁর কোন আযাব প্রেরণ করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নিকট দুআ করবে; কিন্তু তিনি তা মঞ্জুর করবেন না।” (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুল জামে' ৭০৭০নং)

তিনি আরো বলেন, "যে সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন ব্যক্তি যখন বিভিন্ন পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তখন সে ব্যক্তিকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি তারা তাকে বাধা না দেয় (এবং ঐ পাপাচরণ বন্ধ না করে), তাহলে তাদের জীবদ্দশাতেই আল্লাহ তাদেরকে তাঁর কোন শাস্তি ভোগ করান।" (আহমদ ৪/৩৬৪, আবু দাউদ ৪৩৩৯, ইবনে মাজাহ ৪০০৯, ইবনে হিব্বান, সহীহ আবু দাউদ ৩৬৪৬ নং)

তিনি আরো বলেন, "যে কোন সম্প্রদায়ে যখন পাপাচার চলতে থাকে, তখন তারা প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও যদি বন্ধ করার লক্ষ্যে কোন চেষ্টা-সাধনা না করে, তাহলে আল্লাহ ব্যাপকভাবে তাদের মাঝে আযাব প্রেরণ ক'রে থাকেন।” (সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৩৮নং)

কুইস বিন আবু হাযেম বলেন, একদা হযরত আবু বকর (রা.) দণ্ডায়মান হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা ক'রে বললেন, 'হে লোকসকল! তোমরা অবশ্যই এই আয়াত পাঠ ক'রে থাক--- [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لاَ يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ] (১০৫) سورة المائدة

অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের আত্মরক্ষা করাই কর্তব্য। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। (সূরা মাইদা ১০৫ আয়াত) কিন্তু আমরা আল্লাহর রসূল-কে বলতে শুনেছি যে, "লোকেরা যখন কোন গর্হিত (শরীয়ত-পরিপন্থী) কাজ দেখেও তার পরিবর্তন সাধনে যত্নবান হয় না, তখন অনতিবিলম্বে আল্লাহ তাদের জন্য তাঁর কোন শাস্তিকে ব্যাপক ক'রে দেন।” (আহমদ, আসহাবে সুনান, ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৩৬নং)

কেন সেই ধ্বংস আসবে, কেন শাস্তি ব্যাপক হবে? কেন হেঁটকার সাথে মসুরি পিষা যাবে? কেন গমের সাথে ঘুণও পিষা যাবে? তার উত্তর দিয়েছেন মহানবী। তিনি বলেছেন, "আল্লাহর নির্ধারিত সীমায় অবস্থানকারী (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধাদানকারী) এবং ঐ সীমা লংঘনকারী (উক্ত কাজে তোষামোদকারীর) উপমা হল এক সম্প্রদায়ের মত; যারা একটি দ্বিতলবিশিষ্ট পানি-জাহাজে লটারি করে কিছু লোক উপর তলায় এবং কিছু লোক নিচের তলায় স্থান নিল। (নিচের তলা সাধারণতঃ পানির ভিতরে ডুবে থাকে। তাই পানির প্রয়োজন হলে নিচের তলার লোকদেরকে উপর তলায় যেতে হয় এবং সেখান হতে সমুদ্র বা নদীর পানি তুলে আনতে হয়।) সুতরাং পানির প্রয়োজনে নিচের তলার লোকেরা উপর তলায় যেতে লাগল। (উপর তলার লোকদের উপর পানি পড়লে তারা তাদের উপর ভাগে আসা অপছন্দ করল। তারা বলেই দিল, 'তোমরা নিচে থেকে আমাদেরকে কষ্ট দিতে এসো না।') নিচের তলার লোকেরা বলল, 'আমরা যদি আমাদের ভাগে (নিচের তলায় কোন স্থানে) ছিদ্র ক'রে দিই, তাহলে (দিব্যি আমরা পানি ব্যবহার করতে পারব) আর উপর তলার লোকদেরকে কষ্টও দেব না। (এই পরিকল্পনার পর তারা যখন ছিদ্র করতে শুরু করল।) তখন যদি উপর তলার লোকেরা তাদেরকে নিজ ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয় (এবং সে কাজে বাধা না দেয়), তাহলে সকলেই (পানিতে ডুবে) ধ্বংস হয়ে যায়। (উপর তলার লোকেরা সে অন্যায় না করলেও রেহাই পেয়ে যাবে না।) পক্ষান্তরে উপর তলার লোকেরা যদি তাদের হাত ধরে (জাহাজে ছিদ্র করতে) বাধা দেয়, তাহলে তারা নিজেরাও বেঁচে যায় এবং সকলকেই বাঁচিয়ে নেয়।” (বুখারী ২৪৯৩, ২৬৮৬, তিরমিযী ২১৭৩নং)

