📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 শিরক

📄 শিরক


শির্ক মুশরিকদের ক্ষতি করে না, যেহেতু এটা তাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া পার্থিব ঢিল। তাদেরকে ঢিল দেওয়া হয়েছে, তারা উন্নত হবে। কিন্তু পরকালে তারা শাস্তি পাবে। ইহকালেও কিছু পেতে পারে। আল্লাহ বলেন,

[وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِّأَنফُسِهِمْ إِنَّمَا নُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ] (১৭৮) سورة آل عمران
অর্থাৎ, অবিশ্বাসিগণ যেন কিছুতেই মনে না করে যে, আমি তাদেরকে যে সুযোগ দিয়েছি, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বস্তুতঃ আমি তাদেরকে এ জন্য সুযোগ দিয়েছি যে, যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায়। আর তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (আলে ইমরানঃ ১৭৮)

পক্ষান্তরে তওহীদবাদী মুসলিমদের মাঝে শির্ক তাদের ধ্বংসের কারণ। যে জাতির মাঝে শির্ক থাকে, সে জাতির মাঝে নিরাপত্তা বিলীন হয়ে যায়। শঙ্কা-ভীতি তার নিত্যকার সাথী হয়। আল্লাহর আযাব ও গযবের উপযুক্ত হয় তার কর্ম। মহান আল্লাহ তওহীদের ইমাম ইব্রাহীম (আ.)-এর উক্তি আল-কুরআনে উদ্ধৃত ক'রে বলেছেন,

[وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُم بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالأَمْنِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ (৮১) الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ] (৮২) سورة الأنعাম
অর্থাৎ, তোমরা যাকে আল্লাহর অংশী কর, আমি তাকে কিরূপে ভয় করব? অথচ তোমরা ভয় কর না যে, তোমরা আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে শরীক ক'রে চলছ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের নিকট কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। সুতরাং যদি তোমরা জান (তাহলে বল), দু'দলের মধ্যে কোন্ দলটি নিরাপত্তালাভের অধিকারী?' যারা বিশ্বাস করেছে এবং তাদের বিশ্বাসকে যুলুম (শির্ক) দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত। (আনআমঃ ৮১-৮২)

তিনি মুশরিকদের বাস্তব পরিস্থিতি উল্লেখ ক'রে বলেছেন, [وَمَن يُشْرِكْ بِالله فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاء فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سحيق] (৩১) سورة الحج অর্থাৎ, যে কেউ আল্লাহর শরীক করে (তার অবস্থা) সে যেন আকাশ হতে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। (হাজ্জঃ ৩১)

যেমন বড় বড় পাখি ছোট কোন জীবকে অত্যন্ত দ্রুত ছোঁ মেরে নিয়ে যায়, বা বাতাস কিছুকে উড়িয়ে নিয়ে দূরে কোথাও নিক্ষেপ করে এবং যার কোন হদিস পাওয়া যায় না; উক্ত দুই অবস্থাতেই মৃত্যু অবধারিত। ঠিক অনুরূপ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে, সে সুস্থ প্রকৃতি ও আন্তরিক পবিত্রতার দিক দিয়ে পবিত্রতা ও নির্মলতার এক উচ্চাসনে আসীন হয়। কিন্তু যখনই সে শির্কের পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখনই সে নিজেকে উঁচু হতে একদম নীচে, পবিত্রতা হতে অপবিত্রতায় এবং নির্মলতা হতে কর্দম ও পঙ্কিলতায় নিক্ষেপ করে। শির্ক মানুষকে মানসিক পরাজয় ও আতঙ্কগ্রস্ত করে। আর যার মনে ভয় থাকে, সে কি আর বিজয়ী বীর হতে পারে?

মহান আল্লাহ বলেন, [سَنُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ بِمَا أَشْرَكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَمَأْوَاهُمُ النَّارُ وَبِئْسَ مَثْوَى الظَّالِمِينَ] (১৫১) سورة آل عمران
অর্থাৎ, যারা অবিশ্বাস করে তাদের হৃদয়ে আমি ভীতির সঞ্চার করব, যেহেতু তারা আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করেছে; যার সপক্ষে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। জাহান্নাম হবে তাদের নিবাস। আর অনাচারীদের আবাসস্থল অতি নিকৃষ্ট! (আলে ইমরানঃ ১৫১)

যে জাতির মাঝে মূর্তিপূজা, অথবা জীবিত বা মৃত মানুষ কিংবা তার ছবি পূজা, কবর বা মাযার পূজা, তাগূত বা শক্তিপূজা হয়, সে জাতি কি ধ্বংসের উপযুক্ত নয়? মাটির নিচে কবরে রেখে পূজা অথবা প্রতিমূর্তি বানিয়ে বেদির উপর রেখে পূজার মাঝে আর কতটুকুই বা পার্থক্য আছে? দুর্গাপূজা ও দর্গাপূজার মাঝে কেবল একটি স্বরচিহ্নের পার্থক্য আছে। মাযারে বাৎসরিক মেলার আয়োজন ক'রে, নজর-নিয়ায ও কুরবানী পেশ ক'রে শির্কের যে ধুম জাতির মাঝে প্রচলিত রয়েছে, তাতে কি তার অভ্যুদয়ের কোন আশা করা যেতে পারে?

মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) প্রমুখাৎ বর্ণিত, আল্লাহর রসূল মৃত্যুশয্যায় শয়নাবস্থায় বলে গেছেন, "আল্লাহ ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে অভিশাপ (ও ধ্বংস) করুন। কারণ তারা তাদের নবীগণের কবরসমূহকে মসজিদ (সিজদার স্থান) বানিয়ে নিয়েছে।” (বুখারী, মুসলিম ৫২৯নং, নাসাঈ)

এ জাতির মুশরিকরা বলে, "আমরা তো সমাধিস্থ বুযুর্গকে 'খোদা' বলে মানি না।" মক্কার মুশরিকরাও তাদের দেবতাগুলিকে 'খোদা' বলে মানত না। তারা যে কারণে তাদের পূজা করত, সে কারণ কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে,

[أَلَا الله الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى الله زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحُكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ] (৩) سورة الزمر
অর্থাৎ, তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর উপাসনা করে, যা তাদের কোন অপকারও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। অথচ তারা বলে, এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বলে দাও, 'তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ, যা তিনি অবগত নন, না আকাশসমূহে, আর না পৃথিবীতে? তিনি পবিত্র এবং তারা যে অংশী করে, তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে।' (ইউনুসঃ ১৮)

অর্থাৎ, জেনে রাখ, খাঁটি আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা বলে, 'আমরা এদের পূজা এ জন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।' ওরা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে, আল্লাহ তার ফায়সালা ক'রে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না, যে মিথ্যাবাদী অবিশ্বাসী। (যুমার: ৩)

তাহলে সে যুগের মুশরিক এবং এ যুগের কালেমা-ওয়ালা মুশরিকের মাঝে কোন পার্থক্য থাকল কি? হ্যাঁ, পার্থক্য আছে একটি অতিরিক্ত বিষয়ে। আর তা হল এই যে, সে যুগের মুশরিকরা কেবল সুখের সময় শির্ক করত, কিন্তু দুঃখ ও বিপদের সময় কেবল আল্লাহকে ডাকত। আর এ যুগের মুশরিকরা সুখে-দুঃখে সব সময়ই শির্ক করে! শির্ক হল বড় ফিতনা। আর যে জাতির মধ্যে ফিতনা থাকে, সে জাতি কি কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে? মহান আল্লাহ বলেছেন,

[وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ اللهِ فَإِنِ انتَهَوا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ] (১৯৩) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাক, যতক্ষণ না ফিতনা (অশান্তি, শির্ক বা ধর্মদ্রোহিতা) দূর হয়ে আল্লাহর দ্বীন (ধর্ম) প্রতিষ্ঠিত না হয়, কিন্তু যদি তারা নিবৃত্ত হয়, তবে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে ছাড়া (অন্য কারো বিরুদ্ধে) আক্রমণ করা চলবে না। (বাক্বারাহঃ ১৯৩)

[وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ] (১৯১) سورة البقرة
অর্থাৎ, ফিতনা (অশান্তি, শির্ক বা ধর্মদ্রোহিতা) হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর। (ঐঃ ১৯১)

শির্ক মানবতার অপমান। শির্ক থাকতে কি মানব-সমাজের সার্বিক কল্যাণ লাভ হতে পারে?

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 জুলুমবাজি

📄 জুলুমবাজি


অত্যাচার সমাজে অন্যতম পাপাচার। এই পাপাচারও যখন তুঙ্গে ওঠে, ধ্বংস তখন অনিবার্যরূপে সমাজের ভাগ্যে পরিণত হয়। মহান আল্লাহ সে কথা কুরআনে বলেছেন,

[وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِن قَبْلِكُمْ لَا ظَلَمُوا وَجَاءتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ وَمَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا كَذَلِكَ نَجْزِي الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ] (১৩) سورة يونس
অর্থাৎ, আমি অবশ্যই তোমাদের পূর্বে বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস ক'রে দিয়েছি, যখন তারা সীমালংঘন করেছিল। তাদের নিকট তাদের রসূলগণও প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল; কিন্তু তারা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমি অপরাধীদেরকে এইরূপেই শাস্তি দিয়ে থাকি। (ইউনুসঃ ১৩)

