📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 হীনমন্যতা

📄 হীনমন্যতা


পরাজয়ের একটি কারণ হীনম্মন্যতা। কোন কোন মানুষ ভাবে, সে বড় কাজের যোগ্য নয়, সে বিজয় লাভের উপযুক্ত নয়। অনেকে চাইলে গোটা ফুল বাগান পেত, কিন্তু তারা গোটা কতক ফুল নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে।

কত বুযুর্গ বুখারীর তাদরীস ছেড়ে দুনিয়ার লোভে সরকারী স্কুলে 'আলিফ-বা' পড়াচ্ছেন। কত বড় বড় ডিগ্রী অর্জন ক'রে পরিশেষে প্রাইমারীর শিক্ষকতা করছেন! তাঁরা তাঁদের ইলমের যাকাতও বের করেন না। ঐ হীনম্মন্যতার শিকারে পরিণত হন, 'আমাদের সে ক্ষমতা নেই সাহেব!' অবশ্য তাঁরা পার্থিব বিষয়ে মহা-বিজয় লাভ করেন।

অনেকে চাকরি না পেয়ে বসে বসে অথবা চাষ-ব্যবসা নিয়ে নিজের শিক্ষা বিনষ্ট ক'রে ফেলছেন। অনেকের ক্ষমতা আছে কলমের জিহাদ করা, অথচ হীনম্মন্যতার শিকার হয়ে সে প্রতিভা হেলায় নষ্ট ক'রে দিচ্ছেন। অনেকের মনে কিছু করার সৎ সাহস নেই, মনে উদ্দীপনা ও উৎসাহ নেই। তাই ঝিমিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। ফলে জাতির কোন কল্যাণে তাঁদেরকে দেখা যায় না। শ্রেষ্ঠ জাতির মধ্যে শামিলও হতে চান না। অথচ তাঁদের উপর জাতির হক আছে।

পাহাড়ে চড়তে হলে সাহস লাগে। আর সাহস না থাকলে, উঁচু মন না থাকলে, হিম্মত না থাকলে গর্তের মধ্যেই থেকে যেতে হয়। আরবী কবি বলেন, 'ওয়ামান ইয়াতাহাইয়্যাব সুঊদাল জিবালি ইয়াঈশ আবাদাদ্দাহরি বাইনাল হুফার।' অর্থাৎ, যে ব্যক্তি পাহাড় চড়তে ভয় পায়, সে চিরদিন গর্তের মধ্যেই বাস করে।

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 ভীতি ও ত্রাস

📄 ভীতি ও ত্রাস


অধঃপতনের মূলে এটিও একটি কারণ। যেহেতু মৃত্যুর ত্রাসে সন্ত্রস্ত হলে মানুষ মরার আগেই মরতে বসে। আর ভয় পাওয়ার কারণ, সে বিজাতির শক্তি, বিজাতির শৌর্য-বীর্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখে ভীষণভাবে প্রভাবান্বিত হয়। ফলে তখন সে নিজের আসল পরিচয় দিতেও ভয় পায়। আত্মগোপন ক'রে বাঁচতে চায়। যাতে সে কোন ফিতনা ও পরীক্ষার সম্মুখীন না হয়। সে ভাবে ঈমানের পথ কুসুমাস্তীর্ণ। অথচ তা নয়। ঈমানের পথ কণ্টকাকীর্ণ ও দুর্গম। মহান আল্লাহ বলেন, [أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ (২) وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ] (৩) سورة العنكبوت

অর্থাৎ, মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা বিশ্বাস করি' এ কথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না ক'রে ছেড়ে দেওয়া হবে? আমি অবশ্যই এদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; সুতরাং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। (আনকাবুতঃ ২-৩)

মহান আল্লাহ ঈমানী সত্যতার পরীক্ষা গ্রহণ করবেন। আর মু'মিনকে শত বাধা উল্লংঘন ক'রে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কিন্তু যে জাতি সেই পরীক্ষার সম্মুখীন হতেই চায় না, সেই জাতির অবস্থায় কি উচ্চ মর্যাদা আসতে পারে? যে জাতি নিজের অধিকার আদায়ে মানুষের সমালোচনাকে ভয় পায়, গালি-প্রহারকে ভয় পায়, জেল যেতে ভয় পায়, শহীদ হতে ভয় পায়, সে জাতি কি উন্নতির মুখ দেখতে পায়? যে জাতি বাঁচার জন্য মরতে ভয় পায়, সে জাতি কি বাঁচার অধিকার লাভ করতে পারে?

আল্লাহর রসূল বলেন, "অনতি দূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজপাত্রের উপর একত্রিত হয়। (এবং চারিদিক থেকে ভোজন ক'রে থাকে।)” একজন বলল, 'আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।” একজন বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! দুর্বলতা কী?' তিনি বললেন, “দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া।” (আবু দাউদ ৪২৯৭, মুসনাদে আহমাদ ৫/২৭৮)

জেনে রাখা ভাল যে, শত্রুর অবস্থানের বহু ক্রোশ দূর থেকে বীরত্ব প্রকাশ করা যেমন আসলে ভীরুতা, তেমনি নিরপরাধ সাধারণ মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি ক'রে সন্ত্রাস প্রয়োগ করাও বড় ভীরুতা। শক্তিমত্তার সাথে শত্রুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনে মোকাবিলা করাই হল আসল বীরত্ব।

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 দেশগত জাতীয়তাবাদ

📄 দেশগত জাতীয়তাবাদ


জাতীয়তাবাদের অভিশাপে পড়ে মুসলিম উম্মাহ বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়ে অধঃপতনের অতল তলে তলিয়ে যেতে পারে। মুসলিমদের শত্রুরা জানে, জাতীয়তাবাদের কুঠারে মুসলিমদেরকে বিভিন্ন খন্ডে ছিন্ন ছিন্ন করা যায়। আর তাই তারা জাতীয়তাবাদের নামে তাদেরকে উস্কানি দিয়ে পরস্পরকে শত্রুভাবাপন্ন ক'রে তুলতে সার্থক হয়েছে। আরবী জাতীয়তাবাদ, তুর্কী জাতীয়তাবাদ, কুর্দী জাতীয়তাবাদ, আফ্রিকী জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি নাম দিয়ে এককে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলে ফায়দা লুটার শত চেষ্টা করা হচ্ছে। আর তার ফলে মুসলিম জাতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অথচ ইসলাম এসেছে কেবল 'মুসলিম' জাতীয়তাবাদের নাম নিয়ে। তওহীদের পতাকাতলে সকল উম্মাহকে সুসংহত জাতিরূপে প্রতিষ্ঠা করতে। ইসলামে কোন বর্ণ-বৈষম্য নেই। সাদা-কালোর ভেদাভেদ নেই। ভৌগলিক সীমারেখার বিচ্ছিন্নতা নেই। ইসলাম 'আরব' বা 'আরবী' দেশ বা ভাষার নাম নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। ইসলাম 'মক্কা' বা 'মদীনা' শহরের নাম নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। ইসলাম 'কুরাইশ' গোত্রের নাম নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। বরং মদীনায় প্রসিদ্ধ দু'টি গোত্র ছিল, আওস ও খাযরাজ। তাদের মাঝে গোত্রীয় কোন্দল প্রায় লেগেই থাকত। ইসলাম এসে তাদের সে আপোস-বিরোধ দূরীভূত ক'রে সুন্দর ঐক্য সৃষ্টি করল।

