📘 জান্নাতি জীবন 📄 গীবতের তাওবা

📄 গীবতের তাওবা


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارُ وَلَا دِرْهَمُ
'কেউ যদি কোনো ভাইয়ের ইজ্জত নষ্ট করে থাকে, তাহলে আজকেই যেন এর সুরাহা করে, তার কাছে মাফ চেয়ে নেয়। যেদিন কোনো কিছু কাজে আসবে না, ওই দিন (অর্থাৎ কিয়ামত) আসার আগে।[১০৪]
তার মানে আমি যদি কারও গীবত করি, কারও ক্ষতি করতে চেষ্টা করি তার অজান্তে, তাহলে আগে তার কাছে যেয়ে মাফ চেয়ে নিতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আশা করি, সবাই বুঝতে পারছেন আমার কথা।
আমরা দিন-রাত কত গীবত করেছি। কত মানুষের বিরুদ্ধে কত কথা বলেছি। নিজেই হয়তো জানি না। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সন্তান এখন মায়ের বিরুদ্ধে গীবত করে, মা সন্তানের বিরুদ্ধে গীবত করে। অথচ একই ঘরে থাকে তারা। ছেলের বউয়ের ব্যাপারে গীবত চলতে থাকে, ছেলের ব্যাপারে গীবত চলতে থাকে। পরনিন্দা-পরচর্চা চলতে থাকে। কিয়ামতের দিন এই সন্তান দাঁড়িয়ে বলবে, 'হে আল্লাহ! মা আমার গীবত করেছে।' আবার মা দাঁড়িয়ে বলবে, 'হে আল্লাহ! আমার ছেলে আমার নামে গীবত করেছে।'
এভাবে পারিবারিক জীবন আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মায়ের কত ইহসান সন্তানের ওপর। সন্তান মায়ের কাছে কতই-না প্রিয়। কিন্তু একজন আরেকজনের নামে গীবত করে একে অপরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনেক নামাজ-রোজা-এগুলো কিয়ামতের দিন কাজে আসবে না। যার নামে গীবত করেছি, সে আমার কাছ থেকে সব নিয়ে নেবে।
বুখারির রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যতদিন বেঁচে আছো, তাড়াতাড়ি শুধরে নাও।'[১০৫]
জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, হে মানবমন্ডলী! তোমরা মরার পূর্বেই আল্লাহ নিকট তওবা করো এবং কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ার পূর্বেই সৎ কাজের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। তাঁর অধিক যিক্সের মাধ্যেমে তোমাদের রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে অধিক পরিমাণে দান-খয়রাত করো, এজন্য তোমাদের রিযিক বাড়িয়ে দেয়া হবে, সাহায্য করা হবে এবং তোমাদের অবস্থার সংশোধন করা হবে। তোমরা জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আমার এই স্থানে আমার এই দিনে, আমার এই মাসে এবং আমার এই বছরে তোমাদের উপর কিয়ামতের দিন পর্যন্ত জুমুআহ্ সালাত ফার্দ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি আমার জীবদ্দশায় বা আমার ইনতিকালের পরে, ন্যায়পরায়ণ অথবা যালেম শাসক থাকা সত্ত্বেও জুমুআহ্ সালাত তুচ্ছ মনে করে বা অস্বীকার করে তা বর্জন করবে, আল্লাহ তার বিক্ষিপ্ত বিষয়কে একত্রে গুছিয়ে দিবেন না এবং তার কাজে বরকত দান করবেন না। সাবধান! তা সালাত, যাকাত, হাজ্জ, সওম এবং অন্য কোন নেক আমার গ্রহণ করা হবে না যতক্ষণ না সে তওবা করে। যে ব্যক্তি তওবা করে আল্লাহর তাআলা তার তওবা কবুল করেন। সাবধান! নবী পুরুষের, বেদুইন মুহাজিরের এবং পাপাচারী মু'মিন ব্যক্তির ইমামতি করবে না। তবে স্বৈরাচারী শাসক তাকে বাধ্য করলে এবং তার তরবারি ও চাবুকের ভয় থাকলে স্বতন্ত্র কথা। [১০৬]
শুধু শুধরালেই হবে না। মাসআলা হলো, আজকের পর থেকে ওই লোকের বিরুদ্ধে আর কোনো গীবত করা যাবে না। যাদের কাছে গীবত করা হয়েছিল, তাদের কাছে ওই লোকের ব্যাপারে সুনাম করতে হবে। বলতে হবে—‘ভাই! লোকটা অনেক ভালো। আসলে আমিই বুঝতে পারিনি।' এটা জরুরি।
মায়ের নামে বদনাম করলে তার কাছে যেয়ে বলতে হবে, 'আম্মু! আমি ভুল করেছি। বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা।' এভাবে যেয়ে তার ভালো গুণের কথা বলতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে-'হে আল্লাহ! আপনি গীবত করতে নিষেধ করেছিলেন। নিষেধ করার পরেও আমি গুনাহের কাজ করেছি। দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন।'
এখানে তাহলে কয়টা কাজ হলো? ১. ক্ষমা চাওয়া ২. তাওবা করা
১. ক্ষমা চাওয়া
কাউকে গালি দিলে, গীবত করলে, তার কাছে প্রথমে মাফ চান। মাফ চাইলে কি আপনার ইজ্জত কমে যাবে? বাবা-মাও যদি সন্তানের গীবত করে, তবে তাদেরকেও মাফ চাইতে হবে সন্তানের কাছে।
এখন বলতে পারেন, 'বাবা-মা আবার মাফ চাইবে কেন? এটা কেমন কথা?' তারা যে আল্লাহর কথা লঙ্ঘন করেছে, তাহলে মাফ চাইবে না?