[وَتِلْكَ الْقُرَى أَهْلَكْنَاهُمْ لمَّا ظَلَمُوا وَجَعَلْنَا لِمَهْلِكِهِم مَّوْعِدًا] (৫৯) سورة الكهف
অর্থাৎ, ঐসব জনপদ; তাদের অধিবাসীবৃন্দকে আমি ধ্বংস করেছিলাম, যখন তারা যুলুম করেছিল এবং তাদের ধ্বংসের জন্য আমি স্থির করেছিলাম এক নির্দিষ্ট ক্ষণ। (কাহফঃ ৫৯)

[ثُمَّ صَدَقْنَاهُمُ الْوَعْدَ فَأَنجَيْنَاهُمْ وَمَن نَّشَاء وَأَهْلَكْنَا الْمُسْرِفِينَ] (৯) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, অতঃপর আমি তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, সুতরাং আমি তাদেরকে এবং যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করলাম। আর সীমালংঘনকারীদেরকে ধ্বংস করলাম। (আম্বিয়াঃ ৯)

[فَكَأَيِّن مِّن قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ فَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا وَبِئْرٍ মُّعَطَّلَةٍ وَقَصْرٍ মَّشِيدٍ] (৪৫) سورة الحج
অর্থাৎ, আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ যেগুলির বাসিন্দা ছিল যালেম, এসব জনপদ তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল এবং কত কূপ পরিত্যক্ত হয়েছিল ও কত সুদৃঢ় প্রাসাদও। (হাজ্জঃ ৪৫)

[أَهُمْ خَيْرٌ أَمْ قَوْمُ تُبَّعٍ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ أَهْلَكْنَاهُمْ إِنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ] (৩৭)
অর্থাৎ, ওরা কি শ্রেষ্ঠ, না তুব্বা' সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তীরা; আমি ওদেরকে ধ্বংস করেছিলাম, নিশ্চয় ওরা ছিল অপরাধী। (দুখানঃ ৩৭)

[وَلَوْ شَاءَ اللهُ جَعَلَهُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَكِن يُدْخِلُ مَن يَشَاء فِي رَحْمَتِهِ وَالظَّالِمُونَ مَا لَهُم مِّن وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ] (৮) سورة الشورى
অর্থাৎ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষকে একই জাতিভুক্ত (একই মতাদর্শের অনুসারী) করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে স্বীয় অনুগ্রহের অধিকারী ক'রে থাকেন। আর সীমালংঘনকারী (যালেম) দের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই। (শূরাঃ ৮)

এ কথা বিদিত যে, মহান প্রতিপালক অত্যাচারীর সাহায্য করেন না। বরং তিনি অত্যাচারিতের সাহায্য ক'রে থাকেন। অত্যাচারিত ব্যক্তি দুআ করলে আল্লাহ বলেন, 'আমার ইজ্জতের কসম! আমি তোমাকে সাহায্য করবই, যদিও কিছু পরে।” (সঃ তারগীব ২২৩০নং)

অত্যাচারিতের দুআ ও আল্লাহর মাঝে কোন অন্তরাল নেই। সুতরাং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে বদ্দুআর কান্নারোল ও নয়নাশ্রু তার জন্য তুফান ও বন্যা হয়ে ধ্বংস আনয়ন করে। যুলুম থাকলে বিজয় লাভ সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ যালেম মুসলিম রাজ্যকে ধ্বংস করেন এবং ন্যায়পরায়ণ কাফের রাজ্যকে রক্ষা করেন। বলাই বাহুল্য যে, উম্মাহর মাঝে অন্যায়, অত্যাচার ও যুলুমবাজি আছে বলেই পরাজয় তার দুর্ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকাশ থাকে যে, শরীয়তে আমভাবে যুলুম বলতে ৩ প্রকার যুলুমকে বুঝানো হয়।
১। আল্লাহর প্রতি যুলুম। আর তা হয় তার সাথে কাউকে শরীক করার মাধ্যমে। এ যুলুম কিন্তু সবচেয়ে বড় যুলুম। মহান আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ (১৩) سورة لقمان অর্থাৎ, আল্লাহর অংশী করা তো চরম অন্যায়। (লুক্বমানঃ ১৩)
২। বান্দার নিজের প্রতি যুলুম। আর তা হয় নানা পাপ করার মাধ্যমে।
৩। বান্দার অপরের প্রতি যুলুম। আর তা হয় অপরের প্রতি অত্যাচার ও অন্যায় ব্যবহার করার মাধ্যমে। অন্যায়ভাবে অপরের ধন-সম্পদ কুক্ষিগত ক'রে, অপরের অধিকার নষ্ট ক'রে, অপরকে হক থেকে বঞ্চিত ক'রে, অপরকে কষ্ট দিয়ে যে অত্যাচার করা হয়, তাতে উম্মতের প্রগতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি হয়।

