📄 মতানৈক্য
মতের মিল না থাকাটা স্বাভাবিক। 'বিচিত্র বোধের এ ভুবন; লক্ষকোটি মন'। যত মন তত মত। তবুও বহু কিছুতে মিল আছে মনে-মনে। সেই মিলের দিকটা খেয়াল রেখে ঐক্য বজায় রাখলে জাতি অধঃপতনে পিছলে যাওয়া থেকে বাঁচতে পারে। কিন্তু বাস্তব বড় প্রতিকূল। কত বিষয় নিয়ে উম্মাহর ঐক্য ভেঙ্গে খান-খান হয়ে গেছে। আর ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে কেউ দাঁড়াতে পারে? জাতির সংবিধান শিখিয়েছে,
[وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ] (৪৬) سورة الأنفাল
অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া- বিবাদ করো না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন। (আনফালঃ ৪৬)
[وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ الله جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ মِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم মِّنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ] (১০৩) سورة آل عمران
অর্থাৎ, তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন) কে শক্ত ক'রে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের (দোযখের) প্রান্তে ছিলে, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তা হতে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার। (আলে ইমরানঃ ১০৩)
কিন্তু কোথায় তার আমল? মহানবী (সা.) মদীনায় ছিন্ন মালা গেঁথে সুন্দর সমাজ গড়লেন। পরস্পরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ক'রে সংহতিপূর্ণ দেশ গড়লেন। কিন্তু তাঁর তিরোধানের পর তৃতীয় খিলাফত কালে ফিতনা শুরু হয়ে গেল। মানব মনের সন্দিহান ও প্রবৃত্তির খেয়াল-খুশীর বশবর্তী হয়ে দল-মত তৈরি হল। উম্মাহর সোনার থালা ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে গেল। ইয়াহুদী ও মুনাফিক গোষ্ঠির চক্রান্তে পড়ে বহু মুসলিম সেই ফিতনার শিকার হয়ে গেল। খারেজী বা খাওয়ারেজ বিদ্রোহী দলের সৃষ্টি হল। ঐকবদ্ধ জামাআতের মাঝে বিচ্ছিন্নতার জন্ম হল। আলী (রা.)-এর খিলাফতকে কেন্দ্র ক'রে শিয়া ফির্কা সৃষ্টি হল। আজও উম্মতের একটা বিরাট অংশ সেই ফির্কার মতবাদ নিয়ে সঠিক ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকল।
তারপরেও অনেক ফির্কা সৃষ্টি হল, সুফীবাদ, দর্শনবাদ ইত্যাদি। সুন্নী ভাগ হল মযহাব সৃষ্টি ক'রে। নিজ নিজ ইমামের অন্ধ পক্ষপাতিত্ব বজায় রেখে নিজ নিজ মযহাব নিয়ে খোশ থাকল বিরাট সংখ্যক একদল মুসলিম। তাতেও দোষ ছিল না, যদি তারা আক্বীদায় আহলে সুন্নাহ অলজামাআহ হত। কিন্তু আক্বীদায় শির্ক থাকার ফলেও তাদের অনেকে ইসলামের সঠিক রাজপথ থেকে দূরে সরে থাকল। জামাআতী, তবলীগী, বেরেলী, দেওবন্দী নামেও দল বের হল। একদল অন্য দলকে 'কাফের' ফতোয়া দিয়ে আপোসের শত্রুতা বাড়িয়ে তুলল। সেই সাথে ধর্মনিরপেক্ষ নামক একটি মুসলিম নামধারী সমাজ তো রয়েছেই। রয়েছে রাজনৈতিক দলাদলির বিচ্ছিন্নতা। তাতে বাপ-বেটা, ভাই- ভাই, এমনকি স্বামী-স্ত্রীও বিরোধী দলের হয়ে ছিন্ন-ভিন্ন! সব মিলে জাতির এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়েছে বিজাতি। তারাও উক্ত দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ ক'রে 'সাম-দান-ভেদ-দন্ড' প্রয়োগ ক'রেছে এবং নানা আগ্রাসনের মাধ্যমে জাতিকে ভক্ষিত তৃণের মতো ক'রে ছেড়েছে।
অথচ 'ডিভাইড এন্ড রুল'-এর নীতি ছিল ফিরআউনের। মহান আল্লাহ বলেন, [إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءهُمْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ] (৪) سورة القصص