সকল পাপের সাজা আল্লাহ দুনিয়ায় দেন না। কিন্তু যখন দেন, তখন তা ভূমি-ধস, আকৃতি-পরিবর্তন, ঝড়-ঝঞ্চা, তুফান-প্লাবন, ভূমিকম্প- আগ্নেয়গিরি, মহামারী, মড়ক রোগ-ব্যাধি ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে শায়েস্তা করেন। মহান আল্লাহ বলেন, [وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ] অর্থাৎ, এরূপই তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও; যখন তিনি কোন অত্যাচারী জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন। (হুদঃ ১০২)

অবশ্য জাতির মধ্যে সংস্কারের লোক থাকলে মহান আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন না। সংস্কার ও সংশোধনের কাজ যে যাবৎ চালু থাকবে, সে যাবৎ আল্লাহর কোন আযাব আসবে না। এটা আল্লাহর ওয়াদা, [فَلَوْلا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِنْ قَبْلِكُمْ أُولُو بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلاً مِمَّنْ أَنْجَيْنَا مِنْهُمْ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ * وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ] (هود: ১১৬ -১১৭)

অর্থাৎ, যেসব উম্মত তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে, আমি যাদেরকে রক্ষা করেছিলাম তাদের মধ্য হতে অল্প কতক ব্যতীত এমন সজ্জন ছিল না, যারা পৃথিবীতে অশান্তি ঘটাতে বাধা প্রদান করত। যালেমরা যে আরাম- আয়েশে ছিল, তার পিছনেই পড়ে রইল। আর তারা ছিল অপরাধী। আর তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস ক'রে দেন, অথচ ওর অধিবাসীরা সদাচারী থাকে। (হুদঃ ১১৬-১১৭)

পক্ষান্তরে সংস্কার ও সংশোধনের কাজ বন্ধ থাকলে অচিরে আল্লাহর আযাব এসে জাতিকে গ্রাস করে। মহান আল্লাহ বলেন, [وَكَانَ فِي الْمَدِينَةِ تِسْعَةُ رَهْطٍ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ .......] (النمل: ৪৮ - ৫৩) অর্থাৎ, সে শহরে ছিল নয় জন এমন ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করত না। ওরা বলল, 'তোমরা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ কর যে, আমরা রাত্রিকালে তাকে ও তার পরিবার-পরিজনকে অবশ্যই হত্যা করব; অতঃপর তার দাবিদারকে নিশ্চয় বলব, তার পরিবার-পরিজনকে হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি; আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।' ওরা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও চক্রান্ত করলাম, কিন্তু ওরা বুঝতে পারেনি। অতএব দেখ ওদের চক্রান্তের পরিণাম কি হয়েছে; আমি অবশ্যই ওদেরকে এবং ওদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি। এই তো তাদের বাড়ী-ঘর; তাদের সীমালংঘন হেতু তা জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। এতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে এবং যারা বিশ্বাসী ও সাবধানী ছিল, তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি। (নামঃ ৪৮-৫৩)