এক মরুবাসী (বেদুঈন) লোকের কাছে মহানবী কিছু খেজুর ধার নিয়েছিলেন। সে তাঁর নিকট নিজের পাওনা আদায় করতে এসে তাঁকে কটু কথা শুনাতে লাগল। এমনকি সে তাঁকে বলল, 'আপনি আমার ঋণ পরিশোধ না করলে, আমি আপনাকে মুশকিলে ফেলব!' এ কথা শুনে সাহাবাগণ তাকে ধমক দিলেন ও বললেন, 'আরে বেআদব! জান তুমি কার সাথে কথা বলছ?' লোকটি বলল, 'আমি আমার হক আদায় চাচ্ছি।' মহানবী বললেন, “তোমরা হকদারের সঙ্গ দিলে না কেন?” অতঃপর তিনি খাওলাহ বিন্তে কাইসের নিকট বলে পাঠালেন যে, “যদি তোমার কাছে খেজুর থাকে, তাহলে আমাকে ধার দাও। অতঃপর আমাদের খেজুর এলে তোমাকে পরিশোধ করে দেব।” খাওলাহ বললেন, 'অবশ্যই দোব। আমার আব্বা আপনার জন্য কুরবান হোক, হে আল্লাহর রসূল!' অতঃপর তিনি খেজুর দিলে মহানবী লোকটির ঋণ পরিশোধ করলেন এবং আরো কিছু বেশি খেতে দিলেন। লোকটি বলল, 'আপনি আমার হক পূরণ করলেন, আল্লাহ আপনার হক পূরণ করুক।' মহানবী বললেন, “ওরাই হল ভাল লোক, (যারা সুন্দরভাবে ঋণ পরিশোধ করে।) সে জাতি পবিত্র হবে না (বা না হোক), যে জাতির দুর্বল ব্যক্তি নিজ অধিকার অনায়াসে আদায় না করতে পেরেছে।” (ইবনে মাজাহ ২৪২৬, বায্যার, ত্বাবারানী, আবু য়‍্যা'লা, সহীহুল জামে' ২৪২১ নং)

সে জাতি কি সভ্য হতে পারে, যে জাতির দুর্বলরা চিরদিন সবলদের পদতলে পিষ্ট হয়? কক্ষনই না। দুর্বলদের ঘাড়ে পা রেখে যে জাতি উন্নত হতে চায়, সে জাতি অনুন্নত। নবী তাঁর সুমহান প্রভু হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (আল্লাহ) বলেন, "হে আমার বান্দারা! আমি অত্যাচারকে আমার নিজের জন্য হারাম করে দিয়েছি এবং আমি তা তোমাদের মাঝেও হারাম করলাম। সুতরাং তোমরাও একে অপরের প্রতি অত্যাচার করো না। (মুসলিম)

আপাততঃ অত্যাচারী গায়ে বাতাস লাগিয়ে বেড়ালেও শাস্তি তার অবধার্য। সোর্স ও ঘুসের জোরে বেঁচে গেলেও একদিন সে ধরা পড়বেই। আর তখন সে রক্ষা পাবে না। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীকে অবকাশ দেন। অতঃপর যখন তিনি তাকে পাকড়াও করেন, তখন তাকে ছাড়েন না।” তারপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন, [وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ] (১০২) অর্থাৎ, “তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও এরূপই হয়ে থাকে। যখন তিনি অত্যাচারী জনপদকে পাকড়াও ক'রে থাকেন। নিশ্চয়ই তাঁর পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।” (সূরা হুদ ১০২ আয়াত, বুখারী-মুসলিম)

অত্যাচার করা যেমন পাপ, তেমনি কারো প্রতি অত্যাচার হতে দেখে চুপ থাকাও পাপ। অত্যাচারী ও অত্যাচারিতকে সাহায্য না করাও পাপ। রাসূলুল্লাহ বলেন, “তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিত।” আনাস বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! অত্যাচারিতকে সাহায্য করার বিষয়টি তো বুঝলাম; কিন্তু অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করব?' তিনি বললেন, "তুমি তাকে অত্যাচার করা হতে বাধা দেবে, তাহলেই তাকে সাহায্য করা হবে।” (বুখারী)

আবু বকর সিদ্দীক বলেন, 'হে লোক সকল! তোমরা এই আয়াত পড়ছ, “হে মু'মিনগণ! তোমাদের আত্মরক্ষা করাই কর্তব্য। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (সূরা মায়েদাহ ১০৫ আয়াত) কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, "যখন লোকেরা অত্যাচারীকে (অত্যাচার করতে) দেখবে এবং তার হাত ধরে না নেবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে (আমভাবে) তার শাস্তির কবলে নিয়ে নেবেন।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)

মহান আল্লাহ বলেছেন, [وَاتَّقُواْ فِتْنَةً لا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ] অর্থাৎ, তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় কর, যা বিশেষ ক'রে তোমাদের মধ্যে যারা অত্যাচারী কেবল তাদেরই ক্লিষ্ট করবে না এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। (আনফালঃ ২৫)

মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি নিজ বাতিলের মাধ্যমে হককে খন্ডন ক'রে কোন যালেমকে সাহায্য করে, সে ব্যক্তির নিকট থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দায়িত্ব উঠে যায়।” (সহীহুল জামে' ৬০৪৮/১নং) তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি বিবাদের সময় অন্যায় দ্বারা অথবা কোন অত্যাচারীকে সাহায্য করে, সে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রোষে অবস্থান করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তা থেকে বিরত না হয়।” (ইবনে মাজাহ ২৩২০, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬০৪৯নং)

ন্যায়ের জন্য যারা যুদ্ধ করে, তারা অন্যায়কে সাহায্য করে না। অন্যায়ের সাথে আপোসও করে না। নচেৎ যে অত্যাচারে কোন প্রকার সহযোগিতা করে, সেও একজন অত্যাচারী। আইনের মাধ্যমে অত্যাচার করার চাইতে বড় অত্যাচার আর নেই। সে অত্যাচারে কেউ বাধা দিতে পারে না। রক্ষক হয়ে যদি কেউ ভক্ষক হয়, তাহলে আর কে রক্ষা করবে? বাঘে ধান খেলে কে তাকে তাড়াবে? অত্যাচারী মানুষ সবশেষে একাকী হয়ে যায়। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সকলে তার চারিপাশ থেকে দূরে সরে যায়। পরিশেষে তার পরিণতি পরাজয় ছাড়া আর কী?

যুলুম করার ফলে বহু জনপদ ধ্বংস হয়েছে। আল্লাহর আযাব এসে যালেমদেরকে নিশ্চিহ্ন করেছে। আযাবে পতিত হয়ে তারা নিজেরাই তাদের ভুল স্বীকার করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, [فَمَا كَانَ دَعْوَاهُمْ إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا إِلا أَنْ قَالُوا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِينَ] (৫) سورة الأعراف অর্থাৎ, যখন আমার শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল, তখন তাদের কথা শুধু এটিই ছিল যে, নিশ্চয় আমরা সীমালংঘন করেছি। (আ'রাফঃ ৫)

[وَكَمْ قَصَمْنَا مِنْ قَرْيَةٍ كَانَتْ ظَالِمَةً وَأَنْشَأْنَا بَعْدَهَا قَوْمًا آخَرِينَ * فَلَمَّا أَحَسُّوا بَأْسَنَا إِذَا هُمْ مِنْهَا يَرْكُضُونَ * لا تَرْكُضُوا وَارْجِعُوا إِلَى مَا أُتْرِفْتُمْ فِيهِ وَمَسَاكِنِكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْأَلُونَ * قَالُوا يَا وَيْلَنَا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِينَ * فَمَا زَالَتْ تِلْكَ دَعْوَاهُمْ حَتَّى جَعَلْنَاهُمْ حَصِيدًا خَامِدِينَ] (الأنبياء : ১১-১৫)
অর্থাৎ, আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি। যার অধিবাসীরা সীমালংঘনকারী ছিল এবং তাদের পরে অপর জাতি সৃষ্টি করেছি। অতঃপর যখন ওরা আমার শাস্তির কথা অনুভব করল, তখনই ওরা জনপদ হতে পলায়ন করতে লাগল। (ওদের বলা হয়েছিল,) 'তোমরা পলায়ন করো না এবং তোমাদের ভোগ-সম্ভারের নিকট ও তোমাদের আবাস গৃহে ফিরে এসো; যাতে এ বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে।' ওরা বলল, 'হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী।' আমি ওদেরকে কাটা শস্য ও নিভানো আগুনের মত না করা পর্যন্ত ওদের এ আর্তনাদ স্তব্ধ হয়নি। (আম্বিয়াঃ ১১-১৫)

দুর্বলদের প্রতি যুলুমের একটি অংশ মহিলাদের প্রতি যুলুম করা। মহিলা স্বভাবতঃ দুর্বল, তাই বলে তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার প্রতি অত্যাচার করা বৈধ নয়। তাকে তার ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা বৈধ নয়। মহানবী বলেছেন, “হে আল্লাহ! আমি লোকদেরকে দুই শ্রেণীর দুর্বল মানুষের অধিকার সম্বন্ধে পাপাচারিতার ভীতিপ্রদর্শন করছি; এতীম ও নারী।” (নাসায়ী)