অর্থাৎ, ফিরআউন আপন দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিল এবং সেখানকার অধিবাসীবৃন্দকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ক'রে ওদের একটি শ্রেণীকে সে হীনবল করেছিল; সে ওদের পুত্রদেরকে হত্যা করত এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। নিঃসন্দেহে সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। (কাস্বাসঃ ৪)
কোন মুসলিম পারে না জাতির ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরাতে। যেহেতু মহান আল্লাহ তাঁর নবী (সা.)-কে বলেছেন, [إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهুম بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ] (১৫৯) سورة الأنعাম
অর্থাৎ, অবশ্যই যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। তিনিই তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদেরকে অবহিত করবেন। (আনআমঃ ১৫৯)
আর উম্মাহকে বলেছেন, [مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ (৩১) مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ] (৩২) سورة الروم
অর্থাৎ, তোমরা বিশুদ্ধ-চিত্তে তাঁর অভিমুখী হও; তাঁকে ভয় কর। যথাযথভাবে নামায পড় এবং অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে; প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত। (রুমঃ ৩১-৩২)
কিন্তু তবুও পাশ্চাত্যের রাজনীতি মুসলিম সমাজে প্রবিষ্ট হয়ে সমাজ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় দলের শহীদ মুসলিম নিজ দলের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত, তার দল-বিরোধী মানুষের প্রাণ নিতেও প্রস্তুত, চাহে সে নামাযী মুসলিম হোক না কেন, তাকে ঘর-ছাড়া করতে, তার ঘর- বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে, তার বিষয়-সম্পত্তি বোম দিয়ে উড়িয়ে দিতে তার কোন দ্বিধা নেই। রাজনীতির জন্য সন্ত্রাসের পথ বেছে নিতে তার কোন বাধা নেই। যেহেতু তখন সে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ নয়, তখন সে শুধুমাত্র পার্টির জন্য একনিষ্ঠ। সে তখন পার্টির জন্য সব কিছু দিতে পারে, আল্লাহর জন্য কিছু দিতে পারে না। সে পার্টির জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে, কিন্তু ইসলামের জন্য পার্টিকে ব্যবহার করে না। আর মুসলিম হয়ে কখনো বলে, 'সব ধর্ম সমান।' আবার কখনো বলে, 'ইসলামে রাজনীতি নেই।' অবশ্য শেষোক্ত কথাটি ঠিকই বলে। কারণ তার উদ্দেশ্য হল, তাদের বর্তমানের যে খুন-ধর্ষণের রাজনীতি, ভোটাভোটি ও ফাটাফাটির রাজনীতি, কাদা ছুঁড়াছুড়ির রাজনীতি, দলীয় কেশাকেশির রাজনীতি ইসলামে নেই।
শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, ইসলামী সংগঠনও নেতাদের পরস্পর হিংসাবশতঃ এবং পদের লালসার শিকার হয়ে ভেঙ্গে খান-খান হয়ে যাচ্ছে। পদ না পেলেই জামাআত পাল্টাচ্ছে, নচেৎ নতুন জামাআত গঠন করছে! অবশ্য এটা যে হবে, সে কথা বাস্তব। যেহেতু মহানবী (সা.) বলে গেছেন, "নিশ্চয় শয়তান এ ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়েছে যে, আরব দ্বীপে নামাযী (মুসলিম)রা তার পূজা করবে। তবে (এ বিষয়ে সুনিশ্চিত) যে, সে তাদের মধ্যে উস্কানি দিয়ে (উত্তেজনা সৃষ্টি ক'রে তাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব- কলহে লিপ্ত করতে সফল হবে।)” (মুসলিম)
