📄 বান্দার মালের হক নষ্টকারীর তাওবা
এবার আমাকে তালিকা তৈরি করতে হবে, আমি কার কত মাল নষ্ট করেছি। এরপর আমার জায়গা-জমিন-সব দিয়ে হলেও আমি তার জরিমানা দিয়ে দেবো। এখন আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
মালের হকের ব্যাপারটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাল সাধারণত আপনজনরাই বেশি নষ্ট করে। বাবা তার মেয়ের হক নষ্ট করে। গ্রামে এটা একেবারে স্বাভাবিক। শহরেও স্বাভাবিক কি না, সেটা জানি না। আপনারা ভালো বলতে পারবেন।
মেয়ের হক নষ্ট করে বাবা। মেয়েকে কোনোরকম একটা বুঝ দিয়ে সম্পত্তি সব ছেলেদেরকে দিয়ে যায়। শরীয়তে সে তো বাবা হওয়ারই যোগ্য না। কখনোই না। সন্তানাদির ব্যাপারে আমি কাউকে প্রাধান্য দিচ্ছি না। কোন সন্তান লালন-পালন করলে আপনি জান্নাতে যাবেন, এটা আগে বুঝুন। হাদীসে স্পষ্ট আছে, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা শুনিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যার তিন জন মেয়ে আছে, সে ওই মেয়েদেরকে দ্বীন শিখিয়েছে এবং দ্বীনি শিষ্টাচারের ওপর বড় করেছে, বড় করার পর দ্বীনদার পুরুষের কাছে ওই মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে-সেই লোকটা জান্নাতি।'
এরপর আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করেছেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! দুটো মেয়ে হলে?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'দুটো হলেও যদি এভাবে পালন করে, দ্বীন শিক্ষা দেয় এবং দ্বীনদার পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেয়। এ পর্যন্ত সে যদি ইখলাসের সাথে করে, তবুও সে জান্নাতি।' আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! যার একটা মেয়ে আছে?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'একজন হলেও জান্নাতে যাবে।[৯৭]
ছেলেকে নেককার বানালে অনেক বড় সওয়াব। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতি হওয়ার ব্যাপারে সরাসরি সুসংবাদ দিয়েছেন মেয়েদের বেলায়। মেয়েদেরকে দ্বীন শেখালে, দ্বীনদার বরের সাথে বিয়ে দিলে, সেই পিতা জান্নাতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা বলে দিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেও মেয়েদের পিতা। তাঁর চার মেয়ে ছিল। তাঁর ছেলেদের মধ্যে একজনও বেঁচে থাকেনি।
আর আমরা? যে কন্যার বাবা জান্নাতে যাওয়ার নিশ্চয়তা পেত, ওই বাবা মেয়ের হক নষ্ট করে জাহান্নামে যাচ্ছে। মেয়েকে উলটাপালটা বুঝ দিচ্ছে। ভাই তাকে ঠকাচ্ছে। সম্পদ নিতে আসলে ওর সাথে আর কোনো কথা বলে না ভাই। জীবনের জন্য সব সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। অথচ ভাইয়ের বলার দরকার ছিল, 'বোন আমার! তোর সম্পদ তুই নিতে না চাস, কিন্তু আমরা দিতে চাই। দয়া করে তোর সম্পদটা নিয়ে যা।'
এভাবে আজ স্বামী তার স্ত্রীর হক নষ্ট করছে। মোহর দিচ্ছে না। মোহর যে দেওয়া উচিত, এই অনুভূতিও দিল থেকে সরে গিয়েছে। কিন্তু বিয়ের সময় মানুষকে দেখিয়ে মোহরটা নির্ধারণ করেছে। যেটা পারবে না, ওটা নির্ধারণ করেছে। পাঁচ লাখ দেবো, দশ লাখ দেবো। কেন ভাই? এত নির্ধারণ করছো কেন? কে বলেছে এটা নির্ধারণ করতে? মোহর না দিয়ে তো স্ত্রীর কাছে যাওয়াই জায়েজ নেই-যদি স্ত্রী অনুমতি না দেয়। কিন্তু মারা যাওয়ার আগেও ওই মোহর আর দেওয়া হয়ে ওঠে না। মারা যাওয়ার সময় সন্তানদেরকে ওসিয়তও করে না যে, 'আমার মোহরটা দিয়ে দিস তোর মাকে।' আপনিও বুড়ো হয়ে মারা যাচ্ছেন, আরেকজনও বুড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ওই টাকা দিয়ে কী করবে? এখন তো খেতেও পারে না ঠিকমতো, পরতেও পারে না। যখন শখ ছিল, ওই সময় শখ পূরণ করতে পারেনি। আর এখন আপনি বুড়ো অবস্থায় দিচ্ছেন তার মোহর? ওগুলোতে আবার ছেলে-মেয়েরা ভাগ বসিয়েছে। নাতি-নাতনিও ভাগ বসিয়েছে। আশ্চর্য কথা! শরীয়ত আপনার স্ত্রীকে যেটা দিয়েছে, আপনি তার কাছে যাওয়ার আগে ওটা পরিশোধ করে দেবেন।
