📄 আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করা
জাতির জীবনে যখন সুখ আসে, তখন সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যায়। ভুলে যায় তাঁর অনুগ্রহকে, ভুলে যায় তাঁর করুণাকে। সে সময় সে যেন আত্মনির্ভর হয়ে উঠে। স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অমুখাপেক্ষী প্রকাশ করে নিজেকে। আর তখনই আসে আযাবের চাবুক। কারুনকে মহান আল্লাহ এত ধনভান্ডার দান করেছিলেন, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। তাই সে দম্ভ করত। তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, 'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।' কিন্তু সে বলল, 'এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি!' আমি বুদ্ধি না লাগালে কি আল্লাহ ধন দিতেন? আরে 'স্বামীর হাতে ধন থাকলে, স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী' হয়! পরিণামে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করলেন। (সূরা ক্বাস্বাসের শেষাংশ দ্রষ্টব্য)
অনুরূপ অনেক মানুষ আছে, যাদেরকে 'সুখে খেতে ভূতে কিলোয়।' আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে অপছন্দ করে। অতি সুখ যখন একঘেয়ে হয়ে যায়, তখন 'পরিবর্তন' চায়। অথচ সে পরিবর্তন দুঃখের দিকে প্রত্যাবর্তন ঘটায়। বানী ইস্রাঈল বেশ সুখেই 'মান্না ও সালওয়া' খাচ্ছিল। কিন্তু তাদের পিঁয়াজ-রসুন খেতে পছন্দ হল। তারা বলল,
[يَا مُوسَى لَن نَّصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ مِن بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا]
অর্থাৎ, 'হে মুসা! একই রকম খাদ্যে আমরা কখনো ধৈর্য ধারণ করব না, সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, তিনি যেন ভূমি জাত দ্রব্য শাক-সব্জী, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পিঁয়াজ উৎপাদন করেন।' মুসা বললেন,
[أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْراً فَإِنَّ لَكُم مَّا سَأَلْتُمْ]
অর্থাৎ, মুসা বলল, 'তোমরা কি উৎকৃষ্ট বস্তুকে নিকৃষ্ট বস্তুর সাথে বিনিময় করতে চাও? তবে কোন নগরে অবতরণ কর। তোমরা যা চাও, তা সেখানে আছে।' আল্লাহ বলেন,
[وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذُّلَّةُ وَالْمُسْكَنَةُ وَبَاؤُوْا بِغَضَبٍ মِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ] (৬১) البقرة
অর্থাৎ, আর তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যগ্রস্ত হল এবং আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হল। এ জন্য যে তারা আল্লাহর নিদর্শন সকলকে অমান্য করত এবং (প্রেরিত পুরুষ) নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন করবার জন্যেই তাদের এই পরিণতি ঘটেছিল। (বাক্বারাহঃ ৬১)
অনুরূপ ঘটেছিল সাবা'-ওয়ালাদের। মহান আল্লাহ বলেন, [لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ جَنَّتَانِ عَنْ يَمِينٍ وَشِمَالٍ كُلُوا مِنْ رِزْقِ رَبِّكُمْ وَاشْكُرُوا لَهُ بَلْدَةٌ طَيِّبَةٌ وَرَبُّ غَفُورٌ (১৫) فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَاهُمْ بِجَنَّتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَى أُكُل خَمْطٍ وَأَثْلٍ وَشَيْءٍ مِنْ سِدْرٍ قَلِيلٍ (১৬) ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ نُجَازِي إِلا الْكَفُورَ (১৭) وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا قُرًى ظَاهِرَةً وَقَدَّرْنَا فِيهَا السَّيْرَ سِيرُوا فِيهَا لَيَالِي وَأَيَّامًا آمِنِينَ (১৮) فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ] (১৯) سورة سبأ
অর্থাৎ, সাবা'বাসীদের জন্য ওদের বাসভূমিতে এক নিদর্শন ছিল; দু'টি বাগান: একটি ছিল ডান দিকে, অপরটি ছিল বাম দিকে; ওদেরকে বলা হয়েছিল, 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দেওয়া রুযী ভোগ কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। এ শহর উত্তম এবং তোমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল।' পরে ওরা আদেশ অমান্য করল। ফলে আমি ওদের ওপর বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যা প্রবাহিত করলাম এবং ওদের বাগান দু'টিকে পরিবর্তন ক'রে দিলাম এমন দু'টি বাগানে, যাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুলগাছ। আমি ওদেরকে এ শাস্তি দিয়েছিলাম ওদের সত্য