সা'দ (রা.) বলেন, একদা আল্লাহর রসূল বনী মুআবিয়ার মসজিদে প্রবেশ ক'রে দু' রাকআত নামায পড়লেন। আমরাও তাঁর সাথে নামায পড়লাম। তিনি তাঁর প্রতিপালকের নিকট সুদীর্ঘ দুআ করলেন। অতঃপর ঘুরে বসে বললেন, “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তিনটি জিনিস প্রার্থনা করলাম। কিন্তু তিনি আমাকে দু'টি জিনিস দান করলেন এবং একটি জিনিস দিলেন না। আমি প্রার্থনা করলাম, তিনি যেন আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষ-কবলিত ক'রে ধ্বংস না করেন, তিনি আমাকে তা দিলেন। আমি চাইলাম, তিনি যেন আমার উম্মতকে বন্যা-কবলিত ক'রে ডুবিয়ে ধ্বংস না করেন, তিনি আমাকে তা দিলেন। আমি চাইলাম, তিনি যেন আমার উম্মতের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব না রাখেন, তিনি আমাকে তা দিলেন না।” (মুসলিম, মিশকাত ৩/২৫০)
খাব্বাব (রা.) বলেন, একদা আল্লাহর রসূল আমাদেরকে নিয়ে খুব লম্বা নামায পড়লেন। লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি এমন নামায পড়লেন, যা আগে পড়তেন না।' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, এটি ছিল আগ্রহ ও ভীতির নামায। আমি এতে আল্লাহর নিকট তিনটি জিনিস প্রার্থনা করলাম। কিন্তু তিনি আমাকে দু'টি জিনিস দান করলেন এবং একটি জিনিস দিলেন না। আমি প্রার্থনা করলাম, তিনি যেন আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষ-কবলিত ক'রে ধ্বংস না করেন, তিনি আমাকে তা দিলেন। আমি চাইলাম, তিনি যেন আমার উম্মতের উপর কোন পর-শত্রুকে আধিপত্য না দেন, তিনি আমাকে তা দিলেন। আমি চাইলাম, তিনি যেন আমার উম্মতের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব না রাখেন, তিনি আমাকে তা দিলেন না।” (তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত ৩/২৫০) অন্য এক বর্ণনায় আছে, "আমি চাইলাম, তিনি যেন তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত ক'রে এক দলকে অপর দলের নিপীড়নের আস্বাদ গ্রহণ না করান, কিন্তু তিনি আমাকে তা দিলেন না।” (সহীহহুল জামে' ২৪৩৩নং)
অবশ্য তাতে উম্মত সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। তবে অধঃপতনের একটি উন্মুক্ত পথ নিশ্চয়ই বটে।
📄 মুনাফিক্বী বা কপটতা
মুসলিমদের অধঃপতনের জন্য বহুলাংশে দায়ী তাদের সমাজে মিলে-মিশে বাসরত একটি গোষ্ঠি, যারা নামে মুসলিম, কামেও অনেক সময় নামায-রোযা করে, দাড়ি রাখে, টুপি লাগায়, কিন্তু তাদের অন্তর মুনাফিক্বী ও কপটতায় ভরতি। এরা আসলে মুসলিমদের ভালাই চায় না। পারলে তাদের ক্ষতি করে, তাদের অধোগতি পছন্দ করে। মুসলিমরা ইসলামের স্বর্ণযুগ থেকেই তাদের হাতে মার খেয়ে খেয়ে আসছে, তাদের চক্রান্তের শিকার হয়ে বহু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহুবার। আজও তাদের ছোবল থেকে মুক্ত নয় জাতি। এরা ঘরের শত্রু বিভীষণ। এরা জাতির ঘর-চোর। আর পর-চোরকে পার আছে, কিন্তু ঘর-চোরকে পার নেই। তাই জাতি তাদের অনিষ্টকারিতা থেকে বাঁচতে পারছে না। আর বাঁচতে পারছে না বলেই মার খাচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যায়ে এরা জাতির প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে বিজাতির হাতে জাতিকে বিক্রি ক'রে দিচ্ছে। সংস্কার, প্রগতি, উন্নয়নের নামে জাতির প্রকৃত রূপকে বিকৃত করছে। অনেকে বিজাতির চামচা হয়ে নিজ জাতির বড় খিয়ানত করছে। বিজাতির সভ্যতায় মুগ্ধ হয়ে অজ্ঞানে নিজের জাতিকে তুচ্ছ করছে। নিজের সভ্যতা না বুঝেই পরের সভ্যতাকে সুন্দর ভাবছে।
'ইসলামে তুমি দিয়ে কবর মুসলিম বলে কর ফখর
মুনাফিক তুমি সেরা বেদ্বীন, ইসলামে যারা করে যবেহ
তুমি তাদেরই হও তাবে তুমি জুতা-বওয়া তারই অধীন।'
