📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 ইস্তিগফার ও দুআ

📄 ইস্তিগফার ও দুআ


জয়-পরাজয় যখন আল্লাহর হাতে, তখন তাঁর কাছে নিজেদের ত্রুটির কথা স্বীকার ক'রে পরাজয় থেকে আশ্রয় প্রার্থনা চাওয়া আমাদের কর্তব্য। দুআ বলতে শুধু দুআ চাওয়াই নয়; বরং কাকুতি-মিনতি সহকারে চাওয়া, নাছোড়বান্দা হয়ে চাওয়া, সকাতরে প্রার্থনা করা। যেহেতু পতন ও পরাজয় এক প্রকার আযাব, সুতরাং তা রোধ করতে অতিরিক্ত মিনতির সাথে আবেদন পেশ করতে হবে। যেমন ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায় করেছিল। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন,

[فَلَوْلا كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الخِزْيِ فِي الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ] (৯৮) سورة يونس
অর্থাৎ, সুতরাং কোন জনপদ বিশ্বাস করল না কেন, যাদের বিশ্বাস উপকারী হতো; ইউনুসের সম্প্রদায়ের ব্যাপারটি স্বতন্ত্র, যখন তারা বিশ্বাস করল, তখন আমি তাদের থেকে পার্থিব জীবনে অপমানজনক শাস্তি বিদূরিত করে দিলাম এবং এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত তাদেরকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করলাম। (ইউনুসঃ ৯৮)

অর্থাৎ আমি যে জনপদগুলিকে ধ্বংস করেছি, তার মধ্য থেকে কোন একটি জনপদবাসীও কেনই বা এমন হলো না যে, এমন সময়ে ঈমান নিয়ে আসত, যে সময়ে ঈমান আনলে তাদের জন্য ফলপ্রসূ হত! তবে ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। যখন তারা ঈমান আনল, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের উপর থেকে আযাব রহিত ক'রে দিলেন। সংক্ষিপ্ত ঘটনা হল এই যে, যখন ইউনুস দেখলেন যে, তাঁর দাওয়াত ও তবলীগে তাঁর সম্প্রদায় প্রভাবিত হচ্ছে না, তখন তিনি নিজ সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিলেন যে, অমুক দিন তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসবে এবং তিনি নিজে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যখন মেঘের মত তাদের উপর আযাবের লক্ষণাদি দেখা দিল, তখন তারা শিশু, নারী এমনকি জীবজন্তু সমেত এক মাঠে সমবেত হল এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতির সাথে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করল। আল্লাহ তাআলা তাদের তওবা কবুল ক'রে তাদের উপর থেকে আযাব রহিত ক'রে দিলেন। (আহসানুল বায়ান)

বলা বাহুল্য, কাকুতি-মিনতি বড় উপকারী জিনিস। আর তার জন্যই বিপদকালে কুনূত বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। কুনুতে নাযেলায় পাঁচ-ওয়াক্তের নামাযের শেষ রাকআতে রুকু থেকে উঠার পর দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে মুসলিমদের জন্য দুআ ও শত্রুদের জন্য বদ্দুআ করতে হয়। আল্লাহর আযাব যখন আসে, তখন কাকুতি-মিনতির সাথে প্রার্থনা ক'রে তা দূর করতে হয়। কোন এক আযাবের সময় হাসান বাসরী (রঃ) বললেন, 'হে ইরাকবাসী! আল্লাহর আযাবকে তোমরা তোমাদের হাত-পা দ্বারা দূর করো না। বরং আল্লাহর কাছে তওবা দ্বারা দূর কর। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, [فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا] (৪৩) سورة الأنعام অর্থাৎ, সুতরাং আমার শাস্তি যখন তাদের উপর আপতিত হল, তখন তারা বিনীত হয়ে প্রার্থনা করল না কেন? (আনআমঃ ৪৩)

সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিকট বিনীত হয়ে প্রার্থনা কর এবং তওবা কর, তাহলে তিনি তোমাদের আযাব দূর ক'রে দেবেন এবং অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। (আসবাবু ইনহিয়ারিল উমাম ১৭ পৃঃ) জাতির যা দুরবস্থা, তাতে পতন তার ভাগ্য হওয়ারই কথা। নিজের অবস্থার পরিবর্তন না ঘটিয়ে আল্লাহর কাছে পরিবর্তন চাওয়া বড় লজ্জার ব্যাপার। পরন্তু মহান আল্লাহ বলেছেন, [إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَّالٍ] (১১) سورة الرعد অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। আর কোন সম্প্রদায়ের সম্পর্কে যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন, তাহলে তা রদ করবার কেউ নেই এবং তিনি ছাড়া তাদের কোন অভিভাবক নেই। (রা'দঃ ১১)