এভাবেই, আজকাল আপনজনরা মালের ব্যাপারে আত্মীয়কে ঠকাচ্ছে। ভাই ভাইকে ঠকাচ্ছে, আর স্বামী স্ত্রীকে ঠকাচ্ছে, মেয়েদেরকে ঠকাচ্ছে তাদের পিতা। এই হক না দেওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের ফিতনা শুরু হয়েছে। এখন বোন বলছে, 'মাফ করে দিয়েছি।' স্ত্রী বলছে, 'আমিও মাফ করে দিয়েছি।' না, এটা মাফ হয় না শরীয়তে। ভালো করে বুঝে নিন, এই মাফ মাফ নয়।
তাহলে মাফ কাকে বলে? আপনি আপনার বোনকে পুরো জমি বুঝিয়ে দিলেন অথবা জমির প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দিলেন। আপনার স্ত্রীকে মোহরানা পুরোপুরি খামে দিয়ে দিলেন। অথবা তার একাউন্টে জমা করে দিলেন। জমা করে দেওয়ার পরে, মালিকানায় আসার পরে যদি তারা বলে-এগুলো আপনি নিয়ে যান, আমার আর লাগবে না; তাহলে হক আদায় হবে। এটাই মাসআলা। এর আগ পর্যন্ত মাফ নয়। স্ত্রী এখন আপনার অধীনে আছে, সে তো বলবেই নিয়ে যান। তার হস্তগত হওয়ার পর সে যদি ফিরিয়ে দেয়, তবে বুঝবেন মাফ হয়েছে।
ধরুন, আপনি আপনার বোনকে ওয়ারিশ পরিমাণ সম্পদ লিখে দিয়েছেন বা সম্পদ পরিমাণ টাকা দিয়ে দিয়েছেন। টাকা হাতে যাওয়ার পর সে যদি ফিরিয়ে দেয়, তবেই কেবল মাফ। কিন্তু কয়জনে টাকা ফেরত দেয় আল্লাহই ভালো জানেন! টাকা যাওয়ার আগে সব দিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু টাকা হাতে গেলে দিয়ে দেওয়া যায় না। তাহলে টাকা না দিয়েই আপনি কিভাবে বুঝলেন যে, সে মাফ করে দিয়েছে? তাকে তো তার মালিকানা বুঝিয়েই দেননি। অথচ বলছেন-'মাফ করে দিয়েছে।' আপনি এই মাফ নিয়ে বসে থাকুন। এই মাফ মাফ নয়।
আমি আমার বোনের হক নষ্ট করছি, আমার স্ত্রীর হক নষ্ট করছি, আমার মেয়ের হক নষ্ট করছি। আমি তো ভাই/স্বামী/পিতা হওয়ার যোগ্যতাই রাখি না। মালের কথা উঠলেই লোকে বলে- 'ওরা তো মাফ করে দিয়েছে।' অথবা 'তাওবা করে নিয়েছি।'
অনেকেই চাঁদাবাজির টাকা লুটেপুটে খায়। অথচ রাস্তাঘাটে কত গাড়ির থেকে প্রতিদিন চাঁদা উঠিয়েছে জীবনে, জানেও না। তাহলে সে কিভাবে মাফ পাবে? কয়জনের থেকে মাফ চাইবে? কত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, জানেই তো না সে। এখানে শুধু টাকা নেয়নি, জোর খাটিয়ে নিয়েছে, ক্ষমতা খাটিয়ে নিয়েছে। ও যে কত টাকা দিয়ে ওর পেট পুরেছে, তা তো জানে না। কিয়ামত পর্যন্ত এটা মাফের কোনো সুযোগ নেই। ওর বিরুদ্ধে কিয়ামতের দিন কত নালিশ যে দাঁড়াবে, ও নিজেই জানে না। মালের হকের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। আল্লাহ কসম! এই ব্যাপারে কোনো সাহাবা, কোনো তাবিয়ি মাফের কথা বলেনি। অন্য কারও মাল আত্মসাৎ করে মসজিদে দান করে মাফ পাওয়ার সুযোগ নেই। না, সবার আগে পাওনাদার ব্যক্তির কাছে গিয়ে বলতে হবে- 'হে ভাই! আমি জোর খাটিয়ে, অন্যায়ভাবে তোমার থেকে টাকা নিয়েছি। আমাকে মাফ করো।'
টাকা ফিরিয়ে দিয়ে এরপর আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলে লাভ আছে। এর বাইরে হজ করলেও মাফ নেই। মাল পাওনাদারের কাছে ফেরত না দিলে কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার বিরুদ্ধে অনেক ফরিয়াদি থাকবে। তার বিরুদ্ধে নালিশ জানাবে অনেকেই।
মাল বোঝার বিষয়। বাড়ি বানাতে গেলে আসে এলাকার ছেলেরা। তারা বলে, 'ভাই! একটু মিষ্টি খাব।' ও নাকি মিষ্টি খাবে! তুমি তো মল খাচ্ছ, মিষ্টি না! এরচেয়ে বড় গুনাহ হতে পারে না। এটা এত বড় অন্যায়, এত বড় গুনাহ যে, তার ব্যাপারে হাদীসে ধমকি আছে। তার ঈমানই থাকতে পারে না এই অবস্থায়। আর সে নাকি মিষ্টি খেতে এসেছে!
