📄 আল্লাহর আইন অবজ্ঞা করা
জাতির বহু সদস্য ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আল্লাহর আইনকে অবজ্ঞা করে, এ যুগে অচল ভাবে, যুগোপযোগী নয় ধারণা করে। ধারণা করে, বর্তমান আধুনিক সমাজে মানুষের মনগড়া আইন বেশি ভাল। ফলে সে চিরন্তন আইনকে না নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করে, না সামাজিক জীবনে, আর না রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। নিজেদের ঈমানী দুর্বলতার ফলে আল্লাহর আইনের উপর আস্থা রাখতে পারে না। ফলে সে আইনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয় না। অথবা কোন কোন অংশে চালু থাকলেও সবার উপরে তা বলবৎ করে না। অনেকে মূর্খতাবশতঃ ধারণা করে যে, ইসলামী আইনে নারীর অধিকার রক্ষা করা হয়নি।
অনেকে অজ্ঞানতাবশতঃ মনে করে যে, ইসলামী আইনে অমুসলিমদের অধিকার রক্ষা করা হয়নি। অনেকে ভুল ধারণাবশতঃ মনে করে যে, ইসলামী আইনে সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য ন্যায়পরায়ণতা নেই। অনেকে না জেনে মন্তব্য করে যে, ইসলামী আইনে মানবাধিকার লংঘন হয়। অথচ তারা জানে না যে, মানবের সৃষ্টিকর্তাই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক (আহকামুল হাকেমীন)। মহান আল্লাহ বলেন,
[أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ] (৫০) المائدة
অর্থাৎ, তবে কি তারা প্রাগ-ইসলামী (জাহেলী) যুগের বিচার-ব্যবস্থা পেতে চায়? খাঁটি বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিচারে আল্লাহ অপেক্ষা কে শ্রেষ্ঠতর? (মাইদাহঃ ৫০)
সুতরাং মু'মিন সম্প্রদায়ের জন্য এ ঈমান জরুরী যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের চাইতে বেশি ন্যায়পরায়ণ আর অন্য কেউ হতে পারে না। যে আল্লাহ বলেন,
[إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ] (النحل: ৯০)
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন। (নাহলঃ ৯০)
[إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ] (النساء: ৫৮)
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-কার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। (নিসাঃ ৫৮)
যে রসূল বলেন, وَمَنْ يَعْدِلُ إِنْ لَمْ أَعْدِلْ (অর্থাৎ, যদি আমি ইনসাফ না করি, তাহলে আর কে ইনসাফ করবে?) (বুখারী, মুসলিম ২৫০৫নং)
সে আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর বিধানে অন্যায় ও অবিচার থাকতে পারে? এ বিচারে ইনসাফ না থাকলে, দুনিয়ার অন্য কোন বিচারে ইনসাফ নেই। এ বিধানে মানবাধিকার সুরক্ষিত না হলে, বিশ্বের অন্য কোন বিধানে মানবাধিকার সুরক্ষিত নয়।
আসলে যে নেতারা নিজেদের জীবনেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে না, তারা তাদের রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করতে তো ভয় করবেই। অপরাধী কোনদিন পুলিশ পছন্দ করে না। নিজেরা অপরাধী বলেই ইসলামী-শাসনকে তাদের ভয় লাগে। যারা দুর্নীতি ও নৈরাজ্যে দেশকে জ্বালিয়ে রাখে, তারা আল্লাহর আইন চাইবে কেন? তাছাড়া নেতা তো জনগণ বানায়। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যেমন হবে, আইন তেমন হবে। আধুনিক বিশ্বে সেই মতোই চলতে হবে। নচেৎ কুরসীর পায়া ভেঙ্গে যাবে। গণতন্ত্রের আধুনিক মন্ত্রে সৃষ্টিকর্তার আইনের স্থান নেই। আর স্থান করতে গেলে গদিতে নিজের স্থান হারিয়ে যাবে। সুতরাং 'জয় হোক গণতন্ত্রের, অক্ষয় হোক আমার গদি। রাজনীতিতে ধর্মের স্থান নেই।'
যে মানবেরা নিজেদের মানবতা রক্ষা করে না, তারা আবার মানবাধিকার দাবি করে! কোন মানবকে যদি তার অমানবতার শাস্তি দেওয়া হয়, তাতেও কি মানবাধিকার লংঘন হয়? অবশ্য তাতে যদি সীমালংঘন হয়, তাহলে অধিকার লংঘন হতে পারে। কিন্তু ইলাহী বিধানে কোন সীমালংঘন নেই। পক্ষান্তরে শাসন ইসলামী হলেও বিচারে আমীর-গরীবে পার্থক্য করলে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত যে, চুরির অপরাধে অপরাধিণী মাখযুম গোত্রের একজন মহিলার ব্যাপার কুরাইশ বংশের লোকেদের খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। সাহাবীগণ বললেন, 'ওর ব্যাপারে আল্লাহর রসূল-এর সঙ্গে কে কথা বলতে পারবে?' তাঁরা বললেন, 'রসূল-এর প্রিয়পাত্র উসামা ইবনে যায়েদ ছাড়া কেউ এ সাহস পাবে না।' সুতরাং উসামা রসূল-এর সঙ্গে কথা বললেন। তিনি বলে উঠলেন, "তুমি আল্লাহর এক দণ্ডবিধান (প্রয়োগ না করার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?” পরক্ষণেই তিনি দাঁড়িয়ে খুৎবাহ দিলেন এবং বললেন, “(হে লোক সকল!) নিশ্চয় তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের লোকেরা এ জন্য ধ্বংস হয়েছিল যে, যখন তাদের কোন সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন তাদের কোন দুর্বল লোক চুরি করত, তখন তার উপর শরীয়তের শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তাহলে অবশ্যই আমি তার হাতও কেটে দিতাম।” (বুখারী ও মুসলিম)
তাগূতী বিধান দ্বারা মুসলিমরা দেশ শাসন করলে তাদের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব লেগে থাকবে। আর গৃহদ্বন্দ্বের ফিতনা ধ্বংস ছাড়া আর কী? আল্লাহর রসূল বলেছেন, “হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর।
(১) যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে যা তাদের পূর্বপুরুষের মাঝে ছিল না।
(২) যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে।
(৩) যে জাতিই তার মালের যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সে জাতিই তার জন্য আকাশ হতে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হবে। যদি অন্যান্য প্রাণীকুল না থাকত, তাহলে তাদের জন্য আদৌ বৃষ্টি হত না।
(৪) যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সে জাতির উপরেই তাদের বিজাতীয় শত্রুদলকে ক্ষমতাসীন করা হবে; যারা তাদের মালিকানা-ভুক্ত বহু ধন-সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করবে।
(৫) যে জাতির শাসকগোষ্ঠী যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর কিতাব (বিধান) অনুযায়ী দেশ শাসন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাদের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব অবস্থায়ী রাখবেন।” (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)
তিনি আরো বলেছেন, "পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি।” জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি কী কী?' তিনি বললেন, “(১) যে জাতিই (আল্লাহর) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সেই জাতির উপরেই তাদের শত্রুকে ক্ষমতাসীন করা হবে।
(২) যে জাতিই আল্লাহর অবতীর্ণকৃত সংবিধান ছাড়া অন্য দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সেই জাতির মাঝেই দরিদ্রতা ব্যাপক হবে।
(৩) যে জাতির মাঝে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ পাবে, সে জাতির মাঝেই মৃত্যু ব্যাপক হবে।
(৪) যে জাতিই যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সেই জাতির জন্যই বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হবে।
(৫) যে জাতি দাঁড়ি-মারা শুরু করবে, সে জাতি ফসল থেকে বঞ্চিত হবে এবং দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ৭৬০নং)
ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা-কল্পে নয়, বরং তাগূতী আইন চালু করার জন্য আজ মুসলমান নিজেদের জান-মাল বিলিয়ে দিচ্ছে। যে জাতির জীবন আল্লাহর দেওয়া, যার জীবন ছিল কেবল আল্লাহরই জন্য, তাতে কেউ শরীক ছিল না। আল্লাহ বলেন,
[قُلْ إِنَّ صَلاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَاتِي الله رَبِّ الْعَالَمِينَ (১৬২) لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ] (১৬৩) سورة الأنعাম
অর্থাৎ, বল, 'নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) দের মধ্যে আমিই প্রথম।' (আনআমঃ ১৬২-১৬৩)
সে জাতি নিজের জীবন তাগুতের জন্য উৎসর্গ করছে। যে জাতিকে বিজাতির সাথে অন্তরঙ্গতা করতে নিষেধ করা হয়েছিল, সেই জাতিই অপরকে গদ্দিনশীন করার জন্য নিজেদের যথাসর্বস্ব বিসর্জন দিচ্ছে। সুতরাং জাতির পরাজয়ই কি অনিবার্য ভাগ্য নয়?
