📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 শত্রু-চক্রান্ত সম্বন্ধে সতর্ক থাকা

📄 শত্রু-চক্রান্ত সম্বন্ধে সতর্ক থাকা


শত্রুর শত্রুতা যদি গোপনে বাড়তে থাকে এবং মুসলমান তার খবরও না রাখে, তাহলে অবশ্যই তা এমন বৃদ্ধি পাবে যে, তার বিরুদ্ধে তারা আর মাথাও তুলতে সক্ষম হবে না। শত্রু ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে যাচ্ছে, দুশমন মুসলিম-নিধনের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখছে, ফাঁদ পেতে শিকার ক'রে কাবু করতে চাচ্ছে, আর মুসলিমরা 'আভী দিল্লী বহুত দূর হ্যায়' বলে যদি নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই অতর্কিতে হামলা ক'রে তাদেরকে পরাভূত করবে।

সজাগ জাতি বিজয় লাভে সক্ষম হয়। জ্বিন ও মনুষ্য-শয়তানের নানা কুচক্রী দল থেকে পূর্ব থেকে সাবধান থাকলে পরাজয় আসে না। মহান আল্লাহ জাতিকে সজাগ হতে বলেন,

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ فَانفِرُوا ثُبَاتٍ أَوِ انْفِرُوا جَمِيعًا] (৭১) النساء
[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اسْتَجِيبُوا الله وَلِلরَّسُولِ إِذَا دَعَاكُم لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمُرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ] (২৪) سورة الأنفال
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! রসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করে, যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সাড়া দাও এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে। (আনফালঃ ২৪)

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُوا اللهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ] (৩৫) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর ও তাঁর পথে সংগ্রাম কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (মাইদাহঃ ৩৫)

[وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ] (৬৯) العنكبوت
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন কর, অতঃপর হয় দলেদলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হও অথবা এক সঙ্গে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হও। (নিসাঃ ৭১)

তিনি জাতিকে সতর্ক হতে বলেন, [وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُواْ فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّهَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلاغُ الْمُبِينُ] (৯২) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর অনুসরণ কর ও রসূলের অনুসরণ কর এবং সতর্ক হও। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রাখ যে, স্পষ্ট প্রচারই আমার রসূলের কর্তব্য। (মাইদাহঃ ৯২)

যদিও মু'মিন সরল-সহজ হয়, তবুও সময়ে তাকে কঠোর হতে হয়। তা না হলে শত্রু তার নাম-নিশানা মিটিয়ে দিতে কোন কসুর করবে না।

মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে একই গর্তে দ্বিতীয়বার দংশিত হয় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার কানার লাঠি বারবার হারায় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে দুধ-কলা দিয়ে কাল-সাপ পোষে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার ঘরের চেরাগ ঘরে আগুন লাগায় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার ঘরের ঢেঁকি কুমীর হয়ে তারই ছেলে ধরে খায় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং 'ঘরের ভাত দিয়ে শকুনি পোষে, গোয়ালের গরু টেকে বসে'---এমন হয় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে খাল কেটে কুমীর আনে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে হ্যাঁপায় পড়ে স্রোতে ভাসে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে হাতির মতো দকে পড়লে বকেও ঠোকর মারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার সম্মুখ দিয়ে ছুঁচ গলে না, পিছন দিয়েও হাতি গলে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং পচা শামুকে তার পা কাটে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তাকে গাছে তুলে কেউ মই কেড়ে নিতে পারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার ঘাড়ে বন্দুক রেখে কেউ শিকার করতে পারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে নেচে মরে, আর বেদেয় ঝুলি ভরে না।

শত্রুর দুরভিসন্ধির ব্যাপারে সদা সজাগ থাকলে, শত্রুর গতিবিধি সর্বদা নজরায়ত্তে রাখলে পরাজয় বরণ করতে হয় না।