তবে বলে রাখা প্রয়োজন যে, মাফের ধরন নিয়ে আমরা প্রায়শই ভুল বুঝে থাকি। এদেশে মাফ মানে হলো পা ধরা। কোথা থেকে আসল এই বাজে রীতি? হাদীসে এটা নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কেউ পা ধরে মাফ চেয়েছে। এটা তো ফালতু একটা কাজ। কোথা থেকে এসেছে কে জানে! অথচ মাফ চাওয়া মানে হচ্ছে— 'এই অন্যায় আমি আর করব না। আমি ভুল করেছি, আর এই ভুল রিপিট করব না।' এরপর বাকি জিন্দেগিতে এটা প্রমাণ করে দেওয়া যে—'আমি ভালো হয়ে গিয়েছি।'
এটাকে মাফ বলে। মাফ চাওয়া মানে জবান দিয়ে বলা যে, 'আমি ভুল করেছি।' সন্তানের কাছে বললে সন্তান শিখবে। বুঝবে যে, অন্যায় হলে ভুল স্বীকার করতে হয়। এতে করে বাবা-মা সন্তানের কাছে বড় হবে, ছোট হবে না।
২. তাওবা করা
মাফ চাওয়ার পর, তার সুনাম করার পর, আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। এটা হলো তাওবার সুরত।
হাদীসটা যেন আমরা মাথায় রাখি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطْرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ
'আমার উম্মতের মধ্যে সে-ই প্রকৃত গরিব, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হক তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না যায়, সেই ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [১০৭]

টিকাঃ
[১০৪] বুখারি: ২৪৪৯
[১০৫] রিয়াদুস সলেহিন, হাদিস নং ৯৪
[১০৬] সুনানে ইবনে মাজাহ, ১০৮১; যঈফ। তাখরীজ আলবানী: ইরওয়াহ ৫৯১।
[১০৭] মুসলিম, ৬৩৪৩।

📘 জান্নাতি জীবন 📄 নামাজ কাযার তাওবা

📄 নামাজ কাযার তাওবা


আমাদের ওপর আল্লাহর কী কী হক আছে-সেটার একটা তালিকা আছে। সব হক নিয়ে তো আলোচনা সম্ভব না, তাই উদাহরণ দিয়ে বলছি। ফরজকে আদায় করা যেমন ফরজ, তেমনই ফরজকে ফরজ মানাও ফরজ। একইভাবে যে ফরজ আমার থেকে ছুটে গিয়েছে-সেটার তালিকা বানানোও ফরজ। আল্লাহর হক হলো, আমি যেদিন থেকে বালেগ হয়েছি, সেদিন থেকে আমি নামাজকে যথার্থভাবে পড়েছি কি না। মনে করুন, কেউ বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হয়েছে বারো বছর বয়সে। তো সেই সময় থেকে ছুটে যাওয়া নামাজের হিসাব শুরু করতে হবে।
জন্মতারিখের কথা মনে রাখি বা না রাখি, আমি কবে বালেগ হয়েছি, আমার সেটা জানা থাকা লাগবে। পিতা-মাতার জন্য সন্তানের এই খোঁজখবর রাখা জরুরি। এভাবে সন্তানকে সজাগ করা জরুরি-'এখন থেকে তোমার ওপর আল্লাহর হক আছে। তোমাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে।' আমি যদি এভাবে তাকে সতর্ক করতাম, তাহলে কোনো ওজরের কারণে যদি তার নামাজ ছুটে যেত, তাহলে কবে কয় ওয়াক্ত নামাজ ছুটে গিয়েছে-সেটার হিসেব তার কাছে থাকত। শরীয়তে ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়ার সুযোগই নেই। অনিচ্ছায় যদি আমার কোনো নামাজ ছুটে যায়-ওজরের কারণে, ঘুমের কারণে-তবে ওই নামাজের হিসেব আমার জানা থাকতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবাদের যুগে এই কল্পনাই ছিল না যে, মানুষ ইচ্ছা করে নামাজ ছাড়তে পারে। নিজেকে মুসলিম দাবি করব, আবার নামাজ ছেড়ে দেবো! এটা হতেই পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবাদের যুগে যারা দিলে দিলে কাফির ছিল, তাদেরকে বলে মুনাফিক। ওরাও এই কথা বুঝত যে, মুসলিম পরিচয় দেওয়ার পর কোনো ফরজ ছুটে যাবে, নামাজ ছুটে যাবে-এটা সম্ভব না। এজন্য ওরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পেছনে নামাজ পড়ত। তার মানে, ওই সময়ে কোনো মুনাফিকও ইচ্ছা করে কোনো নামাজ কাযা করেনি। মুনাফিক কাকে বলে? যে আল্লাহকে পছন্দ করে না, যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসে না, যে দ্বীনকে দিল থেকে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু এমন অবস্থায়ও সে নামাজ কাযা করেনি। অর্থাৎ নিজেকে মুসলিম দাবি করার পর কেউ নামাজ কাযা করতে পারে, এই কথা ওই যুগের মুনাফিকরাও জানত না; বরং কাযা ছিল অনিচ্ছায়। তাই আমার জীবনে যদি কোনো সময় কোনো ওয়াক্তের নামাজ ছুটে যায়, তবে সেটার কাযা আদায় করতে হবে।
এখন, ছুটে যাওয়া ফরজ নামাজের তালিকা করুন আপনি। যদি আপনার কাছে নিশ্চিতভাবে জানা না থাকে, তাহলে আপনি কবে বালেগ হয়েছেন-তা ধারণা করুন। এরপর দেখবেন, বালেগ হওয়ার পর থেকে নিয়ে এখন আপনার বয়স কত। এই বয়সে আপনি দেখলেন যে, জীবনের প্রায় পনেরো-ষোলো কী বিশ-পঁচিশ বছর এমন গেছে যে, আপনি নামাজ পড়েননি। আগের যুগে মুনাফিকদের এই সুযোগ ছিল না, কিন্তু এখন এই সুযোগ হয়ে গেছে। আমরা বানিয়ে নিয়েছি। এখন আমি যে পনেরো বছর নামাজ পড়লাম না, সেই পনেরো বছরের নামাজের কাযা আদায় করা আমার জন্য জরুরি।
এখন আপনি যদি মনে করেন, আমার নামাজ কাযা হয়েছে পনেরো বছর, ওই হিসাবে আমি এতদিনের নামাজ পড়ব কিভাবে! এক কাজ করি, আমি এই পনেরো বছরের নামাজের বদলে প্রতিদিন মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত সালাতুত তাওবা পড়া শুরু করি। আর আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া শুরু করি- 'আল্লাহ, আপনি আমাকে মাফ করে দিন।'
না, এটাকে তাওবা বলে না। আমার ওপর যে নামাজ কাযা আছে, আমাকে তা আদায় করতে হবে। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কাযা আদায় করতে থাকব। এরপরও যদি দেখি, মৃত্যুর আগে মাত্র পাঁচ বছরের নামাজ আদায় করেছি, আরও দশ বছরের কাযা নামাজ বাকি, আমি সন্তানের কাছে এই দশ বছরের নামাজের ওসিয়ত করে যাব- 'বাবা, আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর ফিকির করো।' বাঁচানোর তরিকা কী? তরিকা হলো বাকি দশ বছরের ফিদিয়া সন্তানরা দিয়ে দেবে। প্রত্যেকদিন ছয় ওয়াক্ত হিসাব করে ফিদিয়া দিতে হয়। নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু ফিদিয়া ছয় ওয়াক্তের। অতিরিক্ত হচ্ছে বিতরের ফিদিয়া। বিতরও ওয়াজিব, তাই ফিদিয়া। এক দিনে ছয় ওয়াক্তের দিতে হবে। ছয় ওয়াক্তের হিসাব করে আমার সন্তানদেরকে বলে যেতে হবে যে-'বাবা, আমার এই সম্পত্তি আছে। এই সম্পত্তি থেকে তুমি আমার এই ওসিয়ত পূর্ণ করে দিয়ো।'