কোন কোন সময় আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ থাকে তাঁর খাস বান্দাদের প্রতি, তাই তাঁরা বিপদের মাঝেও বেঁচে যান। নচেৎ আম আযাবে ভাল- মন্দ সবাই নিষ্পিষ্ট হয়। বিশেষ ক'রে তখনকার ভাল লোকদের এই দোষ থাকে যে, তারা মন্দকাজে বাধা দেয় না। যেহেতু মন্দকাজের লোকেরা প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী থাকে অথবা নিজেরা তাদের সাথে খোশামদি ও তোষামোদির সাথে কালাতিপাত করে, তাই তাদেরকে ছাড়া হয় না।

অনেকে আঘাত পেয়ে বলে, 'কী দরকার, ঘরের খেয়ে বনের মোষ চরানো?' অনেকে বলে, 'নিজের চরকায় তেল দাও।' কেউ বলে, 'চাচা আপনা জান বাঁচা।' কেউ বলে, 'আপনি বাঁচলে বাপের নাম।' কেউ বলে, 'যে কাঠ খাবে, সে আঙ্গার হাগবে।' কেউ বলে, 'যে পাপ করবে, সে হিসাব দেবে, পরের তাতে নাক গলানোর দরকার কী?' এইভাবে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর মানুষেরা অপরাধীদের অপরাধকে দৃষ্টিচ্যুত করে। অপরের পাপ দেখেও চুপ থাকে। অথবা নিজের দুর্বলতম ঈমানের পরিচয় দিয়ে মুখে খিল এঁটে নেয়। যেহেতু সৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজে বাধা দিতে গেলে তাকে তাদের কাছে 'খারাপ' হতে হবে তাই।

সুতরাং অপরাধীদের কাছে 'ভাল' থেকে মোসাহেবি করে। অপরাধ দেখেও চুপ থাকে, প্রতিবাদ করে না। বলে, 'যে বিষয়ে আমরা একমত, সেই বিষয়ে মিলে-মিশে কাজ করি।' অথচ যে বিষয়ে অমত, সে বিষয় যদি শির্ক হয় অথবা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়, তাহলে সে বিষয়ে চুপ থাকলে যে তার অপরাধ ছোট নয়, তা বলাই বাহুল্য। অপরাধ দেখে চুপ থাকার যে অপরাধ ছিল মূসা (আ.)-এর জাতির, তার জন্য তাকে নর থেকে বানর জাতিতে পরিণত হয়ে ধ্বংস হতে হয়েছে। সে কথা মহান আল্লাহ বলেছেন, [فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ أَنْجَيْنَا الَّذِينَ يَنْهَوْنَ عَنْ السُّوءِ وَأَخَذْنَا الَّذِينَ ظَلَمُوا بِعَذَابٍ بَئِيسٍ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ (১৬৫) فَلَمَّا عَتَوْا عَنْ مَا نُهُوا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ] (১৬৬)

অর্থাৎ, যে উপদেশ তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা বিস্মৃত হল, তখন যারা মন্দ কাজে বাধা দান করত, তাদেরকে আমি উদ্ধার করলাম এবং যারা অত্যাচারী ছিল তারা সত্যত্যাগ করত বলে আমি তাদেরকে কঠোর শাস্তির সাথে পাকড়াও করলাম। অতঃপর তাদের জন্য যে কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সে কাজেও তারা যখন সীমালংঘন করতে লাগল, তখন আমি তাদেরকে বললাম, 'তোমরা ঘৃণিত বানরে পরিণত হও!' (আ'রাফঃ ১৬৫-১৬৬)

প্রতিবাদ ও প্রতিকার করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে জাতি পাপ দেখে 'মানবাধিকার' বা 'ব্যক্তি-স্বাধীনতা'র দোহাই দিয়ে চুপ থাকে, সে জাতি ইলাহী গযব থেকে নিষ্কৃতি পাবে না।