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 ধৈর্যশীলতা

📄 ধৈর্যশীলতা


সবুরে মেওয়া ফলে, সবুরে বিজয় আনে। জাতির জীবনে বহু দুঃখ-কষ্ট এসেছে। বিজাতি বহু কষ্ট দিয়েছে ও দিচ্ছে। গৃহদ্বন্দ্বেও জাতি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রয়েছে। এ সব কিছুতে ধৈর্যের প্রয়োজন আছে। বিপদগ্রস্ত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে তাতে সাহায্যপ্রাপ্ত হওয়ার দু'টি পথ আছে, ধৈর্য এবং নামায। মহানবী যখন কোন কঠিন বিপদে বা সমস্যায় পড়তেন, তখন নামায পড়তেন। (আহমাদ ১/২০৬, আবু দাউদ ১৩১৯, নাসাঈ, মিশকাত ১৩২৫নং) আর মহান আল্লাহ জাতিকে বলেছেন,

[وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلا عَلَى الْخَاشِعِينَ] (৪৫) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে এ কঠিন। (বাক্বারাহঃ ৪৫)

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ] (১৫৩) البقرة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন। (ঐঃ ১৫৩)

পরাজয় ও অসাফল্য দিয়ে মহান আল্লাহ জাতির পরীক্ষা নিতে পারেন। আর সেই পরীক্ষায় পাশ করতে প্রয়োজন আছে ধৈর্যের। মহান আল্লাহ বলেন,

[وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفْ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ (১৫৫) الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (১৫৬) أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ] (১৫৭)
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধনপ্রাণ এবং ফলের (ফসলের) নোকসান দ্বারা পরীক্ষা করব; আর তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও। যারা তাদের উপর কোন বিপদ এলে বলে, 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চিতভাবে তারই দিকে ফিরে যাব।' এই সকল লোকের প্রতি তাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা ও করুণা বর্ষিত হয়, আর এরাই হল সুপথগামী। (ঐঃ ১৫৫-১৫৭)

জান্নাতের পথ ততটা সহজ নয়, যতটা অনেকে ধারণা ক'রে থাকে। জান্নাতের পথ কণ্টকাকীর্ণ, বিপদসঙ্কুল, মরু-কান্তার, অতি দুর্গম, বড় বন্ধুর। আর সেই পথ অতিক্রম ক'রেই জান্নাতে যেতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

[أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَمَا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهُ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ] (২১৪) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করবে; যদিও পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের অবস্থা এখনো তোমরা প্রাপ্ত হওনি? দুঃখ-দারিদ্র্য ও রোগ-বালা তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল, তারা এতদূর বিচলিত হয়েছিল যে, রসূল ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারিগণ বলে উঠেছিল, 'আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?' জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। (বাক্বারাহঃ ২১৪)

[أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَا يَعْلَمِ اللهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ]
অর্থাৎ, তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করবে, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা না জানছেন! (আলে ইমরানঃ ১৪২)

[أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ (২) وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ] (৩) سورة العنكبوت
অর্থাৎ, মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা বিশ্বাস করি' এ কথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না ক'রে ছেড়ে দেওয়া হবে? আমি অবশ্যই এদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; সুতরাং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। (আনকাবূতঃ ২-৩)

ঈমানের সাথে জিহাদ এবং তাতে ধৈর্যের বলেই লাভ হবে ইহ-পরকালের বিজয়। মহান আল্লাহ বলেন,

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ (১০) تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنফُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ (১১) يَغْفِرْ لকُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةٌ فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (১২) وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِّنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ] (১৩) سورة الصف
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দেব না, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে? (তা এই যে,) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে। আল্লাহ তোমাদের পাপরাশিকে ক্ষমা ক'রে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত এবং (প্রবেশ করাবেন) স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য। আর তিনি তোমাদেরকে দান করবেন বাঞ্ছিত আরো একটি অনুগ্রহ; আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। আর বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও। (স্বাফঃ ১০-১৩)