অথবা মনে করুন, আমার সম্পত্তি এই পরিমাণ নেই-যা দিয়ে আমার এই নামাজের কাফফারা হবে। তাহলে আমার সন্তানের হাত ধরে বলতে হবে- 'বাবা, তুমি পারলে এটা আদায় করে দিয়ো। আমি তো জীবনে তোমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছি। কবরে আমি আমার নামাজের হিসাব দিতে পারব না। আগে বুঝিনি যে, নামাজ পড়া আমার জন্য এত জরুরি। বুঝলেও এত গুরুত্ব দিইনি। যেদিন থেকে বুঝতে পেরেছি, সেদিন থেকে আমি নামাজ আদায় করা শুরু করেছি। কিন্তু আমার এইটুকু নামাজ ছুটে গেছে, তোমরা দয়া করে এর ফিদিয়ার টাকাটা আদায় করে দিয়ো।'
ওসিয়ত করা জরুরি। কেউ যদি এই অবস্থায় মারা যায় যে, টাকা দিয়ে ওসিয়ত করে গেছে, কিন্তু টাকা এখনো বাকি আছে, আশা করা যায় আল্লাহ তাকে মাফ করবেন।
তরিকা ছিল এটা যে, আমার বাবার কত ওয়াক্ত নামাজ ছুটে গেছে-তা হিসাব করে আমি ফিদিয়া আদায় করে দেবো। এটা না যে, আমার নামাজ ছুটে গেছে, এখন আমি মসজিদে গিয়ে তাওবা করি, শবে বরাত, শবে কদর, রমজানে ইবাদত করি। তাওবার সুরত হচ্ছে হিসাব করা। অথবা হিসাব না জানলে অনুমান করা ও কাযা আদায় শুরু করা। আপনি নামাজ পড়া শুরু করুন, আর তালিকা করুন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ-ফজর, যুহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং বিতর-সহ পড়তে থাকুন। নিয়ত এটা করতে হবে- 'হে আল্লাহ! আমার তো হিসেব জানা নেই। আমি এত গাফেল যে, আমার হিসাবই জানা নেই। আমি আর গাফিল হব না। আর এই ধরনের গাফিলতি হলে হিসাব রাখব।' এরপর পুরোপুরি হিসাব রেখে আল্লাহ রব্বুল ইযযাতের কাছে নামাজে দাড়িয়ে এই কথা বলতে হবে-'হে আল্লাহ! আমার জীবনে যত নামাজ কাযা হয়েছে, এর প্রথম ফজর পড়ছি।'
আবার যুহরের সময় বলতে হবে- 'হে আল্লাহ! আমার জীবনে যত নামাজ কাযা হয়েছে, এর প্রথম যুহর পড়ছি।' একইভাবে আসরের সময় বলতে হবে 'প্রথম আসর', মাগরিবের সময় 'প্রথম মাগরিব'। একটা আদায় হয়ে গেলে, এর পরে যেটা থাকবে-ওটাও তো প্রথমই হয়ে যাবে। মনে করুন, এক হালি কলা সিরিয়াল অনুযায়ী সাজানো আছে-১, ২, ৩, ৪। এর মাঝে প্রথমটা সরিয়ে নিলে দ্বিতীয়টা প্রথম হয়ে যাবে না? আবার দ্বিতীয়টা সরিয়ে দিলে তৃতীয়টা প্রথম হয়ে যাবে, তৃতীয়টা সরিয়ে দিলে চতুর্থটা প্রথম হয়ে যাবে। একইভাবে আপনি যখন কাযা নামাজগুলো আদায় করতে থাকবেন, প্রথম কাযা নামাজটা আদায় করার পর যেটা থাকবে, সেটা প্রথম হয়ে যাবে। এভাবেই নিয়ত করে প্রথম কথাটা মনে রাখতে হবে। আরও বিভিন্ন তরিকা আছে, এটা মনে রাখার একটা তরিকা। এভাবে নামাজ আদায় করতে থাকবেন। আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা কবুল করে নেবেন। বিগত দিনের নামাজ ছাড়ার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমিন।

📘 জান্নাতি জীবন 📄 তাওবা কবুলের আলামত

📄 তাওবা কবুলের আলামত


মাত্র একটা কবীরা গুনাহ যদি কেউ করে, আর তার তাওবা যদি কবুল না হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী তার জন্য জান্নাত হারাম। তার যত আমলই থাকুক না কেন। জান্নাতে কেউ কবীরা গুনাহ নিয়ে যেতে পারব না। কবীরা গুনাহ আগে মাফ করাতে হবে আল্লাহর কাছে। এরপর সে জান্নাতে যাবে। জান্নাতে কেবল পূতপবিত্র মানুষই যাবে।
আমরা জীবনে যেই গুনাহই করি না কেন, ওই গুনাহ আমি মাফ পেয়েছি কি না, এটা নিশ্চিত হওয়া যাবে হাশরের দিনে। কিন্তু দুনিয়ায় থাকতেই আমি আমার তাওবা কবুল হয়েছে কি না—এটার একটা বড় আলামত নিয়ে আমরা আলোচনা করব। একটা হলো গুনাহ ছাড়া, আরেকটা হলো তাওবা কবুল হওয়া। গুনাহ ছাড়া হলো তাওবার প্রথম শর্ত। গুনাহমুক্ত জীবন নিয়ে আমরা আগেই আলোচনা করেছি। তাওবা কবুল হয়েছে কি না, আজকে শুধু এই একটা বিষয় নিয়েই আলোচনা করব。
দুটো অবস্থা যদি আমার দিলে তৈরি হয়, তাহলে আমি আশা করতে পারি আল্লাহ আমার তাওবা কবুল করেছেন। অবস্থা দুইটা।
• ১. আক্ষেপ
• ২. অনুশোচনা
দুটোকে আমি ভিন্ন ভিন্ন অর্থে বলেছি। এই দুই অবস্থা আমার দিলে পয়দা হলে, আমি আশা করতে পারি যে, আল্লাহ তাআলা আমার তাওবা কবুল করেছেন। আক্ষেপ পয়দা হতে হবে দিলের ভেতরে। আরেকটা হলো অনুশোচনা। এখন আপনি বলতে পারেন, ‘আক্ষেপ আর অনুশোচনা—দুইটা কি ভিন্ন জিনিস?’ আমি আলোচনায় আসছি এ বিষয়ে।
১. আক্ষেপ
আক্ষেপ কাকে বলে? লস বা ক্ষতির অনুভূতি দিলে আসলে তাকে আক্ষেপ বলে। একটা উদাহরণ দিই। মনে করুন, আপনি এক কোটি টাকা নিয়ে রওনা করেছেন। তো চৌরাস্তায় যাওয়ার পরে সেই টাকা চুরি হয়ে গেছে অথবা ছিনতাই হয়ে গেছে। এই টাকা হারানোর পরে আপনার দিলের ভেতরে আফসোস আসবে না? খারাপ লাগবে না? যখনি আপনার এই টাকার কথা মনে পড়বে, তখনই আপনার দিলের ভেতরে বড় আক্ষেপ পয়দা হবে। বড় আফসোস পয়দা হবে। আমি আক্ষেপের অর্থ বোঝানোর জন্য এই কথা বলছি। আপনার জীবনের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনার কথা যখন আপনার মনে পড়বে, তখন আপনি এই এক কোটি টাকা হারানোর কথাও বলবেন। যদি দশ বছর পরেও ওই চৌরাস্তা দিয়ে কোনোদিন যান, টাকা হারানোর কথা ঠিকই মনে পড়বে। মনে মনে বলবেন, 'এটাই তো সেই যায়গা, যে যায়গায় আমি এক কোটি টাকা হারিয়েছি! হায় হায়!'