ওই লোকটার একটা বাড়ি করতে জীবন চলে যাচ্ছে, আর তুমি এসে উলটো চাঁদাবাজি করছো। দশ লাখ টাকা দিতে হবে, পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে...। কিয়ামতের দিন এগুলো সব আগুন হবে, আগুন পেটে নিয়ে উঠবে তোমরা। এজন্য ঘরে বসে তাওবা করলে কাজ হবে না। হকদারের কাছে হক পৌঁছে দিয়ে, তার কাছে গিয়ে মাফ চাইতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই কেবল রেহাই আছে। না হলে কোনো মাফ নেই। এটাই মাসআলা। এই ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন, 'যে তার ভাইয়ের হক নষ্ট করেছে, সে তার থেকে পুরোপুরি মাফ চেয়ে নিতে হবে। এর আগে মাফ নয়।' নচেৎ হজ, উমরা, নামাজ-কোনো কিছু কাজে আসবে না।[৯৮]
ভাই আমি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলিনি। এটা আঘাতের মাসআলা না। বাস্তব বিষয়। আপনি মুসলিম দাবি করে কিভাবে আরেকজনের হক নষ্ট করেন? আপনি তো জানেন-এর বদলায় কিয়ামতের দিন পেট ভরে আগুন নিয়ে আসবেন। এটা কুরআনের আয়াত।
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتْلَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
'নিশ্চয় যারা ইয়াতিমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে। আর অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে।'[৯৯]
যে ব্যক্তি আরেক জনের মাল অন্যায়ভাবে খায়, সে আসলে আগুন খেলো। কুরআনের স্পষ্ট শব্দ। অথচ তার কোনো পেরেশানি নেই। রাস্তা-ঘাটে, অলিতেগলিতে আজ এগুলো চলছে। এটার বিনিময়ে হজ, উমরা করলে কোনো লাভ হবে না। এটার তাওবা হলো, যার কাছে যত টাকা খেয়েছে দিয়ে আসতে হবে। এরপর জোরপূর্বক খাওয়ার কারণে মাফ চাইতে হবে তার কাছে। যদি মাফ হয়, তখন আল্লাহর কাছে মাফ চান। আল্লাহ আমাদের বোঝার, আমল করার তাওফীক দান করুন。
টিকাঃ
[৯৭] মুসনাদে আহমাদ: ১৪২৪৭; সহীহ
[৯৮] মুসলিম ১৩৭, নাসায়ী ৫৪১৯, আবু দাউদ ২৩২৪।
[৯৯] সূরা নিসা, ৪: ১০
📄 মুমিনের ইজ্জত নষ্টকারীর তাওবা
মানুষকে অপমান করা বলতে কী বোঝায়, আমরা সকলেই তা জানি। অপমান সরাসরি হতে পারে, পেছনেও হতে পারে। গালি দেওয়া, বাবা-মা তুলে কথা বলা, টিটকারি করা, তিরস্কার করা, উপহাস করা-এই সবগুলোই হচ্ছে মানুষের ইজ্জতের ওপর আঘাত। এই আঘাত মানুষকে সামনাসামনিও দেওয়া যায়, আবার পেছনে পেছনেও দেওয়া যায়। পেছনে যে বদনাম করা হয়, ওটাকে গীবত বলে।
ধরুন, কারও ভেতর কোনো বদগুণ লুকিয়ে আছে, কিন্তু অন্য মানুষ সেটা জানে না। আপনি তা জানিয়ে দিলেন। এটাকে গীবত বলে। আবার ধরুন, একজন সিগারেট খায় সবার সামনে। তাকে সিগারেটখোর বললে গীবত হবে fix না। কারণ, সে এই অন্যায়টা দেখিয়ে দেখিয়ে করে। কেউ যদি প্রকাশ্য নেশা করে আর সবাই তা জানে, তবে তার কথা বলাটা অন্যায় না। ভালো করে বুঝুন, এটা গীবত না। কিন্তু একজনের কোনো গোপন কথা বা আচরণ যদি থাকে-যা লোকে জানে না, তবে সেটা জানিয়ে দিলে গীবত হবে।
গীবত নিয়ে আলোচনা আমার মাকসাদ না। কিন্তু মানুষের সম্মানহানি করা, তিরস্কার করা, খোঁটা দেওয়া, গালি দেওয়া-এগুলো স্পষ্ট কবীরা গুনাহ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। বুখারি শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقُ
'মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকি। [১০০]
এটা শরীয়ত-বিরোধী কাজ। ফাসিকি কাজ। আপনি কারও গীবত করেছেন, কাউকে গালি দিয়েছেন, কাউকে সামনাসামনি অপমান করেছেন, বেইজ্জতি করেছেন-তাহলে আপনার জন্য ধ্বংস। আল্লাহ তাআলা একটি সূরার শুরুতেই বলেছেন,
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لِّمَرَةِ
'দুর্ভোগ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য, যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গীবতকারী। [১০১]