মহান আল্লাহর আদেশ পালনে ধৈর্য, তাঁর নিষেধ পালনে ধৈর্য এবং তাঁর লিখিত তকদীরের বালা-মসীবতের উপর ধৈর্য না ধরলে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহান আল্লাহ এমন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সম্বন্ধে বলেন,

[وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ] (১১) سورة الحج
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে দ্বিধার সাথে; তার কোন মঙ্গল হলে তাতে সে প্রশান্তি লাভ করে এবং কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়; সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইহকালে ও পরকালে; এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি। (হাজ্জঃ ১১)

ধৈর্যশীলতা মহান আল্লাহর একটি মহাদান। যে ধৈর্যশীলতার তরবারি দ্বারা বিপদ ও অসাফল্যের মুন্ডু কেটে ফেলা যায়। ধৈর্য ধারণ করলে সৌভাগ্য ও সুখ লাভ হয়। মহানবী বলেন, “সে ব্যক্তি সৌভাগ্যবান, যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হল, সে ব্যক্তি সৌভাগ্যবান, যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হল। আর সে ব্যক্তিও সৌভাগ্যবান, যাকে ফিতনায় ফেলা হল, কিন্তু তাতে সে ধৈর্যধারণ করল।” (আবু দাউদ)

রাজার অত্যাচারে ধৈর্যধারণও জাতির বৃহত্তর সুখ বজায় থাকার উপায়। নচেৎ রাজদ্রোহিতায় আছে চরম অসাফল্য ও দুঃখ। আর সে জন্যই শরীয়তের বিধানে প্রকাশ্য কুফরী না দেখা পর্যন্ত এবং প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় না হওয়া পর্যন্ত বিদ্রোহ করা বৈধ নয়।

মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি তার নেতাকে কোন অপছন্দনীয় কর্মে লিপ্ত দেখবে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে।” (আস্-সুন্নাহ, ইবনে আবী আসেম ১১০১ নং)

উবাদাহ বিন স্বামেত কর্তৃক বর্ণিত, নবী বলেন, “তোমার কষ্ট ও আনন্দের সময়, পছন্দ ও অপছন্দের সময়, (রাজা) তোমার উপর আর কাউকে অগ্রাধিকার দিলে, তোমার ধন-সম্পদ হরণ করে নিলে এবং তোমার পিঠে চাবুক মারলেও তুমি তাঁর কথা মেনে চল এবং আনুগত্য কর।” (আস্ সুন্নাহ, ইবনে আবী আসেম ১০২৬ নং)

উবাদাহ বিন স্বামেত আরো বলেন, রসূলুল্লাহ আমাদের নিকট থেকে আমাদের খুশী ও কষ্টের বিষয়ে, স্বস্তি ও অস্বস্তির বিষয়ে এবং আমাদের অগ্রাধিকার নষ্ট হলেও আনুগত্য ও আদেশ পালনের উপর এবং ক্ষমতাসীন শাসকের বিদ্রোহ না করার উপর বায়আত (প্রতিশ্রুতি) গ্রহণ করেছেন। বলেছেন, "তবে হ্যাঁ, যদি তোমরা প্রকাশ্য কুফরী হতে দেখ, যাতে তোমাদের নিকট আল্লাহর তরফ থেকে কোন দলীল বর্তমান থাকে (তাহলে বিদ্রোহ করতে পার)।” (বুখারী + মুসলিম)

একদা আম্র বিন আস-এর সামনে মুস্তাওরিদ কুরাশী বললেন, আমি রসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি যে, "কিয়ামত সংঘটিত হবার সময় রোমান (ইউরোপীয়) দের সংখ্যা বেশী হবে।” হযরত আম্র মুস্তাওরিদকে বললেন, 'কী বলছেন খেয়াল ক'রে দেখুন!' তিনি বললেন, 'আল্লাহর রসূল যা বলেছেন, তা বলতে আমার বাধা কিসের?'

