📄 দাঁড়ি-মারা
জাতির এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর অভ্যাস হল ক্রেতাকে ঠকিয়ে বেশি লাভ করা। এই জন্য হাদীসে ব্যবসায়ীদেরকে পাপাচারী বলা হয়েছে। (আহমাদ, হাকেম) কারণ তারা ব্যবসায় মিথ্যা বলে। মিথ্যা কসম খায়। ধোঁকা- ধাপ্পা দেয়। মাপে ও ওজনে কম দেয়। আর এটি একটি ধ্বংসাত্মক পাপ। আল্লাহর রসূল বলেছেন,
“হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর। যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে---যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না।
যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে। যে জাতিই তার মালের যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সে জাতির জন্যই আকাশ হতে বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হবে। যদি অন্যান্য প্রাণীকুল না থাকত, তাহলে তাদের জন্য আদৌ বৃষ্টি হত না।
যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সে জাতির উপরেই তাদের বিজাতীয় শত্রুদলকে ক্ষমতাসীন করা হবে; যারা তাদের মালিকানা-ভুক্ত বহু ধন-সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করবে।
আর যে জাতির শাসকগোষ্ঠী যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর কিতাব (বিধান) অনুযায়ী দেশ শাসন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাদের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব অবস্থায়ী রাখবেন।” (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)
তিনি আরো বলেছেন, "পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি।” জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি কি কি?' তিনি বললেন, “যে জাতিই (আল্লাহর) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সেই জাতির উপরেই তাদের শত্রুকে ক্ষমতাসীন করা হবে। যে জাতিই আল্লাহর অবতীর্ণকৃত সংবিধান ছাড়া অন্য দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সেই জাতির মাঝেই দরিদ্রতা ব্যাপক হবে। যে জাতির মাঝে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ পাবে, সে জাতির মাঝেই মৃত্যু ব্যাপক হবে। যে জাতিই যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সেই জাতির জন্যই বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হবে। যে জাতি দাঁড়ি-মারা শুরু করবে, সে জাতি ফসল থেকে বঞ্চিত হবে এবং দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ৭৬০নং)
📄 আত্মগর্ব
জাতির আত্মগর্ব তার পরাজয়ের একটি কারণ। নিজেদের সংখ্যাধিক্য, অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকত্ব ও আধিক্য ইত্যাদি নিয়ে আত্মগর্ব করলে সে গর্ব খর্ব হয়। সংখ্যায় অধিক হলে কী হবে? ঈমান ও আমলে কম। অধিকাংশ লোকদেরকে কোথায় দেখা যায়? ভালতে না মন্দতে? অধিকাংশ লোক আল্লাহ-ওয়ালা, না আল্লাহ-ভোলা? সৃষ্টিকর্তাই বলে দিয়েছেন,
[وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلا يَخْرُصُونَ] (১১৬) سورة الأنعام
অর্থাৎ, যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামতো চল, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত ক'রে দেবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরণ করে এবং তারা কেবল অনুমানভিত্তিক কথাবার্তাই বলে থাকে। (আনআমঃ ১১৬)
[وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ] (১০৩) سورة يوسف
অর্থাৎ, তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (ইউসুফ: ১০৩)
[وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ] (১০৬) سورة يوسف
অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু তাঁর অংশী স্থাপন করে। (ঐঃ ১০৪)
[اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ] (১৩) سورة سبأ
অর্থাৎ, 'হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তোমরা কাজ করতে থাক। আমার দাসদের মধ্যে কৃতজ্ঞ অতি অল্পই।' (সাবা'ঃ ১৩)
জাতির মাথা গুনতিতে অনেক, কিন্তু কাজে কেবল কতক। আর তার জন্যই সংখ্যাধিক্যের কোন মূল্য নেই। আল্লাহর রসূল বলেন, "অনতি দূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজপাত্রের উপর একত্রিত হয়। (এবং চারিদিক থেকে ভোজন ক'রে থাকে।)” একজন বলল, 'আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।” এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! দুর্বলতা কী?' তিনি বললেন, “দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া।” (আবু দাউদ ৪২৯৭, আহমাদ ৫/২৭৮)
বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের সংখ্যাধিক্য দেখতেই বেশি, তাদের মধ্যে হকপন্থী ও তওহীদবাদী কয়জন আছে? কোন দেশে জান-মাল দিয়ে বিজয় আনে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা, পরিশেষে গদি পড়ে ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের দখলে। কারণ সে দেশে তাদেরই সংখ্যা বেশি। কোন দেশে তওহীদবাদীরা জান-মাল দিয়ে বিজয় আনে। অতঃপর গদি চালায় মাজারী অথবা শিয়ারা। এমন না হলে গৃহযুদ্ধ চলে। কাফেরদের কবল থেকে দেশমুক্ত ক'রে নিজেদের মাঝে গদির লড়াই চলে। গণতন্ত্রের নীতিতে বিরোধী বাহাত্তর দলের কাছে একটি দল কি কোনও দিন ক্ষমতাসীন হতে পারবে? পক্ষান্তরে বিজয়ের জন্য সংখ্যাধিক্য হওয়া জরুরী নয়। জরুরী হল ঈমানী দীপ্তির আধিক্য। নচেৎ,
[كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةً بِإِذْنِ الله وَاللهُ مَعَ الصَّابِرِينَ] (২৪৯) البقرة
অর্থাৎ, আল্লাহর ইচ্ছায় কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন। (বাক্বারাহঃ ২৪৯)
আত্মগর্বকে আল্লাহ অপছন্দ করেন। পরন্ত আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সংখ্যাধিক্য কোন কাজের নয়। তিনি বলেন, [لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ] (২৫) سورة التوبة
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে তো বহুক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং হুনাইনের যুদ্ধের দিনেও; যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তা তোমাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন ক'রে পলায়ন করেছিলে। (তাওবাহঃ ২৫)
আত্মগর্ব জাতির পরাজয় আনে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি, শিল্প ও খনিজ-পদার্থ ইত্যাদি নিয়ে গর্ব কোন কাজের নয়; যদি তাতে আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টি না থাকে। এক জাতির কথা মহান আল্লাহ বলেন, [فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِندَهُم مِّنَ الْعِلْمِ وَحَاقَ بِهِم مَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِؤُون] (৮৩) سورة غافر
অর্থাৎ, ওদের নিকট যখন স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ ওদের রসূল এসেছিল, তখন ওরা নিজেদের জ্ঞানের দম্ভ করত। ওরা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তাই তাদেরকে বেষ্টন করল। (মু'মিনঃ ৮৩)
রসূল বা নায়েবে রসূল যখন বলেন, 'হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর।' তখন তারা বলে, 'কী দরকার? আমাদের কাছে জ্ঞান-বিজ্ঞান আছে।' যখন তাঁরা বলেন, 'তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং ব্যভিচার, সমকাম, অশ্লীলতা ইত্যাদি বর্জন কর, তাহলে ইহ-পরকালে সুখী হবে।' তারা বলে, 'তার প্রয়োজন কী? আমাদের মাঝে ডাক্তার আছে, বিজ্ঞানী আছে।' তাঁরা বলেন, 'সূদ বর্জন কর, তাতে বর্কত বিনাশ হয়ে যাবে।' তারা বলে, 'অসুবিধা কী? আমাদের মাঝে অর্থনীতিবিদ সুপন্ডিতরা রয়েছেন। আমাদের কাছে অর্থনীতি পরিকল্পনা রয়েছে এবং সকল মন্দা থেকে রেহাই পাওয়ার পুরনো অভিজ্ঞতা রয়েছে।' এইভাবে নিজেদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আত্মগর্বের দোহাই দিয়ে আল্লাহর কথা ভুলে যায়। পরিশেষে ভাগ্য হয় পরাজয়।