একদা আনসারের উক্ত গোত্র-দু'টি কোন এক মজলিসে এক সাথে বসে আলাপ-আলোচনা করছিল। ইত্যবসরে শাস বিন ক্বাইস ইয়াহুদী তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের পারস্পরিক এই সৌহার্দ্য দেখে জ্বলে উঠল। যারা একে অপরের কঠোর শত্রু ছিল, তারা আজ ইসলামের বর্কতে দুধে চিনির মত পরস্পর অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে! সে একজন যুবককে দায়িত্ব দিল যে, তুমি তাদের মাঝে গিয়ে সেই 'বুআষ' যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দাও, যা হিজরতের পূর্বে তাদের মাঝে সংঘটিত হয়েছিল এবং সেই যুদ্ধে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যে বীরত্ব প্রকাশক কবিতাগুলো পড়েছিল, তা ওদেরকে শুনাও। সে যুবক গিয়ে তা-ই করল। ফলে উভয় গোত্রের পূর্বের আক্রোশ-আগুন পুনরায় জ্বলে উঠলো এবং পরস্পরকে গালাগালি করতে লাগল। এমনকি অস্ত্র ধারণের জন্য একে অপরকে ডাকাডাকি শুরু ক'রে দিল। তারা আপোসে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। এমন সময় রসূল উপস্থিত হয়ে তাদেরকে বুঝালেন। তারা বিরত হয়ে গেল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

[وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ الله جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاء فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ] (১০৩) سورة آل عمران

অর্থাৎ, তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন) কে শক্ত ক'রে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের (দোযখের) প্রান্তে ছিলে, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তা হতে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার। (আলে ইমরানঃ ১০৩)

বর্তমানে দলে দলে বিভক্ত হওয়ার দৃশ্য আমাদের সামনেই রয়েছে। কুরআন ও হাদীস বোঝার এবং তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়ে পারস্পরিক কিছু মতপার্থক্য থাকলেও তা কিন্তু দলে দলে বিভক্ত হওয়ার কারণ নয়। এ ধরনের বিরোধ তো সাহাবী ও তাবেঈনদের যুগেও ছিল, কিন্তু তাঁরা ফির্কাবন্দী সৃষ্টি করেননি এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েও যাননি। কারণ, তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সকলের আনুগত্য ও আক্বীদার মূল কেন্দ্র ছিল একটাই। আর তা হল, কুরআন এবং হাদীসে রসূল (সা.)। কিন্তু যখন ব্যক্তিত্বের নামে চিন্তা ও গবেষণা কেন্দ্রের আবির্ভাব ঘটল, তখন আনুগত্য ও আক্বীদার মূল কেন্দ্র পরিবর্তন হয়ে গেল। আপন আপন ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের উক্তি ও মন্তব্যসমূহ প্রথম স্থান দখল করল এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উক্তিসমূহ দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হল। আর এখান থেকেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা শুরু হল; যা দিনে দিনে বাড়তেই লাগল এবং বড় শক্তভাবে জাতির মনে বদ্ধমূল হয়ে গেল। (আহসানুল বায়ান)

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব

📄 অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব


অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব হল: দলীল, যুক্তি, ন্যায়-অন্যায় না দেখে অন্ধভাবে বিশেষ ব্যক্তি, দল, ভাষা বা দেশের পক্ষপাতিত্ব করা। বাতিলের তরফদারি করা, হক গ্রহণ না ক'রে হঠকারিতায় অবিচল থাকা। ধনবত্তা ও নেতৃত্বের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকার ফলে ধনী ও নেতারা ভাবে, সকল কল্যাণের একচেটিয়া অধিকার তাদেরই। গরীবরা কোন কিছুতে বড় হতে পারে না। গরীবদের মধ্যে কারো প্রতিভার বিকাশ ঘটলে তা ধনীরা ভাল মনে মেনে নেবে কেন? মক্কার ধনী ও নেতারাও তাই মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর গরীব শিষ্যদেরকে মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারত না। আল্লাহ সে কথা বলেছেন, [وَكَذَلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لِّيَقُولُوا أَهَؤُلاء মَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّن بَيْنِنَا أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّاكِرِينَ] (৫৩) سورة الأنعাম

অর্থাৎ, এভাবে তাদের এক দলকে অন্য দল দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যেন তারা বলে যে, 'আমাদের মধ্যে কি তাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন?' আল্লাহ কি কৃতজ্ঞগণ সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত নন? (আনআমঃ ৫৩)

ইসলামের সূচনায় বেশীর ভাগ গরীব এবং ক্রীতদাস শ্রেণীর লোকেরাই মুসলমান হয়েছিল। এই জন্য এই জিনিসটাই কাফের নেতাদের পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ালো এবং তারা এই গরীবদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপও করত এবং যাদের উপর এদের কর্তৃত্ব চলত, তাদের উপর যুলুম-নির্যাতনের রোলার চালাত ও বলত যে, 'এরাই কি সেই লোক, যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন?' উদ্দেশ্য তাদের এই ছিল যে, ঈমান ও ইসলাম যদি বাস্তবিকই আল্লাহর অনুগ্রহ হত, তবে তা সর্বপ্রথম আমাদের উপর হত। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, [وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا لَوْ كَانَ خَيْرًا مَّا سَبَقُونَا إِلَيْهِ] (১১) الأحقاف