তারা কবির এই কবিতার মূর্ত-প্রতীক। তারা তাগূতী 'ধর্ম-নিরপেক্ষতা'য় মুগ্ধ হয়ে ইসলামী আইন ও আদালতকে ঘৃণা করল। নিজেদের স্বার্থে আঘাত লাগছিল বলে অথবা নিজেদের গদি লাভের তাগীদে ইসলামী শাসন ও আদালত তুলে দিল। মুসলিমদের ঈমান ও আমলকে তুলে দিল বিজাতির হাতে। নামধারী মুসলিম নাস্তিকরা বিকিয়ে গেল বিজাতির হাতে, জাতিকেও বেচে দিল বিজাতির হাটে। কেউ কেউ নিজের কলম বিক্রি ক'রে জাতির মূলে কুঠারাঘাত করল। 'মৌলবাদী, সন্ত্রাসবাদী' প্রভৃতি নাম দিয়ে স্বজাতির বদনাম করল। তারা দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে বিক্রি করল। মহান আল্লাহ বলেন,
"মানুষের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যারা বলে, 'আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী', কিন্তু তারা বিশ্বাসী নয়। আল্লাহ এবং বিশ্বাসিগণকে তারা প্রতারিত করতে চায়, অথচ তারা যে নিজেদের ভিন্ন কাউকেও প্রতারিত করে না। এটা তারা অনুভব করতে পারে না। তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন ও তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাচারী। তাদেরকে যখন বলা হয়, 'পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না', তারা বলে, 'আমরা তো শান্তি স্থাপনকারীই।' সাবধান! এরাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু এরা এটা অনুভব করতে পারে না। যখন তাদের বলা হয়, 'অপরাপর লোকদের মত তোমারাও বিশ্বাস কর', তারা বলে, 'নির্বোধেরা যেরূপ বিশ্বাস করেছে আমরাও কি সেরূপ বিশ্বাস করব?' সাবধান! এরাই নির্বোধ, কিন্তু এরা জানে না। যখন তারা বিশ্বাসিগণের সংস্পর্শে আসে, তখন বলে, 'আমরা বিশ্বাস করেছি।' আর যখন তারা নিভৃতে তাদের দলপতিগণের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, 'আমরা তো তোমাদের সাথেই রয়েছি; আমরা শুধু তাদের সাথে পরিহাস ক'রে থাকি।' আল্লাহ তাদের সাথে পরিহাস করেন, আর তাদের অবাধ্যতায় তাদেরকে বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াবার অবকাশ দেন। এরাই সৎপথের বিনিময়ে ভ্রান্ত পথ ক্রয় করেছে। সুতরাং তাদের ব্যবসা লাভজনক হয়নি, তারা সৎপথে পরিচালিতও নয়। তাদের দৃষ্টান্ত, যেমন এক ব্যক্তি অগ্নি প্রজ্বলিত করল; তা যখন তার চারদিক আলোকিত করল, আল্লাহ তখন তাদের জ্যোতিঃ অপসারিত করলেন এবং তাদেরকে ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিলেন; তারা কিছুই দেখতে পায় না। তারা বধির, বোবা ও অন্ধ; সুতরাং তারা ফিরবে না। কিংবা যেমন আকাশের মুষলধারা বৃষ্টি, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ-চমক। বজ্রধ্বনিতে তারা মৃত্যুভয়ে তাদের কানে আঙ্গুল দেয়। আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। বিদ্যুৎ-চমক তাদের দৃষ্টি-শক্তিকে প্রায় কেড়ে নেয়। যখনই বিদ্যুতালোক তাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়, তারা তখনই পথ চলতে থাকে এবং যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তখন তারা থমকে দাঁড়ায়। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হরণ করতেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (বাক্বারাহঃ ৮-২০)
কী চমৎকার তাদের গুণাবলী! কী ভয়ানক তাদের কর্মাবলী! কত স্পষ্ট তাদের চক্রান্ত! কিন্তু তবুও জাতি কি তাদের হাত থেকে বাঁচতে পারছে? না। কারণ পুকুরের পানিতে কুমীর থাকলে সেখানে নামতে না দিয়ে ছেলেকে বাঁচানো যায়, কিন্তু ঘরের ঢেঁকিই যদি কুমীর হয়, তাহলে ছেলেকে বাঁচানো যাবে কীভাবে? যে জাতির উপরে উঠার সময় তারই কোন লোক পায়ে ধরে টান দিলে সে জাতি উপরে উঠে কীভাবে? যে পাত্রের নিচে চোরা ছিদ্র থাকে, সে পাত্র পরিপূর্ণ হয় কীভাবে?