জাতির যা দুরবস্থা, তাতে রহম পাওয়ার যোগ্য নয়। একদা বাসরাবাসীরা বৃষ্টি প্রার্থনা করল। অতঃপর ফিরে এসে বলতে লাগল, 'আশ্চর্য আল্লাহর কসম! বৃষ্টি প্রার্থনা করলাম অথচ বৃষ্টি হল না!' তা শুনে মালেক বিন দীনার বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! তোমরা বৃষ্টি হওয়াতে দেরি হচ্ছে ভাবছ। আমি তো আকাশ থেকে পাথর বর্ষণে দেরি হচ্ছে ভাবছি!' (ঐ, আল-ইকুদুল ফারীদ ২/১২)

তা এ তো মালেক বিন দীনারের যুগের কথা। আমাদের আধুনিক বিশ্বের কথা কী? অনাবৃষ্টির সময় যদিও অনেকে হাত তুলে বৃষ্টি প্রার্থনা করে, বৃষ্টি নামলে মাথায় ছাতা দিয়ে বৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করে, কিন্তু বাড়ির ছাদে ছাদে যে ছাতা লাগানো আছে, সে ছাতায় বৃষ্টি নামতে বারণ করারই কথা। যে ডিস দিয়ে সারা বিশ্বের বিষকে বেডরুমে বসে পান করা হয়, সে বিষে নীল হওয়া দেহ যে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

বৃষ্টি না হলেও চাষীরা ক্যানেলের পানি দিয়ে চাষ করতে পারে, ফসল ফলাতে পারে। কিন্তু শত শত চ্যানেলের মাধ্যমে যে পানি মুসলিমদের মন ও মগজের জমিকে সিঞ্চিত করছে, তাতে কোন্ ফসল ফলবে; বিজয়ের, না পরাজয়ের?

তবুও আমরা ইস্তিগফার করতে থাকব। ইনশাআল্লাহ বিজয় আসবে এবং পরাজয় দূর হবে। পতন-গহ্বর থেকে উত্থান লাভ করব। মহান আল্লাহর ওয়াদা,

[وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ]
অর্থাৎ, আল্লাহ এরূপ নন যে, তুমি তাদের মধ্যে থাকা অবস্থায় তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং তিনি এরূপ নন যে, তাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা অবস্থায় তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। (আনফালঃ ৩৩)

[وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُواْ إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءِ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ] (৫২) سورة هود
অর্থাৎ, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (তোমাদের পাপের জন্য) তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন কর; তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি আরো বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।' (হ্রদঃ ৫২)

আর মুসা (আ.)-এর মতো বলব,

[رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُم مّিন قَبْلُ وَإِيَّايَ أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاءُ مِنَّا إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَاء وَتَهْدِي مَن تَشَاء أَنتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ] (১৫৫) سورة الأعراف
অর্থাৎ, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তাদের কর্মদোষে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এতো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল। (আ'রাফঃ ১৫৫)

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 আশাবাদিতা ও আল্লাহর প্রতি আস্থা

📄 আশাবাদিতা ও আল্লাহর প্রতি আস্থা


জাতির নিরাশ মনে আশার আলো সঞ্চারিত করতে না পারলে পরাজয় এমনিতেই এসে যাবে। মুসলিমকে এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ জাতির সাথে আছেন। জয়-পরাজয় তাঁরই হাতে আছে।

[وَاللَّهُ يُؤَيِّدُ بِنَصْرِهِ مَن يَشَاء] (১৩) سورة آل عمران অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। (আলে ইমরানঃ ১৩)

[وَمَا النَّصْرُ إِلا مِنْ عِندِ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ] (১০) سورة الأنفال অর্থাৎ, সাহায্য (বিজয়) তো শুধু আল্লাহর নিকট হতেই আসে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। (আনফালঃ ১০)

[بَلِ اللَّهُ مَوْلاكُمْ وَهُوَ خَيْرُ النَّاصِرِينَ] (১৫০) سورة آل عمران অর্থাৎ, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী। (আলে ইমরানঃ ১৫০)

[إِن يَنصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِن يَخْذُلْكُمْ فَمَن ذَا الَّذِي يَنصُرُكُم مِّن بَعْدِهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ] (১৬০) سورة آل عمران
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করলে কেউই তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না। আর তিনি তোমাদের সাহায্য না করলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে তোমাদেরকে সাহায্য করবে? এবং বিশ্বাসিগণের উচিত, কেবল আল্লাহরই উপর নির্ভর করা। (ঐঃ ১৬০)

তাঁরই উপর ভরসা রাখতে হবে, তাঁরই কাছে অনুনয়-বিনয় সহকারে বিজয় ও উত্থান প্রার্থনা করতে হবে। তিনি মহাশক্তিশালী, মহাপরাক্রমশালী বাদশা।

[فَأَمَّا عَادٌ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يَجْحَدُونَ] (১৫) سورة فصلت
অর্থাৎ, আ'দ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, ওরা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করত এবং বলত, 'আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী কে আছে?' ওরা কি তবে লক্ষ্য করেনি যে, আল্লাহ যিনি ওদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি ওদের অপেক্ষাও অধিক শক্তিশালী? আর ওরা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করত। (হা-মীম সাজদাহঃ ১৫)

তাঁর আছে আমাদের অজানা বহু সৈন্য।

[وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ] (المدثر : ৩১) অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। (মুদ্দাষিরঃ ৩১)

[إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ] (৪০)
অর্থাৎ, যদি তোমরা তাকে (রাসূলুল্লাহকে) সাহায্য না কর, তাহলে আল্লাহই (তাকে সাহায্য করবেন যেমন তিনি) তাকে সাহায্য করেছিলেন সেই সময়ে, যখন অবিশ্বাসীরা তাকে (মক্কা হতে) বহিষ্কার ক'রে দিয়েছিল, যখন সে ছিল দু'জনের মধ্যে একজন; যখন উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল। সে তখন স্বীয় সঙ্গী (আবু বকর) কে বলেছিল, 'তুমি বিষণ্ণ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।' অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন এবং এমন সেনাদল দ্বারা তাকে শক্তিশালী করলেন, যাদেরকে তোমরা দেখতে পাওনি এবং তিনি অবিশ্বাসীদের বাক্য নীচু ক'রে দিলেন, আর আল্লাহর বাণীই সমুচ্চ রইলো। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (তাওবাহ: ৪০)

[ثُمَّ أَنزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنزَلَ جُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ] (২৬) سورة التوبة
অর্থাৎ, তারপর আল্লাহ তাঁর নিকট হতে তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের উপর সান্ত্বনা বর্ষণ করলেন; যাতে তাদের চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং এমন এক সৈন্যবাহিনী অবতীর্ণ করলেন, যা তোমরা দেখতে পাওনি এবং তিনি অবিশ্বাসীদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন। আর এটিই অবিশ্বাসীদের কর্মফল। (ঐঃ ২৬)

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا] (৯) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল এবং আমি ওদের বিরুদ্ধে ঝড় এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যা তোমরা দেখতে পাওনি। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার দ্রষ্টা। (আহযাবঃ ৯)

আর তাঁর সৈন্যই হবে সর্ববিজয়ী, অপরাজেয়।

[وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ] (১৭৩) سورة الصافات অর্থাৎ, নিঃসন্দেহে আমার বাহিনীই বিজয়ী হবে। (স্বাফ্ফাতঃ ১৭৩)

[أَمَّنْ هَذَا الَّذِي هُوَ جُندٌ لَّكُمْ يَنصُرُكُم مِّن دُونِ الرَّحْمَنِ إِنِ الْكَافِرُونَ إِلَّا فِي غُرُورٍ] অর্থাৎ, পরম দয়াময় আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের এমন কোন সৈন্যবাহিনী আছে কি, যারা তোমাদের সাহায্য করবে? অবিশ্বাসীরা তো ধোঁকায় রয়েছে। (মুল্ক: ২০)

পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ইসলামের। মহান আল্লাহ বলেছেন,

[وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ]
অর্থাৎ, আমি (যবুর) কিতাবে উপদেশের পর লিখে দিয়েছি যে, 'নিশ্চয় আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে।' (আম্বিয়াঃ ১০৫)

সারা পৃথিবীর মানুষ ইসলামকে শ্রদ্ধা করবে, ইসলামকে স্বাগত জানাবে, ইসলামকে গ্রহণ করবে। মহান আল্লাহ বলেন,

[هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ] (৩৩) سورة التوبة، الصف ৯
অর্থাৎ, তিনিই পথনির্দেশ (কুরআন) এবং সত্য ধর্ম সহ নিজ রসূল প্রেরণ করেছেন, যাতে তাকে সকল ধর্মের উপর জয়যুক্ত করেন, যদিও অংশীবাদীরা অপ্রীতিকর মনে করে। (তাওবাহঃ ৩৩, স্বাফঃ ৯)

মহানবী বলেছেন, "অবশ্য অবশ্যই (ইসলামের) এই বিষয় ততদূর পর্যন্ত পৌঁছবে, যতদূর পর্যন্ত রাত-দিন পৌঁছেছে। আল্লাহ কোন মাটির অথবা লোমের (শহর বা মরুর) ঘরে এই দ্বীন প্রবিষ্ট না ক'রে ছাড়বেন না, সম্মানীর সম্মানের সাথে অথবা অসম্মানীর অসম্মানের সাথে। আল্লাহ সম্মানীর ইসলাম দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমদেরকে সম্মানিত করবেন এবং অসম্মানীর অসম্মান দ্বারা কুফরীকে লাঞ্ছিত করবেন।” (আহমাদ, ইবনে হিব্বান, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩নং)

মহান আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, তিনি ইসলামের বিজয়-পতাকা উড্ডয়ন করবেন।

[إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ] (গাফির: ৫১)
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে ও বিশ্বাসীদেরকে পার্থিব জীবনে ও সাক্ষিগণের দণ্ডায়মান (কিয়ামত) দিনে সাহায্য করব। (মু'মিনঃ ৫১)

[وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ (৪০) الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَاللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ]
অর্থাৎ, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাশক্তিমান, চরম পরাক্রমশালী। আমি তাদেরকে পৃথিবীতে (রাজ) ক্ষমতা দান করলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে। (হাজ্জঃ ৪০-৪১)

সাময়িক পতন তো ঘটতেই পারে। সাময়িক পরাজয় আসতেই পারে। শেষ পরাজয় ইসলাম-বিরোধীদের। বিশ্ববিজয়ী হবে ইসলাম। ইসলামের শান্তিতে শান্তিময় হবে বিশ্ব।

জাতির ইতিহাসের পাতায় বহু উত্থান-পতনের ঘটনাঘটন লিপিবদ্ধ হয়েছে। তবুও ইসলাম মিটে যায়নি।
'ইসলাম কী ফিতরত মে কুদরত নে লচক দী হ্যায়, উতনা হী উভরেগা জিতনা কে দাবাওগে।'

প্রত্যেক কারবালার পরেও ইসলাম জীবিত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। উত্থান-পতনের রশি ধরে ধরে শেষ পরিণাম হবে মুসলিমদের। মহান আল্লাহ মুসলিমদেরকে সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

[وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُم فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُمَبِّدِلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ] (৫৫) سورة النور
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদেরকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে অবশ্যই প্রতিনিধিত্ব দান করবেন; যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য তাদের ধর্মকে -- যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন -- সুদৃঢ় করবেন এবং তাদের ভয় ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার উপাসনা করবে, আমার কোন অংশী করবে না। অতঃপর যারা অকৃতজ্ঞ (বা অবিশ্বাসী) হবে, তারাই সত্যত্যাগী। (নূরঃ ৫৫)

আর পরাজয় হবে মুসলিম-শত্রুদের।

[فَفَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَأُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ] অর্থাৎ, অনন্তর যারা অবিশ্বাস করেছে আমি তাদেরকে ইহকাল ও পরকালে কঠোর শাস্তি প্রদান করব। আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। (আলে ইমরান: ৫৬)

[قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلَى جَهَنَّمَ وَبِئْسَ الْمِهَادُ] (১২) آل عمران অর্থাৎ, যারা অবিশ্বাস করে তাদেরকে বল, তোমরা শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং তোমাদেরকে দোযখে একত্রিত করা হবে। আর তা অতি মন্দ শয়নাগার। (ঐঃ ১২)

[أَمْ يَقُولُونَ نَحْنُ جَمِيعٌ مُنتَصِرٌ (৪৪) سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ] (৪৫) القمر অর্থাৎ, অথবা তারা বলে যে, 'আমরা সংঘবদ্ধ অপরাজেয় দল।' এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে। (ক্বামারঃ ৪৪-৪৫)

সাময়িক বিজয় ও উন্নয়ন নিয়ে কাফেরদল খোশ হতে পারে। কিন্তু একদিন না একদিন তাদের পরাজয় হবেই। মহান আল্লাহ বলেছেন,

[وَلا يَزَالُ الَّذِينَ كَفَرُوا تُصِيبُهُمْ بِمَا صَنَعُوا قَارِعَةٌ أَوْ تَحُلُّ قَرِيباً مِنْ دَارِهِمْ]
অর্থাৎ, যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের কর্মফলের জন্য তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে অথবা বিপর্যয় তাদের আশেপাশে আপতিত হতেই থাকবে। (রা'দঃ ৩১)

তবুও প্রশ্ন জাগে, মুসলিমদের এ অবস্থা কেন? কবি তার জবাব দিয়েছেন,

'খোদায় পাইয়া বিশ্ববিজয়ী হল একদিন যারা।
খোদায় ভুলিয়া ভীত পরাজিত আজ দুনিয়ায় তারা।।
খোদার নামের আশ্রয় ছেড়ে ভিখারীর বেশে দেশে দেশে ফেরে
ভোগ-বিলাসের মোহে ভুলে হায় নিল বন্ধন কারা।।
খোদার সঙ্গে যুক্ত সদাই ছিল যাহাদের মন,
দুখে-রোগে-শোকে অটল যাহারা রহিত সর্বক্ষণ---
এসে শয়তান ভোগ-বিলাসের কাড়িয়া লয়েছে ঈমান তাদের
খোদায় হারায়ে মুসলিম আজ হয়েছে সর্বহারা।।'

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 বিজয় লাভের প্রস্তুতি

📄 বিজয় লাভের প্রস্তুতি


বিজয় আল্লাহর নিকট থেকে আসে। কিন্তু জাতিকে বিজয় লাভের উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করতে হয়। ফসল আল্লাহই দেন, কিন্তু বান্দাকে জমি প্রস্তুত করতে হয়, বীজ-রোপন করতে হয়, সেচ দিতে হয় ইত্যাদি। যে কোন সংগ্রামে জয়লাভ করতে হলে প্রধানতঃ দু'টি শক্তির একান্ত প্রয়োজন।

প্রথমতঃ ঈমানী শক্তি। আর তা হল শির্কমুক্ত আক্বীদাহ এবং বিশেষতঃ এই বিশ্বাস যে, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ আমাদেরকে বিজয়ী করবেনই।

[كَتَبَ اللَّهُ لَأَغْلِبَنَّ أَنَا وَرُسُلِي إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ] (২১) سورة المجাদلة অর্থাৎ, আল্লাহ লিপিবদ্ধ করেছেন যে, আমি এবং আমার রসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। (মুজাদালাহঃ ২১)

[إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ] (গাফির: ৫১) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে ও বিশ্বাসীদেরকে পার্থিব জীবনে ও সাক্ষিগণের দণ্ডায়মান (কিয়ামত) দিনে সাহায্য করব। (মু'মিনঃ ৫১)

[وَإِنَّ جُندَنَا هُمُ الْغَالِبُونَ] (১৭৩) سورة الصافات অর্থাৎ, নিঃসন্দেহে আমার বাহিনীই বিজয়ী হবে। (স্বাফফাতঃ ১৭৩)

দ্বিতীয়তঃ বস্তুগত শক্তি। প্রচুর অর্থ চাই। আর তার জন্য যাকাত খরচের একটি খাতই রাখা হয়েছে আল্লাহর পথে সংগ্রামের। সেই অর্থ দিয়ে বিজয়লাভের এমন সাজ-সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র ও যোদ্ধা প্রস্তুত করতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করা সম্ভব। অযথেষ্ট শক্তি নিয়ে সংগ্রামে নামা যায় না। যেমন সামান্য শক্তি দিয়ে সন্ত্রাস ক'রে বিজয় লাভ হয় না। দুটোর মধ্যে কেবল একটি শক্তির উপর নির্ভর ক'রে বিজয় আসে না, তবে আল্লাহ চাইলে তাঁর 'কুন' শব্দে বিনা যুদ্ধে বিজয় আসতে পারে, সে কথা ভিন্ন।

মহানবী (সা.)-এর কাছে যত ঈমানী শক্তি ছিল, তাঁর তুলনায় আর কারো ছিল না। তাঁর সাহাবাবর্গেরও সে শক্তি অন্যান্য মানুষের তুলনায় বিশাল ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা বস্তুগত শক্তি প্রয়োগ করেছেন। অস্ত্রশস্ত্র সাথে নিয়েছেন, লৌহবর্ম ও শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করেছেন। আর আল্লাহ বলেছেন,

[وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِّبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهুমُ اللهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ] (৬০) سورة الأنفال
অর্থাৎ, তোমরা তাদের (মুকাবিলার) জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও সুসজ্জিত অশ্ব প্রস্তুত রাখ, এ দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু তথা তোমাদের শত্রুকে সন্ত্রস্ত করবে এবং এ ছাড়া অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ জানেন। আর আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি অত্যাচার করা হবে না। (আনফালঃ ৬০)

আবার কেবল বস্তুগত শক্তির উপরেও নির্ভর করলে বিজয় আসবে না। আত্মনির্ভর বা শক্তিমত্তায় অহংকারী হয়ে উঠলে মহান আল্লাহ বিজয়ের পালা বদলে দেন।

[لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ] (২৫) سورة التوبة
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে তো বহুক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং হুনাইনের যুদ্ধের দিনেও; যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তা তোমাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন ক'রে পলায়ন করেছিলে। (তাওবাহঃ ২৫)

মক্কা ও তায়েফের মধ্যস্থলে একটি উপত্যকার নাম হুনাইন। এখানে হাওয়াযিন এবং সাক্বীফ নামক দুই গোত্র বসবাস করত। এই উভয় গোত্রের লোকেরা তীর নিক্ষেপ কাজে বড় পটু বলে প্রসিদ্ধি ছিল। এরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে কথা রসূল জানতে পারলে ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে সেই গোত্র দু'টির সাথে লড়াই করার উদ্দেশ্যে 'হুনাইন' উপত্যকায় উপস্থিত হলেন। এই যুদ্ধ মক্কা বিজয়ের ১৮/১৯ দিন পর শওয়াল মাসে সংঘটিত হয়। উল্লিখিত উভয় গোত্রের লোকেরা পরিপূর্ণরূপে প্রস্তুতি নিয়েই ছিল। তারা বিভিন্ন ঘাঁটিতে তীরন্দাজদেরকে মোতায়েন ক'রে দিল। এদিকে মুসলিমদের মাঝে আত্মগর্ব সৃষ্টি হল যে, আজ আমরা কমসে কম সংখ্যা স্বল্পতার কারণে পরাজিত হব না। অর্থাৎ, আল্লাহর মদদ বিস্মৃত হয়ে তাঁরা নিজেদের সংখ্যাধিক্যের উপর ভরসা ক'রে বসলেন। আল্লাহর নিকট এই গর্ব পছন্দ ছিল না। পরিণামস্বরূপ যখন হাওয়াযিনের সুদক্ষ তীরন্দাজরা বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর ধারণাতীতভাবে একই সাথে তীর বর্ষণ করতে শুরু করল, তখন মুসলিম বাহিনী বিচলিত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পলায়ন শুরু করল। যুদ্ধ-ময়দানে কেবল নবী ১০০ জনের মতো সৈন্য নিয়ে অবিচলিত থাকলেন। তিনি মুসলিমদেরকে ডাক দিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা আমার কাছে এসো। আমি হলাম আল্লাহর রসূল।' সেই সাথে তিনি এই যুদ্ধ-কবিতা পড়তে লাগলেন,

أنا النبي لا كذب أنا ابن عبد المطلب
অর্থাৎ, 'আমি হলাম নবী, এটা মিথ্যা নয়। আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান।'

পুনরায় তিনি আব্বাস (রা.)-কে (যাঁর গলার আওয়াজ বড় উঁচু ছিল) আদেশ করলেন যে, 'মুসলিমদেরকে একত্রিত করার জন্য ডাক দাও।' অতএব তাঁর আওয়াজ শুনে মুসলিমরা লজ্জিত হলেন এবং পুনরায় ময়দানে একত্রিত হলেন। অতঃপর এমন দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করলেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জয়ী ক'রে দিলেন। আল্লাহর মদদ এমনভাবে এল যে, তিনি তাঁদের উপর সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন; যার ফলে তাঁদের অন্তর থেকে কাফেরদের ভয় দূর হয়ে গেল। আর সেই সাথে ফিরিশাদলও প্রেরণ করলেন। (আহসানুল বায়ান)

সংগ্রাম ক'রে বাঁচার মধ্যে জাতির প্রাণ রয়েছে। তাই আল্লাহ বলেছেন, [وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ] (৬৯) العنكبوت অর্থাৎ, যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহে পরিচালিত করব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গেই থাকেন। (আনকাবুতঃ ৬৯)

'যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ,
কেহ কভু তাহাদের করেনি সম্মান।'

📘 জাতির উত্থান পতন > 📄 শত্রু-চক্রান্ত সম্বন্ধে সতর্ক থাকা

📄 শত্রু-চক্রান্ত সম্বন্ধে সতর্ক থাকা


শত্রুর শত্রুতা যদি গোপনে বাড়তে থাকে এবং মুসলমান তার খবরও না রাখে, তাহলে অবশ্যই তা এমন বৃদ্ধি পাবে যে, তার বিরুদ্ধে তারা আর মাথাও তুলতে সক্ষম হবে না। শত্রু ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে যাচ্ছে, দুশমন মুসলিম-নিধনের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখছে, ফাঁদ পেতে শিকার ক'রে কাবু করতে চাচ্ছে, আর মুসলিমরা 'আভী দিল্লী বহুত দূর হ্যায়' বলে যদি নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই অতর্কিতে হামলা ক'রে তাদেরকে পরাভূত করবে।

সজাগ জাতি বিজয় লাভে সক্ষম হয়। জ্বিন ও মনুষ্য-শয়তানের নানা কুচক্রী দল থেকে পূর্ব থেকে সাবধান থাকলে পরাজয় আসে না। মহান আল্লাহ জাতিকে সজাগ হতে বলেন,

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ فَانفِرُوا ثُبَاتٍ أَوِ انْفِرُوا جَمِيعًا] (৭১) النساء
[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اسْتَجِيبُوا الله وَلِلরَّسُولِ إِذَا دَعَاكُم لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمُرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ] (২৪) سورة الأنفال
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! রসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করে, যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সাড়া দাও এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে। (আনফালঃ ২৪)

[يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُوا اللهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ] (৩৫) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর ও তাঁর পথে সংগ্রাম কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (মাইদাহঃ ৩৫)

[وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ] (৬৯) العنكبوت
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন কর, অতঃপর হয় দলেদলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হও অথবা এক সঙ্গে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হও। (নিসাঃ ৭১)

তিনি জাতিকে সতর্ক হতে বলেন, [وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُواْ فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّهَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلاغُ الْمُبِينُ] (৯২) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর অনুসরণ কর ও রসূলের অনুসরণ কর এবং সতর্ক হও। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রাখ যে, স্পষ্ট প্রচারই আমার রসূলের কর্তব্য। (মাইদাহঃ ৯২)

যদিও মু'মিন সরল-সহজ হয়, তবুও সময়ে তাকে কঠোর হতে হয়। তা না হলে শত্রু তার নাম-নিশানা মিটিয়ে দিতে কোন কসুর করবে না।

মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে একই গর্তে দ্বিতীয়বার দংশিত হয় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার কানার লাঠি বারবার হারায় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে দুধ-কলা দিয়ে কাল-সাপ পোষে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার ঘরের চেরাগ ঘরে আগুন লাগায় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার ঘরের ঢেঁকি কুমীর হয়ে তারই ছেলে ধরে খায় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং 'ঘরের ভাত দিয়ে শকুনি পোষে, গোয়ালের গরু টেকে বসে'---এমন হয় না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে খাল কেটে কুমীর আনে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে হ্যাঁপায় পড়ে স্রোতে ভাসে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে হাতির মতো দকে পড়লে বকেও ঠোকর মারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার সম্মুখ দিয়ে ছুঁচ গলে না, পিছন দিয়েও হাতি গলে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং পচা শামুকে তার পা কাটে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তাকে গাছে তুলে কেউ মই কেড়ে নিতে পারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং তার ঘাড়ে বন্দুক রেখে কেউ শিকার করতে পারে না।
মু'মিন সতর্ক থাকে, সুতরাং সে নেচে মরে, আর বেদেয় ঝুলি ভরে না।

শত্রুর দুরভিসন্ধির ব্যাপারে সদা সজাগ থাকলে, শত্রুর গতিবিধি সর্বদা নজরায়ত্তে রাখলে পরাজয় বরণ করতে হয় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00