অর্থাৎ, বিশ্বাসীদের সম্পর্কে অবিশ্বাসীরা বলে, 'এটা ভাল হলে তারা এর দিকে আমাদের অগ্রগামী হত না।' (আহক্বাফঃ ১১) অর্থাৎ, এই দুর্বলদের পূর্বে আমরাই মুসলমান হয়ে যেতাম। বিলাল, আম্মার, সুহাইব ও খাব্বাব (রা.)-এর মত মুসলিমরা ছিলেন মক্কার মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতার সৌভাগ্য লাভে তাঁরাই ধন্য হন। এ দেখে মক্কার কাফেররা বলত যে, এই দ্বীনে যদি কোন কল্যাণ থাকত, তবে আমাদের মত সম্মানী ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই সর্বপ্রথম তা গ্রহণ করত, ওরা আমাদের আগে ঈমান আনতে পারত না।

কিন্তু মহান আল্লাহ বাহ্যিক চাকচিক্য, মান-মর্যাদা এবং নেতাসুলভ ভাব-ভঙ্গিমার প্রতি লক্ষ্য করেন না। তিনি তো অন্তরের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করেন এবং এই দিক দিয়ে তিনি জানেন যে, কে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা এবং সত্যকে চিনেছে কে? তাই তিনি যার মধ্যে কৃতজ্ঞতার গুণ দেখেছেন, তাকে ঈমানের সৌভাগ্য দানে ধন্য করেছেন। যেমন, হাদীসে এসেছে যে, “মহান আল্লাহ তোমাদের আকার-আকৃতি এবং তোমাদের মালধনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও তোমাদের আমলসমূহকে দেখেন।” (মুসলিম)

মহান আল্লাহ তাদের নেতাদের অবস্থা উল্লেখ ক'রে বলেছেন, [وَلَمَّا جَاءَهُمْ الْحَقُّ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ وَإِنَّا بِهِ كَافِرُونَ (৩০) وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِنْ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ (৩১) أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضاً سُخْرِيّاً وَرَحْمَةُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ] (৩২) سورة الزخرف

অর্থাৎ, যখন ওদের কাছে সত্য এল, তখন ওরা বলল, 'এ তো যাদু এবং আমরা এ প্রত্যাখ্যান করি।' ওরা বলে, 'এ কুরআন কেন অবতীর্ণ করা হল না দু'টি জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির ওপর?' এরা কি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বন্টন করে! আমিই ওদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করেছি ওদের পার্থিব জীবনে এবং এককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছি; যাতে ওরা একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে এবং ওরা যা জমা করে, তা হতে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্টতর। (যুখরুফ :৩০-৩২)

দু'টি জনপদ বলতে মক্কা ও তায়েফকে বুঝানো হয়েছে। আর প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি বলতে অধিকাংশ মুফাস্সিরের নিকট মক্কার অলীদ বিন মুগীরা এবং তায়েফের উরওয়া বিন মাসউদ সাক্বাফীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেউ কেউ আরো কিছু নাম উল্লেখ করেছেন। তবে এর উদ্দেশ্য হল, এমন দু'টি ব্যক্তিত্বের নির্বাচন, যারা হবে পূর্ব থেকেই মহা সম্মান ও পদের অধিকারী, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিত্তশালী এবং স্ব-স্ব গোত্রে গণ্যমান্য। অর্থাৎ, কুরআন যদি অবতীর্ণ হত, তবে দু'টি শহরের মধ্য থেকে এ রকম কোন ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হত, ঐ মুহাম্মাদের উপর নয়, যার ঘর পার্থিব ধন-সম্পদ থেকে শূন্য এবং যে তার জাতির নেতৃত্ব ও সর্দারির পদেও প্রতিষ্ঠিত নয়।

অর্থাৎ, ধনে-মালে, পদমর্যাদায় এবং বুদ্ধি-জ্ঞানে আমি মানুষের মাঝে এই পার্থক্য ও তফাৎ এই জন্য রেখেছি যে, যাতে বেশী মালের অধিকারী ব্যক্তি স্বল্প মালের অধিকারী ব্যক্তির কাছ থেকে, উচ্চ পদের মালিক তার চাইতে নিম্ন পদের মালিকের কাছ থেকে এবং অনেক বেশী জ্ঞান-বুদ্ধির মালিক তার চাইতে কম জ্ঞান-বুদ্ধির মালিকের কাছ থেকে কাজ নিতে পারে। মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ এই কৌশলের মাধ্যমে বিশ্বজাহানের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যথা সকলেই যদি ধন-মালে, মান-সম্মানে, জ্ঞান-গরিমায় এবং বুদ্ধি-বিবেচনা ও অন্যান্য পার্থিব উপায়-উপকরণে সমান হত, তবে কেউ কারো কাজ করার জন্য প্রস্তুত হত না। অনুরূপ ছোট মানের ও তুচ্ছ মনে করা হয় এমন কাজও কেউ করত না। এ হল মানুষেরই প্রয়োজনীয় বিষয়; যা মহান আল্লাহ প্রত্যেককে পার্থক্য ও তফাতের মাঝে রেখেছেন এবং যার কারণে প্রত্যেক মানুষ অপর মানুষের মুখাপেক্ষী হয়। মানবিক সমস্ত প্রয়োজন কোন একজন মানুষ---তাতে সে যদি কোটিপতিও হয় তবুও---অন্য মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা না নিয়েই সে একাকী পূরণ করতে চাইলেও তা কোন দিন পারবে না।

বলা বাহুল্য, দরিদ্রদের প্রতি এমন তাচ্ছিল্য এবং নিজেদের ধনবত্তা ও নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ পক্ষপাতিত্ব থাকার ফলে তারা 'হক' গ্রহণ করতে পারেনি। আর তার জন্য অবশ্যই তারা ধ্বংসের শিকার হয়েছে, দুনিয়াতে এবং আখেরাতেও। অথচ মহান আল্লাহ বান্দাকে নির্দেশ দিয়েছেন, বান্দা যেন সত্যনিষ্ঠ হকপন্থীদের সাথী হয়। তিনি বলেছেন, [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُوا اللهَ وَكُونُواْ مَعَ الصَّادِقِينَ] (১১৯) سورة التوبة অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও। (তাওবাহঃ ১১৯)

আর যারা কোন প্রকারের পক্ষপাতিত্ব না রেখে 'হক' গ্রহণ ক'রে নেয়, তাদের তিনি প্রশংসা করেছেন, তারা 'বুদ্ধিমান' বা 'জ্ঞানী' বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, [وَالَّذِينَ اجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهُ لَهُمُ الْبُشْرَى فَبَشِّরْ عِبَادِ (১৭) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُولُوا الْأَلْبَابِ] (১৮) سورة الزمر