আতান তুর্ক কামাল পাশার মতো পদস্থ মুসলমানরা, যাদের কাছে মুসলিম দ্বীনদার শিক্ষিত যুবকরা চাকরির জন্য গেলে যদি বলে, 'তোমাদের নবীর সুন্নত ছাগল চরানো, ছাগল চরিয়ে খাওগে। সরকারি চাকরি নিয়ে কী করবে?!' তাহলে জাতির পার্থিব মান বর্ধন হবে কীভাবে? সালমান রুশদী ও তাসলিমা নাসরীনের মতো মুনাফিক লেখকেরা যদি টাকা খেয়ে বিজাতির কাছে জাতির কুৎসা গায়, তাহলে সে জাতির ভাবমূর্তি বিশ্ব জন-মানবের কাছে বিকৃত হবে না কেন?
জাতির বহু লোকও আছে, যারা সেই মুনাফিকদের কথা শোনে। আর তার ফলে বিপদ আরো বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ বলেন, [لَوْ خَرَجُوا فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلا خَبَالاً ولأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ] (৪৭) سورة التوبة
অর্থাৎ, যদি তারা তোমাদের সাথে বের হত, তাহলে কেবল তোমাদের মাঝে বিভ্রাটই বৃদ্ধি করত এবং তারা তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছুটাছুটি করত। আর তোমাদের মধ্যে তাদের কতিপয় অনুগত (কথা শোনার লোক) রয়েছে। আল্লাহ যালেমদের সম্বন্ধে খুব অবগত আছেন। (তাওবাহঃ ৪৭)
📄 জিহাদ বর্জন
জিহাদ মানে সংগ্রাম। মুসলিমরা দুনিয়ার জন্য সংগ্রাম করলেও দ্বীনের জন্য সংগ্রাম পরিত্যাগ করেছে। ইসলামকে সঠিক অর্থে দুনিয়ার মানুষের সামনে পেশ করতে শৈথিল্য করেছে, প্রয়োজনে জিহাদে পিছপা থেকেছে, তাই তারা পরাজয়ের শিকার হয়েছে। সঠিক জীবন-পথে জিহাদ নেই, জান-মালের জিহাদ নেই, কলম ও মুখের জিহাদ নেই। পক্ষান্তরে অবৈধ উপায়ে ধন-সংগ্রহে জিহাদ আছে, অবৈধ পার্থিব বিষয়ে জিহাদ আছে। জিহাদ নেই নিজেকে বৈধভাবে বাঁচাবার পথে। জিহাদ নেই জাতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার পথে, জিহাদ নেই জাতির কলঙ্কিত ভাবমূর্তির কলঙ্ক মুছার পথে। তাই তো জাতি অন্য জাতির কাছে অবহেলিত, পদদলিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, ঘৃণিত, অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও নিষ্পিষ্ট।
আল্লাহর রসূল বলেন, “যখন তোমরা 'ঈনাহ' (সূদী) ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” (মুসনাদে আহমদ ২/২৮, ৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২, বাইহাকী ৫/৩১৬)
তিনি আরো বলেন, "---এক জাতি হবে যারা গরুর লেজ ধরে চাষবাস করবে এবং জিহাদে বিমুখতা প্রকাশ করবে, তারা হবে ধ্বংস।” (আবু দাউদ ৪৩০৬, মিশকাত ৫৪৩২ নং)
প্রকাশ থাকে যে, জিহাদ মানে সন্ত্রাস নয় কখনই।
📄 অপরাধ দৃষ্টিচ্যুত করা
আরবীতে দু'টি বিপরীতমুখী শব্দ আছে, ইফসাদ ও ইসলাহ। 'ইফসাদ' মানে ফাসাদ সৃষ্টি করা, অশান্তি সৃষ্টি করা, অন্যায় ও পাপাচার ক'রে বেড়ানো ইত্যাদি। পক্ষান্তরে 'ইসলাহ' মানে শান্তি স্থাপন করা, সংশোধন করা, সংস্কার করা, সদাচার করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিকার করা, সৎকাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দকাজে বাধা দেওয়া ইত্যাদি। ইফসাদ পরাজয় ও ধ্বংসের কারণ। আর ইসলাহ বিজয় ও সুখলাভের কারণ। জাতির মাঝে যখন ফাসাদ বেশি হয়, অন্যায়, দুর্নীতি, অবিচার ও অশান্তি ব্যাপক হয়, তখনই জাতির জীবনে ধ্বংস ও পরাজয় নেমে আসে।