📄 আল্লাহর শাস্তি থেকে বেপরোয়া
আল্লাহর আযাব থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা এবং তাঁর শাস্তির ব্যাপারে বেপরোয়া হওয়া ধ্বংসের একটি কারণ। জাতি কোন পরোয়া না ক'রে দিবারাত্রি পাপ ক'রে যায়, প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ক'রে যায়, মু'মিনদের মাঝে পাপ ছড়িয়ে যায়! জাতি কি নিজেকে শাস্তিমুক্ত মনে করে, জাতির কি কোন পাকড়াও হবে না? জাতি কি সুনিশ্চিতভাবে নিরাপদ? মহান আল্লাহ বলেন,
[أَفَأَمِنَ أَهْلُ الْقُرَى أَن يَأْتِيَهُمْ بَأْسُنَا بَيَاتًا وَهُمْ نَائِمُونَ (৯৭) أَوَ أَمِنَ أَهْلُ الْقُرَى أَن يَأْتِيَهُمْ بএْسُنَا ضُحًى وَهُمْ يَلْعَبُونَ (৯৮) أَفَأَمِنُواْ مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ] (৯৯) سورة الأعراف
অর্থাৎ, তবে কি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ভয় রাখে না যে, আমার শাস্তি তাদের উপর আসবে রাত্রিকালে, যখন তারা থাকবে ঘুমে মগ্ন? অথবা জনপদের অধিবাসীবৃন্দ কি ভয় করে না যে, আমার শাস্তি তাদের উপর আসবে দিনের প্রথম ভাগে, যখন তারা থাকবে খেলায় মত্ত? তারা কি আল্লাহর চক্রান্তের ভয় রাখে না? বস্তুতঃ ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই আল্লাহর চক্রান্ত হতে নিরাপদ বোধ করে না। (আ'রাফ ৯৭-৯৯)
জাতির বহু লোক তার নিজের দুশমন। সেই দুশমনরা ও কাফেররা আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে! তবে তারা সে চক্রান্তে কৃতকার্য হয় না। জয় হয় আল্লাহরই। [وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ] (৫৪) سورة آل عمران অর্থাৎ, অতঃপর তারা ষড়যন্ত্র করল এবং আল্লাহও কৌশল প্রয়োগ করলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলী। (আলে ইমরানঃ ৫৪)
যে জাতি আল্লাহর বিরুদ্ধে চক্রান্তে বিজয়ী হতে চায়, সে জাতি আসলেই হুতভাগা চির-পরাজিত।
📄 আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করা
জাতির জীবনে যখন সুখ আসে, তখন সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যায়। ভুলে যায় তাঁর অনুগ্রহকে, ভুলে যায় তাঁর করুণাকে। সে সময় সে যেন আত্মনির্ভর হয়ে উঠে। স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অমুখাপেক্ষী প্রকাশ করে নিজেকে। আর তখনই আসে আযাবের চাবুক। কারুনকে মহান আল্লাহ এত ধনভান্ডার দান করেছিলেন, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। তাই সে দম্ভ করত। তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, 'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।' কিন্তু সে বলল, 'এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি!' আমি বুদ্ধি না লাগালে কি আল্লাহ ধন দিতেন? আরে 'স্বামীর হাতে ধন থাকলে, স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী' হয়! পরিণামে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করলেন। (সূরা ক্বাস্বাসের শেষাংশ দ্রষ্টব্য)
অনুরূপ অনেক মানুষ আছে, যাদেরকে 'সুখে খেতে ভূতে কিলোয়।' আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে অপছন্দ করে। অতি সুখ যখন একঘেয়ে হয়ে যায়, তখন 'পরিবর্তন' চায়। অথচ সে পরিবর্তন দুঃখের দিকে প্রত্যাবর্তন ঘটায়। বানী ইস্রাঈল বেশ সুখেই 'মান্না ও সালওয়া' খাচ্ছিল। কিন্তু তাদের পিঁয়াজ-রসুন খেতে পছন্দ হল। তারা বলল,