মহিলাকে তার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। যেহেতু শিক্ষা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয।
মহিলাকে তার মীরাস থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
মহিলাকে তার সেই কর্মক্ষেত্রে চাকরি করতে বাধা দেওয়া যাবে না, যেখানে তার নারীত্ব ও সতীত্ব বজায় থাকে।
মহিলাকে এমন কাজে বাধ্য করা যাবে না, যাতে তার নারীত্বে ও সতীত্বে ক্ষতি হতে পারে।
মহিলাকে দ্বীন-চর্চা করতে ও মসজিদ যেতে বাধা দেওয়া যাবে না।
মহিলাকে পণ্য-দ্রব্যের প্রচার-লেবেল হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।
মহিলাকে দেহ-ব্যবসায় বাধ্য করা যাবে না।
মহিলাকে বেপর্দা ক'রে ফ্রি-সেক্সের বাজারে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
মহিলাকে বাড়ির ভিতর অর্গলবদ্ধ ক'রে রাখা যাবে না।
মহিলাকে সেবা-দাসীরূপে ব্যবহার করা যাবে না।

বিদায় হজ্জে নবী সর্বপ্রথম আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করলেন এবং উপদেশ দান ও নসীহত করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, “শোনো! তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার কর। কেননা, তারা তোমাদের নিকট কয়েদী। তোমরা তাদের নিকটে এ (শয্যা-সঙ্গিনী হওয়া, নিজের সতীত্ব রক্ষা করা এবং তোমাদের মালের রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি) ছাড়া অন্য কোনও জিনিসের অধিকার রাখ না। হ্যাঁ, সে যদি কোন প্রকাশ্য অশ্লীলতার কাজ করে (তাহলে তোমরা তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখ)। সুতরাং তারা যদি এমন কাজ করে, তবে তাদেরকে বিছানায় আলাদা ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে মার। কিন্তু সে মার যেন যন্ত্রণাদায়ক না হয়। অতঃপর তারা যদি তোমাদের অনুগত হয়ে যায়, তবে তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। মনে রাখ, তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার রয়েছে, অনুরূপ তোমাদের উপর তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। তোমাদের অধিকার হল, তারা যেন তোমাদের বিছানায় ঐ সব লোককে আসতে না দেয়, যাদেরকে তোমরা অপছন্দ কর এবং তারা যেন ঐ সব লোককে তোমাদের বাড়ীতে প্রবেশ করার অনুমতি না দেয়, যাদেরকে তোমরা অপছন্দ কর। আর শোনো! তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তাদেরকে ভালোরূপে খেতে-পরতে দেবে।” (তিরমিযী, হাসান সূত্রে)

যুলুম বা অন্যায় হল কোন জিনিসকে তার সঠিক স্থান না দেওয়া। সুতরাং যেমন কোন জিনিসকে তার চাইতে নিম্নমানের স্থানে রাখা অন্যায়, তেমনি তার চাইতে উচ্চ স্থানে রাখাও অন্যায়। নারীকে ইসলাম যথার্থ মর্যাদা দিয়েছে, তা বলে তাকে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমান-সমান মর্যাদা দেয়নি। সৃষ্টিকর্তার এ বিধানের খেলাপ করলেও জাতি অধঃপতনের দিকে গড়িয়ে যায়।

আল্লাহর রসূল-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যবাসীরা তাদের রাজক্ষমতা কেসরা (রাজ) কন্যার হাতে তুলে দিয়েছে, তখন তিনি বললেন, “সে জাতি কোন দিন সফলকাম হতে পারে না, যে জাতি তাদের শাসন ক্ষমতা একজন নারীর হাতে তুলে দেয়।” (বুখারী ৪৪২৫নং)

পুরুষের সমান অধিকার দেয়নি বলে মহিলার মান কমে যায় না। মহিলার মান ও মর্যাদা থাকবে রাজ-রানী ও রাজ-মাতা হয়ে। আর মাতার অধিকার পিতা অপেক্ষা তিনগুণ বেশি।

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 ব্যভিচার

📄 ব্যভিচার


জেনা-ব্যভিচার, বিবাহ-বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কে যৌন-মিলন জাতির অধঃপতনের একটি কারণ। চারিত্রিক এই অবক্ষয়কে যদিও পাশ্চাত্যে নারী-স্বাধীনতার নামে বড় সভ্যতা মনে করা হয়, আসলে কিন্তু তা প্রগতির নামে দুর্গতি। নারী-স্বাধীনতার নামে যৌন-স্বাধীনতাই সেখানকার সমাজে সমাদৃত। অবশ্যই তারা সভ্য সমাজের লোক নয়। ইসলাম যে সভ্যতা আনয়ন করেছে, যৌন-লাঞ্ছনার হাত থেকে উদ্ধার ক'রে নারীকে যে মর্যাদা দিয়েছে, তারা নারী-স্বাধীনতায় তা পায়নি। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের চরম উন্মাদনায় তারা নারীকে গাড়ি বানিয়ে অর্থ উপার্জন করছে। ইচ্ছামতো ভোগ করছে নারী-দেহ। নারীকে ভোগের বস্তু তারাই ক'রে রেখেছে। ফলে তাদের সমাজ ব্যভিচারের বন্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে। অবশ্য তাদের ভাষায় 'ব্যভিচার' বলে কিছু নেই। যেহেতু বৈধ-অবৈধ সব মিলনই তাদের কাছে সহবাস।