মা যয়নাব বিন্তে জাহশ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, একদা নবী (সা.) শঙ্কিত অবস্থায় আমার নিকট প্রবেশ ক'রে বললেন, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই।) আসন্ন বিপদের দরুন আরবের মহাসর্বনাশ। আজই ইয়া'জুজ-মা'জুজের প্রাচীরে এই পরিমাণ ছিদ্র হয়ে গেছে।” এ কথা বলার সাথে সাথে তিনি তাঁর বৃদ্ধা ও তর্জনী আঙ্গুল দ্বারা গোলাকার বৃত্তি বানালেন (এবং ঐ ছিদ্রের পরিমাণের প্রতি ইঙ্গিত করলেন)। এ কথা শুনে আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মাঝে নেক লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যখন নোংরামির মাত্রা বেড়ে যাবে।” (বুখারী ৩৩৪৬, মুসলিম ২৮৮০নং)
মানুষ যদি নোংরামিতে রাজি থাকে, অন্যায়ে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি জাতি বাধা না দেয়, তাহলে আল্লাহর আযাব ব্যাপক হয়। মহানবী বলেন, "সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমরা অতি অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে বাধা দান করবে, নতুবা অনতিবিলম্বে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের উপর তাঁর কোন আযাব প্রেরণ করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নিকট দুআ করবে; কিন্তু তিনি তা মঞ্জুর করবেন না।” (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুল জামে' ৭০৭০নং)
তিনি আরো বলেন, "যে সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন ব্যক্তি যখন বিভিন্ন পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তখন সে ব্যক্তিকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি তারা তাকে বাধা না দেয় (এবং ঐ পাপাচরণ বন্ধ না করে), তাহলে তাদের জীবদ্দশাতেই আল্লাহ তাদেরকে তাঁর কোন শাস্তি ভোগ করান।" (আহমদ ৪/৩৬৪, আবু দাউদ ৪৩৩৯, ইবনে মাজাহ ৪০০৯, ইবনে হিব্বান, সহীহ আবু দাউদ ৩৬৪৬ নং)
তিনি আরো বলেন, "যে কোন সম্প্রদায়ে যখন পাপাচার চলতে থাকে, তখন তারা প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও যদি বন্ধ করার লক্ষ্যে কোন চেষ্টা-সাধনা না করে, তাহলে আল্লাহ ব্যাপকভাবে তাদের মাঝে আযাব প্রেরণ ক'রে থাকেন।” (সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৩৮নং)
কুইস বিন আবু হাযেম বলেন, একদা হযরত আবু বকর (রা.) দণ্ডায়মান হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা ক'রে বললেন, 'হে লোকসকল! তোমরা অবশ্যই এই আয়াত পাঠ ক'রে থাক--- [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لاَ يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ] (১০৫) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের আত্মরক্ষা করাই কর্তব্য। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। (সূরা মাইদা ১০৫ আয়াত) কিন্তু আমরা আল্লাহর রসূল-কে বলতে শুনেছি যে, "লোকেরা যখন কোন গর্হিত (শরীয়ত-পরিপন্থী) কাজ দেখেও তার পরিবর্তন সাধনে যত্নবান হয় না, তখন অনতিবিলম্বে আল্লাহ তাদের জন্য তাঁর কোন শাস্তিকে ব্যাপক ক'রে দেন।” (আহমদ, আসহাবে সুনান, ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৩৬নং)
কেন সেই ধ্বংস আসবে, কেন শাস্তি ব্যাপক হবে? কেন হেঁটকার সাথে মসুরি পিষা যাবে? কেন গমের সাথে ঘুণও পিষা যাবে? তার উত্তর দিয়েছেন মহানবী। তিনি বলেছেন, "আল্লাহর নির্ধারিত সীমায় অবস্থানকারী (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধাদানকারী) এবং ঐ সীমা লংঘনকারী (উক্ত কাজে তোষামোদকারীর) উপমা হল এক সম্প্রদায়ের মত; যারা একটি দ্বিতলবিশিষ্ট পানি-জাহাজে লটারি করে কিছু লোক উপর তলায় এবং কিছু লোক নিচের তলায় স্থান নিল। (নিচের তলা সাধারণতঃ পানির ভিতরে ডুবে থাকে। তাই পানির