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 আবেগপ্রবণ হওয়া

📄 আবেগপ্রবণ হওয়া


বাপ-বেটায় পথ চলছিল। রাস্তায় বাপের পুরনো শত্রু এক জাঁদরেলের সাথে দেখা। সাক্ষাতের শুরুতেই জাঁদরেল বাপকে গালাগালি শুরু ক'রে দিল। তার প্রতিশোধ ও মুখ নিতে বেটাও গালাগালি শুরু করল। বেটার জোশ খুব বেশি, কিন্তু জ্ঞানে হুঁশ কম, দেহে শক্তি অল্প। তবুও লাফিয়ে লাফিয়ে জাঁদরেলকে বলতে লাগল, 'হারামজাদা! তোর দাঁত ভেঙ্গে দেব।' ---তোর আর তোর বাপের মাথা গুঁড়িয়ে দেব। ---আমার বাপের গায়ে হাত দে দেখি, তোর মাথা উড়িয়ে দেব।

জাঁদরেল তার বাপের মুখে মারল এক ঘুসি। তা দেখে বেটা বলল, 'শালা! আর একবার মার দেখি, তোর নাক ভেঙ্গে দেব!' আবারও জাঁদরেল তার বাপকে মারল। ছেলে আবারও একই কথা বলল। কিন্তু জাঁদরেলকে মারতে সে পারল না। পুনরায় জাঁদরেল নিরীহ বাপকে আর এক ঘুসি মারলে সে ছেলেকে বলল, 'চুপ কর! বাক্যেতে পর্বত, কিন্তু কার্যে তুলাকার। পারবি না তো মুখে ফুটানি কেন? ফুটানি না করলে তো বারবার আমাকে মারটা খেতে হয় না।'

জাতির মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যাদের লম্ফ-ঝম্পের কারণে জাতিকে মার খেতে হচ্ছে। তারা মুখে খুব তর্জন-গর্জন করে, কিন্তু কার্যতঃ তার ফলে জাতির জীবনে আরও জ্বালা আসে। তারা জাতির মায়ায় করতে চায় অনেক কিছু, কিন্তু বানাবার জায়গায় বিগড়ে দেয়। তারাই পানির ছিটা দিয়ে লগির গুঁতো খায়। মৌচাকে ঢিল মেরে মৌমাছির বিঁধুনি খায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। উল্টে জাতির জীবনে কলঙ্কের কালিমা প্রলিপ্ত হয়। তারা বলে আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে আল্লাহ বান্দাকে সাহায্য করেন। কিন্তু আল্লাহ তো কেবল তাঁর উপরে ভরসা করতেই বলেননি। তিনি বলেছেন,

[وَأَعِدُّوا لَهُم মَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِّبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهুমُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ] (৬০) سورة الأنفال

অর্থাৎ, তোমরা তাদের (মুকাবিলার) জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও সুসজ্জিত অশ্ব প্রস্তুত রাখ, এ দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু তথা তোমাদের শত্রুকে সন্ত্রস্ত করবে এবং এ ছাড়া অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ জানেন। আর আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি অত্যাচার করা হবে না। (আনফালঃ ৬০)

তাঁর রসূল বলেছেন, "উট বেঁধে আল্লাহর উপর ভরসা কর।” আর তিনি আল্লাহর উপর সবচেয়ে বেশি ভরসাকারী ও নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে লৌহবর্ম ও শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করতেন, হাতে অস্ত্র নিতেন। তাহলে আমাদের ক্ষেত্রে কি শুধু ভরসাই যথেষ্ট হবে?

তারা আবেগে পরিপ্লুত হয়ে আরো বলে, আল্লাহর নবী মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী নিয়ে বদর যুদ্ধে ১০০০ যোদ্ধার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। আমরা সংখ্যা ও শক্তিতে কম থাকলেও আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করবেন। তা অবশ্যই করবেন; যদি তাঁদের মতো আমাদের ঈমানী শক্তি থাকে। তাছাড়া তিনি কেবল ৩১৩ জন সাহাবীর জোরে যুদ্ধে জয়লাভ করেননি। তাঁদের সাথে ফিরিস্তাকেও যোদ্ধারূপে পাঠানো হয়েছিল। অথচ তারা জানে না যে, তাদের সাহায্যেও কোন ফিরিস্তা যোদ্ধারূপে আসবে কি না।