[يَا مُوسَى لَن نَّصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ مِن بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا]
অর্থাৎ, 'হে মুসা! একই রকম খাদ্যে আমরা কখনো ধৈর্য ধারণ করব না, সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, তিনি যেন ভূমি জাত দ্রব্য শাক-সব্জী, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পিঁয়াজ উৎপাদন করেন।' মুসা বললেন,
[أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْراً فَإِنَّ لَكُم مَّا سَأَلْتُمْ]
অর্থাৎ, মুসা বলল, 'তোমরা কি উৎকৃষ্ট বস্তুকে নিকৃষ্ট বস্তুর সাথে বিনিময় করতে চাও? তবে কোন নগরে অবতরণ কর। তোমরা যা চাও, তা সেখানে আছে।' আল্লাহ বলেন,
[وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذُّلَّةُ وَالْمُسْكَنَةُ وَبَاؤُوْا بِغَضَبٍ মِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ] (৬১) البقرة
অর্থাৎ, আর তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যগ্রস্ত হল এবং আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হল। এ জন্য যে তারা আল্লাহর নিদর্শন সকলকে অমান্য করত এবং (প্রেরিত পুরুষ) নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন করবার জন্যেই তাদের এই পরিণতি ঘটেছিল। (বাক্বারাহঃ ৬১)
অনুরূপ ঘটেছিল সাবা'-ওয়ালাদের। মহান আল্লাহ বলেন, [لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ جَنَّتَانِ عَنْ يَمِينٍ وَشِمَالٍ كُلُوا مِنْ رِزْقِ رَبِّكُمْ وَاشْكُرُوا لَهُ بَلْدَةٌ طَيِّبَةٌ وَرَبُّ غَفُورٌ (১৫) فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَاهُمْ بِجَنَّتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَى أُكُل خَمْطٍ وَأَثْلٍ وَشَيْءٍ مِنْ سِدْرٍ قَلِيلٍ (১৬) ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ نُجَازِي إِلا الْكَفُورَ (১৭) وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا قُرًى ظَاهِرَةً وَقَدَّرْنَا فِيهَا السَّيْرَ سِيرُوا فِيهَا لَيَالِي وَأَيَّامًا آمِنِينَ (১৮) فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ] (১৯) سورة سبأ
অর্থাৎ, সাবা'বাসীদের জন্য ওদের বাসভূমিতে এক নিদর্শন ছিল; দু'টি বাগান: একটি ছিল ডান দিকে, অপরটি ছিল বাম দিকে; ওদেরকে বলা হয়েছিল, 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দেওয়া রুযী ভোগ কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। এ শহর উত্তম এবং তোমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল।' পরে ওরা আদেশ অমান্য করল। ফলে আমি ওদের ওপর বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যা প্রবাহিত করলাম এবং ওদের বাগান দু'টিকে পরিবর্তন ক'রে দিলাম এমন দু'টি বাগানে, যাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুলগাছ। আমি ওদেরকে এ শাস্তি দিয়েছিলাম ওদের সত্য অকৃতজ্ঞতা (বা অস্বীকারের) জন্য। আর আমি অকৃতজ্ঞ (বা অস্বীকারকারী)কেই শাস্তি দিয়ে থাকি। ওদের এবং যে সব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলির অন্তর্বর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং ঐ সকল জনপদে ভ্রমণকালে বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবধানে বিশ্রামস্থান নির্ধারিত করেছিলাম এবং ওদেরকে বলেছিলাম, 'তোমরা এ সব জনপদে রাত-দিন নিরাপদে ভ্রমণ কর।' কিন্তু ওরা বলল, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের সফরের বিশ্রামস্থান দূরে দূরে স্থাপন কর।' এভাবে ওরা নিজেদের প্রতি যুলম করেছিল। ফলে আমি ওদেরকে কাহিনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত করলাম এবং ওদেরকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ক'রে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। (সাবা' ১৫-১৯)