তখন আম্র বললেন, 'যদি তা সত্য হয়, তাহলে তা রোমানদের ৪টি স্বভাব-গুণের কারণে হবে। প্রথমতঃ ফিতনার সময়ে সকল মানুষের চেয়ে ওরাই বেশী সহ্যশীল। দ্বিতীয়তঃ বিপদের পর ওরাই অধিক শীঘ্র নিজেদেরকে সামলে নিতে পারে। আর এইভাবে ৪টি স্বভাব তিনি উল্লেখ করলেন এবং আরো একটি অধিক বললেন। (মুসলিম ২৮৯৮ নং)

উলামাগণ বলেন, আম্র বিন আসের উক্ত কথার উদ্দেশ্য কাফের নাসারা রোমানদের প্রশংসা করা নয়। বরং তাঁর উদ্দেশ্য মুসলিমদেরকে এই কথা জানানো যে, কিয়ামত অবধি তারা অবশিষ্ট থাকবে এবং তারাই সংখ্যাগুরু হবে। আর তার কারণ, তারা ফিতনার সময় সকলের চেয়ে অধিক সহ্য ক'রে থাকে। সহনশীলতার সাথে পরিস্থিতির গতিবিধি লক্ষ্য করে এবং অনুকূল ও প্রতিকূল নির্ণয় করে অনুকূলের পক্ষ অবলম্বন করে। যাতে তাদের জান-মালের কোন ক্ষতি না হয়।

বিজয়ের জন্য কেবল বলই নয়, কলেরও প্রয়োজন। সাফল্যের জন্য কেবল জোশই নয়, হুঁশেরও প্রয়োজন। আর এ সবে চাই ধৈর্যশীলতা, সহনশীলতা, ধীরতা, স্থিরতা ও গম্ভীরতা। দুশমনদের ষড়যন্ত্রের মুকাবিলায় চাই তাক্বওয়া ও ধৈর্য।

মহান আল্লাহ বলেন, [إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُواْ لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ] (১২০) سورة آل عمران
অর্থাৎ, যদি তোমাদের কোন মঙ্গল হয়, তাহলে তারা নাখোশ হয়, আর তোমাদের অমঙ্গল হলে তারা খোশ হয়। যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং সাবধান হয়ে চল, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে, নিশ্চয় তা আল্লাহর জ্ঞানায়ত্তে। (আলে ইমরানঃ ১২০)

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 অর্থ-সম্পদের সদ্ব্যবহার

📄 অর্থ-সম্পদের সদ্ব্যবহার


মুসলিমদের পরাজয়ের কারণ অর্থাভাব নয়। কারণ এ উম্মাহর কাছে অর্থের ভান্ডার আছে। যে জিনিসের অভাব আছে, তা হল সঠিকভাবে সেই অর্থকে কাজে লাগাবার কৌশল।

মুসলিমদের বিজয়ের জন্য ভরসা পার্থিব কোন উপায়-উপকরণ নয়। তবে তারও প্রয়োজন আছে। তকদীর ও তদবীর উভয়ই এক সাথে কাজ করলে তবেই জাতির প্রতিদ্বন্দ্বিতার গগনে বিজয়ের সূর্য উদিত হয়।

জাতির লোকেরা যদি নিজ নিজ ধন-মালে ঠিকমতো আল্লাহর হক আদায় করত, তাহলে তাদের কেউ দুর্বল ও দরিদ্র থাকত না। তাদের কেউ খাদ্যের অভাবে নিজের স্বভাব নষ্ট করত না। ভাতের জন্য জাত পরিবর্তন করত না। যে ঘরে 'অভাব' থাকে, সে ঘরে 'ভাব' থাকে না। অভাব থাকলে ভাবনায় ঘেরে। আর ভাবনাগাজীদের পরাজয় সুনিশ্চিত।

সুতরাং জাতি যদি নিজেদের অভাব মোচন ক'রে স্বভাব সংশোধন করতে পারত, যথাস্থানে ধন-ব্যয় ক'রে নিজেদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারত, তাহলে সাফল্য ও বিজয়ের চাঁদমুখ দর্শন করত।

যাদের মালে যাকাত ফরয, তারা যাকাত আদায় করে না। যাদের ফসলে ওশর ফরয, তারা ওশর আদায় করে না। অনেকে সূদ খেয়ে বড়লোক হলেও অধিকাংশ মানুষ সূদ দিয়ে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় জাতি তার ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে কীভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে? অর্থলোভে বিকিয়ে যাচ্ছে জাতির বড় বড় মাথা। অর্থাভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জাতির বড় বড় প্রতিভা। যাদেরকে নিয়ে জাতির ভবিষ্যৎ তারা চলে যাচ্ছে বিজাতির ছত্রছায়ায়। তারা সেখানে অর্থ পাচ্ছে, মর্যাদা পাচ্ছে। অনেকে চিন্তাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী দূরে সরে যাচ্ছে দ্বীন থেকে বেদ্বীন হয়ে, তারাও আশ্রয় পাচ্ছে বিজাতির কাছে।

জাতির নেতৃত্বে অর্থের যথাযোগ্য প্রয়োগ নেই। জাতির সম্পদের যথার্থ হিফাযত নেই। যেখানে খরচ করা প্রয়োজন, সেখানে কার্পণ্য। আর যেখানে খরচ করা নিষ্প্রয়োজন, সেখানে অপব্যয় ও অপচয়। এই যদি জাতির অবস্থা হয়, তাহলে কি সাফল্য ও বিজয়ের প্রভাত তার রাজ্যে উদয় হবে?

আল্লাহর রসূল বলেন, “কিয়ামতের দিন ততক্ষণ পর্যন্ত কোন বান্দার পা সরবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, তার আয়ু কী কাজে ব্যয় করেছে, তার ইল্ম দ্বারা কী আমল করেছে, তার সম্পদ কোথা হতে অর্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে, তার দেহ কোথায় ধ্বংস করেছে?---এসব সম্পর্কে। (তিরমিযী, সহীহুল জামে' ৭৩০০নং)

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 ইতিহাস অধ্যয়ন

📄 ইতিহাস অধ্যয়ন


জাতির উচিত, ইতিহাস অধ্যয়ন করা। কারণ, 'ইতিহাস সব কিছুর শিক্ষা দেয়, এমন কি ভবিষ্যতেরও।' 'যে জাতির ইতিহাস নেই, সে জাতি মৃত।' ইতিহাসের গুরুত্ব আছে বলেই মহান আল্লাহ কত জাতির ইতিহাস বর্ণনা করেছেন কুরআনে। ইতিহাসের সেই কাহিনী বর্ণনা করতেও বলেছেন তিনি।

[فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ] (১৭৬) سورة الأعراف অর্থাৎ, তুমি কাহিনী বিবৃত কর, যাতে তারা চিন্তা করে। (আ'রাফঃ ১৭৬) আর তার উপকারিতা বর্ণনা ক'রে তিনি বলেছেন,

[لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِّأُوْلِي الأَلْبَابِ] (১১১) يوسف অর্থাৎ, তাদের কাহিনীতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। (ইউসুফ: ১১১) সুতরাং আমাদের উচিত, ইতিহাস মন্থন ক'রে শিক্ষা ও উপদেশের মণি-মুক্তা উদ্ধার করা।

বিশেষ ক'রে ইসলামী ইতিহাস পড়লে হিম্মত উঁচু হয়, উৎসাহ বৃদ্ধি পায়, হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার স্পৃহা জাগরিত হয়, বিজয়ের ইতিহাস পড়ে বিজয়ের আশা মনে প্রবল হয়। ইতিহাস পঠনে দুর্বল মন সবল হয়, শত্রুর নানা চক্রান্ত্র সম্বন্ধে ওয়াকেফ-হাল হওয়া যায়। কত অভিজ্ঞতা লাভ হয়।

'হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে কাজ করে যাও গোপনে গোপনে,
মুখর দিনের চপলতা-মাঝে স্থির হয়ে তুমি রও।
হে অতীত, তুমি গোপনে হৃদয়ে কথা কও, কথা কও।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00