আবেগময় মনে তারা বাহ্যিক দিকটা দেখে, কিন্তু আভ্যন্তরিক আত্মিক দিকটার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না ক'রে আগুনে ঝাঁপ দেয়। ভাবে, তাদেরও আগুন বুঝি ইব্রাহীম নবীর মতো ফুলের বিছানা হয়ে যাবে! পরিশেষে বলি, আবেগ থাকা অবশ্যই ভাল, তবে তার লাগামহীন বেগ থাকা ভাল নয়, নচেৎ অনেক বেগ পেতে হয় সে আবেগ নিয়ে। গাড়ির স্পিড অনেক বেশি থাকা ভাল, কিন্তু তাতে ব্রেক থাকতে হয়। নচেৎ সে গাড়ি নিয়ে অচিরে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে সব কিছু হারাতে হয়। নিজের জীবন যায়, গাড়িতে সকল আরোহীর জীবনও সর্বনাশগ্রস্ত হয়। জাতির জীবন আশঙ্কায় পড়ে কৌশলহীন আবেগ-মথিত কিছু মাথার জন্য। আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত দিন।

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 বিলাসিতা

📄 বিলাসিতা


ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, বিভব ও বিলাসিতার আতিশয্যে বহু জাতি, বহু রাজা ধ্বংস হয়েছে। অতি শৌখিনতার ফলে নিজের গৌরব হারাতে হয়েছে। সুর, সুরা ও সুরমার নেশায় আমীর থেকে ফকীর হতে হয়েছে। সাধারণতঃ এই শ্রেণীর মানুষেরাই মদোন্মত্ত হয় এবং মদ-বিহল হয়ে সত্য প্রত্যাখ্যান করে। উপদেশকারীর উপদেশকে তুচ্ছজ্ঞান করে। ফলে তাদের অনিবার্য পরিণতি হয় অধঃপতন।

এমনই কিছু বিলাসী মানুষের কথা আল-কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে, যারা নবীর দাওয়াত পর্যন্ত উপেক্ষা করেছিল। চিত্ত-বিলাসী বিত্তশালীরা নবীকে অস্বীকার করেছিল। মহান আল্লাহ বলেন,

[وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُم بِهِ كَافِرُونَ] (৩৪)

অর্থাৎ, যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখনই সেখানকার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, 'তুমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।' (সাবা'ঃ ৩৪)

[وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِم مُّقْتَدُونَ] (২৩) سورة الزخرف

অর্থাৎ, এভাবে, তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখনই ওদের মধ্যে যারা বিত্তশালী ছিল তারা বলত, 'আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের অনুসারী পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।' (যুখরুফঃ ২৩)

[وَإِذَا أَرَدْنَا أَن تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا] (১৬) سورة الإسراء

অর্থাৎ, যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন ওর সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিদেরকে (সৎকর্ম করতে) আদেশ করি, অতঃপর তারা সেথায় অসৎকর্ম করে; ফলে ওর প্রতি দন্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং ওটাকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। (বানী ইস্রাঈলঃ ১৬)

অতিরিক্ত সুখ-বিলাস মানুষের মনে মরিচা ধরিয়ে দেয়। প্রবল শৌখিনতা ও বিষয়াসক্তি মানুষকে অন্ধ ও বধির ক'রে তোলে। যার ফলে তার হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, মায়া-মমতা মন থেকে মুছে যায়। আর তখন কোন আর্তের আর্তনাদ তার কর্ণগোচর হয় না, কোন হিতাকাঙ্ক্ষীর হিতোপদেশ তাকে প্রভাবান্বিত করতে পারে না। আনন্দের উন্মত্ততায় সে বুঝতে চেষ্টাও করে না যে, সে ধ্বংসের বিস্ফোরক পদার্থের স্তূপে বসে আনন্দ করছে।