মুসলিমের ইজ্জত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পৃথিবীর সবথেকে দামি দিনে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মাঠে, পৃথিবীর এক দামি কাজ-হজের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, তার একটা কথা হলো, অন্যায়ভাবে কারও রক্তপাত করা, কারও মাল নষ্ট করা এবং কারও ইজ্জতে আঘাত দেওয়া তোমাদের জন্য হারাম। আজকে যেভাবে হারাম, কিয়ামত পর্যন্ত সেভাবে হারাম। আরাফার দিনে যেভাবে হারাম, অন্যদিনেও সেভাবে হারাম। এই শহরে যেভাবে হারাম, সব জায়গায় তোমাদের জন্য অন্যায় রক্তপাত করা হারাম। [১০২]
সবচেয়ে দামি জায়গায়, সবচেয়ে দামি সময়ে, সবচেয়ে দামি নবি এই ঘোষণা দিয়েছেন।
এখন তো একজন মুসলিমকে অপমান করা, বাবা হয়ে ছেলেকে অপমান করা, ছেলে হয়ে বাবাকে অপমান করা, স্বামী হয়ে স্ত্রীকে অপমান করা, স্ত্রী হয়ে স্বামীকে অপমান করা-এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে। সুযোগ পেলেই ঘটছে। এখন পারিবারিক অবস্থা দুভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা হয়ে গিয়েছে শ্বশুরালয়, আরেকটা বাবা-মায়ের ঘর। আলাদা দুটো। একটা ছেলে পক্ষ, একটা মেয়ে পক্ষ। অথচ এই দুই পক্ষ একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে, একজন আরেক জনের সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য। আর এখন দুপক্ষ হয়েছে, একজন আরেকজনের বদনাম গাওয়ার জন্য; ভুল ধরার জন্য। কে কোনটা ভুল করেছে-তা খোঁজাই যেন মাকসাদ হয়ে গেছে। তাহলে আত্মীয়তার বন্ধনে লাভ হলো কী? এর আগে তো আমরা এত বড় গুনাহের বাজার সাজাইনি। এখন তো গুনাহের বাজার সাজিয়ে বসেছি। কী খাওয়াল-না খাওয়াল, কতটা যত্ন করল, কতটা করল না-এটা নিয়ে বিশাল আলোচনার ফিরিস্তি। প্রত্যেকটা ঘর একেকটা জাহান্নামের কুণ্ডলী হয়ে গিয়েছে।
আমি ছেলেপক্ষ হয়ে মেয়েপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলি! আমি কি একবারও ভাবি না, আমারও মেয়ে আছে! আমি আজ বাবা হয়ে সন্তানের ইজ্জত রাখছি না। আমার রাগ উঠে গেছে, ব্যস। আমার সন্তানকে যা মন চায় তা-ই বলছি। সন্তানের গীবত করছি। সন্তানও বাবা-মায়ের গীবত করছে। এই যে গীবতের চর্চা চলছে-এভাবে আমরা একজন আরেকজনের ইজ্জতকে নষ্ট করছি। কিয়ামতের দিন বাবা-সন্তান একজন আরেকজনকে জান্নাতে নেবে তো দূরের কথা, একজন আরেকজনকে যেন জাহান্নামে নেওয়ার জন্য পাড়াপাড়ি করতে থাকবে।
এজন্য অবস্থার সংশোধন করা দরকার। পেছনে যা হওয়ার হয়েছে। সামনে আমরা আর গালি দেবো না, গীবত করব না, কাউকে আঘাত করব না, কাউকে কষ্ট দেবো না অন্যায়ভাবে। এই কথার প্রতিজ্ঞা করা দরকার। প্রতিজ্ঞা করার পরে আমার কাজ হলো একথা বলা যে, 'ভাই! আমি আপনাকে অমুক দিনে গালি দিয়েছি। আমি আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। আপনার নামে গীবত করেছি। আপনি যদি মাফ না করেন, আল্লাহ আমাকে মাফ করবে না।' অনেক সময় হয়তো মনে থাকে না যে, রাগবশত আমি কী বলেছি। তবুও যদি আমার আবছা আবছা মনে পড়ে যে, 'হ্যাঁ, আমি ঝামেলা করেছি, গীবত করেছি, তার নামে বদনাম গেয়েছি'-তাহলে তার কাছে এ কথা বলা জরুরি। তাকে বলতে হবে, 'ভাই! আমার তো সব মনে নেই। আমি তোমার গীবত করেছি, আমাকে মাফ করে দিয়ো।'
তাহলে প্রথম কাজ হলো, জীবনে কখনো তার গীবত করব না-এটা তাকে শুনিয়ে দেওয়া。
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া。
তৃতীয় কাজ হলো, বদনামের পরিবর্তে তার ভালো গুণগুলো উপস্থান করা। তার সুনাম করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে দুআ শিখিয়েছেন,
اللَّهُمَّ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، فَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ سَبَبْتُهُ، أَوْ لَعَنْتُهُ، أَوْ جَلَدْتُهُ، فَاجْعَلْهَا لَهُ زَكَاةً وَرَحْمَةً