অকৃতজ্ঞতা (বা অস্বীকারের) জন্য। আর আমি অকৃতজ্ঞ (বা অস্বীকারকারী)কেই শাস্তি দিয়ে থাকি। ওদের এবং যে সব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলির অন্তর্বর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং ঐ সকল জনপদে ভ্রমণকালে বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবধানে বিশ্রামস্থান নির্ধারিত করেছিলাম এবং ওদেরকে বলেছিলাম, 'তোমরা এ সব জনপদে রাত-দিন নিরাপদে ভ্রমণ কর।' কিন্তু ওরা বলল, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের সফরের বিশ্রামস্থান দূরে দূরে স্থাপন কর।' এভাবে ওরা নিজেদের প্রতি যুলম করেছিল। ফলে আমি ওদেরকে কাহিনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত করলাম এবং ওদেরকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ক'রে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। (সাবা' ১৫-১৯)
মহান আল্লাহ এমনই এক জনপদের কথা উদাহরণ স্বরূপ বলেছেন, [وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ] (১১২) অর্থাৎ, আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। (নাহলঃ ১১২)
অধিকাংশ মুফাস্সিরগণ এই জনপদ বা শহর বলতে মক্কা বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, এই আয়াতে মক্কা ও মক্কাবাসীদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। আর তা ঐ সময় ঘটেছিল, যখন আল্লাহর রসূল তাদের জন্য অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহুম্মাশদুদ ওয়াতআত্যাকা আলা মুদার ওজআলহা আলাইহিম সিনিনা কাসিনি ইউসুফ।' অর্থাৎ, হে আল্লাহ মুদার গোত্রকে কঠিনভাবে ধর এবং তাদের উপর এমন অনাবৃষ্টি এনে দাও যেমন ইউসুফ (আ.)-এর যুগে মিসরে হয়েছিল। (বুখারী ৪৮২১, মুসলিম ২১৫৬নং)
সুতরাং মহান আল্লাহ তাদের নিরাপত্তাকে ভয় এবং সুখকে ক্ষুধা দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দিয়েছিলেন। এমনকি তাদের অবস্থা এই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, তারা হাড় ও গাছের পাতা খেয়ে দিন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল।
কিছু মুফাস্সিরের মতে এই জনপদ কোন নির্দিষ্ট গ্রাম বা শহর নয়। বরং এটি উপমা স্বরূপ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, অকৃতজ্ঞ লোকেদের এই পরিণাম হবে। তাতে তারা যে স্থানের বা যে কালেরই হোক না কেন। (আহসানুল বায়ান) যে জাতিকে 'সুখে খেতে ভূতে কিলোয়', সে জাতির ঘাড় থেকে পরাজয়ের ভূত নামবে কীভাবে?
জাতির অনেক মানুষ আছে, যাদের স্বভাব সেই মহিলার মতো, যে পতির খায়, আর উপপতির গুণ গায়! আরো অনেক মানুষ আছে, যারা সৃষ্টির অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা করে। কিন্তু স্রষ্টার বিস্তর পেয়ে কৃতঘ্নতা করে! যেমন এক ব্যক্তি তার বাদশার দরবারে নিজের অভাবের অভিযোগ নিয়ে গেল। বাদশা তার নামে এক কোটি টাকার চেক লিখে দিলেন। তারপর চুপচাপ দরবার থেকে বের হয়ে এসে দারোয়ানকে দেখতে পেলে সে তাকে দরবারে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করল। লোকটি বলল, 'অভাবের অভিযোগ নিয়ে এসেছিলাম।' সে কথা শুনে দারোয়ান ৫০ টাকার একটি নোট তার হাতে ধরিয়ে দিল। তাতে সে প্রচুর খোশ হল এবং পঞ্চমুখে তার প্রশংসা করতে লাগল। তা দেখে বাদশা হাসলেন এবং এমন কৃতঘ্নতা ও কৃতজ্ঞতা দেখে অবাক হলেন।
জাতির দরিদ্র মানুষও মহান আল্লাহর কোটি কোটি টাকার চেক নিয়ে পকেটে ভরে মুখ বন্ধ ক'রে আছে। অথচ সামান্যের জন্য সৃষ্টির প্রশংসায় পঞ্চমুখ আছে! কেউ করে পীরের প্রশংসা, কেউ করে ডাক্তারের প্রশংসা, কেউ করে নেতার প্রশংসা, কেউ করে দাতার প্রশংসা, কেউ করে শিক্ষকের প্রশংসা, কেউ করে আর কারো প্রশংসা। অথচ মহান আল্লাহই তাকে সুস্থতা দিয়েছেন, সুস্থতার মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে চোখ দিয়েছেন, চোখের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে হাত দিয়েছেন, হাতের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে পা দিয়েছেন, পায়ের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে যৌবন দিয়েছেন, যৌবনের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে সৌন্দর্য দিয়েছেন, সৌন্দর্যের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে আরো অনেক নিয়ামত দিয়েছেন, সে সকল নিয়ামতের মূল্য কত? কোথায় তাঁর কৃতজ্ঞতা? তাতেও কি সে সাফল্য পেতে চায়?
📄 নিরাশাবাদিতা
মানুষ যখন নিরাশ হয়ে যায়, তখন জীবন-যুদ্ধ বন্ধ ক'রে বসে যায়। যখন নিরাশ হয়, তখন মরিয়া হয়, মারমুখী হয়, আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়। অথচ নিরাশ হওয়া পরাজয়ের একটি বড় কারণ। আগেই যদি ভেবে বসা হয় যে, প্রতিপক্ষ সংখ্যা ও সরঞ্জামে অনেক বেশি, তাহলে জেতার আশা আর মনে বাসা বাঁধে না।
এ কারণেই মহান আল্লাহ বদর যুদ্ধের সময় শত্রু পক্ষকে মুসলিমদের চোখে স্বল্প দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেন, [إِذْ يُرِيكَهُمُ اللَّهُ فِي مَنَامِكَ قَلِيلاً وَلَوْ أَرَاكَهُمْ كَثِيرًا لَّفَشِلْتُمْ وَلَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَلَكِنَّ اللَّهَ سَلَّمَ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (৪৩) وَإِذْ يُرِيكُمُوهُمْ إِذِ الْتَقَيْتُمْ فِي أَعْيُنِكُمْ قَلِيلاً وَيُقَلِّلُكُمْ فِي أَعْيُنِهِمْ لِيَقْضِيَ اللهُ أَمْرًا كَانَ مَفْعُولاً وَإِلَى اللَّهُ تُرْجَعُ الأُمُورُ] (৪৪)
অর্থাৎ, স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাকে স্বপ্নে তাদের সংখ্যা অল্প দেখিয়েছিলেন। যদি তোমাকে তাদের সংখ্যা অধিক দেখাতেন, তাহলে তোমরা সাহস হারাতে এবং যুদ্ধ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করতে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে রক্ষা করেছেন। অন্তরে যা আছে সে সম্বন্ধে অবশ্যই তিনি বিশেষভাবে অবহিত। স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিলে, তখন তিনি তাদেরকে তোমাদের দৃষ্টিতে স্বল্প-সংখ্যক দেখিয়েছিলেন এবং তোমাদেরকেও তাদের দৃষ্টিতে স্বল্প-সংখ্যক দেখিয়েছিলেন; যাতে যা ঘটার ছিল, তা তিনি সম্পন্ন করেন। আর সব বিষয় আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়ে থাকে। (আনফালঃ ৪৩-৪৪)
বিজয়ের কোন কাজেই নিরাশ হওয়া চলবে না। আশা রাখতে হবে বড় এবং সেই সাথে ধৈর্যও ধারণ করতে হবে। বিজয় তত সহজ কিছু নয় যে, আশা করলেই পাওয়া যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, [أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْখُلُوا الْجَنَّةَ وَلَا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزلْزِلُواْ حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ] (২১৪) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা বেহেশ্ত প্রবেশ করবে; যদিও পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের অবস্থা এখনো তোমরা প্রাপ্ত হওনি? দুঃখ-দারিদ্র্য ও রোগ-বালা তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল, তারা এতদূর বিচলিত হয়েছিল যে, রসূল ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারিগণ বলে উঠেছিল, 'আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?' জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। (বাক্বারাহঃ ২১৪)
ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে আশা পূরণ হওয়ার জন্য। সফলতার সুউচ্চ শিখরে আরোহন করতে হলে পিঠ বাঁকা করতে হবে। পিঠ সোজা রেখে কেউ সাফল্যের পর্বতে চড়তে পারে না। ধৈর্যের সাথে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। মহান আল্লাহ বলেন, [حَتَّى إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَن نَّشَاء وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ] (১১০) سورة يوسف
অর্থাৎ, অবশেষে যখন রসূলগণ নিরাশ হল এবং (লোকে) ভাবল যে, তাদেরকে মিথ্যা (প্রতিশ্রুতি) দেওয়া হয়েছে, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য এল। অতঃপর আমি যাকে ইচ্ছা করলাম সে উদ্ধার পেল। আর অপরাধী সম্প্রদায় হতে আমার শাস্তি রদ করা হয় না। (ইউসুফঃ ১১০)