এমন বিলাসী মানুষ বৈষয়িক কোন বিষয়ে তিক্ত-বিরক্ত হয় না। ঘন্টার পর ঘন্টা ধন-মাল ও বিলাস-বিভবের কথায় ক্ষান্ত-클লান্ত হয় না। কিন্তু পরকালের কথা বললে দু-পাঁচ মিনিটেই বিরক্তি আসে। আর মৃত্যুর কথা তো শুনতেই চায় না। ঘন্টার পর ঘন্টা গান শুনেও তার প্রাণ ভরে না, কিন্তু ক্ষণকাল কুরআন শুনতে তার গায়ে জ্বালা ধরে।

অন্তর শক্ত হয়ে যায়, ফলে সেই অবস্থায় কোন আযাব এলে তাতেও নাক সিঁটকায়! ধ্বংসকারিতাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে অবজ্ঞা করে। কিন্তু তাতে তার ধ্বংসের বিধিলিপি অবশ্যই খন্ডন হয় না। মহান আল্লাহ বলেন,

[فَلَمَّا رَأَوْهُ عَارِضًا مُسْتَقْبِلَ أَوْدِيَتِهِمْ قَالُوا هَذَا عَارِضٌ تُمْطِرُنَا بَلْ هُوَ مَا اسْتَعْجَلْتُم بِهِ رِيحٌ فِيهَا عَذَابٌ أَلِيمٌ (২৪) تُدَمِّرُ كُلَّ شَيْءٍ بِأَمْرِ رَبِّهَا فَأَصْبَحُوا لَا يُرَى إِلَّا مَسَاকِنُهُمْ كَذَلِكَ نَجْزِي الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ] (২৫) سورة الأحقاف

অর্থাৎ, অতঃপর যখন তাদের উপত্যকার দিকে তারা মেঘ আসতে দেখল, তখন তারা বলতে লাগল, 'ওটা তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দান করবে।' (হৃদ বলল,) 'বরং ওটাই তো তা, যা তোমরা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছ; এক ঝড়, যাতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। যা তার প্রতিপালকের নির্দেশে সবকিছুকে ধ্বংস ক'রে দেবে।' অতঃপর তাদের পরিণাম এই হল যে, তাদের বাসগৃহগুলো ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান রইল না। এভাবে আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি। (আহক্বাফঃ ২৪-২৫)

এই হল বিলাস-ঘটিত হৃদয় কঠিন হওয়ার শাস্তি, যা বিলাসীদেরকে অবশ্যই ভোগ করতে হয়।

পক্ষান্তরে আযাব দেখে তাদের মনে ভয় হওয়ার কথা ছিল, ভ্রান্তির ঘোর কেটে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা না হয়ে তাদের ভ্রম বৃদ্ধিই পেল। নিজেদের অবলম্বিত পথকেই সঠিক পথ বলেই বিশ্বাস করল। আর তার পরিণাম অবশ্যই ধ্বংস ছিল। মহান আল্লাহ বলেন,

[فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا وَلَكِن قَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ] (৪৩) سورة الأنعাম

অর্থাৎ, সুতরাং আমার শাস্তি যখন তাদের উপর আপতিত হল, তখন তারা বিনীত হল না কেন? অধিকন্তু তাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল এবং তারা যা করছিল, শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করল। (আনআমঃ ৪৩)

মানুষের অর্থনৈতিক ধ্বংসকারিতার মূলে রয়েছে এই বিলাসিতার আতিশয্য। মানুষ মাদক দ্রব্যের পশ্চাতে ফি বছর কোটি কোটি টাকা অপচয় করছে। অপচয় করছে গান-বাজনার পিছনে এবং প্রসাধন ও খেলাধুলা সহ আরো অন্যান্য বিলাস-ব্যসনে। এর পরেও কি ধ্বংসকারিতার জন্য অন্য কিছুকে দায়ী করা চলে? যে মহিলাদের জন্য ওয়াজেব ছিল, কেবল নিজ নিজ স্বামীর জন্য প্রসাধন ও সৌন্দর্য অবলম্বন করবে, সেই মহিলারা বাড়ির বাইরে অন্যের জন্য প্রসাধনে কত শত টাকা নষ্ট করে।