অর্থাৎ, যারা তাগুতের পূজা হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অনুরাগী হয়, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার দাসদেরকে--- যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং যা উত্তম তার অনুসরণ করে। ওরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং ওরাই বুদ্ধিমান। (যুমার: ১৭-১৮)

ঈমানদারীর দাবী হল, মু'মিন কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসবে এবং আল্লাহরই ওয়াস্তে কাউকে ঘৃণা করবে। মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ঘৃণা করে, আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দান করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই কিছু দান করা হতে বিরত থাকে, সে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী।” (সহীহ আবু দাউদ ৩৯১০নং)

“ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল হল আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব করা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা করা, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ঘৃণা করা।” (ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৫৩৯নং) সুতরাং ঈমানী পক্ষপাতিত্বই মু'মিনের চরিত্র। কিতাব ও সুন্নাহর পক্ষপাতিত্বই তার স্বাভাবিক আচরণ।

দুনিয়ার বুকে কত রকমের অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব কাজ করছে এবং মানুষকে 'হক' গ্রহণে বঞ্চিত রাখছে, তার হিসাব দেওয়া মুশকিল। পরিবারগত অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এমন পক্ষপাতিত্ব দাম্পত্যকে বিষময় ক'রে তোলে। বর্ণগত বৈষম্য রয়েছে, যা সাদা ও কালো চামড়ার মানুষের মাঝে ভেদাভেদের প্রাচীর খাড়া ক'রে রেখেছে। বংশগত অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। এর ফলে এক বংশের লোক অন্য বংশের লোককে ঘৃণা করে, ছোট ভাবে। অন্য বংশের প্রতিভাকে অবজ্ঞা করে 'সারকুঁড়ে পদ্মফুল' বলে। অথচ বর্ণ ও বংশগত এমন কাদা ছুঁড়াছুড়ি ইসলাম অন্যায় বলে ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন,

[يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ] (১৩) سورة الحجرات

অর্থাৎ, হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরেরর সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন। (হুজুরাতঃ ১৩)

মহানবী বলেন, “মানুষের মধ্যে দুই কর্ম (ছোট) কুফরী; বংশে খোঁটা দেওয়া এবং মৃতের জন্য মাতম করা।” (মুসলিম)

“চারটি কর্ম জাহেলিয়াত যুগের যা আমার উম্মত ত্যাগ করবে না; (নিজের) বংশ নিয়ে গর্ব করা, (পরের) বংশে খোঁটা মারা, নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির আশা করা এবং মৃতের উপর মাতম করা।” (সহীহুল জামে ৮৮৮নং) "লোকেরা যেন মৃত বাপ-দাদাদের নিয়ে ফখর করা অবশ্যই ত্যাগ করে। তারা তো জাহান্নামের কয়লা মাত্র। তা ত্যাগ না করলে তারা সেই গোবুরে পোকার চেয়েও নিকৃষ্ট হবে, যে নিজ নাক দ্বারা মল ঠেলে নিয়ে যায়। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের নিকট থেকে জাহেলিয়াতের গর্ব ও ফখর দূর করে দিয়েছেন। (মুসলিম) তো মুত্তাকী (সংযমশীল) মুমিন অথবা পাপাচারী বদমায়াশ। মানুষ সকলেই আদমের সন্তান এবং আদম মাটি হতে সৃষ্ট।” (সহীহুল জামে' ৫৩৫৮নং)

“আরবীর উপর অনারবীর এবং অনারবীর উপর আরবীর, কৃষ্ণকায়ের উপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের উপর কৃষ্ণকায়ের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল 'তাক্বওয়ার' কারণেই।” (মুসনাদে আহমাদ ৫/৪১১) “যদি লোককে দেখ যে, সে জাহেলিয়াতের বংশ-সম্পর্ক উত্থাপন করছে, তাহলে তোমরা তাকে তার বাপের লিঙ্গ কামড়াতে বল এবং ইঙ্গিত করো না। (বরং স্পষ্ট বলো)।” (সহীহুল জামে ৫৮১নং)

পার্টি ও দলগত অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। আর এই আধুনিক জাহেলী যুগের বৈষম্যের কারণে মুসলিমরা আপোসে মাতামাতি, লাঠালাঠি ও ফাটাফাটি ক'রে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পার্টি-পার্টি ক'রে নিজেদেরকে মাটি করছে তারা, আর তাতে ফসল ফলাচ্ছে অন্যেরা। পার্টির জন্য তারা এমনই নিবেদিত-প্রাণ যে, তার বিজয় রক্ষার্থে নিজেদের ভাইয়ের মাথায় লাঠি মারতে, তার প্রতি বোম ও গুলি ছুঁড়তে, তার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে, তার চাল-চুলো উড়িয়ে দিতে, এমনকি নিজের রক্তও প্রবাহিত করতে আদৌ কুণ্ঠিত নয়। ধর্মগত অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্য জাতি নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দিকে, আত্মহত্যার দিকে। মযহাবগত অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। এক একটি সম্প্রদায় এক একজন ইমামকে নিজেদের 'মান্যবর' এর আসনে আসীন ক'রে অন্য মযহাবের মতামতকে অবজ্ঞা করে, অন্য মযহাবের লোককে কটাক্ষ করে, অনেক সময় 'কাফের' বলে ফতোয়া জারী ক'রে আপোসে মারামারি করে।

ভাষাগত অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। এক ভাষার লোক অন্য ভাষার লোককে ছোট জানে। অবশ্য মুসলিমদের নিকটে এ সিদ্ধান্ত শিরোধার্য যে, আরবীই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাষা, যেহেতু তা আল-কুরআনের ভাষা। কিন্তু বাঙালী হিন্দী ভাষার লোককে 'ছোট' জেনে 'বিহারী', 'পছিয়া' বলে নাক সিঁটকায়। অনুরূপ বিহারী ও পছিয়ারাও বাঙালীদেরকে 'বাঙালী' বলে তাচ্ছিল্য করে। বরং এক এলাকার বাঙালীরাও অন্য এলাকার বাঙালীদেরকে ভাষা নিয়ে অবজ্ঞা করে।