দুনিয়াতে আমাদের অনেক প্রিয় মানুষ হলো বাবা-মা। কারও বাবা-মা মারা গেলে মানুষ আক্ষেপ করে, পেরেশানি করে, দুঃখ করে। কিন্তু কিছুদিন পরে এই দুঃখের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে। ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের কথা মানুষ ভুলে যায়। এমন হয়। কিন্তু টাকার কথা ভুলতে পারে না মানুষ। খুব কমই পারে। বাবা-মা হারানোর কথা যতটা মনে পড়ে, টাকা হারানোর কথা এরচেয়ে বেশি মনে পড়ে। মানুষ এটিকে নিয়ে আরও বেশি আক্ষেপ করে। এবং যে যায়গায় হারিয়েছে, তার স্মৃতিশক্তি ঠিক থাকলে, ওটা তার মনে পড়বে। আমার কথা আপনারা কি বুঝতে পেরেছেন?
তাহলে আমরা তাওবা কবুলের প্রথম বিষয়টা বুঝতে পারলাম। আমাদের দিলে আক্ষেপ থাকতে হবে।
মাত্র একটা কবীরা গুনাহ যদি আমি আল্লাহর কাছ থেকে মাফ করাতে না পারি, তাওবা যদি কবুল করাতে না পারি, তাহলে শরীয়তের ফয়সালা অনুযায়ী আমাকে জাহান্নামে যেতে হবে। এটাই ফয়সালা। তবে আল্লাহ যদি দয়া করে মাফ করে দেন, তাহলে ভিন্ন কথা। উদাহরণ সহজ।
যে ইবলিস অভিশপ্ত মালাউন হয়েছে, সে ইবাদত করেছে কত বছর? দুই-চার বছর? না হাজার হাজার বছর? কিন্তু গুনাহ করেছে কয়টা? মাত্র একটা। এই একটা গুনাহের কারণে সে কি জান্নাতে থাকতে পেরেছে, নাকি পারেনি? আদম আলাইহিস সালাম ভুলে একটা কাজ করেছেন, জান্নাতে চিরদিন থাকার জন্যই সেটা করেছেন, কিন্তু ওই কাজ করে কি জান্নাতে থাকতে পেরেছেন? পারেননি।
এটা আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, কবীরা গুনাহ করলে জান্নাতে থাকাও যায় না, আবার কবীরা গুনাহ নিয়ে জান্নাতে যাওয়াও যায় না; যদি আল্লাহ মাফ না করেন। কবীরা গুনাহ আল্লাহ আগে মাফ করবেন, এর পরে সে জান্নাতে যাবে। জান্নাতে কেবল পূতপবিত্র মানুষই যাবে। গুনাহমুক্ত পবিত্র মানুষ যাবে। তাহলে এটার পদ্ধতি কী? এর একটা পদ্ধতি হলো আমরা তাওবা করব, আর আল্লাহ তাওবাকে কবুল করে নেবেন।
তাহলে তাওবা কবুলের জন্য প্রথমেই কী খুঁজতে হবে আমাকে? মনে আছে আপনাদের? দিলের ভেতরে আক্ষেপ। অর্থাৎ, আমি যে বিশাল বড় ক্ষতি করে ফেলেছি, এটার অনুভূতি দিলের ভেতর বসাতে হবে। দিলের ভেতরে এই অনুভূতি আনতে হবে যে, হাশরের দিন আমার অবস্থা কী হবে? আল্লাহই জানেন, আমার তাওবা কবুল হয়েছে কি না! আমার নাম জান্নাতিদের কাতারে এসেছে কি না! এটা যখন জীবনে বারবার মনে পড়তে থাকবে, যখন এই অনুভূতি মনে করার চেষ্টা করব আমরা প্রাথমিক স্তরে, তখন আমরা আশাবাদী হতে পারব যে, আল্লাহ তাআলা হয়তো আমাদের তাওবা কবুল করেছেন।
অতএব, তাওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে একটা সিম্পটম বা আলামত আমি পেয়ে গিয়েছি। তা হলো, লস বা ক্ষতির অনুভূতি দিলের মধ্যে আসা যে, গুনাহ করে আমি কত বড় লস করেছি।
দেখুন, মানুষ গুনাহ জারি রাখতে পারে না বিভিন্ন কারণে। কেউ বয়সের ভারে গুনাহ করতে পারে না। কিন্তু যখন তার কোনো নাতি-নাতনি নাচছে, তখন সে বলে—‘আরে, তোমাদের মতো বয়স থাকতে আমিও কত নাচানাচি করেছি। এখন তো বুড়ো হয়ে গিয়েছি। শরীর সায় দেয় না।’ এমন মানুষ নেই? এমন বলিয়ে লোক নেই? এই যে সে বলছে, ‘আমিও কত নাচানাচি করেছি’—এটা কি আক্ষেপ, নাকি অক্ষমতা? অক্ষমতা। একজন বিবাহতে বিশাল বড় গান-বাজনার আয়োজন করছে, পাশে আরেক লোক আফসোস করছে। কারণ, সে একসময় বড়লোক ছিল, এখন গরিব হয়ে গেছে। একসময় অনেক টাকাপয়সা ছিল, এখন আর নেই। তো ওই বিবাহের অনুষ্ঠান দেখে সে আফসোস করছে। বলছে, ‘আমার ছেলের বিবাহতে আমি এরচেয়ে বেশি কিছু করতাম, যদি আমার টাকাপয়সা থাকত।’
সেও তো গুনাহ ছেড়েছে। কিন্তু গুনাহ ছাড়ার কারণ কী? গুনাহের আক্ষেপ দিলে নিয়ে? নাকি তার সামর্থ নেই গুনাহ করার, এই জন্য গুনাহ ছেড়ে দিয়েছে? এই লোক আল্লাহওয়ালা না। সে তাওবাকারী না। গুনাহের স্বাদ তার দিলের ভেতরে এখনো আছে। এটা আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে। আমাদের অনেকে গুনাহ ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু গুনাহের স্বাদ এখনো ছাড়তে পারিনি। গুনাহের কথা শুনলে-বললে এখনো মজা লাগে। অথচ দেখুন, এক কোটি টাকা কেউ হারালে, তার ওই কথা মনে পড়লে দুঃখ লাগে। দুঃখ আর মজা এক? দুঃখ আর স্বাদ এক? এটা আসতে হবে তাওবার ক্ষেত্রে। আমার তাওবা কবুল হয়েছে কি না, এর এক নম্বর শর্ত হলো আক্ষেপ। এক কোটি টাকা হারালে যে পরিমাণ আক্ষেপ আমার দিলে হয়, গুনাহ করার দ্বারা এরচেয়ে শত শত গুণ বেশি আক্ষেপ আসতে হবে। যদি আসে আশা করা যায় যে, তাওবা কবুল হওয়ার প্রথম আলামত আমার ভেতরে আছে।
কিন্তু আরেকজনকে কনসার্টের আয়োজন করতে দেখে যদি আমি আক্ষেপ করে বলি—‘আজ যদি আমার টাকাপয়সা থাকত, তবে আমিও এই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম! সে তো ঢোল-তবলা এনেছে, আমি আনতাম ড্রাম।’ তাহলে আমি যদিও ড্রাম আনিনি, কিন্তু ড্রাম বাজানোর সমান গুনাহ আমার আমলনামায় লিখিত হয়ে গেছে। একবারে স্পষ্ট তিরিমিজির বর্ণনা। রাসূল বলেছেন, ‘দুই শ্রেণীর মানুষ জান্নাতি, আর দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামি। [১০৮]
দুই শ্রেণীর মানুষ জান্নাতি। তারা কারা? একজন—যে তার সম্পত্তি অকাতরে আল্লাহর জন্য ব্যয় করেছে। সে এই টাকা দিয়ে জান্নাত কামাই করেছে। তার পাশে আরও একজন ভদ্রলোক, গরিব মানুষ—সেও অকাতরে দান করে। তার দিলের ভেতরে এই স্বপ্ন—আমার যদি টাকা থাকত, আমিও ওই ব্যক্তির মতো সব বিলিয়ে দিতাম আল্লাহর পথে। একবারে সাচ্চা দিলে সে এই কথা আল্লাহকে বলেছে। এরপরও পকেটে ১০০ টাকা থাকলে ১০ টাকা দিয়ে দেয়, ৫০ টাকা দিয়ে দেয়। তাহলে একজন কোটি কোটি টাকা দান-খয়রাত করেছে, আরেকজনে স্বপ্ন লালন করেছে আমার টাকা থাকলে আমিও এভাবে দিয়ে দিতাম। আল্লাহ বলছেন, দুইজনকে আমি জান্নাতে একই স্তরে রাখব। কারণ, তার কাছে টাকা না থাকলেও তার স্বপ্ন আছে দান করার। তামান্না আছে দিলের ভেতর। ওই তামান্নার কারণে তার স্তর ওই যায়গায়। আরেক ব্যক্তির উদাহরণ দিই। সে তার পাশেই কোনো ফুর্তিবাজ লোককে দেখে বলে, আমারও যদি এই পরিমাণ টাকা থাকত, তবে আমি ওর চেয়েও বেশি উড়াতাম। ওর চেয়েও বেশি মস্তি করতাম। তো, এই লোকের গুনাহ ওই ফুর্তিবাজ লোকের সমান। দুজন জাহান্নামে একই স্তরে থাকবে। যদিও সে আমোদ-ফুর্তি করেনি, কিন্তু তার দিলের ভেতরে একটা স্বপ্ন আছে করার। কথা বুঝেছেন কি?