বেশ্যাবৃত্তি তাদের কাছে ঘৃণ্য নয়। কারণ বেশ্যারা 'বেশ্যা' নয়, যৌনকর্মী! রক্ষিতা শব্দও তাদের ভাষায় নেই। যেহেতু গার্লফ্রেন্ড, লিভ টুগেদার, প্রেম-ভালবাসা ইত্যাদির অধিকার মানুষের জন্মগত। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া প্রত্যেক যৌন-মিলনই ব্যভিচার। আর ব্যভিচার একটি কদর্য আচরণ।

সমাজে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যভিচার ঘটে, প্রাইভেট সেক্রেটারী, অফিসের মহিলা কর্মী, বাড়িতে দাসী-চাকরানীর সাথে ব্যভিচার চলে। সমাজে যে মহিলার নারীসুলভ কোন কাজের ব্যবস্থা নেই, সে নিজের তথা ভাই-বোন বা ছেলেমেয়ের পেট চালাতে খুব সহজভাবে বেশ্যাবৃত্তি বেছে নেয়। অভাবে স্বভাব নষ্ট করে, অসহায় অবস্থায় নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি বিক্রি ক'রে পেট চালায়। কিন্তু সে অসহায়তা কি বেশ্যাবৃত্তির কোন অজুহাত হতে পারে? সমাজ কি এমন বেশ্যাদের জন্য দায়ী হবে না?

সমাজে পেশাদার স্থায়ী প্রকাশ্য বেশ্যা রয়েছে। তাদের জন্য অনুমোদিত পেশা ও বাসা রয়েছে! ভ্রাম্যমান বেশ্যা, গুপ্ত বেশ্যারও অভাব নেই। আর সেই সাথে প্রেমিক-প্রেমিকার অবৈধ যৌন-মিলনের ফলে সমাজ নীতি-নৈতিকতাহারা হয়ে অধঃপতনের অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মহান আল্লাহ বলেছেন,

[وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً] (৩২) سورة الإসراء
অর্থাৎ, তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। (বানী ইস্রাঈল: ৩২)

ব্যভিচার একটি ভয়ঙ্কর ব্যাধি। যার ফলে চরিত্র, সংসার, সমাজ ও দেশ ধ্বংস হয়। আল্লাহর রসূল বলেছেন, “হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর।
যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে---যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না।
যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে।
যে জাতিই তার মালের যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সে জাতির জন্যই আকাশ হতে বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হবে। যদি অন্যান্য প্রাণীকুল না থাকত, তাহলে তাদের জন্য আদৌ বৃষ্টি হত না।
যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সে জাতির উপরেই তাদের বিজাতীয় শত্রুদলকে ক্ষমতাসীন করা হবে; যারা তাদের মালিকানা-ভুক্ত বহু ধন-সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করবে।
আর যে জাতির শাসকগোষ্ঠী যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর কিতাব (বিধান) অনুযায়ী দেশ শাসন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাদের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব অবস্থায়ী রাখবেন।” (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)

তিনি আরো বলেছেন, "পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি।” জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি কী কী?' তিনি বললেন, “যে জাতিই (আল্লাহর) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সেই জাতির উপরেই তাদের শত্রুকে ক্ষমতাসীন করা হবে। যে জাতিই আল্লাহর অবতীর্ণকৃত সংবিধান ছাড়া অন্য দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সেই জাতির মাঝেই দরিদ্রতা ব্যাপক হবে। যে জাতির মাঝে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ পাবে, সে জাতির মাঝেই মৃত্যু ব্যাপক হবে। যে জাতিই যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সেই জাতির জন্যই বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হবে। যে জাতি দাঁড়ি-মারা শুরু করবে, সে জাতি ফসল থেকে বঞ্চিত হবে এবং দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ৭৬০নং)

মহানবী আরো বলেছেন, "আমার উম্মত মঙ্গলের মধ্যে থাকবে, যতদিন না তাদের মধ্যে জারজ সন্তান ব্যাপক হবে। সুতরাং যখন জারজ সন্তান ব্যাপক হবে, তখন অচিরে আল্লাহ আয্যা অজাল্ল নিজের পক্ষ থেকে শাস্তি তাদের উপর ব্যাপক ক'রে দেবেন।” (আহমাদ, সঃ তারগীব ২৪০০নং) আধুনিক যুগের নতুন মহামারী 'এইডস' ঐ ব্যভিচারেরই কারেন্ট শাস্তি। তাছাড়া ধ্বংসের পথ আরো থাকতে পারে।

উম্মুল মু'মিনীন যয়নাব বিনতে জাহশ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, একদা নবী তাঁর নিকট শঙ্কিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। তিনি বলছিলেন, “আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই, আরবের জন্য ঐ পাপ হেতু সর্বনাশ রয়েছে যা সন্নিকটবর্তী। আজকে ইয়া'জুজ-মা'জুজের দেওয়াল এতটা খুলে দেওয়া হয়েছে।” এবং তিনি (তার পরিমাণ দেখানোর জন্য) নিজ বৃদ্ধা ও তর্জনী দুই আঙ্গুল দ্বারা (গোলাকার) বৃত্ত বানালেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মাঝে সৎলোক মওজুদ থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হব?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যখন নোংরামি (ব্যভিচার) বেশি হবে।” (বুখারী-মুসলিম)

এ গেল লৈঙ্গিক ব্যভিচারের কথা। এ ছাড়াও অন্যান্য ব্যভিচার রয়েছে সমাজে। আর তা আরো ব্যাপক। মহানবী বলেন, “চোখ দু'টিও ব্যভিচার করে। আর তার ব্যভিচার হল, (কাম-নজরে নারীর সৌন্দর্যের প্রতি) দৃষ্টিপাত করা। কান দু'টিও ব্যভিচার করে। আর তার ব্যভিচার হল, (যৌন-কথা) শ্রবণ করা। জিভও ব্যভিচার করে। আর তার ব্যভিচার হল, (যৌন-কথা) বলা। হাতও ব্যভিচার করে। আর তার ব্যভিচার হল, সকামে স্পর্শ করা। ব্যভিচার করে পা দু'টিও। আর তার ব্যভিচার হল, (যৌনক্রিয়ার উদ্দেশ্যে) হেঁটে যাওয়া।” (বুখারী-মুসলিম, মিশকাত ৮৬ নং)

যে জাতি নৈতিক ও চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার, সে জাতি কি সভ্য, উন্নত ও প্রগতিশীল হতে পারে? আর বিজাতির আধিপত্য আসে নারী ও সুরার মাধ্যমেই। তাদের ভাষায়, 'মুসলমানদেরকে সৈন্যাধিক্য ও মহাশক্তি দ্বারা পরাজিত করতে পারবে না। ওদেরকে পরাজিত করতে হলে নারী ও সুরার অস্ত্র ব্যবহার কর।'

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 সুদ

📄 সুদ


সূদী কারবার উম্মাহর ধ্বংসের অন্যতম কারণ। যে সুদখোর, সুদদাতা, সূদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষ্যদাতাও অভিশপ্ত! এক দিরহাম খাওয়া সূদ আল্লাহর নিকটে ৩৬ ব্যভিচার অপেক্ষা অধিক গুরুতর! যে "সূদ খাওয়ায় রয়েছে ৭০ প্রকার পাপ। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো!" (ইবনে মাজাহ ২২৭৮, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৮৪৪নং) সে পাপ মাথায় নিয়ে কোন জাতি সভ্য হতে পারে?

নবী বলেন, “যে ব্যক্তিই বেশি-বেশি সূদ খাবে তারই (মালের) শেষ পরিণাম হবে অল্পতা।” (ইবনে মাজাহ ২২৭৯, হাকেম ২/৩৭, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৮৪৮নং) সুতরাং এমন পাপের কুফল ধ্বংস ছাড়া আর কী হতে পারে? মহান আল্লাহ বলেন,

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ] (২৭৮)
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যা বকেয়া আছে তা বর্জন কর; যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। (বাক্বারাহঃ ২৭৮)

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ]
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ক্রমবর্ধমান হারে (দ্বিগুণ-চতুর্গুণ বা চক্রবৃদ্ধি হারে) সূদ খেয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে। (আলে ইমরানঃ ১৩০)

সে জাতি কীভাবে সফল ও উন্নত হতে পারে, যে জাতির মানুষ সূদী কারবারে নানাভাবে জর্জরিত। প্রায় প্রত্যেক মানুষ কোন না কোনভাবে সূদী লেনদেনে জড়িয়ে আছে। কেউ সূদ না খেলেও অর্থ হিফাযত করতে গিয়ে সূদী ব্যাংকের সাথে সহযোগিতায় জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। সূদী ব্যাংক আজ বিশ্বের সর্বত্রে অর্থনীতির রমরমার বাজার খুলে রেখেছে। অবশ্য অনেকে তাকে 'সুদ' না বলে 'লভ্যাংশ' বা 'ইন্টারেস্ট' বলছে। কিন্তু নামের পরিবর্তনে কী জিনিসের পরিবর্তন ঘটে? লবণের নাম 'চিনি' দিলেই কী লবণ মিষ্টি হয়ে যায়? জাতি নামে ও লেবাসে সভ্য হলে কী হবে? মনে ও চরিত্রে অসভ্য হলে আসলেই সে অসভ্য। আর সে অসভ্যতাই তার অধঃপতনের অন্যতম কারণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00