মনের ভিতরে আশা রেখে বিশ্বাস রাখতে হবে, [فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (৫) إِنَّ مَعَ الْعُসْرِ يُسْرًا] (৬) سورة الشرح
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। (ইনশিরাহঃ ৫-৬)
যদি কেউ বারবার হেরে যায়, তবুও মনে এ বিশ্বাস আনা ঠিক নয় যে, সে বিফল মানুষ। যেহেতু বিফলতার বহু পর্বত লংঘন করেই সফলতার সন্ধান পাওয়া যায়। জাতির কোন কোন সদস্যের বিফলতা দেখেও নিরাশ হওয়া ঠিক নয়। কোন নির্দিষ্ট দেশের অসফলতা ও পরাজয় দেখেও নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বরং যে ব্যক্তি ও দেশের মধ্যে সফলতা আছে, তাকে দেখে নিজের মধ্যে আশাবাদিতা সঞ্চয় করা উচিত। যেখানে অন্ধকার আছে, সেখানে না তাকিয়ে, যেখানে আলো আছে, সেখানে তাকিয়ে নিজের জীবনকে আলোকিত করার স্বপ্ন দেখলে তবেই সফল হওয়া যায়।
সাহাবাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের কথা শুনে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। তাতারের হত্যাকান্ড শুনেও নিরাশ হওয়া উচিত নয়। কারামেতাদের আধিপত্য শুনেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বাইতুল মাকদিস ৯১ বছর ধরে খ্রিষ্টানদের দখলে ছিল। সেই সময় সেখানে না জুমআহ হয়েছে, না জামাআত। সে কথা শুনে নিরাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ, যা হয়েছে, বয়ে গেছে। তার পরেও মুসলিমরা আধিপত্য পেয়েছে। বর্তমানেও ইয়াহুদী শক্তিকে বিশ্ববিজয়ী দেখে নিরাশ হওয়ার কিছু নয়। কারণ তার পরেও মুসলিমদের হারানো গৌরব ফিরে আসবেই। এই আশা জাতির মনে বাসা বাঁধা দরকার।
সাময়িক পরাজয় দেখে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। যেহেতু সবশেষে যার জয়, সেই হয় বিজয়ী। নিরাশ হওয়ার মানেই হল আল্লাহর প্রতি কুধারণা করা। বান্দার উচিত, তাঁর প্রতি সুধারণা ও আশা রাখা। তিনি বলেছেন, [لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ الله] (৫৩) سورة الزمر
অর্থাৎ, আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না। (যুমারঃ ৫৩)
[وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ] (৫৬) سورة الحجر
অর্থাৎ, 'পথভ্রষ্টরা ব্যতীত আর কে নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়?' (হিজরঃ ৫৬)
[وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ] (৮৭)
অর্থাৎ, 'আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না, কারণ অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয় না।' (ইউসুফঃ ৮৭)
📄 শিক্ষাহীনতা
জ্ঞান-বিজ্ঞান জাতির মেরুদন্ড। সুতরাং যে জাতির তা নেই, সে জাতি কি উঠে দাঁড়াতে পারে? যে জাতির কেবল একটাই জীবন নয়, বরং দু'দুটো জীবন, সেই জাতি যদি জীবন ধারণের জ্ঞান শিক্ষা না করে, তাহলে ধ্বংস হবে না কি?
যে জাতির সর্বপ্রথম ইলাহী আদেশ ছিল, 'পড়', সে জাতি পড়াতেই যদি মরা হয়, তাহলে ধ্বংসই তার ভাগ্য হবে না কি?
যে জাতির আবির্ভাব ঘটেছিল অপরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, সেই জাতি যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানে অপর জাতির মুখাপেক্ষী হয়, তাহলে তার পরিণতি অধঃপতন নয় কি?
যে জাতির পরশমণি হয়ে থাকার কথা ছিল, সেই জাতি যদি অন্যের পরশে মরিচা-পড়া লোহা হয়ে যায়, তাহলে কর্মকারের হাপরে স্থান পাওয়ার উপযুক্ত নয় কি?
অজ্ঞানতা যে জাতিকে তার দ্বীন থেকে পিছিয়ে দিয়েছে, অলসতা যে জাতিকে পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানেও অনুন্নত ক'রে রেখেছে, সে জাতির অভ্যুত্থান কীভাবে হতে পারে?
যে জাতি বিজাতির পদলেহন ক'রে বাঁচতে অভ্যস্ত হয়, সে জাতির জ্ঞান-বুদ্ধির কি ঋদ্ধি-বৃদ্ধি হতে পারে?