অবশ্য এমন শ্রেণীর লোকেরা ছোট জ্ঞানের হয়। জ্ঞানী লোকেরা এই শ্রেণীর পক্ষপাতগ্রস্ত হন না। এক জালসায় বক্তৃতা করলাম। জালসা শেষে এক বাঙালী আমার প্রতি ভক্তি প্রকাশ ক'রে সালাম-মুসাফাহার পর জিজ্ঞাসা করল, 'খুব সুন্দর ওয়ায করেছেন, আপনার বাড়ি কোন জেলায়?' আমি বললাম, 'পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান জেলায়?' তখন চট্ ক'রে সে বলল, 'ওহো! আপ ইন্ডিয়া কা হ্যায়?' আমি বললাম, 'কী ব্যাপার? আপনি আবার হিন্দী বলতে শুরু ক'রে দিলেন যে?' বলল, 'হিন্দী কা সাথ, হিন্দী বাত বোলেগা।' ---কিন্তু হিন্দী হলেও আমি তো বাঙালী। আমার ভাষা তো বাংলাই। এতক্ষণ ওয়ায শুনলেন না? ---ইন্ডিয়াতে বাংলা হয় কী ক'রে? ---কেন? কোলকাতা রেডিওতে বাংলা শোনেন না? ---রেডিওতে বাংলা হলেই কি দেশের ভাষা বাংলা হয় নাকি? বিভিসি লন্ডন থেকে বাংলা হয়, তার মানে কি লন্ডনের ভাষা বাংলা? চমৎকার যুক্তি! আমি অবাক হয়ে বললাম, 'আপনি কি বাঙালী?' -অবশ্যই। ---কিন্তু আপনি একটা কূপমণ্ডুক। ---তার মানে? ---কেন বাংলা শব্দও বুঝতে পারলেন না? ---আপনি কি সব হিন্দী শব্দ বুঝেন? ---না, তা বুঝি না। তবে এটা বুঝলাম যে, আপনি একটা কুয়োর ব্যাঙ? ---তা কেন? ---কারণ, কোন্ কোন্ দেশে বাংলা বলা হয়---তা আপনি জানেন না। আর ইন্ডিয়াতেও যে হিন্দী ছাড়া আরো অন্য অনেক ভাষা বলা হয়---তারও খবর রাখেন না। জানেন কি, ভারতের জাতীয়-সঙ্গীতও বাংলায়? আর ক্যাসেটে আমার বক্তৃতা শুনে এক অজ্ঞ মন্তব্য করেছে, আমি নাকি কেরালার লোক!

অন্য এক মযহাবী পক্ষপাতগ্রস্ত শিক্ষিত লোক আমার বই পড়ে মন্তব্য করেছেন, আমি নাকি বাঙালী নই! অবশ্য তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, 'বাংলাদেশী নই।' বুরাইদার এক সভায় একাধিক উলামার জমায়েত ছিল। আমার বক্তৃতা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। সভার শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম---এক সাথে খাওয়া-দাওয়া করব বলে। কিন্তু এক দেশী ভাই সকল বক্তাকে ডেকে তাঁর বাসায় নিয়ে চলে গেলেন। আর আমি বিদেশী ফ্যালফ্যাল ক'রে তাকিয়ে রইলাম। আহবায়ক হোটেল থেকে আমার খাবারের ব্যবস্থা ক'রে তিনিও চলে গেলেন! তাঁদের নাকি স্বদেশীয় কোন খাস মিটিং ছিল। আমি থাকলে তাঁদের অসুবিধা ছিল।

একদা কোর্টে একটি বিষয়ে সাক্ষী-সত্যায়নের সময় আমার সাথ দিলেন না অন্য দেশের হুজুররা। তাতে নাকি তাদের দেশের লোকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া হত তাই! দেশগত অন্ধ-পক্ষপাতিত্বের ফলে সত্যের সাক্ষ্য না দিয়ে গোনাহগার হতে তাঁদের কোন দ্বিধা হল না। মহান আল্লাহ বলেন, [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُونُواْ قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاء لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنফُসِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقَيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا] (১৩৫) سورة النساء

অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (নিসাঃ ১৩৫) [وَلَا يَأْبَ الشُّهَدَاءُ إِذَا مَا دُعُوا] অর্থাৎ, যখন (সাক্ষ্য দিতে) ডাকা হয়, তখন যেন সাক্ষীরা অস্বীকার না করে। (বাক্বারাহঃ ২৮২)

[وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ وَمَن يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آথِمٌ قَلْبُهُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ] (২৮৩) অর্থাৎ, তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, বস্তুতঃ যে তা গোপন করে, নিশ্চয় তার অন্তর পাপময়। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। (বাক্বারাহঃ ২৮৩)

আর সেই সাক্ষ্য না দিয়ে আমাকে এমন অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিলেন যে, আমি ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম। অথচ দ্বীনের নবী বলেন, “মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তাকে মিথ্যা বলবে না (বা মিথ্যাবাদী ভাববে না), তার সাহায্য না ক'রে তাকে অসহায় ছেড়ে দেবে না। এক মুসলিমের মর্যাদা, মাল ও খুন অপর মুসলিমের জন্য হারাম। আল্লাহভীতি এখানে (অন্তরে) রয়েছে। কোন মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ মনে করাটাই একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (তিরমিযী)

অবশ্য পরিশেষে সেই দেশেরই দুই ব্যক্তি আমার সহযোগিতা করেছিলেন। আল্লাহ তাঁদেরকে 'জাযায়ে খাইর' দিন। তবে স্বদেশী ভাইদের কাছে তাঁদেরকে গুঁতুনি খেতে হয়েছিল। ভাষা ও দেশগত পক্ষপাতিত্ব মানুষকে অন্ধ ক'রে ফেললে দ্বীনের ব্যাপারেও অপরকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করতে শুরু ক'রে দেয়। এক দাওয়াত অফিসে বাংলা বিভাগে লোকের প্রয়োজন। প্রস্তাব এল, ইন্ডিয়ান বাঙালী রাখা যাবে না। আর এ প্রস্তাব ছিল একজন দ্বীনের দায়ীর। ইসলামী দায়ী নির্বাচনে দেশের লোক হতে হবে, তা কেন? যেহেতু দেশের লোকই দেশের পরিবেশ বেশী জানবে। কিন্তু ইসলাম তো দেশ-বিদেশের সকলের জন্য। তাছাড়া প্রতিবেশী দেশের ট্রেডিশন, সভ্যতা ও সংস্কৃতি তো সমানই। অন্য ব্যাপারে সে কথা প্রকাশ করাই হয়। তাহলে একমাত্র দেশীয় অন্ধ-পক্ষপাতিত্বই কি সমানে কাজ করছে না? দাওয়াতের কাজে দেশের লোক অথবা বিদেশের, 'হক' হলে তা গ্রহণ করতে বাধা থাকার কথা নয়। উর্দু ভাষার জন্য বিহারী, পছিয়া ও পাকিস্তানী সবাই কি উপকৃত হবে না?