মহান আল্লাহ এমনই এক জনপদের কথা উদাহরণ স্বরূপ বলেছেন, [وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ] (১১২) অর্থাৎ, আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। (নাহলঃ ১১২)
অধিকাংশ মুফাস্সিরগণ এই জনপদ বা শহর বলতে মক্কা বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, এই আয়াতে মক্কা ও মক্কাবাসীদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। আর তা ঐ সময় ঘটেছিল, যখন আল্লাহর রসূল তাদের জন্য অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহুম্মাশদুদ ওয়াতআত্যাকা আলা মুদার ওজআলহা আলাইহিম সিনিনা কাসিনি ইউসুফ।' অর্থাৎ, হে আল্লাহ মুদার গোত্রকে কঠিনভাবে ধর এবং তাদের উপর এমন অনাবৃষ্টি এনে দাও যেমন ইউসুফ (আ.)-এর যুগে মিসরে হয়েছিল। (বুখারী ৪৮২১, মুসলিম ২১৫৬নং)
সুতরাং মহান আল্লাহ তাদের নিরাপত্তাকে ভয় এবং সুখকে ক্ষুধা দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দিয়েছিলেন। এমনকি তাদের অবস্থা এই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, তারা হাড় ও গাছের পাতা খেয়ে দিন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল।
কিছু মুফাস্সিরের মতে এই জনপদ কোন নির্দিষ্ট গ্রাম বা শহর নয়। বরং এটি উপমা স্বরূপ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, অকৃতজ্ঞ লোকেদের এই পরিণাম হবে। তাতে তারা যে স্থানের বা যে কালেরই হোক না কেন। (আহসানুল বায়ান) যে জাতিকে 'সুখে খেতে ভূতে কিলোয়', সে জাতির ঘাড় থেকে পরাজয়ের ভূত নামবে কীভাবে?
জাতির অনেক মানুষ আছে, যাদের স্বভাব সেই মহিলার মতো, যে পতির খায়, আর উপপতির গুণ গায়! আরো অনেক মানুষ আছে, যারা সৃষ্টির অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা করে। কিন্তু স্রষ্টার বিস্তর পেয়ে কৃতঘ্নতা করে! যেমন এক ব্যক্তি তার বাদশার দরবারে নিজের অভাবের অভিযোগ নিয়ে গেল। বাদশা তার নামে এক কোটি টাকার চেক লিখে দিলেন। তারপর চুপচাপ দরবার থেকে বের হয়ে এসে দারোয়ানকে দেখতে পেলে সে তাকে দরবারে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করল। লোকটি বলল, 'অভাবের অভিযোগ নিয়ে এসেছিলাম।' সে কথা শুনে দারোয়ান ৫০ টাকার একটি নোট তার হাতে ধরিয়ে দিল। তাতে সে প্রচুর খোশ হল এবং পঞ্চমুখে তার প্রশংসা করতে লাগল। তা দেখে বাদশা হাসলেন এবং এমন কৃতঘ্নতা ও কৃতজ্ঞতা দেখে অবাক হলেন।
জাতির দরিদ্র মানুষও মহান আল্লাহর কোটি কোটি টাকার চেক নিয়ে পকেটে ভরে মুখ বন্ধ ক'রে আছে। অথচ সামান্যের জন্য সৃষ্টির প্রশংসায় পঞ্চমুখ আছে! কেউ করে পীরের প্রশংসা, কেউ করে ডাক্তারের প্রশংসা, কেউ করে নেতার প্রশংসা, কেউ করে দাতার প্রশংসা, কেউ করে শিক্ষকের প্রশংসা, কেউ করে আর কারো প্রশংসা। অথচ মহান আল্লাহই তাকে সুস্থতা দিয়েছেন, সুস্থতার মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে চোখ দিয়েছেন, চোখের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে হাত দিয়েছেন, হাতের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে পা দিয়েছেন, পায়ের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে যৌবন দিয়েছেন, যৌবনের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে সৌন্দর্য দিয়েছেন, সৌন্দর্যের মূল্য কত? মহান আল্লাহই তাকে আরো অনেক নিয়ামত দিয়েছেন, সে সকল নিয়ামতের মূল্য কত? কোথায় তাঁর কৃতজ্ঞতা? তাতেও কি সে সাফল্য পেতে চায়?