'হে আল্লাহ! আমি যাকে কষ্ট দিয়েছি, বা যে মুসলিমকে গালি দিয়েছি (নবিজি গালি দেননি, আমাদেরকে শেখানোর জন্য বলেছেন), যে কষ্টই দিয়েছি, এটা তার জন্য সওয়াবের কারণ বানিয়ে দিন। মুক্তির কারণ বানিয়ে দিন। তাকে মাফ করে দিন। [১০৩]
আমাদেরকেও এমনটা বলতে হবে-'হে আল্লাহ! আমি তো আগে বুঝিনি, গীবত করলে কিয়ামতের দিন আপনি ধরবেন। মানুষকে অপমান করলে ধরবেন। হে আল্লাহ! যার যার গীবত আমি করেছি, যাকে বকা দিয়েছি, যাকে অপমান করেছি, তাদের সবার পক্ষ হয়ে আপনার কাছে তাদের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। আপনি এটাকে তাদের সওয়াবের কারণ বানিয়ে দিন।'
এরপর যার বিরুদ্ধে গীবত করেছি, তার সুনাম করতে হবে। এমন না যে, প্রতিটি মানুষেরই সুনাম-সুখ্যাতি রয়েছে। তবে তার কোনো না কোনো ভালো দিক অবশ্যই আছে। আমরা তার সেই ভালো দিকটার আলোচনা করব। এটা তার কানে অবশ্যই পৌঁছাবে। গীবত যেভাবে পৌঁছায়, সুনামও ওভাবেই যাবে। লোকে বলবে, 'আজ তো সে তোমার সুনাম করেছে।' ওর দিলটা তখন ভরে যাবে। দুআ করবে অন্তর থেকে। এভাবেই ভালোবাসা এবং মহব্বত তৈরি হবে।
গীবত, পরনিন্দা, পরচর্চা, অপমান-এগুলো সম্পর্ক ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছেলের মুখে নিন্দা শুনে বাবা অনেকসময় মন খারাপ করে বলতে থাকে—'হায় হায়! এই সন্তান জন্ম দেওয়াই আমার জন্য অন্যায় হয়েছে।' আর এই সন্তানই যখন বাবার প্রশংসা করে, বাবার বুকটা ভরে যায়। মায়ের মনটা খুশিতে নেচে ওঠে। ঠিক তেমনই দ্বীনি ভাইয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন। আমরা যখন ভাইয়ের অগোচরে তার প্রসংশা করব, তার দিলটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। এভাবে একটি ভালোবাসার সমাজ গড়ে উঠবে। সমাজ গীবতমুক্ত হবে। সমাজ না গড়তে পারলে অন্তত পরিবারকে তো ঠিক করুন। প্রতিজ্ঞা করুন যে, আমাদের পরিবারের উপমা হবে কুরআন-হাদীস যেমন চেয়েছে, ঠিক তেমন।
আফসোস! এমন পরিবার তো খুঁজেই পাওয়া যায় না। আজ একটা দ্বীনি পরিবার নেই, সমাজ নেই, রাষ্ট্র নেই।
তাহলে ইসলাম আছে কোথায়?
টিকাঃ
[১০০] বুখারি: ৪৬।
[১০১] সূরা হুমাযাহ, ১০৪: ১।
[১০২] তিরমিযি: ২১৫৯
[১০৩] মুসলিম, ৬৩৭৯
📄 গীবতের তাওবা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارُ وَلَا دِرْهَمُ
'কেউ যদি কোনো ভাইয়ের ইজ্জত নষ্ট করে থাকে, তাহলে আজকেই যেন এর সুরাহা করে, তার কাছে মাফ চেয়ে নেয়। যেদিন কোনো কিছু কাজে আসবে না, ওই দিন (অর্থাৎ কিয়ামত) আসার আগে।[১০৪]
তার মানে আমি যদি কারও গীবত করি, কারও ক্ষতি করতে চেষ্টা করি তার অজান্তে, তাহলে আগে তার কাছে যেয়ে মাফ চেয়ে নিতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আশা করি, সবাই বুঝতে পারছেন আমার কথা।
আমরা দিন-রাত কত গীবত করেছি। কত মানুষের বিরুদ্ধে কত কথা বলেছি। নিজেই হয়তো জানি না। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সন্তান এখন মায়ের বিরুদ্ধে গীবত করে, মা সন্তানের বিরুদ্ধে গীবত করে। অথচ একই ঘরে থাকে তারা। ছেলের বউয়ের ব্যাপারে গীবত চলতে থাকে, ছেলের ব্যাপারে গীবত চলতে থাকে। পরনিন্দা-পরচর্চা চলতে থাকে। কিয়ামতের দিন এই সন্তান দাঁড়িয়ে বলবে, 'হে আল্লাহ! মা আমার গীবত করেছে।' আবার মা দাঁড়িয়ে বলবে, 'হে আল্লাহ! আমার ছেলে আমার নামে গীবত করেছে।'
এভাবে পারিবারিক জীবন আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মায়ের কত ইহসান সন্তানের ওপর। সন্তান মায়ের কাছে কতই-না প্রিয়। কিন্তু একজন আরেকজনের নামে গীবত করে একে অপরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনেক নামাজ-রোজা-এগুলো কিয়ামতের দিন কাজে আসবে না। যার নামে গীবত করেছি, সে আমার কাছ থেকে সব নিয়ে নেবে।
বুখারির রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যতদিন বেঁচে আছো, তাড়াতাড়ি শুধরে নাও।'[১০৫]
জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, হে মানবমন্ডলী! তোমরা মরার পূর্বেই আল্লাহ নিকট তওবা করো এবং কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ার পূর্বেই সৎ কাজের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। তাঁর অধিক যিক্সের মাধ্যেমে তোমাদের রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে অধিক পরিমাণে দান-খয়রাত করো, এজন্য তোমাদের রিযিক বাড়িয়ে দেয়া হবে, সাহায্য করা হবে এবং তোমাদের অবস্থার সংশোধন করা হবে। তোমরা জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আমার এই স্থানে আমার এই দিনে, আমার এই মাসে এবং আমার এই বছরে তোমাদের উপর কিয়ামতের দিন পর্যন্ত জুমুআহ্ সালাত ফার্দ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি আমার জীবদ্দশায় বা আমার ইনতিকালের পরে, ন্যায়পরায়ণ অথবা যালেম শাসক থাকা সত্ত্বেও জুমুআহ্ সালাত তুচ্ছ মনে করে বা অস্বীকার করে তা বর্জন করবে, আল্লাহ তার বিক্ষিপ্ত বিষয়কে একত্রে গুছিয়ে দিবেন না এবং তার কাজে বরকত দান করবেন না। সাবধান! তা সালাত, যাকাত, হাজ্জ, সওম এবং অন্য কোন নেক আমার গ্রহণ করা হবে না যতক্ষণ না সে তওবা করে। যে ব্যক্তি তওবা করে আল্লাহর তাআলা তার তওবা কবুল করেন। সাবধান! নবী পুরুষের, বেদুইন মুহাজিরের এবং পাপাচারী মু'মিন ব্যক্তির ইমামতি করবে না। তবে স্বৈরাচারী শাসক তাকে বাধ্য করলে এবং তার তরবারি ও চাবুকের ভয় থাকলে স্বতন্ত্র কথা। [১০৬]
শুধু শুধরালেই হবে না। মাসআলা হলো, আজকের পর থেকে ওই লোকের বিরুদ্ধে আর কোনো গীবত করা যাবে না। যাদের কাছে গীবত করা হয়েছিল, তাদের কাছে ওই লোকের ব্যাপারে সুনাম করতে হবে। বলতে হবে—‘ভাই! লোকটা অনেক ভালো। আসলে আমিই বুঝতে পারিনি।' এটা জরুরি।
মায়ের নামে বদনাম করলে তার কাছে যেয়ে বলতে হবে, 'আম্মু! আমি ভুল করেছি। বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা।' এভাবে যেয়ে তার ভালো গুণের কথা বলতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে-'হে আল্লাহ! আপনি গীবত করতে নিষেধ করেছিলেন। নিষেধ করার পরেও আমি গুনাহের কাজ করেছি। দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন।'
এখানে তাহলে কয়টা কাজ হলো? ১. ক্ষমা চাওয়া ২. তাওবা করা
১. ক্ষমা চাওয়া
কাউকে গালি দিলে, গীবত করলে, তার কাছে প্রথমে মাফ চান। মাফ চাইলে কি আপনার ইজ্জত কমে যাবে? বাবা-মাও যদি সন্তানের গীবত করে, তবে তাদেরকেও মাফ চাইতে হবে সন্তানের কাছে।
এখন বলতে পারেন, 'বাবা-মা আবার মাফ চাইবে কেন? এটা কেমন কথা?' তারা যে আল্লাহর কথা লঙ্ঘন করেছে, তাহলে মাফ চাইবে না?
তবে বলে রাখা প্রয়োজন যে, মাফের ধরন নিয়ে আমরা প্রায়শই ভুল বুঝে থাকি। এদেশে মাফ মানে হলো পা ধরা। কোথা থেকে আসল এই বাজে রীতি? হাদীসে এটা নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কেউ পা ধরে মাফ চেয়েছে। এটা তো ফালতু একটা কাজ। কোথা থেকে এসেছে কে জানে! অথচ মাফ চাওয়া মানে হচ্ছে— 'এই অন্যায় আমি আর করব না। আমি ভুল করেছি, আর এই ভুল রিপিট করব না।' এরপর বাকি জিন্দেগিতে এটা প্রমাণ করে দেওয়া যে—'আমি ভালো হয়ে গিয়েছি।'
এটাকে মাফ বলে। মাফ চাওয়া মানে জবান দিয়ে বলা যে, 'আমি ভুল করেছি।' সন্তানের কাছে বললে সন্তান শিখবে। বুঝবে যে, অন্যায় হলে ভুল স্বীকার করতে হয়। এতে করে বাবা-মা সন্তানের কাছে বড় হবে, ছোট হবে না।
২. তাওবা করা
মাফ চাওয়ার পর, তার সুনাম করার পর, আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। এটা হলো তাওবার সুরত।
হাদীসটা যেন আমরা মাথায় রাখি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطْرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ
'আমার উম্মতের মধ্যে সে-ই প্রকৃত গরিব, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হক তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না যায়, সেই ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [১০৭]
টিকাঃ
[১০৪] বুখারি: ২৪৪৯
[১০৫] রিয়াদুস সলেহিন, হাদিস নং ৯৪
[১০৬] সুনানে ইবনে মাজাহ, ১০৮১; যঈফ। তাখরীজ আলবানী: ইরওয়াহ ৫৯১।
[১০৭] মুসলিম, ৬৩৪৩।
📄 নামাজ কাযার তাওবা
আমাদের ওপর আল্লাহর কী কী হক আছে-সেটার একটা তালিকা আছে। সব হক নিয়ে তো আলোচনা সম্ভব না, তাই উদাহরণ দিয়ে বলছি। ফরজকে আদায় করা যেমন ফরজ, তেমনই ফরজকে ফরজ মানাও ফরজ। একইভাবে যে ফরজ আমার থেকে ছুটে গিয়েছে-সেটার তালিকা বানানোও ফরজ। আল্লাহর হক হলো, আমি যেদিন থেকে বালেগ হয়েছি, সেদিন থেকে আমি নামাজকে যথার্থভাবে পড়েছি কি না। মনে করুন, কেউ বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হয়েছে বারো বছর বয়সে। তো সেই সময় থেকে ছুটে যাওয়া নামাজের হিসাব শুরু করতে হবে।
জন্মতারিখের কথা মনে রাখি বা না রাখি, আমি কবে বালেগ হয়েছি, আমার সেটা জানা থাকা লাগবে। পিতা-মাতার জন্য সন্তানের এই খোঁজখবর রাখা জরুরি। এভাবে সন্তানকে সজাগ করা জরুরি-'এখন থেকে তোমার ওপর আল্লাহর হক আছে। তোমাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে।' আমি যদি এভাবে তাকে সতর্ক করতাম, তাহলে কোনো ওজরের কারণে যদি তার নামাজ ছুটে যেত, তাহলে কবে কয় ওয়াক্ত নামাজ ছুটে গিয়েছে-সেটার হিসেব তার কাছে থাকত। শরীয়তে ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়ার সুযোগই নেই। অনিচ্ছায় যদি আমার কোনো নামাজ ছুটে যায়-ওজরের কারণে, ঘুমের কারণে-তবে ওই নামাজের হিসেব আমার জানা থাকতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবাদের যুগে এই কল্পনাই ছিল না যে, মানুষ ইচ্ছা করে নামাজ ছাড়তে পারে। নিজেকে মুসলিম দাবি করব, আবার নামাজ ছেড়ে দেবো! এটা হতেই পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবাদের যুগে যারা দিলে দিলে কাফির ছিল, তাদেরকে বলে মুনাফিক। ওরাও এই কথা বুঝত যে, মুসলিম পরিচয় দেওয়ার পর কোনো ফরজ ছুটে যাবে, নামাজ ছুটে যাবে-এটা সম্ভব না। এজন্য ওরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পেছনে নামাজ পড়ত। তার মানে, ওই সময়ে কোনো মুনাফিকও ইচ্ছা করে কোনো নামাজ কাযা করেনি। মুনাফিক কাকে বলে? যে আল্লাহকে পছন্দ করে না, যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসে না, যে দ্বীনকে দিল থেকে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু এমন অবস্থায়ও সে নামাজ কাযা করেনি। অর্থাৎ নিজেকে মুসলিম দাবি করার পর কেউ নামাজ কাযা করতে পারে, এই কথা ওই যুগের মুনাফিকরাও জানত না; বরং কাযা ছিল অনিচ্ছায়। তাই আমার জীবনে যদি কোনো সময় কোনো ওয়াক্তের নামাজ ছুটে যায়, তবে সেটার কাযা আদায় করতে হবে।
এখন, ছুটে যাওয়া ফরজ নামাজের তালিকা করুন আপনি। যদি আপনার কাছে নিশ্চিতভাবে জানা না থাকে, তাহলে আপনি কবে বালেগ হয়েছেন-তা ধারণা করুন। এরপর দেখবেন, বালেগ হওয়ার পর থেকে নিয়ে এখন আপনার বয়স কত। এই বয়সে আপনি দেখলেন যে, জীবনের প্রায় পনেরো-ষোলো কী বিশ-পঁচিশ বছর এমন গেছে যে, আপনি নামাজ পড়েননি। আগের যুগে মুনাফিকদের এই সুযোগ ছিল না, কিন্তু এখন এই সুযোগ হয়ে গেছে। আমরা বানিয়ে নিয়েছি। এখন আমি যে পনেরো বছর নামাজ পড়লাম না, সেই পনেরো বছরের নামাজের কাযা আদায় করা আমার জন্য জরুরি।
এখন আপনি যদি মনে করেন, আমার নামাজ কাযা হয়েছে পনেরো বছর, ওই হিসাবে আমি এতদিনের নামাজ পড়ব কিভাবে! এক কাজ করি, আমি এই পনেরো বছরের নামাজের বদলে প্রতিদিন মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত সালাতুত তাওবা পড়া শুরু করি। আর আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া শুরু করি- 'আল্লাহ, আপনি আমাকে মাফ করে দিন।'