ভাষাগত পক্ষপাতিত্বের ফলে হিন্দীরা তাদের খাস সভায় আমাকে আহবান করে না। কারণ, আমি বাঙালী। আর বাংলাদেশীরাও তাদের খাস বৈঠকে আমাকে আহূত করে না। কারণ, আমি হিন্দী! অবশ্য আমার দোষ এই যে, আমি বলেছিলাম, আমরা সউদী আরবে এসে কোন বিশেষ প্রতীক বা পরিচয় নিয়ে কাজ করব না। আমরা কেবল 'মুসলিম' পরিচয়ে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর দাওয়াত দেব। 'মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক, আর কিছু নয়--- এই হোক শেষ পরিচয়।'

আমাদের নীতি হবে, আগে সংশোধন, পরে সংগঠন। আমরা সংকীর্ণ পরিচয়ের বেড়ি পায়ে লাগিয়ে দাওয়াতের বিশাল ময়দান অতিক্রম করতে পারব না। বিশেষ পরিচয় নিয়ে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকব না এবং কোন ব্যক্তিগত আঘাতের সময় নিজ সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে বিরোধ সৃষ্টি করব না। মহানবী বলেছেন, "আমার উম্মতের মাঝে তিনটি কাজ হল জাহেলিয়াতের প্রথা, যা মুসলিমরা ত্যাগ করবে না; (মুর্দার জন্য) মাতম করা, তারা (ও নক্ষত্রের) মাধ্যমে বৃষ্টির আশা করা এবং জাহেলী যুগের ডাক ডাকা।” বর্ণনাকারীকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'তা কেমনভাবে?' তিনি বললেন, 'হে অমুক গোত্র, হে অমুক গোত্র, হে অমুক গোত্র!' বলে ডাকা। (সিলসিলাহ সহীহাহ ৪/৪১১)

তিনি আরো বলেছেন, "আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজের আদেশ করছি; যা আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন। রাষ্ট্রনেতার কথা শুনবে, তার আনুগত্য করবে, জিহাদ করবে, হিজরত করবে এবং (একই রাষ্ট্রনেতার নেতৃত্বে) জামাআতবদ্ধভাবে বসবাস করবে। যেহেতু যে ব্যক্তি বিঘত পরিমাণ জামাআত থেকে দূরে সরে যায়, সে আসলে ফিরে না আসা পর্যন্ত ইসলামের রশিকে নিজ গলা থেকে খুলে ফেলে দেয়। আর যে ব্যক্তি জাহেলী যুগের ডাক ডাকে, সে আসলে জাহান্নামীদের দলভুক্ত।” এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! যদিও সে নামায পড়ে ও রোযা রাখে?' তিনি বললেন, “যদিও সে নামায পড়ে ও রোযা রাখে। সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা আল্লাহর (নামে) ডাকে ডাকো, যিনি তোমাদের নাম দিয়েছেন 'মুসলিম, মু'মিন'।” (ত্বাবারানী, আবু য়‍্যা'লা, ইবনে হিব্বান, তিরমিযী ২৮৬৩নং)

মহান আল্লাহ বলেন, [وَجَاهِدُوا فِي اللهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِن قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ فَنِعْمَ الْمُوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ] سورة الحজ

অর্থাৎ, সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত; তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি; এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ); তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম' এবং এই গ্রন্থেও; যাতে রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং তোমরা সাক্ষী স্বরূপ হও মানব জাতির জন্য। সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী তিনি! (হাজ্জঃ ৭৮)

অবশ্য সেই ইসলামের কথা বলা হচ্ছে, যা খাঁটি। যা হল তাওহীদের সাথে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্যের সাথে তাঁর দাসত্ব করা এবং শির্ক ও মুশরিকদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করা। সেই ইসলাম, যা দিয়ে নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে পাঠানো হয়েছে এবং সাহাবায়ে কিরাম তথা তাঁদের অনুসারিগণ পালন করেছেন।

জাহেলী যুগের এমন দলগত নাম ও ডাক ইসলামে পছন্দনীয় নয়। বানুল মুস্তালিক যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ তখনো মুরাইসী' ঝর্ণার নিকট অবস্থান করছিলেন, এমন সময় কতকগুলো লোক পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সেখানে আগমন করে। আগমনকারীদের মধ্যে উমার (রা.)-এর একজন শ্রমিক ছিল, যার নাম ছিল জাহজাহ গিফারী। ঝর্ণার নিকট আরো একজন ছিল, যার নাম ছিল সিনান বিন অবার জুহানী। কোন কারণে এই দু'জনের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হতে হতে শেষ পর্যায়ে ধস্তাধস্তি ও মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এক পর্যায়ে জুহানী চিৎকার শুরু ক'রে দেয়, 'হে আনসার দল! (আমাকে সাহায্যের জন্য দ্রুত এগিয়ে এস।)' অপর পক্ষে জাহজাহ আহবান করতে থাকে, 'হে মুহাজির দল! (আমাকে সাহায্য করার জন্য তোমরা শীঘ্র এগিয়ে এস।)' রসূল তা দেখে বললেন, “আমি তোমাদের মধ্যে বর্তমান আছি অথচ তোমরা অজ্ঞতার যুগের আচরণ করছ? তোমরা এসব পরিহার করে চল, এ সব হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত।” (তিরমিযী ৩৩১৫নং) তিনি বলেছেন, “যদি লোককে দেখ যে, সে জাহেলিয়াতের বংশ-সম্পর্ক উত্থাপন করছে, তাহলে তোমরা তাকে তার বাপের লিঙ্গ কামড়াতে বল এবং ইঙ্গিত করো না। (বরং স্পষ্ট বলো)।” (সহীহুল জামে ৫৮১নং)

জাহেলী যুগের অন্ধ পক্ষপাতিত্ব এমন যে, তার ফলে তারা হক গ্রহণ করত না। অবশ্য এই পক্ষপাতিত্বে হিংসা ও অহংকার সজীবরূপে সক্রিয় থাকে। যার ফলে তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, [إِذْ جَعَلَ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى রَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ التَّقْوَى وَكَانُوا أَحَقَّ بِهَا وَأَهْلَهَا وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا] (২৬) سورة الفتح