এজন্য তাওবা কবুল হওয়ার এক নম্বর শর্ত হলো—গুনাহের কথা মনে হলে দিলটা আঁতকে উঠতে হবে। কোটি টাকা হারালে যেভাবে দিল আঁতকে ওঠে, ওভাবে! এভাবে গুনাহের কথা মনে হলেও বলতে হবে—আরে! আমার তো জান্নাতে যাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু এই গুনাহের কারণে এই বাধা তৈরি হয়েছে। যদি আমার দিলের ভেতর গুনাহের ব্যাপারে, গুনাহের ক্ষতির ব্যাপারে এই অনুভূতি এবং আক্ষেপ আসে, তাহলে আমার তাওবা কবুলের একটা বড় আলামত পাওয়া গেছে।
২. অনুশোচনা
আমি দুইটা বিষয়ের কথা বলেছিলাম। একটা হলো আক্ষেপ, আরেকটা হলো অনুশোচনা। আক্ষেপের পরে আসে অনুশোচনা। আক্ষেপ আসার পরে মোটামুটি আশাবাদী যে, তাওবা কবুল হয়েছে। এবার 'অনুশোচনা' বিষয়টা বুঝুন।
আল্লাহ রব্বুল ইযযাত আমার চোখ, হাত, পা, নাক, কান ও আমার জন্য সারা দুনিয়াকে সাজিয়েছেন। আমাকে সিজদা না করার জন্য ইবলিসকে আল্লাহ তাআলা জান্নাত থেকে পুরোপুরি বের করে দিয়েছে। আর আমিই যদি ইবলিসের গুনাহগুলো করি, আল্লাহকে বাদ দিয়ে ইবলিসের কথা মানি, ইবলিসের মতো আচরণ করি, কবীরা গুনাহে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি, তবে আল্লাহর সামনে আমি চেহারা দেখাব কিভাবে? দিলের ভেতর এমন কিছু জাগ্রত করার নামই অনুশোচনা। অনেক সময় মানুষ অপরাধ করার পরে, অপরাধ মাফ চাওয়ার পরেও একটা কাচুমাচু ভাব থাকে না? তো, আল্লাহর সামনে এমন কাচুমাচু ভাব থাকতে হবে। আমি তাঁর সামনে চেহারা দেখাব কী করে? আল্লাহ তাওবার তাওফীক দিয়েছেন। আক্ষেপও আছে। কিন্তু আল্লাহর সামনে আমি এই চেহারা নিয়ে দাঁড়াব কিভাবে, এই অনুভূতি নিয়ে দুনিয়া থেকে মরতে হবে। যদি এই দুই অবস্থা থাকে, তাহলে আমি আশাবাদী-আমার তাওবা কবুল হয়েছে।
সহিহ মুসলিমের একটা হাদীস শোনাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, 'আত তাওবাতু আন নাদাম।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
আমি আমার পিতার সাথে আবদুল্লাহ (রাঃ) -এর নিকট উপস্থিত হলাম। আমি তাকে বলতে শুনলাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ "অনুতপ্ত হওয়াই তওবা”। আমার পিতা তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি নিজে কি নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন যে, "অনুতপ্ত হওয়াই তওবা”? তিনি বলেন, হাঁ। [১০৯]
তোমার তাওবা হয়েছে কি না-সেটা বোঝার শর্ত হলো, তোমার ভেতর 'নাদাম' থাকা। আরবিতে নাদাম শব্দের দুইটা অর্থ। একটা হলো আক্ষেপ, আরেকটা হলো অনুশোচনা। আক্ষেপের উদাহরণ আমি বুঝিয়েছি। হৃদয়ে আফসোস থাকা: 'আহারে! ওর সাথে চলে আমার জীবনটা বিশাল বড় লসের ভেতরে ফেলে দিয়েছি। আমি তো জান্নাতে যাব, ওর সাথে চলার কারণে জাহান্নামে নাম লিখিয়ে ফেলেছি। ওই যায়গায় যাওয়ার কারণে আমার গুনাহ হয়েছে। ওই জায়গা দেখলে আমি আঁতকে উঠি।' দ্বিতীয় হলো, অনুশোচনা। 'আল্লাহকে আমি চেহারা দেখাব কী করে'-দুনিয়া ত্যাগ করা পর্যন্ত হৃদয়ে এই অনুভূতি ধারণ করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন গোশত খাচ্ছিলেন। আমরা গোশত খেতে খেতে কী গল্প করি?
'আরে, গোশতের এ কী স্বাদ! কোন কসাই থেকে এনেছিস? রান্না তো বেশ মজার হয়েছে।' এই সমস্ত কথাবার্তাই বলি। কিন্তু গরুর গোশতকে যিনি সুস্বাদু বানিয়েছেন, উনাকে মাঝখান থেকে ভুলে গিয়েছি। উনাকে মনে রাখতে হবে। কাকে? যিনি এই গোশতের মধ্যে স্বাদ দিয়েছেন। আমার রব, আমার মুনিব, তাঁকে মনে রাখতে হবে। তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোশত খাচ্ছিলেন। রানের গোশত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোশত কামড় দিয়ে খাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, 'আনা সাইয়েদুন নাস ইয়াওমাল কিয়ামাহ।' অর্থাৎ, 'আমি কিয়ামতের দিন সকল মানুষের সর্দার হব।' এরপর তিনি সাহাবাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি জানো, সেটা কিভাবে?'
খাবার খাচ্ছেন আর দ্বীনি কথা বলছেন। অনেকে বলে, খাবার খাওয়ার সময় কথা বলা নিষেধ। অথচ নবিজি কত লম্বা-চওড়া ঘটনা বর্ণনা করেছেন। খাওয়ার সময়টা দ্বীনি কথাবার্তার জন্য বেশ উপযুক্ত। খাওয়ার সময় মানুষের সাথে কথা বলতে এমনিতেই ভালো লাগে। আপনি দেখবেন, মানুষের যত গল্পগুজবের একটা জায়গা হলো চা স্টল। চা খায় আর গল্প করে। কিন্তু গল্প কেমন হওয়া দরকার-সেটা কিন্তু ঠিক করা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের দৃশ্য সামনে এনেছেন। বলছেন, 'জানো, আল্লাহ তাআলা আমাকে নেতা কী করে বানিয়ে দেখাবেন?' সাহাবিরা বলছেন, 'আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি বলুন।'
তো, খানাও চলছে, আবার সাথে সাথে আরেক খাবারের মজাও দিলের ভেতরে আসছে। জান্নাতি খাবারের মজা। তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন-আল্লাহ তাআলা সব মানুষকে একটা উঁচু জায়গায় জমা করবেন। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দেবে, সবাই তা শুনতে পারবে। এরপর সবাই একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাইকে দেখতে পাবে। এমন হবে না যে, কেউ কাউকে দেখবে না। সবাই সবাইকে দেখবে, এই কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। সবাই সবার আওয়াজ শুনবে। আবার সবাই সবাইকে দেখবে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, 'তখন হালত এমন হবে যে, সূর্য একেবারে মানুষের কাছাকাছি চলে আসবে। অবস্থা এমন ভয়াবহ হবে যে, তারা এটা সহ্য করতে পারবে না।'
একবারে সহ্যের বাইরে চলে যাবে অবস্থা। মানুষ বলতে থাকবে-ফয়সালা যা হওয়ার হোক। তবুও এই অবস্থা থেকে নিস্তার চাই। এই অবস্থা থেকে মুক্তি চাওয়া দরকার। আল্লাহর কাছে অন্তত হিসাব-নিকাশ শুরুর আবদার করা দরকার। হিসাব নিকাশ যা হওয়ার, তা-ই হোক। কিন্তু এই অবস্থা সহ্য করতে পারছি না। তখন একজন আরেকজনকে বলবে, আমাদের এই করুণ পরিণতি তোমরা অনুভব করছো না? তাড়াতাড়ি এমন একজনকে তালাশ করো, যে আল্লাহকে গিয়ে এই কথা বলবে যে, 'আল্লাহ, আপনি হিসাব-নিকাশ শুরু করুন।' কারণ আল্লাহ তাআলা আজকে যত রাগান্বিত হয়েছেন, আর কোনোদিন এমন রাগান্বিত হননি। ভবিষ্যতেও হবেন না। এই অবস্থায় আমাদের কিছু বলার সামর্থ্য নেই। তাই এমন নেককার লোকদের খুঁজে বের করো, যাদের কথা আল্লাহ তাআলা আমলে নেবেন। তাড়াতাড়ি তালাশ করো।
এরপর একজন আরেকজনকে বলবে, 'চলো, আমরা আদমের কাছে যাই। কারণ আদম আলাইহিস সালাম হলো আবুল বাশার।'
আমাদের অনেকের নাম আবুল বাশার আছে। আবুল বাশার মানে হলো মানব-জাতির পিতা। এটা তাঁর উপাধি, লকব। তো মানুষ বলবে, চলো, আমরা সবাই মিলে আদমের কাছে যাই। আদম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলা নিজ পছন্দমতো বানিয়েছেন। এরপর তাঁর ভেতরে নিজে রুহ ফুঁকে দিয়েছেন। ফেরেশতাদেরকে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছেন।'
সবাই এই প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করবে। এরপর আদম আলাইহিস সালামের কাছে আসবে। আসার পরে বলবে, 'আপনি একটু দয়া করে আপনার রবের কাছে আমাদের ব্যাপারে সুপারিশ করুন, যাতে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়।'
আদম আলাইহিস সালাম এই কথা শোনার পরে বলবেন, 'দেখো, আজকে আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন, যা আগেও কখনো হননি, পরেও আর কখনো হবেন না। আমার আজকে অনুশোচনা আসছে দিলের ভেতরে। আমি তো পেরেশান। ওই যে আল্লাহ তাআলা আমাকে একটি গাছের কাছে যেতে বারণ করেছিলেন। আমি তো ওই গাছের কাছে গিয়ে ফেলেছি। এখন আমি এই চেহারা নিয়ে আল্লাহর কাছে যাব কী করে! নাফসি নাফসি!'