📄 আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা
আমভাবে বলা যায় যে, বিভিন্ন জাতির একমাত্র ধ্বংসের কারণ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ। আমরা যদি প্রত্যেক ধ্বংসগ্রস্ত জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা ক'রে দেখি, তাহলে সেটাই দেখতে পাব।
[كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرَّسّ وَثَمُودُ (১২) وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ وَإِخْوَانُ لوط (১৩) وَأَصْحَابُ الْأَيْكَةِ وَقَوْمُ تُبَّعٍ كُلُّ كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ وَعِيدِ] (১৪) ق
অর্থাৎ, তাদের পূর্বেও মিথ্যাজ্ঞান করেছিল নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়, রাস্ ও সামূদ সম্প্রদায়, আ'দ, ফিরআউন ও লুত সম্প্রদায় এবং আয়কার অধিবাসী ও তুব্বা' সম্প্রদায়, তারা সবাই রসূলদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, ফলে তাদের উপর আমার শাস্তির প্রতিশ্রুতি সত্য হয়েছে। (ক্বাফঃ ১২-১৪)
যেমন নূহ (আ.)-এর জাতির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, “অবশ্যই আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম এবং সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (কেবল) আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।' তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলেছিল, 'আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে দেখছি।' সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আমার মধ্যে কোন বিভ্রান্তি নেই, আমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের (প্রেরিত) একজন রসূল। আমি আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছি এবং তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জান না, আমি তা আল্লাহর নিকট হতে জানি। তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের নিকট উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে এবং যাতে তোমরা সাবধান হও ও অনুকম্পা লাভ করতে পার?' অতঃপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে। ফলে তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল, আমি তাদেরকে উদ্ধার করি। আর যারা আমার নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদেরকে (তুফানে) নিমজ্জিত করি। নিশ্চয় তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।” (আ'রাফ: ৫৯-৬৪)
হূদ (আ.)-এর জাতি আ'দের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আ'দ জাতির নিকট ওদের ভ্রাতা হূদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (কেবল) আল্লাহর উপাসনা কর। তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই, তোমরা কি সাবধান হবে না?' তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ যারা অবিশ্বাস করেছিল, তারা বলেছিল, 'আমরা তো দেখছি তুমি একজন নির্বোধ এবং তোমাকে আমরা তো একজন মিথ্যাবাদী মনে করি।' সে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আমি নির্বোধ নই আমি তো বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের (প্রেরিত) একজন রসূল। আমি আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা (বা হিতাকাঙ্ক্ষী)। তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের নিকট উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে? স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং তোমাদেরকে অবয়ব ও শক্তিতে (অন্য লোক অপেক্ষা অধিকতর) সমৃদ্ধ করেছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, হয়তো তোমরা সফলকাম হবে।' তারা বলল, 'তুমি কি আমাদের নিকট এ উদ্দেশ্যে এসেছে যে, আমরা যেন শুধু আল্লাহর উপাসনা করি এবং আমাদের পূর্বপুরুষগণ যার উপাসনা করত, তা বর্জন করি? সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে (আযাবের) ভয় দেখাচ্ছ, তা আনয়ন কর।' হূদ বলল, ' তোমাদের প্রতিপালকের শাস্তি ও ক্রোধ তো তোমাদের উপর নির্ধারিত হয়েই আছে, তবে কি তোমরা আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কতকগুলি নাম সম্বন্ধে, যার নামকরণ তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষেরা করেছে এবং সে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন সনদ পাঠাননি? সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।' অতঃপর তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে আমার দয়াতে উদ্ধার করেছিলাম এবং আমার নিদর্শনসমূহকে যারা মিথ্যা মনে করেছিল এবং যারা অবিশ্বাসী ছিল, তাদেরকে নির্মূল করেছিলাম।” (আ'রাফঃ ৬৫-৭২)
স্বালেহ (আ.)-এর জাতি সামূদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, "সামূদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা স্বালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (কেবল) আল্লাহর উপাসনা কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালক হতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। এটি আল্লাহর উটনী তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। এটিকে আল্লাহর জমিতে চরে খেতে দাও এবং এটিকে কোন ক্লেশ দিও না; দিলে তোমাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হবে। স্মরণ কর, আ'দ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তোমরা নম্র ভূমিতে প্রাসাদ এবং পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করছ। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটিও না।' তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা দুর্বল বিশ্বাসীদেরকে বলল, 'তোমরা কি জান যে, স্বালেহ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?' তারা বলল, 'তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে, আমরা তাতে বিশ্বাসী।' দাম্ভিকেরা বলল, 'তোমরা যা বিশ্বাস কর, আমরা তা অবিশ্বাস করি।' অতঃপর তারা সেই উটনীকে বধ করল এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করল এবং বলল, 'হে স্বালেহ! তুমি রসূল হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ, তা আনয়ন কর।' অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, ফলে তারা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারপর সে তাদের নিকট হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আমি আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদের নিকট পৌছাইয়াছিলাম এবং তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা তো (হিতাকাঙ্ক্ষী) উপদেষ্টাদেরকে পছন্দ কর না।” (আ'রাফঃ ৭৩-৭৯)
লুত (আ.)-এর জাতির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, "আমি লুতকেও পাঠিয়েছিলাম, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, 'তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারী ছেড়ে পুরুষের নিকট গমন কর, তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।' উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, 'এদের (লুত এবং তার সঙ্গীদের) কে জনপদ হতে বহিষ্কৃত কর। এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র থাকতে চায়।' অতঃপর তার স্ত্রী ব্যতীত তাকে ও তার পরিজনবর্গকে রক্ষা করেছিলাম। তার স্ত্রী ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূত। তাদের উপর মুষলধারে পাথর-বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম, সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হয়েছিল তা লক্ষ্য কর।” (আ'রাফঃ ৮০-৮৪)
শুআইব (আ.)-এর জাতি মাদ্যানবাসীদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, "মাদয়ানবাসীদের নিকট তাদের ভ্রাতা শুআইবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (কেবল) আল্লাহর উপাসনা কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। অবশ্যই তোমাদের প্রতিপালক হতে তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। সুতরাং তোমরা মাপ ও ওজন সঠিকভাবে দাও; লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না এবং পৃথিবীতে শান্তি-স্থাপনের পর বিপর্যয় ঘটিও না। তোমরা বিশ্বাসী হলে তোমাদের জন্য এটিই কল্যাণকর। আর তোমরা এই উদ্দেশ্যে পথে পথে বসে থেকো না যে, তোমরা বিশ্বাসিগণকে ভীতি প্রদর্শন করবে, আল্লাহর পথে তাদেরকে বাধা দেবে এবং ওতে বক্রতা (দোষ-ত্রুটি) অনুসন্ধান করবে। স্মরণ কর, তোমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, আল্লাহ তখন তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। আর বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কিরূপ ছিল তা লক্ষ্য কর। আমি যা দিয়ে (আল্লাহর পক্ষ হতে) প্রেরিত হয়েছি, তাতে যদি তোমাদের একটি দল বিশ্বাস করে এবং একটি দল বিশ্বাস না করে, তাহলে তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফায়সালা ক'রে দেন, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী।' তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানগণ বলল, 'আমাদের ধর্মে তোমাদেরকে ধর্মান্তরিত হতেই হবে। অন্যথা হে শুআইব! তোমাকে ও তোমার সাথে যারা বিশ্বাস করেছে, তাদেরকে অবশ্যই আমাদের জনপদ হতে বহিষ্কৃত করব।' সে বলল, 'আমরা অনিচ্ছুক থাকা সত্ত্বেও কি? তোমাদের ধর্মাদর্শ হতে আল্লাহ আমাদেরকে উদ্ধার করার পর যদি আমরা ওতে ফিরে যাই, তাহলে তো আমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করব। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করলে আর তাতে ফিরে যাওয়া আমাদের কাজ নয়। সব কিছুই আমাদের প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ত। আমরা আল্লাহর প্রতি নির্ভর করি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে ফায়সালা করে দাও এবং তুমিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী।' আর তার সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসী (নেতা)গণ বলল, 'তোমরা যদি শুআইবকে অনুসরণ কর, তাহলে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, ফলে তারা নিজগৃহে উপুড় অবস্থায় ধ্বংস হয়ে গেল। মনে হল শুআইবকে যারা মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, তারা যেন কখনো সেখানে বসবাসই করেনি। শুআইবকে যারা মিথ্যা ভেবেছিল, তারাই ছিল ক্ষতিগ্রস্ত। সে তাদের হতে মুখ ফিরাল এবং বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আমার প্রতিপালকের সমাচার তো আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছি। সুতরাং আমি এক অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য কী ক'রে আক্ষেপ করি?” (আ'রাফঃ ৯১-৯৩)
আর মুসা (আ.)-এর ইতিহাস তো বড় লম্বা। তাঁর জাতির কথাই কুরআনে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেছেন,
[وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلأ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحاً لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لأَظُنُّهُ مِنْ الْكَاذِبِينَ (৩৮) وَاسْتَكْبَرَ هُوَ وَجُنُودُهُ فِي الأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ (৩৯) فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ (৪০)] القصص
অর্থাৎ, ফিরআউন বলল, 'হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য আছে বলে জানি না! হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং এক সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর; হয়তো আমি এতে মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। তবে আমি অবশ্যই মনে করি সে মিথ্যাবাদী।' ফিরআউন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহংকার করছিল এবং ওরা মনে করেছিল যে, ওরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না। অতএব আমি তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও ক'রে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম। সুতরাং দেখ, সীমালংঘনকারীদের পরিণাম কী ছিল! (ক্বাস্বাসঃ ৩৮-৪০)
আমভাবে মহান আল্লাহ বলেন, “আমি কোন জনপদে নবী পাঠালে ওর অধিবাসীবৃন্দকে দুঃখ ও ক্লেশ দ্বারা পীড়িত করি, যাতে তারা কাকুতি-মিনতি করে। অতঃপর আমি (তাদের) অকল্যাণকে কল্যাণ দ্বারা পরিবর্তিত করি, অবশেষে তারা প্রাচুর্যের অধিকারী হয় এবং বলে, 'আমাদের পূর্বপুরুষগণও তো (অনুরূপ) সুখ-দুঃখ ভোগ করেছে।' ফলে তাদেরকে আমি এমন অতর্কিতভাবে পাকড়াও করি যে, তারা টের পর্যন্ত পেল না। আর যদি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ বিশ্বাস করত ও সাবধান হত, তাহলে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ-দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা মনে করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। তবে কি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ভয় রাখে না যে, আমার শাস্তি তাদের উপর আসবে রাত্রিকালে, যখন তারা থাকবে ঘুমে মগ্ন? অথবা জনপদের অধিবাসীবৃন্দ কি ভয় করে না যে, আমার শাস্তি তাদের উপর আসবে দিনের প্রথম ভাগে, যখন তারা থাকবে খেলায় মত্ত? তারা কি আল্লাহর চক্রান্তের ভয় রাখে না? বস্তুতঃ ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই আল্লাহর চক্রান্ত হতে নিরাপদ বোধ করে না। কোন দেশের অধিবাসী ধ্বংসের পর যারা ওর উত্তরাধিকারী হয়েছে, তাদের নিকট এটা কি প্রতীয়মান হয়নি যে, আমি ইচ্ছা করলে তাদের পাপের দরুন তাদেরকে শাস্তি দিতে পারি এবং তাদের হৃদয় মোহর ক'রে দিতে পারি; ফলে তারা শুনবে না। এই জনপদের কিছু বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বিবৃত করছিঃ তাদের রসূলগণ তো তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছিল; কিন্তু যা তারা পূর্বে মিথ্যা মনে করেছিল, তাতে তারা আর বিশ্বাস করবার ছিল না। এভাবে আল্লাহ অবিশ্বাসীদের হৃদয়ে সীল মেরে দেন।” (আ'রাফঃ ৯৪-১০১)
যে সকল জাতিকে মহান আল্লাহ ধ্বংস করেছেন, তাদের ধ্বংসের কারণ বর্ণনা ক'রে জ্ঞানীদেরকে সাবধান করেন এবং তার দ্বারা উপদেশ গ্রহণ ক'রে সতর্ক হতে বলেন,
[وَكَأَيِّنْ مِنْ قَرْيَةٍ عَتَتْ عَنْ أَمْرِ رَبِّهَا وَرُسُلِهِ فَحَاسَبْنَاهَا حِسَاباً شَدِيداً وَعَذَّبْنَاهَا عَذَاباً نُكْراً (৮) فَذَاقَتْ وَبَالَ أَمْرِهَا وَكَانَ عَاقِبَةُ أَمْرِهَا خُسْراً (৯) أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ عَذَاباً شَدِيداً فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ الَّذِينَ آمَنُوا قَدْ أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْكُمْ ذِكْراً] (১০) الطلاق
অর্থাৎ, কত জনপদ দম্ভভরে তাদের প্রতিপালকের ও তাঁর রসূলদের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, ফলে আমি তাদের নিকট হতে কঠোর হিসাব নিয়েছিলাম এবং তাদেরকে দিয়েছিলাম কঠিন শাস্তি। অতঃপর তারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করল, আর ক্ষতিই ছিল তাদের কর্মের পরিণাম। আল্লাহ তাদের জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ, যারা ঈমান এনেছ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন উপদেশ। (ত্বালাক্বঃ ৮-১০)
তারা দুর্ধর্ষ ও দোর্দন্ডপ্রতাপ থাকা সত্ত্বেও মহাপরাক্রমশালী প্রতিপালক তাদেরকে ধ্বংস করেছেন। সে কথা তিনি সান্ত্বনা দিয়ে তাঁর নবীকে বলেছেন,
[أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ (৬) إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ (৭) الَّتِي لَمْ يُخْلَقُ مِثْلُهَا فِي الْبِلادِ (৮) وَثَمُودَ الَّذِينَ جَابُوا الصَّخْرَ بِالْوَادِي (৯) وَفِرْعَوْنَ ذِي الْأَوْتَادِ (১০) الَّذِينَ طَغَوْا فِي الْبِلادِ (১১) فَأَكْثَرُوا فِيهَا الْفَسَادَ (১২) فَصَبَّ عَلَيْهِمْ رَبُّكَ سَوْطَ عَذَابٍ (১৩) إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ] (১৪)
অর্থাৎ, তুমি কি দেখ নি, তোমার প্রতিপালক আ'দ জাতির সাথে কিরূপ আচরণ করেছিলেন; সুদীর্ঘ দেহের অধিকারী ইরাম গোত্রের সাথে? যার সমতুল্য জাতি অন্য কোন দেশে সৃষ্টি হয়নি এবং সামুদ জাতির সাথে? যারা উপত্যকায় পাথর কেটে গৃহ নির্মাণ করেছিল? এবং বহু সৈন্য শিবিরের অধিপতি ফিরাউনের সাথে? যারা দেশের মধ্যে উদ্ধত আচরণ করেছিল। অনন্তর সেখানে তারা বিপর্যয় বৃদ্ধি করেছিল। ফলে তোমার প্রতিপালক তাদের উপর শাস্তির চাবুক হানলেন। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সময়ের প্রতীক্ষায় থেকে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। (ফাজরঃ ৬-১৪)
আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিভিন্ন প্রকার বিরুদ্ধাচরণের ফলে জাতির জীবনে বিভিন্ন প্রকার অভিশাপ ও আযাব নামে, সে কথা হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেছেন, “হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর।
যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে---যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না।
যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে।
যে জাতিই তার মালের যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সে জাতির জন্যই আকাশ হতে বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হবে। যদি অন্যান্য প্রাণীকুল না থাকত, তাহলে তাদের জন্য আদৌ বৃষ্টি হত না।
যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সে জাতির উপরেই তাদের বিজাতীয় শত্রুদলকে ক্ষমতাসীন করা হবে; যারা তাদের মালিকানা-ভুক্ত বহু ধন-সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করবে।
আর যে জাতির শাসকগোষ্ঠী যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর কিতাব (বিধান) অনুযায়ী দেশ শাসন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাদের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব অবস্থায়ী রাখবেন।” (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)
📄 যাকাত না দেওয়া
যাকাত ইসলামের দ্বিতীয় রুক্স। মুসলিম জাতির অর্থ-সামাজিক অবস্থা এই যাকাতের সাথে সম্পৃক্ত। গরীব, দুঃখী, এতীম, বিধবা প্রভৃতি মানুষের অন্ন-সংস্থান হয় এই যাকাত থেকে। ইসলামের জিহাদ চলে মুসলিমদের যাকাতের মাল দিয়ে। সেই যাকাত যদি বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়, তাহলে ফসলে পানি বন্ধ ক'রে দেওয়ার মতোই অবস্থা হয়। গরীব মানুষরা অসহায় হয়ে পড়ে, অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন ক'রে জীবন-ধারণ করে, অনেক মহিলা পেটের দায়ে বেশ্যাবৃত্তির পথ বেছে নেয়। অনেকে অপরাধের পথ বেছে নিয়ে সমাজের মানুষের উপর অত্যাচার চালায়। সমাজের অনেক নিরীহ মানুষের হালাল উপায়ে উপার্জিত হাতের লোকমা কেড়ে খায়।
যাকাত বন্ধ করলে জিহাদ বন্ধ হয়ে যায়। বাঁচার তাকীদে শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই যাকাত বন্ধ করলে মহান সৃষ্টিকর্তাও জাতিকে শাস্তি দেন। অনাবৃষ্টি এসে জাতিকে গ্রাস করে। আল্লাহর রসূল বলেছেন, "....যে জাতিই তার মালের যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সে জাতির জন্যই আকাশ হতে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হবে। যদি অন্যান্য প্রাণীকুল না থাকত, তাহলে তাদের জন্য আদৌ বৃষ্টি হত না।” (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)
তিনি আরো বলেন, “যে জাতিই যাকাত প্রদানে বিরত থেকেছে, সে জাতিকেই আল্লাহ দুর্ভিক্ষ দ্বারা আক্রান্ত করেছেন।” (ত্বাবারানীর আউসাত্ব, হাকেম, বাইহাকীও অনুরূপ, সহীহ তারগীব ৭৫৮নং) আর পরকালের শাস্তি তো আছেই। মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তিকে আল্লাহ ধন-মাল দান করেছেন কিন্তু সে ব্যক্তি তার সেই ধন-মালের যাকাত আদায় করে না কিয়ামতের দিন তা (আযাবের) জন্য তার সমস্ত ধন-মালকে একটি মাথায় টাক পড়া (অতি বিষাক্ত) সাপের আকৃতি দান করা হবে; যার চোখের উপর দু'টি কালো দাগ থাকবে। সেই সাপকে বেড়ির মত তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সে তার উভয় কশে ধারণ (দংশন) করে বলবে, 'আমি তোমার মাল, আমি তোমার সেই সঞ্চিত ধনভান্ডার।' এরপর নবী এই আয়াত পাঠ করলেন,
[وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُوْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ سَيُطَوَّقُوْنَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ] آل عمران
অর্থাৎ, আল্লাহর দানকৃত অনুগ্রহে (ধন-মালে) যারা কৃপণতা করে, সে কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যা তারা কার্পণ্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে বেড়ি বানিয়ে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় পরানো হবে। (আলে ইমরানঃ ১৮০) (বুখারী ১৪০৩নং, নাসাঈ)
📄 অবাধ্যচরণ ও পাপাচার
জাতির ধ্বংসের একটি প্রধান কারণ পাপাচার। মহান আল্লাহর এক নাম 'আল-হালীম' এবং আরো এক নাম 'আস-স্বাবুর' যার অর্থ চরম সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল। তিনি অহরহ বান্দার পাপাচরণ দেখেও সহ্য ক'রে নেন। যেহেতু তিনি হিসাব ও শাস্তি দেওয়ার নির্দিষ্ট একটা দিন রেখেছেন। তিনি বলেছেন,
[وَرَبُّكَ الْغَفُورُ ذُو الرَّحْمَةِ لَوْ يُؤَاخِذُهُم بِمَا كَسَبُوا لَعَجَّلَ لَهُمُ الْعَذَابَ بَل لَّهُم مَّوْعِدٌ لَّن يَجِدُوا مِن دُونِهِ مَوْئِلًا] (৫৮) سورة الكهف
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক পরম ক্ষমাশীল, দয়াবান। তাদের কৃতকর্মের জন্য তিনি তাদেরকে পাকড়াও করলে তিনি তাদের শাস্তি ত্বরান্বিত করতেন; কিন্তু তাদের জন্য রয়েছে এক প্রতিশ্রুত মুহূর্ত; যা হতে তাদের কোন আশ্রয়স্থল নেই। (কাহফঃ ৫৮)
তিনি আরো বলেছেন, [وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِم مَّا تَرَكَ عَلَيْهَا مِن دَابَّةٍ وَلَكِن يُؤَخِّرُهُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَإِذَا جَاء أَجَلُهُمْ لاَ يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلا يَسْتَقْدِمُونَ] (৬১) سورة النحل
অর্থাৎ, আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না, কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন; অতঃপর যখন তাদের সময় আসে, তখন তারা মুহূর্তকালও বিলম্ব অথবা অগ্রগামী করতে পারে না। (নাহলঃ ৬১)
কিন্তু অনেক সময় মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি কারেন্ট শাস্তি প্রেরণ করেন। দুনিয়ার বুকেই পাপীকে শায়েস্তা করেন। তিনি বলেন, [أَوَلاَ يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ] অর্থাৎ, তারা কি লক্ষ্য করে না যে, তারা প্রতি বছর একবার বা দু'বার কোন না কোন বিপদে পতিত হয়ে থাকে? তবুও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণও করে না। (তাওবাহঃ ১২৬)
[ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ] (৪১) سورة الروم
অর্থাৎ, মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; যাতে ওদের কোন কোন কর্মের শাস্তি ওদেরকে আস্বাদন করানো হয়। যাতে ওরা (সৎপথে) ফিরে আসে। (রুমঃ ৪১)
[وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَথِيرٍ] (৩০) الشورى
অর্থাৎ, তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা ক'রে দেন। (শূরাঃ ৩০)
পাপাচার যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তার শাস্তি এসে পড়ে বিলম্বে অথবা অবিলম্বে। এ কথার সাক্ষ্য রয়েছে ইতিহাসে। আল-কুরআনে বহু এমন জাতির ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে, যারা তাদের পাপাচরণের কারণে বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
[كَدَأْبِ آلِ فِرْعَوْনَ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ بِذُنُوبِهِمْ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ شَدِيدُ الْعِقَابِ (৫২) ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّراً نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (৫৩) كَدَأْبِ آلِ فِرْعَوْনَ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُمْ بِذُنُوبِهِمْ وَأَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ وَكُلُّ كَانُوا ظَالِمِينَ (৫৪)]
অর্থাৎ, ফিরআউনের বংশধর ও তাদের পূর্ববর্তিগণের অভ্যাসের ন্যায় এরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের পাপের জন্য তাদেরকে শাস্তি দেন। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, শাস্তিদানে কঠোর। এ এজন্য যে, আল্লাহ কোন সম্প্রদায়কে যে সম্পদ দান করেন, তিনি তা (ধ্বংস দিয়ে) পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর নিশ্চিত আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। ফিরআউনের বংশধর ও তাদের পূর্ববর্তিগণের অভ্যাসের ন্যায় এরা এদের প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে। তাদের পাপের জন্য আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং ফিরআউনের বংশধরকে (সমুদ্রে) নিমজ্জিত করেছি। আর তারা সকলেই ছিল অত্যাচারী। (আনফালঃ ৫২-৫৪)
[وَإِذَا أَرَدْنَا أَن تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُواْ فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّরْنَاهَا تَدْمِيرًا (১৬) وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا] (১৭) سورة الإسراء
অর্থাৎ, যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন ওর সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিদেরকে (সৎকর্ম করতে) আদেশ করি, অতঃপর তারা সেথায় অসৎকর্ম করে; ফলে ওর প্রতি দন্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং ওটাকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। নূহের পর আমি কত মানব গোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছি। তোমার প্রতিপালকই তাঁর দাসদের পাপাচরণের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট। (বানী ইস্রাঈলঃ ১৬-১৭)
উহুদের দিন সৈন্য-বিন্যাস করার সময় নবী ৫০ জন তীরন্দাজ সাহাবাকে পিছনের এক ছোট্ট পাহাড়ে পাহারা দিতে আদেশ করলেন, যাতে শত্রুপক্ষ পিছন দিক থেকে আক্রমণ না ক'রে বসে। তাঁদেরকে এ কথাও বলে দেওয়া হয়েছিল যে, যুদ্ধে হার-জিত যাই-বা হোক, তাঁরা যেন কোন অবস্থাতেই ঘাঁটি না ছাড়েন। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর বিজয় পরিলক্ষিত হলে তাঁরা নববী নির্দেশ লংঘন করলে পিছন থেকে কাফেররা পাল্টা আক্রমণ চালায়। ফলে মুসলিমগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। সুতরাং শত্রু পিছন থেকে আল্লাহর রসূল-এর কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়। আঘাতে তাঁর নিচের চোয়ালের ডান দিকের (ঠিক মাঝের পার্শ্ববর্তী) দুটি দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং তাঁর কপাল বিক্ষত হয়। চোট লাগে তাঁর চেহারায়। গালের উপরি অংশে শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া ঢুকে যায়। তা দাঁত দিয়ে তুলতে গিয়ে আবু উবাইদা-এর মাঝের দাঁত দুটি ভেঙ্গে যায়। মুসলিম বাহিনীর ৭০ জন লোক শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে আল্লাহর সিংহ (মহানবীর চাচা) হামযাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব অন্যতম। শত্রুপক্ষ (হিন্দ) তাঁর কলিজা বের ক'রে দাঁতে চিবিয়ে রাগ মিটায়!
মহান আল্লাহ সেদিনকার সেই বিজয়ের পর পরাজয়ের মর্মান্তিক ফলাফল ও তার কারণ উল্লেখ করেছেন কুরআনে। তিনি বলেছেন,
[وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُم مِّن بَعْدِ مَا أَرَاكُم مَّا تُحِبُّونَ مِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ] (১৫২)
অর্থাৎ, আর আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন, যখন তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশক্রমে হত্যা করছিলে। অবশেষে যখন তোমরা সাহস হারিয়েছিলে এবং (রসূলের) নির্দেশ সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছিলেন এবং যা তোমরা পছন্দ কর তা (বিজয়) তোমাদেরকে দেখানোর পরে তোমরা অবাধ্য হয়েছিলে (তখন বিজয় রহিত হল)। তোমাদের কতক লোক ইহকাল কামনা করেছিল এবং কতক লোক পরকাল কামনা করেছিল। অতঃপর তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি তোমাদেরকে তাদের মোকাবেলায় পশ্চাতে ফিরিয়ে দিলেন। তবুও (কিন্তু) তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রতি অনুগ্রহশীল। (আলে ইমরানঃ ১৫২)
এইভাবেই অবাধ্যাচরণ অধোগতি আনয়ন করে এবং বিজয়কে পরাজয়ে পরিবর্তন করে। রসূল-এর অবাধ্যাচরণ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এ ঘোষণা দিয়েছেন মহান আল্লাহ,
[فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ] (৬৩)
অর্থাৎ, সুতরাং যারা তার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় অথবা কঠিন শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। (নূরঃ ৬৩)
মহান আল্লাহ অতি সহিষ্ণু হলেও তিনি মহা পরাক্রমশালী ও প্রতাপশালী। তিনি পাপাচরণের ফলে আযাব ও গযব অবতীর্ণ করতে পারেন। সর্বাবস্থায় না হলেও তাঁর হিকমত ও ইচ্ছা অনুযায়ী কোন কোন অবস্থায় গযব অবর্তীণ ক'রে থাকেন। মুসলিম উম্মাহর মাঝে আজ কত পাপাচারী! কত আল্লাহদ্রোহী ও রসূল-বিদ্বেষী! কত দুনিয়াদার ও দ্বীনত্যাগী! এতসত্ত্বেও সেই উম্মাহ কি উন্নতির স্বপ্ন দেখে?
জাতির সমাজ-ব্যবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সেখানে সাপ এড়িয়ে পথ চলা সহজ, কিন্তু পাপ এড়িয়ে পথ চলা কঠিন। তাই মানুষ পদে পদে পাপ করে। গর্বের সাথে পাপ করে। পাপ করা যেন একটি কৃতিত্বে পরিণত হয়েছে। তাইতো সমাজের অলি-গলিতে পাপের পসার বসেছে। পাপের বন্যায় মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছে। পাপ-দক্ষতায় মানুষ প্রতিযোগিতা করছে!
আর মানুষ যত গোপনেই পাপ করুক না কেন, তার শাস্তি সে প্রকাশ্যেই পায়। ইহকালে শাস্তি পেলে যথোপযুক্ত শাস্তি পেয়ে যায়। অবশ্য তাতে পরকালের শাস্তি মকুব হয়ে যায় না। কারেন্ট শাস্তিরূপে মানুষ পায় অবাধ্য স্ত্রী-সন্তান। এক যুবক একজন অভিজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করেছিল, 'জাহান্নাম কেমন?' অভিজ্ঞ বললেন, 'তুমি বিয়ে করেছ?' সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'বিয়ে কর, তাহলে জাহান্নাম দেখতে পাবে!'
পাপের বাজার এত সরগরম যে, মদ, গান-বাজনা ও নাচ-ব্যভিচারে সমাজ পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। সমাজ-সভ্যতায় যেন ফ্যাশানের মর্যাদা লাভ করেছে এমন পাপাচার। আর আল্লাহর রসূল বলেন, "অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে (কিছু লোককে) মাটি ধসিয়ে, পাথর বর্ষণ করে এবং আকার বিকৃত করে (ধ্বংস করা) হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।” (সহীহুল জামে' ৩৬৬৫, ৫৪৬৭ নং)