অর্থাৎ, যখন অবিশ্বাসীরা তাদের অন্তরে গোত্রীয় অহমিকা---অজ্ঞতা যুগের অহমিকা পোষণ করেছিল, তখন আল্লাহ তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের উপর স্বীয় প্রশান্তি বর্ষণ করলেন; আর তাদেরকে তাকওয়ার বাক্যে সুদৃঢ় করলেন এবং তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। আর আল্লাহ সমস্ত বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখেন। (ফাতহঃ ২৬)

কাফেরদের এই জাহেলী যুগের গোত্রীয় অহমিকা (আভিজাত্যের গর্ব) এর অর্থ হল, মক্কাবাসীদের মুসলিমদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া। তারা বলল যে, এরা আমাদের ছেলে ও বাপদেরকে হত্যা করেছে। লাত-উয্যার শপথ! আমরা এদেরকে কখনই এখানে প্রবেশ করতে দেব না। অর্থাৎ, তারা এটাকে মান-সম্মানের ব্যাপার মনে ক'রে নিল। আর এটাকেই 'অজ্ঞতা-যুগের অহমিকা' বলা হয়েছে। কারণ, কা'বা শরীফে ইবাদতের জন্য আগমনকারীদেরকে রোধ করার অধিকার কারো নেই। মক্কার কুরাইশদের শত্রুতামূলক এই আচরণের উত্তরে আশঙ্কা ছিল যে, মুসলিমদের আবেগ-উদ্যমের মধ্যেও উত্তেজনা এসে যেত এবং তাঁরাও এটাকে তাঁদের সম্মানের ব্যাপার মনে ক'রে মক্কায় প্রবেশ করার জন্য জেদ ধরতেন। ফলে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে পড়ত। আর এই যুদ্ধ মুসলিমদের ক্ষেত্রে বড়ই বিপজ্জনক ছিল। এই জন্য মহান আল্লাহ মুসলিমদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ ক'রে দিলেন। অর্থাৎ, তাঁদেরকে ধৈর্য-সহ্য তথা উত্তেজনা সংবরণ করার তওফীক্ব দান করলেন। সুতরাং তাঁরা নবী করীম (সা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী হুদাইবিয়াতে থেমে গেলেন এবং আবেগপ্রবণ হয়ে মক্কা যাওয়ার প্রচেষ্টা করলেন না।

কেউ কেউ বলেন, মূর্খতাযুগের এই অহমিকা থেকে বুঝানো হয়েছে তাদের সেই আচরণকে, যা সন্ধি ও চুক্তির সময় তারা অবলম্বন করেছিল। তাদের এই আচরণ এবং সন্ধি উভয়টাই বাহ্যতঃ মুসলিমদের জন্য অসহ্যকর ছিল। কিন্তু পরিণতির দিক দিয়ে যেহেতু এতে ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণ ছিল, তাই অতীব অপছন্দনীয় ও কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহ মুসলিমদেরকে তা মেনে নেওয়ার সুমতি দান করলেন। এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ হল এ রকম, যখন রসূল মক্কার কুরাইশদের প্রেরিত প্রতিনিধিদের এই কথা মেনে নিলেন যে, এ বছর মুসলিমরা উমরার জন্য মক্কায় যাবেন না এবং এখান থেকেই প্রত্যাবর্তন করবেন, তখন তিনি আলী (রা.)-কে সন্ধিপত্র লেখার নির্দেশ দিলেন। তিনি (আলী) রসূল (সা.)-এর নির্দেশে 'বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহীম' লিখলেন। তখন তারা প্রতিবাদ করে বলল যে, 'রাহমান' ও 'রাহীম'কে আমরা জানি না। আমরা যে শব্দ ব্যবহার করি---অর্থাৎ, 'বিসমিকাল্লা-হুম্মা' (হে আল্লাহ! তোমার নাম নিয়ে) তাই দিয়ে শুরু করুন। তাই নবী ঐভাবেই লিখালেন। তারপর তিনি লিখালেন, “এটা সেই চুক্তিপত্র যাতে আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদ মক্কাবাসীদের সাথে সন্ধি করছেন।” তখন কুরাইশদের প্রতিনিধিগণ বলল যে, ঝগড়ার মূল কারণই তো আপনার 'রিসালাত' তথা রসূল হওয়া। যদি আমরা আপনাকে আল্লাহর রসূল বলে মেনেই নিতাম, তাহলে এর পর ঝগড়াই-বা আর কী রয়ে যেত? অতঃপর আপনার সাথে যুদ্ধ করার এবং আল্লাহর ঘর থেকে আপনাকে বাধা দেওয়ার প্রয়োজনই কী? অতএব, আপনি এখানে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'র পরিবর্তে 'মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ' লিখুন। সুতরাং তিনি আলী (রা.)-কে এ রকমই লিখার নির্দেশ দিলেন। (এটা মুসলিমদের জন্য বড়ই লাঞ্ছনাকর ও উত্তেজনামূলক পরিস্থিতি ছিল। যদি আল্লাহ তাঁদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ না করতেন, তবে তাঁরা তা কখনই সহ্য করতে পারতেন না।) আলী তাঁর নিজ হাত দিয়ে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' মিটিয়ে দিতে অস্বীকার করলেন। তখন নবী করীম বললেন, (আমাকে দেখিয়ে দাও) এ শব্দটি কোথায়? দেখিয়ে দিলে তিনি নিজের হাতে তা মিটিয়ে দিলেন এবং নিজে (মু'জিযাস্বরূপ) সেই স্থানে 'মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ' লিখলেন। এর পর এই চুক্তিপত্রে তিনটি জিনিস লেখা হয়। (ক) মক্কাবাসীদের মধ্যে যে ইসলাম গ্রহণ ক'রে নবী (সা.)-এর কাছে আসবে, তাকে (মক্কায়) ফিরিয়ে দেওয়া হবে। (খ) আর কোন মুসলিম মক্কাবাসীদের সাথে মিলিত হলে, (মক্কাবাসীরা) তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না। (গ) মুসলিমগণ আগামী বছর মক্কায় আসবে এবং এখানে তিন দিন অবস্থান করতে পারবে। আর তাদের সাথে কোন অস্ত্র থাকবে না। (বুখারী, মুসলিমঃ জিহাদ অধ্যায়) এর সাথে দু'টি কথা আরো লেখা হয়, (ক) এ বছর যুদ্ধ স্থগিত থাকবে। (খ) গোত্রগুলোর মধ্যে যে চায় মুসলিমদের সাথে এবং যে চায় কুরাইশদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে।