আদম আলাইহিস সালাম দুনিয়াতেই থাকতেই আল্লাহ এই ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, 'তোমার তাওবা কবুল হয়েছে।' পবিত্র কুরআনে ঘোষণা এসেছে—
فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
'অতঃপর আদম তার রবের পক্ষ থেকে কিছু বাণী পেল, ফলে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী, অতি দয়ালু।[১১০]
আল্লাহ নিজেই আদমকে তাওবার বাক্য শিখিয়ে দিয়েছেন। আদম আলাইহিস সালাম ওই শব্দ বলার পর তিনি তাওবা কবুল করেছেন।
তাওবা কবুলের ঘোষণা দেওয়ার পরও আদম আলাইহিস সালাম যেতে চাইবেন না কেন? কারণ, আদম আলাইহিস সালামের দিলে অনুশোচনা থাকবে সেদিন। 'আল্লাহ তাআলা আমাকে নিজ হাতে পছন্দসই করে বানিয়েছেন, রুহ ফুঁকে দিয়েছেন, আমাকে নিজে শিক্ষা দিয়েছেন, ফেরেশতাদের দ্বারা সিজদা করিয়েছেন। এরপরও আমি নিষিদ্ধ গাছের কাছে চলে গিয়েছি। এখন এই চেহারা নিয়ে আমি আল্লাহর কাছে যাব কী করে! নাফসি নাফসি! আমি তো নিজের ব্যাপারেই আক্ষেপ করছি। আমার কী হবে! যদি আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করে বসেন, "হে আদম! তুমি এই কাজ কেন করেছিলে?” একজন একজনকে মাফ করার পরেও তো জিজ্ঞেস করতে পারে-তুমি তো একদিন এমন এমন করেছিলে আমার সাথে!'
অনেকে সময় স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয়। এরপর রাগ কেটে যাওয়ার পর বলে—'তুমি কেন এমনটা করলে?'
আদম (আ)-এর মনে হচ্ছিল, 'এখন এত মানুষের সামনে যদি আল্লাহ আমাকে ওই কথা জিজ্ঞেস করেন? আমি এই চেহারা নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারব না।'
আদম আলাইহিস সালামের দিলে যে অনুভূতি, আমার দিলে সেই অনুভূতি আছে কি?
এটা হলো অনুশোচনা। এই চেহারা নিয়ে আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াব কী করে! এরপর আবার সবাই মিলে বলবে, 'এত ভয়াবহ অবস্থা তো আমরা সইতে পারছি না। এ অবস্থা থেকে আমরা মুক্ত হতে চাই। আপনি বলুন, কার কাছে যাব?'
তো আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, 'তোমরা এক কাজ করো, নূহের কাছে যাও।'
আদম আলাইহিস সালাম বোঝাচ্ছেন, নূহের কাছে গেলে আশা করি ফলাফল হবে। প্রথম রাসূল হলো নূহ আলাইহিস সালাম। আদম আলাইহিস সালাম প্রথম রাসূল না। আদম আলাইহিস সালাম প্রথম নবি। নবি আর রাসূল এক না। আদম আলাইহিস সালামের সময় এত বেশি ফিতনা-ফাসাদ ছিল না। সব তো তাঁর নিজের সন্তান। এদের কাছে দাওয়াত দেওয়ার তো দরকারই নেই। এদেরকে তো প্রেশার দিয়েই ঠিক করে দিতে পারবেন। এদের আবার বলা লাগবে নাকি? যাকে থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করা যায় না, তাকে গিয়ে বলতে হবে-ভাইজান, আল্লাহকে মানেন একটু। কিন্তু সন্তানকে তো শাসন করা যায়। আপনারা না করলে না করেন। কিন্তু করা যায় তো।
যখন বাবারা নিজের সন্তানকে শাসন করা ছেড়ে দিয়েছে, তখন থেকে সন্তানরা বাবাকে শাসন করা শুরু করেছে। যে যুগের বাবারা সন্তানকে অন্যায়ের কারণে থাবড়াতে পারত, ওই যুগের সন্তানরা ঠিকই মাথা নিচু করে হককথা মেনে নিত। বাবার সামনে কটুকথা বলার হিম্মতও পেত না। বিশ্বাস না হলে আপনাদের বাবাদের খবর নিয়ে দেখেন। বেশি দূর যাওয়া লাগবে না। ভালোমতো শাসন করতে পেরেছে যে বাবা-মা, ওই সন্তান তত বেশি অনুগত হয়েছে। আমাদের একটা মাদ্রাসার ছাত্র বেশ ভদ্র। একজন জিজ্ঞেস করছে, 'এই ছেলেটা এত ভদ্র কেন?' আমি বললাম, 'খোঁজ নিয়ে গিয়ে দেখো, এর বাবা-মা দুইজন অথবা কোনো একজন অনেক কড়া। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। এই কারণে ও এত ভদ্র।' পরে খোঁজ নিয়েছে। আসার পর আমাকে রিপোর্ট দিয়েছে। বলেছে, 'আপনার কথা শতভাগ সঠিক।'
আগে সন্তানরা উলটাপালটা করার সাহসই পেত না। একেবারে উপস্থিত শাসন করে ঠিক করে দিত বাবা। রাগ করবেন না আপনারা। যতদিন পর্যন্ত পিতা-মাতা সন্তানকে শাসন করেছে, ততদিন পর্যন্ত পিতা-মাতা সন্তানের সর্বোচ্চ ইজ্জত পেয়েছে। ওই পিতামাতা হয়তো এত আদর জানত না। আদর কাকে বলে, আদর কিভাবে করে, সোনা-ময়না-টিয়া-পাখি—এগুলো কিছু বলতে জানত না। কিন্তু দুইটা থাপ্পড় দিত, সব ঠিক হয়ে যেত। তখন সন্তানরা শতভাগ ইজ্জত করত বাবাকে। আর এখন সোনা-ময়না-টিয়া বলেও ভাত খাওয়ানো যায় না। ওই সময় খাবার না খেয়ে কোনো উপায় ছিল না।