এ স্থলে কারুনের কথা ভেবে দেখা যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, “কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল। আমি তাকে ধনভান্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, 'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।' সে বলল, 'এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।' (ক্বাস্বাসঃ ৭৬-৭৮)

হিতাকাঙ্ক্ষীদের উপদেশের জবাবে সে এ কথা বলেছিল। যার অর্থ হল, উপার্জন ও ব্যবসার যে দক্ষতা আমার রয়েছে এ সম্পদ তো তারই ফসল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দানের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? এর দ্বিতীয় অর্থ হল, আল্লাহ আমাকে এই সম্পদ দিয়েছেন, যেহেতু তিনি জানেন যে, আমি এর উপযুক্ত। আর তিনি আমার জন্য এটি পছন্দ করেছেন। যেমন, অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ মানুষের অন্য একটি কথা উল্লেখ করেছেন, “মানুষকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করলে সে আমাকে আহবান করে; অতঃপর যখন আমি তাকে অনুগ্রহ প্রদান করি তখন সে বলে, 'আমি তো এ আমার জ্ঞানের মাধ্যমে লাভ করেছি।' বস্তুতঃ এ এক পরীক্ষা, কিন্তু ওদের অধিকাংশ জানে না।” (সূরা যুমার ৪৯ আয়াত) অর্থাৎ, আমাকে এই অনুগ্রহ এই জন্যই দান করা হয়েছে যেহেতু আল্লাহর জ্ঞানে আমি এর উপযুক্ত ছিলাম। অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, "দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর যখন আমি তাকে অনুগ্রহের আস্বাদ দিই, তখন সে বলেই থাকে, 'এ আমার প্রাপ্য।” (সূরা হা-মী-ম সাজদাহ ৫০ আয়াত) অর্থাৎ, আমি তো এর উপযুক্ত।

আল্লাহ বলেন, “সে (কারূন) কি জানত না যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার থেকেও শক্তিতে ছিল প্রবল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশালী? আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাও করা হবে না। কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।' আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, 'ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।' অতঃপর আমি কারুনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না। পূর্বদিন যারা তার (মত) মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল, 'দেখ, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন। দেখ, অকৃতজ্ঞরা সফলকাম হয় না।' (ঐঃ ৭৮-৮২)

কারুনের মত ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার অভিলাষী ব্যক্তিরা যখন কারুনের শিক্ষণীয় করুণ পরিণতি দেখল, তখন তারা বুঝল যে, ধন-দৌলত এই কথার প্রমাণ নয় যে, ধনবান ব্যক্তির উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট। সুতরাং দেখা যায় যে, আল্লাহ কাউকে মাল বেশি দেন, আবার কাউকেও কম। এর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের সাথে, যা একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানেন না। মালের আধিক্য তাঁর সন্তুষ্টির ও মাল না থাকা তাঁর অসন্তুষ্টির প্রমাণ বহন করে না। যেমন এসব মান-ইজ্জতের মাপকাঠিও নয়। পক্ষান্তরে মাল নিয়ে বিলাস-ব্যসনে মত্ত হয়ে অহংকার প্রদর্শন করলে, আল্লাহর ধ্বংস নেমে আসে।

যে জাতি পার্থিব ভোগ-বিলাসের মোহে পরকাল ভুলে যায়, সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু কবি বলেন, আমরা সে জাতি নই। তবুও আমরা সেই জাতিতে পরিণত হয়ে ধ্বংস হয়েছি এবং হতে চলেছি।

'নাহি মোরা জীব ভোগ-বিলাসের, শাহাদত ছিল কাম্য মোদের
ভিখারীর বেশে খলীফা যাদের শাসন করিল আধা জাহান।
তারা আজ পড়ে ঘুমায়ে বেহুশ বাহিরে বহিছে ঝড়-তুফান।।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00