এইভাবে নিজেদের সুবিধা মতো চুক্তি অপরের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা সম্পাদন করল। আর তাতে তাদের বিশাল অন্ধ পক্ষ-পাতিত্ব প্রকাশ পেয়েছিল। যদি কেউ পক্ষ-পাতগ্রস্ত হয়ে দ্বীনের কাজও করে, তবে তা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। পক্ষ-পাতগ্রস্ত হয়ে জিহাদও কোন কাজে দেবে না ইসলামে।

আবু হুরাইরা বলেন, আম্র বিন উল্কাইশের জাহেলী যুগের সূদের বকেয়া ছিল। সে তা পরিশোধ না নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে অসম্মত হল। ইতিমধ্যে উহুদের যুদ্ধ এসে উপস্থিত হল। (মদীনায় এসে) সে বলল, 'আমার চাচার গোষ্ঠির লোকেরা কোথায়?' লোকেরা বলল, 'তারা উহুদে আছে।' বলল, 'অমুক কোথায়?' বলা হল, 'উহুদে আছে।' বলল, 'অমুক কোথায়?' বলা হল 'উহুদে আছে।' সুতরাং সে তার বর্ম পরে ও অস্ত্র ধারণ ক'রে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হল। সেখানে যখন তারা তাকে দেখল, তখন বলল, 'সাবধান হে আম্র! তুমি আর অগ্রসর হবে না।' সে বলল, 'আমি ঈমান এনেছি।' সুতরাং সে যুদ্ধে শামিল হল এবং জখম হল। অতঃপর সেই বিক্ষত অবস্থায় তাকে তার পরিজনের কাছে বহন ক'রে আনা হল। সা'দ বিন মুআয এসে তার বোনকে বললেন, 'ওকে জিজ্ঞাসা কর, তোমার গোত্রের পক্ষ-পাতিত্ব করতে গিয়ে এবং তাদের ক্রোধে ক্রোধান্বিত হয়ে কি (যুদ্ধ করেছে), নাকি আল্লাহর জন্য ক্রোধান্বিত হয়ে (যুদ্ধ করেছে)?' উত্তরে সে বলল, 'বরং আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য ক্রোধান্বিত হয়ে (যুদ্ধ করেছি)। অতঃপর সে মারা গেলে জান্নাত প্রবেশ করে। অথচ সে এক ওয়াক্তের নামাযও পড়েনি! (আবু দাউদ ২২৮৮নং)

আল্লাহর রসূল-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ করে, অন্ধ-পক্ষপাতিত্বের জন্য যুদ্ধ করে এবং লোক প্রদর্শনের জন্য (সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে) যুদ্ধ করে, এর কোন্ যুদ্ধটি আল্লাহর পথে হয়? আল্লাহর রসূল বললেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, একমাত্র তারই যুদ্ধ আল্লাহর পথে হয়।” (বুখারী ও মুসলিম)

মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি অন্ধ পতাকাতলে যুদ্ধ করে, অন্ধ-পক্ষপাতিত্বের জন্য ক্রোধান্বিত হয়, অন্ধ-পক্ষপাতিত্বের দিকে আহবান করে অথবা অন্ধ-পক্ষপাতিত্বের সাহায্য করে, অতঃপর সে মারা যায়, তার মরণ হয় জাহেলী যুগের মরণ।” (মুসলিম)

আমি বলেছিলাম, এক হয়ে থাকি, সহীহ আক্বীদা ও আমলের ডাক দিই। মহানবী বলেছেন, "এক মু'মিন অপর মু'মিনের জন্য অট্টালিকার ন্যায়, যার এক অংশ অন্য অংশকে মজবুত ক'রে রাখে।” তারপর তিনি (বুঝাবার জন্য) তাঁর এক হাতের আঙ্গুলগুলি অপর হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে ঢুকালেন। (বুখারী)

তিনি আরো বলেছেন, "মু'মিনদের আপোসের মধ্যে একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, দয়া ও মায়া-মমতার উদাহরণ (একটি) দেহের মত। যখন দেহের কোন অঙ্গ পীড়িত হয়, তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।” (বুখারী ও মুসলিম)

আমি বলেছিলাম, দেশে ভাগাভাগি হয়েছে হোক, বিদেশে আমরা ভাগাভাগি হয়ে থাকব না। কিন্তু যে রোগ রাতে ছিল, সে রোগ দিনেও থেকে গেল এবং যে রোগ দেশে ছিল, সে রোগ বিদেশেও দ্বীনী ভাইদেরকে ক্লিষ্ট করতে লাগল। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান তাঁরা, যাঁরা হিদায়াতের দিশা পেয়ে অভিনবরূপে সত্যের একনিষ্ঠ অনুসারী হতে চান।

এইভাবেই মুসলিম উম্মাহ অধঃপতনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ক্রমোন্নতির গোড়ায় ঘুণ ধরছে এবং পতনশীল জাতির উঠে দাঁড়াবার শক্তি ক্রমশঃ হারিয়ে ফেলছে। অন্ধ পক্ষ-পাতিত্বের জেরে শহুরে আলেম গেঁয়ো আলেমের সমালোচনা করছেন, বিদেশ পাশ-করা আলেমরা দেশীয় আলেমদের সমালোচনা করছেন, সুতরাং বিপক্ষের গীবত করতে অপর পক্ষ কি চুপ থাকবেন? কক্ষনই না। আর তার ফলে সাধারণ মানুষের চোখে উলামার কদর কমে যাচ্ছে। জাতির সকল শ্রেণীর নেতাগণ নিজ নিজ মান বৃদ্ধি করতে গিয়ে অপরের মান কমাতে তৎপর হয়ে উঠলে জাতির অবস্থা পতনশীল ছাড়া আর কী হতে পারে? শতধা-বিচ্ছিন্ন এই জাতির মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে পারলে, দেশ, ভাষা, জাতি প্রভৃতির বেড়া ডিঙিয়ে এক হতে পারলে মুসলিমরা উন্নতির মুখ দেখত। অমুসলিমরাও তাদের কদর করত। কিন্তু যাদুঘরের বাঘ দেখে শিশুরাও ভয় পায় না, চিড়িয়াখানায় আবদ্ধ বাঘ দেখে কেউ ভয় পায় না। আপোস-দ্বন্দ্বে যে জাতির অবস্থা যাদুঘর বা চিড়িয়াখানার বাঘের মতো হয়ে গেছে, সে জাতিকে বিজাতি ভয় করবে কেন?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00