প্রয়োজন হলে নিচের তলার লোকদেরকে উপর তলায় যেতে হয় এবং সেখান হতে সমুদ্র বা নদীর পানি তুলে আনতে হয়।) সুতরাং পানির প্রয়োজনে নিচের তলার লোকেরা উপর তলায় যেতে লাগল। (উপর তলার লোকদের উপর পানি পড়লে তারা তাদের উপর ভাগে আসা অপছন্দ করল। তারা বলেই দিল, 'তোমরা নিচে থেকে আমাদেরকে কষ্ট দিতে এসো না।') নিচের তলার লোকেরা বলল, 'আমরা যদি আমাদের ভাগে (নিচের তলায় কোন স্থানে) ছিদ্র ক'রে দিই, তাহলে (দিব্যি আমরা পানি ব্যবহার করতে পারব) আর উপর তলার লোকদেরকে কষ্টও দেব না। (এই পরিকল্পনার পর তারা যখন ছিদ্র করতে শুরু করল।) তখন যদি উপর তলার লোকেরা তাদেরকে নিজ ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয় (এবং সে কাজে বাধা না দেয়), তাহলে সকলেই (পানিতে ডুবে) ধ্বংস হয়ে যায়। (উপর তলার লোকেরা সে অন্যায় না করলেও রেহাই পেয়ে যাবে না।) পক্ষান্তরে উপর তলার লোকেরা যদি তাদের হাত ধরে (জাহাজে ছিদ্র করতে) বাধা দেয়, তাহলে তারা নিজেরাও বেঁচে যায় এবং সকলকেই বাঁচিয়ে নেয়।” (বুখারী ২৪৯৩, ২৬৮৬, তিরমিযী ২১৭৩নং)
সকল পাপের সাজা আল্লাহ দুনিয়ায় দেন না। কিন্তু যখন দেন, তখন তা ভূমি-ধস, আকৃতি-পরিবর্তন, ঝড়-ঝঞ্চা, তুফান-প্লাবন, ভূমিকম্প- আগ্নেয়গিরি, মহামারী, মড়ক রোগ-ব্যাধি ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে শায়েস্তা করেন। মহান আল্লাহ বলেন, [وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ] অর্থাৎ, এরূপই তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও; যখন তিনি কোন অত্যাচারী জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন। (হুদঃ ১০২)
অবশ্য জাতির মধ্যে সংস্কারের লোক থাকলে মহান আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন না। সংস্কার ও সংশোধনের কাজ যে যাবৎ চালু থাকবে, সে যাবৎ আল্লাহর কোন আযাব আসবে না। এটা আল্লাহর ওয়াদা, [فَلَوْلا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِنْ قَبْلِكُمْ أُولُو بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلاً مِمَّنْ أَنْجَيْنَا مِنْهُمْ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ * وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ] (هود: ১১৬ -১১৭)
অর্থাৎ, যেসব উম্মত তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে, আমি যাদেরকে রক্ষা করেছিলাম তাদের মধ্য হতে অল্প কতক ব্যতীত এমন সজ্জন ছিল না, যারা পৃথিবীতে অশান্তি ঘটাতে বাধা প্রদান করত। যালেমরা যে আরাম- আয়েশে ছিল, তার পিছনেই পড়ে রইল। আর তারা ছিল অপরাধী। আর তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস ক'রে দেন, অথচ ওর অধিবাসীরা সদাচারী থাকে। (হুদঃ ১১৬-১১৭)
পক্ষান্তরে সংস্কার ও সংশোধনের কাজ বন্ধ থাকলে অচিরে আল্লাহর আযাব এসে জাতিকে গ্রাস করে। মহান আল্লাহ বলেন, [وَكَانَ فِي الْمَدِينَةِ تِسْعَةُ رَهْطٍ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ .......] (النمل: ৪৮ - ৫৩) অর্থাৎ, সে শহরে ছিল নয় জন এমন ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করত না। ওরা বলল, 'তোমরা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ কর যে, আমরা রাত্রিকালে তাকে ও তার পরিবার-পরিজনকে অবশ্যই হত্যা করব; অতঃপর তার দাবিদারকে নিশ্চয় বলব, তার পরিবার-পরিজনকে হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি; আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।' ওরা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও চক্রান্ত করলাম, কিন্তু ওরা বুঝতে পারেনি। অতএব দেখ ওদের চক্রান্তের পরিণাম কি হয়েছে; আমি অবশ্যই ওদেরকে এবং ওদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি। এই তো তাদের বাড়ী-ঘর; তাদের সীমালংঘন হেতু তা জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। এতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে এবং যারা বিশ্বাসী ও সাবধানী ছিল, তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি। (নামঃ ৪৮-৫৩)
কোন কোন সময় আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ থাকে তাঁর খাস বান্দাদের প্রতি, তাই তাঁরা বিপদের মাঝেও বেঁচে যান। নচেৎ আম আযাবে ভাল- মন্দ সবাই নিষ্পিষ্ট হয়। বিশেষ ক'রে তখনকার ভাল লোকদের এই দোষ থাকে যে, তারা মন্দকাজে বাধা দেয় না। যেহেতু মন্দকাজের লোকেরা প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী থাকে অথবা নিজেরা তাদের সাথে খোশামদি ও তোষামোদির সাথে কালাতিপাত করে, তাই তাদেরকে ছাড়া হয় না।
অনেকে আঘাত পেয়ে বলে, 'কী দরকার, ঘরের খেয়ে বনের মোষ চরানো?' অনেকে বলে, 'নিজের চরকায় তেল দাও।' কেউ বলে, 'চাচা আপনা জান বাঁচা।' কেউ বলে, 'আপনি বাঁচলে বাপের নাম।' কেউ বলে, 'যে কাঠ খাবে, সে আঙ্গার হাগবে।' কেউ বলে, 'যে পাপ করবে, সে হিসাব দেবে, পরের তাতে নাক গলানোর দরকার কী?' এইভাবে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর মানুষেরা অপরাধীদের অপরাধকে দৃষ্টিচ্যুত করে। অপরের পাপ দেখেও চুপ থাকে। অথবা নিজের দুর্বলতম ঈমানের পরিচয় দিয়ে মুখে খিল এঁটে নেয়। যেহেতু সৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজে বাধা দিতে গেলে তাকে তাদের কাছে 'খারাপ' হতে হবে তাই।
সুতরাং অপরাধীদের কাছে 'ভাল' থেকে মোসাহেবি করে। অপরাধ দেখেও চুপ থাকে, প্রতিবাদ করে না। বলে, 'যে বিষয়ে আমরা একমত, সেই বিষয়ে মিলে-মিশে কাজ করি।' অথচ যে বিষয়ে অমত, সে বিষয় যদি শির্ক হয় অথবা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়, তাহলে সে বিষয়ে চুপ থাকলে যে তার অপরাধ ছোট নয়, তা বলাই বাহুল্য। অপরাধ দেখে চুপ থাকার যে অপরাধ ছিল মূসা (আ.)-এর জাতির, তার জন্য তাকে নর থেকে বানর জাতিতে পরিণত হয়ে ধ্বংস হতে হয়েছে। সে কথা মহান আল্লাহ বলেছেন, [فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ أَنْجَيْنَا الَّذِينَ يَنْهَوْنَ عَنْ السُّوءِ وَأَخَذْنَا الَّذِينَ ظَلَمُوا بِعَذَابٍ بَئِيسٍ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ (১৬৫) فَلَمَّا عَتَوْا عَنْ مَا نُهُوا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ] (১৬৬)
অর্থাৎ, যে উপদেশ তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা বিস্মৃত হল, তখন যারা মন্দ কাজে বাধা দান করত, তাদেরকে আমি উদ্ধার করলাম এবং যারা অত্যাচারী ছিল তারা সত্যত্যাগ করত বলে আমি তাদেরকে কঠোর শাস্তির সাথে পাকড়াও করলাম। অতঃপর তাদের জন্য যে কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সে কাজেও তারা যখন সীমালংঘন করতে লাগল, তখন আমি তাদেরকে বললাম, 'তোমরা ঘৃণিত বানরে পরিণত হও!' (আ'রাফঃ ১৬৫-১৬৬)
প্রতিবাদ ও প্রতিকার করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে জাতি পাপ দেখে 'মানবাধিকার' বা 'ব্যক্তি-স্বাধীনতা'র দোহাই দিয়ে চুপ থাকে, সে জাতি ইলাহী গযব থেকে নিষ্কৃতি পাবে না।