যে জাতি কেবল এক সৃষ্টিকর্তার গোলামি জানত, সে জাতি যদি সৃষ্টির গোলামি ক'রে গর্ববোধ করে, তাহলে তার পরিণামে কি জ্ঞানের বিকাশ হতে পারে?
যে জাতি অপরের জ্ঞান দেখে মুগ্ধ, সে জাতি কি নিজের জ্ঞান-বিবেকের উপর আস্থা রাখতে পারে?
উল্টা হতভাগ্য এই জাতির কিছু লোক ধারণা করে যে, তাদেরকে তাদের দ্বীনই জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে পিছিয়ে রেখেছে। অথচ কোন বেদ্বীন ব্যক্তি বা জাতিও তো সে পথে অগ্রসর হতে পারছে না। দ্বীন তো দ্বীনদারকে জ্ঞানচর্চা করতে অনুপ্রাণিত করে। দ্বীন তো বিজ্ঞানের বিরোধী নয়। আর বিজ্ঞানী হওয়ার জন্যেও নাস্তিক হওয়া জরুরী নয়। তাহলে নিজের অপারগতার জন্য দায় সারার এ জবাব কেন?
যুগে যুগে জাতির সম্পদ যে লোকেরা একা একা ভোগ করেছে, সেই ভোগ-বিলাসীরাই পারত সেই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দ্বীন-দুনিয়ার উন্নতি সাধন করতে। যারা বিবির জন্য তাজমহল বানিয়েছে, কিন্তু জাতির জন্য কোন জ্ঞানমন্দির বানায়নি, যারা গদি পেয়ে নিজ পরিবারের আখের গুছিয়েছে, কিন্তু পতনোন্মুখ জাতির কথা ভেবেও দেখেনি, দোষ তো তাদেরই।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে অর্থের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। অতএব জাতির অর্থ যাদের হাতে, তারাই কি জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অনুন্নত এই জাতির অধঃপতনের জন্য সর্বাংশে দায়ী নয়?
'সাবাক পড় ফির স্বাদাক্বাত কা আদালাত কা শাজাআত কা, কাম লিয়া জায়েগা তুঝ সে ফির দুনিয়া কী ইমামাত কা।'
📄 হীনমন্যতা
পরাজয়ের একটি কারণ হীনম্মন্যতা। কোন কোন মানুষ ভাবে, সে বড় কাজের যোগ্য নয়, সে বিজয় লাভের উপযুক্ত নয়। অনেকে চাইলে গোটা ফুল বাগান পেত, কিন্তু তারা গোটা কতক ফুল নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে।
কত বুযুর্গ বুখারীর তাদরীস ছেড়ে দুনিয়ার লোভে সরকারী স্কুলে 'আলিফ-বা' পড়াচ্ছেন। কত বড় বড় ডিগ্রী অর্জন ক'রে পরিশেষে প্রাইমারীর শিক্ষকতা করছেন! তাঁরা তাঁদের ইলমের যাকাতও বের করেন না। ঐ হীনম্মন্যতার শিকারে পরিণত হন, 'আমাদের সে ক্ষমতা নেই সাহেব!' অবশ্য তাঁরা পার্থিব বিষয়ে মহা-বিজয় লাভ করেন।
অনেকে চাকরি না পেয়ে বসে বসে অথবা চাষ-ব্যবসা নিয়ে নিজের শিক্ষা বিনষ্ট ক'রে ফেলছেন। অনেকের ক্ষমতা আছে কলমের জিহাদ করা, অথচ হীনম্মন্যতার শিকার হয়ে সে প্রতিভা হেলায় নষ্ট ক'রে দিচ্ছেন। অনেকের মনে কিছু করার সৎ সাহস নেই, মনে উদ্দীপনা ও উৎসাহ নেই। তাই ঝিমিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। ফলে জাতির কোন কল্যাণে তাঁদেরকে দেখা যায় না। শ্রেষ্ঠ জাতির মধ্যে শামিলও হতে চান না। অথচ তাঁদের উপর জাতির হক আছে।
পাহাড়ে চড়তে হলে সাহস লাগে। আর সাহস না থাকলে, উঁচু মন না থাকলে, হিম্মত না থাকলে গর্তের মধ্যেই থেকে যেতে হয়। আরবী কবি বলেন, 'ওয়ামান ইয়াতাহাইয়্যাব সুঊদাল জিবালি ইয়াঈশ আবাদাদ্দাহরি বাইনাল হুফার।' অর্থাৎ, যে ব্যক্তি পাহাড় চড়তে ভয় পায়, সে চিরদিন গর্তের মধ্যেই বাস করে।