আপনারা আমার কথায় রাগ করবেন না। আপনি অনুশাসন ছাড়লে কী হবে, সন্তান ছাড়েনি। সন্তান ছোটকাল থেকেই দেখেছে—সে যখন একটা থাপ্পড় দেয়, তো আরেকটা গাল আপনি পেতে দেন আরেক বার থাপ্পড় খাওয়ার জন্য। থাপ্পড়ের অনুশীলন তো আপনিই করিয়েছেন। আল্লাহ মাফ করুন! লম্বা-চওড়া শরীয়তবিরোধী কাজ চলে সন্তানের সামনে। মা যদি শাসনের কারণে মারে, তো বাবা বলে—'তোমার খবর আছে। কেন হাত তুললে!' অমনি ঠাস করে মাকে একটা থাপ্পড় দেওয়ার মতো অভিনয় করে। এতে সন্তান বোঝে যে, 'অপরাধী হলো মা। আমিই ঠিক আছি।' তো অপরাধী ওর মা, ও ঠিক আছে। আপনি ওকে কী শেখালেন এটা? আপনি কি ইজ্জত দেওয়া শিখিয়েছেন? তাহলে ও কেন আপনাকে ইজ্জত দেবে? শরীয়তে এটা নিষেধ। আপনি কেন করলেন এই কাজ? যা-ই হোক, আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন।
এরপর সবাই মিলে যাবে নূহ আলাইহিস সালামের কাছে। কারণ নূহ আলাইহিস সালাম হলেন প্রথম রাসূল। যিনি মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত, ঈমানের দাওয়াত নিয়ে গেছেন। এজন্য নূহ আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে সবাই মিলে এই কথা বলবে যে, 'আপনি তো প্রথম রাসূল। আদম আলাইহিস সালাম পাঠিয়েছেন আপনার কাছে। আমাদের এই করুণ অবস্থায় একটু আল্লাহর কাছে গিয়ে সুপারিশ করুন।'
নূহ আলাইহিস সালাম তখন বলবেন, 'ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি। আল্লাহর কাছে আমার এই চেহারা দেখানোর হিম্মত নেই।'
নূহ আলাইহিস সালাম আক্ষেপ করে বলতে থাকবেন, 'আমার এই চেহারা দেখানোর সুযোগ নেই। আল্লাহ তাআলা আমার একটা দুআ কবুল করবেন, এই কথার ওয়াদা দিয়েছেন। কিন্তু আমি ওটা দুনিয়াতে করে ফেলেছি। এখন তো আমার কোনো সুযোগ নেই। এখন আমি কী বলব আল্লাহকে? আর আমি আমার ছেলেকে প্লাবন থেকে বাঁচানোর সুপারিশ করেছিলাম। ওই কথায় আল্লাহ আমার ওপর নারাজ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, "যে সন্তান আমাকে মানে না, ওই সন্তান তোমার হতে পারে না।" আমার ওই রাগের কথা মনে আছে। এখন আল্লাহর কাছে গিয়ে কথা বলার কোনো হিম্মত নেই। আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারব না। আমি তো নিজেকে নিয়েই চিন্তিত। তোমরা দয়া করে আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারও কাছে যাও। নাফসি, নাফসি!'[১১১]
এই হাদীস আরও লম্বা। তাহলে আমারা মূল যে কথা আলোচনা করছিলাম- তা হলো, আমাদের পেছনের গুনাহ ছাড়তে হবে। ভবিষ্যতে গুনাহ না করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। হাদীস থেকে আমরা দুটো আলামত উল্লেখ করলাম তাওবা কবুলের ব্যাপারে-আক্ষেপ ও অনুশোচনা
তাহলে সফল তাওবা কোনটা?
প্রকৃত তাওবা, বাস্তব তাওবা হলো 'আন-নাদাম'। নাদামের দুইটা অর্থ। একটা হলো আক্ষেপ, আরেকটা হলো অনুশোচনা।
'একটা কবীরা গুনাহ করে আমি যে কত বড় ক্ষতি করছি নিজের, তার ব্যাপারে আক্ষেপ থাকতে হবে। আমার নাম জান্নাতির খাতায় ছিল। এখন জাহান্নামিদের তালিকায় আমার নাম উঠে গেছে। আমার নাম আল্লাহ তাআলা ইবলিসের সাথে লিখে দিয়েছেন।' গুনাহের কারণে এই ধরনের আক্ষেপ আসতে হবে দিলের ভেতর।
এরপর অনুশোচনা আসতে হবে- 'আল্লাহর সামনে এই চেহারা নিয়ে কী করে দাঁড়াব! আল্লাহ আমাকে ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আর আমিই কিনা ইবলিসের চেয়েও বেশি গুনাহ করছি! আমি আল্লাহর সামনে মুখ দেখাব কী করে!'
এই ধরনের আক্ষেপ ও অনুশোচনা নিয়ে যদি আমি দুনিয়া থেকে বিদায় নিই, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা আমার তাওবা কবুল করে নেবেন।

টিকাঃ
[১০৮] তিরমিজি
[১০৯] আহমাদ: ৩৫৫৮, ৪০০৪, ৪১১৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫২; সহীহ
[১১০] সূরা আল-বাকারা, ২: ৩৭।
[১১১] সহিহ মুসলিম, ৩৭৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px