না, এটাকে তাওবা বলে না। আমার ওপর যে নামাজ কাযা আছে, আমাকে তা আদায় করতে হবে। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কাযা আদায় করতে থাকব। এরপরও যদি দেখি, মৃত্যুর আগে মাত্র পাঁচ বছরের নামাজ আদায় করেছি, আরও দশ বছরের কাযা নামাজ বাকি, আমি সন্তানের কাছে এই দশ বছরের নামাজের ওসিয়ত করে যাব- 'বাবা, আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর ফিকির করো।' বাঁচানোর তরিকা কী? তরিকা হলো বাকি দশ বছরের ফিদিয়া সন্তানরা দিয়ে দেবে। প্রত্যেকদিন ছয় ওয়াক্ত হিসাব করে ফিদিয়া দিতে হয়। নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু ফিদিয়া ছয় ওয়াক্তের। অতিরিক্ত হচ্ছে বিতরের ফিদিয়া। বিতরও ওয়াজিব, তাই ফিদিয়া। এক দিনে ছয় ওয়াক্তের দিতে হবে। ছয় ওয়াক্তের হিসাব করে আমার সন্তানদেরকে বলে যেতে হবে যে-'বাবা, আমার এই সম্পত্তি আছে। এই সম্পত্তি থেকে তুমি আমার এই ওসিয়ত পূর্ণ করে দিয়ো।'
অথবা মনে করুন, আমার সম্পত্তি এই পরিমাণ নেই-যা দিয়ে আমার এই নামাজের কাফফারা হবে। তাহলে আমার সন্তানের হাত ধরে বলতে হবে- 'বাবা, তুমি পারলে এটা আদায় করে দিয়ো। আমি তো জীবনে তোমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছি। কবরে আমি আমার নামাজের হিসাব দিতে পারব না। আগে বুঝিনি যে, নামাজ পড়া আমার জন্য এত জরুরি। বুঝলেও এত গুরুত্ব দিইনি। যেদিন থেকে বুঝতে পেরেছি, সেদিন থেকে আমি নামাজ আদায় করা শুরু করেছি। কিন্তু আমার এইটুকু নামাজ ছুটে গেছে, তোমরা দয়া করে এর ফিদিয়ার টাকাটা আদায় করে দিয়ো।'
ওসিয়ত করা জরুরি। কেউ যদি এই অবস্থায় মারা যায় যে, টাকা দিয়ে ওসিয়ত করে গেছে, কিন্তু টাকা এখনো বাকি আছে, আশা করা যায় আল্লাহ তাকে মাফ করবেন।
তরিকা ছিল এটা যে, আমার বাবার কত ওয়াক্ত নামাজ ছুটে গেছে-তা হিসাব করে আমি ফিদিয়া আদায় করে দেবো। এটা না যে, আমার নামাজ ছুটে গেছে, এখন আমি মসজিদে গিয়ে তাওবা করি, শবে বরাত, শবে কদর, রমজানে ইবাদত করি। তাওবার সুরত হচ্ছে হিসাব করা। অথবা হিসাব না জানলে অনুমান করা ও কাযা আদায় শুরু করা। আপনি নামাজ পড়া শুরু করুন, আর তালিকা করুন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ-ফজর, যুহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং বিতর-সহ পড়তে থাকুন। নিয়ত এটা করতে হবে- 'হে আল্লাহ! আমার তো হিসেব জানা নেই। আমি এত গাফেল যে, আমার হিসাবই জানা নেই। আমি আর গাফিল হব না। আর এই ধরনের গাফিলতি হলে হিসাব রাখব।' এরপর পুরোপুরি হিসাব রেখে আল্লাহ রব্বুল ইযযাতের কাছে নামাজে দাড়িয়ে এই কথা বলতে হবে-'হে আল্লাহ! আমার জীবনে যত নামাজ কাযা হয়েছে, এর প্রথম ফজর পড়ছি।'
আবার যুহরের সময় বলতে হবে- 'হে আল্লাহ! আমার জীবনে যত নামাজ কাযা হয়েছে, এর প্রথম যুহর পড়ছি।' একইভাবে আসরের সময় বলতে হবে 'প্রথম আসর', মাগরিবের সময় 'প্রথম মাগরিব'। একটা আদায় হয়ে গেলে, এর পরে যেটা থাকবে-ওটাও তো প্রথমই হয়ে যাবে। মনে করুন, এক হালি কলা সিরিয়াল অনুযায়ী সাজানো আছে-১, ২, ৩, ৪। এর মাঝে প্রথমটা সরিয়ে নিলে দ্বিতীয়টা প্রথম হয়ে যাবে না? আবার দ্বিতীয়টা সরিয়ে দিলে তৃতীয়টা প্রথম হয়ে যাবে, তৃতীয়টা সরিয়ে দিলে চতুর্থটা প্রথম হয়ে যাবে। একইভাবে আপনি যখন কাযা নামাজগুলো আদায় করতে থাকবেন, প্রথম কাযা নামাজটা আদায় করার পর যেটা থাকবে, সেটা প্রথম হয়ে যাবে। এভাবেই নিয়ত করে প্রথম কথাটা মনে রাখতে হবে। আরও বিভিন্ন তরিকা আছে, এটা মনে রাখার একটা তরিকা। এভাবে নামাজ আদায় করতে থাকবেন। আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা কবুল করে নেবেন। বিগত দিনের নামাজ ছাড়ার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমিন।